Posts

প্রবন্ধ

দোল পূর্ণিমা: উৎসব থেকে আত্মউদ্বোধন

March 5, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

43
View
Holi: How this Hindu celebration of triumph, colour and food connects me to  my childhood in West Bengal | CN Traveller
রঙের উল্লাসে ভেসে ওঠা প্রাচীন ঐতিহ্যের দেশ-ভারত।

দোল পূর্ণিমা বাঙালির জীবনের যেমন প্রাণের মিলনমেলা ঠিক তেমনি আত্মা শুদ্ধিকরণের অন্যতম পন্থা। বিভিন্ন রঙের সমন্বয়ে মনের অন্ধকার দূর হয়ে যায় এই দোল পূর্ণিমায়। তাই দোল পূর্ণিমা যেনো সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে জীবনকে নতুন রঙে রাঙিয়ে রঙিন জীবনে প্রবেশ করার মাধ্যমও বলা হয়। আভিধানিক অর্থে যাকে বলে বসন্তের রঙের উৎসব থেকে জীবনের আত্মউদ্বোধন।দোলযাত্রা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অতি পবিত্র একটি দিন।দোলপূর্ণিমা হিন্দুধর্মের জন্য খুব শুভ বলে মনে করা হয়।“উপমহাদেশজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া ফাল্গুনী পূর্ণিমার দোল উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ব্যাপক জনপ্রিয়তায় উজ্জ্বল এক সাংস্কৃতিক উৎসব।”

দোল পূর্ণিমা বা হোলি শুধু বাংলাদেশ নয়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয় এবং পালন করা হয়। উপমহাদেশের নামকরণের দিকে যদি নজর দেওয়া যায় তাহলে ভারতের উড়িষ্যায় দোলোৎসব, উত্তর ও মধ্যভারতে হোলি বা হোরি, গোয়া ও কঙ্কণ অঞ্চলে শিমাগা, দক্ষিণ ভারতে কামায়ন। উত্তর ভারতে হোলি উৎসবটি বাংলার দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়।মূলত দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব। নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও ‘জৈমিনি মীমাংশা’য় রং উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। পুরাণমতে ৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের এক শিলালিপিতে রাজা হর্ষবর্ধন কর্তৃক ‘হোলিকোৎসব’ পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। হর্ষবর্ধনের নাটক ‘রত্নাাবলী’তেও হোলিকোৎসবের উল্লেখ আছে। “বহু লোককথা, পুরাণ ও ঐতিহাসিক উপাখ্যানের আবহে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালিত হয়ে আসছে দোল উৎসব।”

Photo: Focus Bangla
রঙের ছোঁয়ায় আবেগ,ভালোবাসা আর সংস্কৃতির মিলনভূমি-বাংলাদেশ।

দোলের আরো একটি মহত্ত্ব যেনো দোলের গান। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বড্ড সিনেমা রসিক মানুষ আমি। দোল পূর্ণিমার তাৎপর্যপূর্ণ নিয়ে বিভিন্ন সিনেমায় ভিন্নতার সহিত অনেক গান  প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু যে গান সবসময় পবিত্র, শুদ্ধতা বয়ে নিয়ে আসে এবং মনের জমানো অভিমান ভুলে যেতে সাহায্য করে তা হলো ‘শোলে’ সিনেমায় জয়া ভাদুড়ি মুখে ধ্বনিত হয়েছিল, ‘হোলি হ্যায় ভাই হোলি ভাই, বুরা না মানো হোলি হ্যায়।’ আর দোল উৎসব রাগার তো সুযোগই নেই। কারণ, রঙের আক্রমণ বিভিন্ন দিক থেকে হবেই। আর এ সত্যি প্রেমের উৎসব। এই উৎসবের সমাগমে কেউ কাউকে চিনে না, ভবিষ্যতে আর কোনো দিন দেখাও হয়নি, কারোর নামটাও জানা হয়না আবার এখান থেকেই শুরু হয় নতুন রঙের মাধ্যমে নতুন বন্ধুত্বের সূত্রপাত।কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু অচেনা মুখ মনে গেঁথেই যায় কারণ দোল উৎসবে তারা এক দিনের জন্য ভালোবেসে, আবেশে রাঙিয়ে দিয়েছিল আবিরে।সমাজের সব অশুভ শক্তির বিপরীতে শুভ শক্তির বিস্তার বা বিজয় লাভ করা এবং সকলের সাথে সকলের আনন্দপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এই উৎসবের প্রধান উদ্দেশ্য। দোল উৎসবের অনুষঙ্গে ফাল্গুনী পূর্ণিমাকে দোলপূর্ণিমা বলা হয়। আবার এই পূর্ণিমা তিথিতেই চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম বলে একে গৌরপূর্ণিমা নামেও অভিহিত করা হয়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমা বা দোলপূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির বা গুলাল নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীগণের সঙ্গে রং খেলায় মেতেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি হয়।পৌরাণিক উপাখ্যান ও লোককথামতে উৎসকে “বসন্ত উৎসব” হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে জানিয়ে রাখি, বসন্তকালে রঙের উৎসবকে বাঙালিদের হোলি বলা উচিত নয়; বরং বলা উচিত দোল উৎসব।তবে কেন একে হোলি বলা হয়, বিশেষ করে ভারতবর্ষের হিন্দিবলয়ে তার একটি ঐতিহাসিক কাহিনী আছে।

