ক্যাম্পাস-প্রেম,পর্ব২৪
হুমায়ূন কবীর
আমার পাশের সিটে বসে আছে তৌফিক।আমাদের মাইক্রোবাসটি ঢাকা -খুলনা রোড ধরে ছুটে চলেছে, ঝিনাইদহের দিকে। উদ্দেশ্য ঝিনাইদহ জেলখানা। সেখানে এক রাজনৈতিক বড় ভাইকে দেখতে যাচ্ছি। তৌফিক আমার কপালে হাত দিয়ে বলল- তোর তো আবার জ্বর এসেছে। অনেক জ্বর। তোর না আসায় ভালো ছিল। শরীরটা এভাবে শেষ করিস না।
আমি রেগে যেয়ে বললাম- ভালো না লাগলে তুই নেমে যা। শরীর আমার, জীবন আমার, মন আমার - আমি কি করবো সেটা আমি বুঝবো। আমি যা খুশি তাই করব।
তৌফিক- রেগে যাচ্ছিস কেন? মেজাজ দেখাচ্ছিস কেন?
তুষার- তে কি, তোর সাথে খোশ গল্প করতে হবে?
তৌফিক - তোর মেজাজ আর বেশি দিন থাকছে না।
তুষার- কেন?
তৌফিক- তোর বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে।
বলেই পকেট থেকে একটা ছবি বের করে আমার চোখের সামনে মেরে ধরল। আমি দেখলাম ছবিটা শিউলির। একটা লাল পেড়ে শাড়ি,হাতা কাটা হালকা রঙের ব্লাউজ। তাকে খুব চমৎকার লাগছে। কিরকম পটল চেরা দুটো চোখ মেলে সে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
তুষার - এ ছবি তুই কোথায় পেলি?
তৌফিক- আমি পরশু তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোদের গ্রামে আমার ফুফু বাড়ি না? সেখান থেকে ফেরার পথে তোদের বাড়ি গিয়েছিলাম। তোর মা অনেক কথা বলল। কান্নাকাটি করলো। তোর শোকে সে মৃতপ্রায়। শেষে এই ছবিটা আমার হাতে দিয়ে বলল, দেখো বাবা, বলে কয়ে তুষারকে রাজি করাতে পারো কিনা? বিয়ে দিলে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
তুষার মা ছবি দিলার তুই নিয়ে এলি
তৌফিক কেন কি হয়েছে সেলাই করার চাদর মাথায় তো শুতে পারিস
ছবিটা তৌফিক এর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে চলন্ত মাইক্রোবাসে জানালা দিয়ে রটান মেরে ফেলে দিলাম। পরক্ষণেই চমকে উঠলাম। এটা কি করে হলো? ছবিটা ঘুরতে ঘুরতে যে পড়ল রাসমিনদের বাড়িতে যাওয়া পথের উপর।এই পথ ধরে কিছুদূর গেলেই রাসমিনদের বাড়ি।
পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম।
তৌফিক বললো - কিরে, সামনের ছিটে বড় ভাইরা আছে না?
তুষার- আরে,রাখ তোর বড় ভাই।
কেউ কিছু বলল না।নিজের ইচ্ছে মত সিগারেট টানতে লাগলাম। সামনের সিটে বসা এক বড় ভাই বলল- তুষার তুই ৩০ মিনিটে পাঁচটা সিগারেট খেয়েছিস ধোয়াই থাকা কষ্ট যদি।যদি বেশি নেশা লাগে, ডাইল খা।ডাইল খাবি?
তুষার- দেন।
বড় ভাই হেসে যত্ন করে এক বোতল ফেনসিডিল এগিয়ে দিল। দ্রুত মুটকি খুলে ঢক ঢক করে শেষ করলাম। আহ্ কি শান্তি। প্রাণটা জুড়িয়ে গেল।
তৌফিক টানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল- সিগারেট, মদ, ফেনসিডিল কিছুই বাদ দিচ্ছিস না। হিরোইন ধরবি কবে?
আমি স্মিত হেসে বললাম, দেখি যত তাড়াতাড়ি ধরা যায়।
তৌফিক- একটা মেয়ের জন্য তোর এত কিছু? যার জন্য তুই তোর জীবন ধ্বংস করছিস, যার জন্য তুই এত কষ্ট করছিস, নিজেকে শেষ করছিস সে কিন্তু তোকে নিয়ে একটুও ভাবছে না। অথচ তুই তার জন্য কষ্ট পাচ্ছিস। নিজেকে তিলে তিলে শেষ করছিস।
তুষার- তার কাজ সে করছে, আমার কাজ আমি করছি।
তৌফিক -ও তোর কাজ নেশা করা? খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু , একটা কথা তোকে বুঝতে হবে রাসমিন তো তোকে ভালবাসে না।
তুষার- না বাসুক।
তৌফিক - তাহলে যে কাজটা তুই রাশমিনের জন্য করছিস, সে কাজটা একটাও ধাড়ী ছাগলের জন্যও করতে পারিস।
তুষার- মানে, তোকে কিন্তু ধাক্কা মেরে মাইক্রো থেকে ফেলে দেবো।
তৌফিক- রাগছিস কেন? শোন, তুই যার জন্য জীবনপাত করছিস, সে কিন্তু এ ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। সে নির্বিকার, ঠিক জড় পদার্থের মত, অবলা প্রাণীর মতো। একটা ছাগলকেও যদি ভালবেসে দুদিন ঘাস পানি খাওয়াতিস একটা ফল পেতিস । কিন্তু তুই এমন একজন মানুষকে ভালোবেসেছিস যার কাছে এর কানাকড়িও মূল্য নেই। হায় তোর ভালবাসা, হায় তোর কপাল।
তুষার - শোন, ফালতু প্যাচাল করিস না। যদি আমার মত প্রেমে পড়তিস, তবে বুঝতিস - কিভাবে একজন চন্ডীদাস ১২ বছর বড়শি ফেলে বসে থাকতে পারে। কত ধৈর্য থাকলে একজন মানুষের মন না জেনেও১২ বছর তার জন্য প্রতিক্ষা করা যায়।