🌑 অন্ধকারের অধিকার
অধ্যায় ১: যে ছায়া নাম ধরে ডাকে
চট্টগ্রামের আকাশ সেদিন অস্বাভাবিকভাবে ভারী ছিল।
মেঘগুলো শুধু বৃষ্টি নামানোর জন্য জমেনি—মনে হচ্ছিল তারা কোনো অজানা গোপন কথা চাপা দিয়ে রেখেছে।
ঈশিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।
হাতে গরম কফির কাপ, সামনে ভেজা রাস্তা, আর মাথার ভেতর পুরনো স্মৃতির শব্দ।
সে নিজেকে শক্ত বানিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই।
কারও ওপর ভরসা করে না।
কারও জন্য কাঁদে না।
কারণ তিন বছর আগে—
একটা সম্পর্ক তাকে শিখিয়ে দিয়েছে, ভালোবাসা মানেই নিরাপত্তা নয়।
হঠাৎ তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন।
Unknown Number
মেসেজ—
“তুমি এখনো বৃষ্টির সময় জানালার পাশে দাঁড়াও।”
তার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে নিচে তাকাল।
রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
কিন্তু বিপরীত দিকের বিল্ডিংয়ের ছাদে একটা ছায়া যেন নড়ল।
আবার মেসেজ—
“তোমার ভয়টা এখনো আগের মতোই সুন্দর।”
ঈশিতার আঙুল কাঁপছিল।
সে লিখল— “আপনি কে?”
সেন্ড করার সাথে সাথে কল।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ।
তারপর গভীর, ধীর একটা কণ্ঠ—
“তুমি আমার কণ্ঠ ভুলে যাওনি, ঈশিতা।”
তার শরীর জমে গেল।
“কে আপনি?”
হালকা একটা হাসি।
“তুমি প্রশ্ন করো… কিন্তু উত্তর তো তুমি জানো।”
কল কেটে গেল।
ঠিক তখনই—
টক… টক… টক…
দরজায় শব্দ।
ঈশিতার গলা শুকিয়ে গেল।
সে ধীরে দরজার কাছে গেল।
হাত কাঁপছিল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে একজন।
কালো হুডি, ভেজা চুল, চোখে অদ্ভুত ঠান্ডা স্থিরতা।
“মিস ঈশিতা,” সে শান্ত স্বরে বলল,
“আমাকে এত সহজে ভুলে গেলে?”
ঈশিতা এক পা পিছিয়ে গেল।
“আপনি কে?”
ছেলেটা ধীরে হুড খুলল।
নিহাল।
নামটা তার মাথার ভেতর বজ্রপাতের মতো বাজল।
তিন বছর আগে—
স্কুলের শেষ বর্ষ।
নিহাল ছিল চুপচাপ, কিন্তু অদ্ভুত রকমের তীব্র।
যে কাউকে কাছে টানতে পারে, আবার মুহূর্তেই ভয় পাইয়ে দিতে পারে।
তাদের সম্পর্কটা খুব দ্রুত গভীর হয়েছিল।
নিহাল তাকে বলত—
“তুমি আমার পৃথিবীর একমাত্র আলো।”
কিন্তু সেই আলোর ভেতরেই ছিল অন্ধকার।
এক রাতে—
স্কুলের পুরনো ল্যাবের সামনে ঈশিতা দেখেছিল নিহালের শার্টে রক্তের দাগ।
পরদিন খবর—
একজন সিনিয়র ছাত্র গুরুতর আহত।
কেউ কিছু প্রমাণ করতে পারেনি।
কিন্তু ঈশিতা ভয় পেয়েছিল।
আর ভয় থেকেই—
সে একদিন হঠাৎ করে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
বাসা বদলায়।
নাম্বার বদলায়।
শহর বদলাতে চায়।
কিন্তু আজ—
নিহাল তার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
“তুমি পালাতে পারো,” নিহাল ধীরে বলল,
“কিন্তু আমার থেকে না।”
তার চোখে অদ্ভুত শান্ত রাগ।
“তুমি আমার বাসার ঠিকানা কীভাবে জানলে?” ঈশিতা ফিসফিস করল।
নিহাল সামান্য এগিয়ে এলো।
“যে জিনিসটা নিজের হয়… তাকে খুঁজে পেতে সময় লাগে, কিন্তু অসম্ভব না।”
ঈশিতার বুক কাঁপছিল।
“আমি তোমাকে ভয় পাই।”
নিহাল থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর খুব নিচু স্বরে—
“আমি তোমাকে আঘাত করতে আসিনি।
আমি এসেছি জানতে… কেন তুমি আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করোনি, সেদিন আসলে কী হয়েছিল।”
বাইরে বজ্রপাত হলো।
ঈশিতা কাঁপা গলায় বলল,
“তুমি কী করেছিলে?”
নিহালের চোখ অন্ধকার হয়ে গেল।
“যে তোমাকে অপমান করেছিল… তাকে শুধু থামিয়েছিলাম।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ঠিক তখনই ঈশিতার ফোনে আরেকটা মেসেজ এলো।
অন্য একটা অচেনা নাম্বার থেকে—
“তাকে বিশ্বাস কোরো না। সে তোমাকে ব্যবহার করছে।”
ঈশিতার হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
নিহাল মেসেজটা দেখল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“সে আবার শুরু করেছে…” সে ধীরে বলল।
“কে?” ঈশিতা জিজ্ঞেস করল।
নিহাল তাকাল তার দিকে।
চোখে এমন এক ঝড়—
যেন শুধু ভালোবাসা না, আরও কিছু আছে।
“যে সত্যিটা তুমি এখনো জানো না।”
বাইরে বৃষ্টি নামতে শুরু করল।
আর ঈশিতা বুঝতে পারল—
তার জীবনে অন্ধকার আবার ফিরে এসেছে।
কিন্তু এবার সে শুধু ভয় না…
কিছু একটা টানও অনুভব করছে।
আর সেই টানটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
34
View