Posts

গল্প

ছায়া সংলাপ

March 2, 2026

সুদীপ্ত সাব্বির

21
View

ধরণ: অন্তরঙ্গ নাট্য 

দৈর্ঘ্য: প্রায় ১০-১২ মিনিট

চরিত্র:

অনামিকা (২৮): চিন্তাশীল, শিল্পী মনস্ক, কিছুটা অভিমানী।

অরিত্র (৩০): ব্যবহারিক, স্থপতি, কিছুটা দায়িত্ববোধের কারণে আবেগ চেপে রাখতে অভ্যস্ত।

লোকেশন: একটি পুরনো ফ্ল্যাটের ছাদ। সন্ধ্যা গড়িয়ে সূর্য ডুবছে। আকাশে কমলা-নীলের মিশেল।

 

দৃশ্য ১

১.১. ছাদ / সন্ধ্যা


[চিত্রায়ণ: ছাদের এক কোণে একটি পুরনো দেওয়াল, যার গায়ে জীর্ণ পানের দাগ। পাশেই কয়েকটি কাপড় শুকোতে দেওয়া তার। আকাশে সূর্যাস্তের রং ছড়িয়ে পড়ছে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে নিচ থেকে উপর তুলে দেখায়—একটি চেয়ারে বসে আছে অনামিকা। হাতে একটি স্কেচবুক, পেন্সিল। সে ছাদের প্যারাপেটের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আঁকছে না।]

[পায়ের শব্দ। ক্যামেরা ঘুরে যায়। সিঁড়ির দরজা দিয়ে ছাদে ওঠে অরিত্র। তার হাতে একটি মগ। গরম চায়ের ধোঁয়া উঠছে।]

অরিত্র: (একটু থেমে) এই যে... চা দিলাম। ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

[অনামিকা ঘুরে তাকায়। তার চোখে একটু অবাক ভাব। নীরবে মগটা নেয়। আঙুলের ছোঁয়ায় দুজনের হাত লাগে। একটি ক্ষুদ্র স্পন্দন। অনামিকা চোখ নামিয়ে নেয়।]

অনামিকা: (চায়ে চুমুক দিয়ে) ধন্যবাদ। তুমি এখনো এলে? ভাবলাম অফিসেই থাকবে।

অরিত্র: (কাঁধ ঝাঁকিয়ে) কাজ ফুরিয়েছিল। তাই... (একটু থেমে) কী আঁকছ?

অনামিকা: কিছু না। শুধু... সময় কাটাচ্ছি।

[চিত্রায়ণ: অরিত্র অনামিকার পাশের একটি পুরনো বেঞ্চে বসে। দুজনের মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব। শহরের দূরের আলোগুলো জ্বলতে শুরু করেছে।]

১.২. ছাদ / আলো-আঁধারি

[অনামিকা তার স্কেচবুক বন্ধ করে রাখে। কিছুক্ষণ নীরবতা।]

অনামিকা: (চায়ের মগে চোখ রেখে) কালকের কথাটা... ঠিক ছিল না।

অরিত্র: কোন কথা?

অনামিকা: তুমি জানো কোনটা। আমি যখন বললাম, আমার ইচ্ছেগুলোকে তুমি গুরুত্ব দাও না, তুমি তখন হেসে উড়িয়ে দিলে। সেটা খারাপ লেগেছিল।

অরিত্র: (দীর্ঘশ্বাস) আমি হাসিনি। আমি শুধু... বোঝাতে চেয়েছিলাম, সব ইচ্ছে পূরণ হয় না, অনামিকা। ব্যবহারিক দিকটাও দেখতে হয়।

অনামিকা: (চোখ তুলে তাকায়) কিন্তু আমার আঁকার টেবিলটা কেনার জন্য জেদ করাটা কি খুব বেশি ব্যবহারিক ছিল? না কি সেটাও অপ্রয়োজনীয় ছিল?

[অরিত্র কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। তার চোখে এক ধরনের ক্লান্তি ও অনুশোচনা মেশানো ভাব।]

অরিত্র: টেবিলটা... আমি নিয়ে দেব। জানো তো, এখানে জায়গাটা একটু ঠিক করলেই...

অনামিকা: (মৃদু হেসে) না অরিত্র, টেবিলের জন্য বলছি না। আমি বলছি, তুমি আমার কথার মর্মটুকু বোঝার চেষ্টা করছো কিনা। টেবিলটা একটা উদাহরণ মাত্র।

১.৩. ছাদ / কাছাকাছি

[চিত্রায়ণ: অরিত্র ধীরে ধীরে অনামিকার পাশে সরে আসে। বেঞ্চের উপর তাদের দুজনের হাতের মাঝে ব্যবধান কমে আসে। বাতাসে চায়ের গন্ধ মিশে আছে।]

অরিত্র: (নিচু স্বরে) আমি বোঝার চেষ্টা করি। সত্যিই করি। কিন্তু কখনো কখনো শব্দ খুঁজে পাই না। কী বললে তুমি ঠিক বুঝবে, কী বললে আঘাত লাগবে না—এই ভয়ে চুপ করে থাকি। আর তুমি সেটাকে অভিমান করে নাও।

[অনামিকা তার দিকে তাকায়। দুজনের চোখাচোখি হয়। এ যেন এক অন্য ভাষায় কথা বলা।]

অনামিকা: আজ কেন এলে তাহলে? শুধু চা দিতে?

অরিত্র: (একটু ইতস্তত করে) না। তোমাকে দেখতে। তুমি যখন ছাদে থাকো, তখন মুখে একটা অন্য রকম শান্তি আসে। সেটা দেখতে ভালো লাগে। মনে হয়, তুমি ঠিক আছো।

[অনামিকার চোখ ছলছল করে। সে চোখের কোণ মুছে ফেলে।]

অনামিকা: আমি ঠিক নেই, অরিত্র। তবুও ভালো আছি। কারণ তুমি আছো। এটাই কি সম্পর্কের সংজ্ঞা নয়? ঠিক না থাকাও, একসঙ্গে ভালো থাকা?

১.৪. ছাদ / গোধূলি লগ্ন

[অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। শহরের আলোগুলো স্পষ্ট হয়। বাতাস দ্রুত বইতে থাকে। অনামিকা শিউরে ওঠে। অরিত্র তার নিজের শার্ট খুলে অনামিকার কাঁধে জড়িয়ে দেয়। এখন তার পরনে শুধু একটি সাদা গেঞ্জি।]

[চিত্রায়ণ: ক্যামেরা ক্লোজ-আপে যায়—অরিত্রের হাত অনামিকার কাঁধে রাখা। অনামিকা তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখে। কোনো কথা নেই। শুধু এই স্পর্শই বলে দেয় সব। ক্ষমা, ভালোবাসা, আর একে অপরের প্রয়োজনীয়তা।]

অরিত্র: (ফিসফিস করে) চলো, নিচে চলি। এখানে ঠাণ্ডা লাগবে।

অনামিকা: (মাথা নাড়া) একটু দাঁড়াও। এই মুহূর্তটা শেষ হোক।

[অরিত্র দাঁড়িয়ে থাকে। অনামিকা মাথা হেলিয়ে তার কাঁধে রাখে। দুজনে মিলে তাকিয়ে থাকে শহরের আলো-আঁধারির দিকে।]

দৃশ্যের শেষ: ক্যামেরা ক্রেন শটে উপরে উঠে যায়—ছাদের উপর দুটি মানবমূর্তি, একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে, যেন নগরীর কোলাহলের মাঝেও তারা তাদের নিজস্ব এক জগৎ তৈরি করে নিয়েছে।

ফেইড আউট।


 

Comments

    Please login to post comment. Login