শুরু করা যাক ঐতিহাসিক কাহিনী দানবী হোলিকার কথা দিয়ে।এই গল্পটি বিষ্ণুভক্ত দৈত‍্য প্রহ্লাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। হোলিকার পরিচয় সে দৈত‍্যরাজ হিরণ‍্যকশিপুর বোন এবং প্রহ্লাদের পিসি। হোলিকা শিশুদের নির্বিচারে হত‍্যা করে খেয়ে ফেলত। শিশুমাংস নাকি তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় ছিল। কথিত ছিল হোলিকাকে আগুন ছুঁতে পারবে না। তাই শিশু ভাইপো প্রহ্লাদকে আগুনে দগ্ধ করার উদ্দেশ‍্যে তাকে কোলে নিয়ে হোলিকা আগুনের মধ‍্যে প্রবেশ করে। কিন্তু তার এই ধারনা ভুল প্রমাণিত হয়। বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ বেঁচে যায়। হোলিকার মৃত‍্যু ঘটে।অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হিসেবে দোলের আগের দিন সন্ধ্যায় ‘হোলিকা দহন’ পালন করে থাকে অবাঙালিরা। প্রাজ্ঞজনেরা মনে করেন, এই দহন প্রতীকী।বসন্তকালের নানা রোগজীবাণুকে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করে সুস্থ নাগরিক জীবন বিশেষ করে শিশুদের জন‍্য প্রতিষ্ঠা করার একটি সামাজিক প্রতীকী কাহিনী।আসলে এই সময়ে শিশুদের নানা রকমের রোগ হতে দেখা যায়।যদিও পুরাণে আরেকটি গল্পও বিধৃত রয়েছে। সেটি কামদেব মদনকে নিয়ে। এককালে স্বর্গে অসুররা প্রবল অত‍্যাচার করতে শুরু করলে দেবতাদের মধ‍্যে ভয় দেখা দেয়। তাঁরা অসুরদের অকথ‍্য অত‍্যাচার থেকে মুক্তির আশায় শিবের শরণাপন্ন হলেন। ধ‍্যান করতে বসে গেলেন ইন্দ্রসহ ব্রহ্মা আর বিষ্ণুও।

এদিকে শিব তখন নিজেও ধ‍্যানে মগ্ন। তাঁর ধ‍্যান না ভাঙলে তিনি সাড়া দেবেন কেমন করে। ফলে তাঁর ধ‍্যান ভাঙানোর চেষ্টায় মৌমাছির দল চলে আসে চারদিকে। তাদের গুনগুন আর পাখির কলরব যাতে শিবের ধ‍্যানে ব‍্যাঘাত না ঘটায় তারজন‍্য শিবের সহচর নন্দী পাহারারত।তিনি মৌমাছির আর পাখির দলকে তাড়াতে গিয়ে খেয়ালহীনভাবে বনের মধ‍্যে অনেকটা দূরেই চলে যান। এই সুযোগে রতিকে সঙ্গে নিয়ে কামদেব মদন সেখানে উপস্থিত হন। ফাঁকা পেয়ে পুষ্পশর ছুঁড়তে যাবে যেই, অমনি মহাদেব ধ‍্যানভঙ্গের পর চোখ মেলে তাকান। দেখতে পেলেন কামদেব মদনকে। তাঁকে দেখেই রেগে জ্বলে উঠলেন তিনি। চোখের ক্রুদ্ধ চাহনিতে ভস্ম করে দিলেন মদনকে।এদিকে চোখের সামনে মদনকে ভস্ম হতে দেখে রতি কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্নায় চারদিক কেঁপে ওঠে, সে কান্না স্বর্গে ইন্দ্রের কাছেও পৌঁছোয়। তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন, মনও গলে গেল তাঁর। রতিকে সান্ত্বনা দিতে তিনি বর দিলেন। বরটি ছিল-দ্বাপর যুগে কৃষ্ণের পুত্র হিসেবে কামদেবকে রতি ফিরে পাবে।এদিকে মহাদেবের অনুচর শ্মশানবাসী ও বনবাসীরা আনন্দে নাচতে-গাইতে থাকে। সেদিনটি ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথি। শিবের অনুচর প্রমথেশ ঘোষণা করল প্রতিবছর এই মদন ভস্মের স্মৃতিতে পবিত্র বহ্ন‍্যুৎসব পালন করা হবে। ফাগুনের রঙের আগুনেই যেন কাম দহনে শুদ্ধ হয় মানুষ।যদিও সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, মদনদহন একটি প্রতীকী ঘটনা। শিবের রোষানলে দগ্ধ কামদেবের ঘটনাটির ব‍্যাখ‍্যায় তাদের মত উদ্দাম রঙের উৎসবে উন্মত্ত মানুষের কামনাবাসনার প্রকাশকে দমন করার জন‍্যই আগুনের এই কাল্পনিক ব‍্যবহার।

দোল উৎসবকে ঘিরে যেমন রঙ, উল্লাস ও মিলনের বর্ণিল চিত্র রয়েছে, তেমনি এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে কিছু বিতর্কিত ও প্রাচীন লোকাচারও। ইউরোপীয় পর্যবেক্ষকদের বিভিন্ন বিবরণ পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, একসময় নিম্নবর্গের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই উৎসব উপলক্ষে অশ্লীল ও যৌন-উদ্দীপক শব্দ ব্যবহারের রীতি প্রচলিত ছিল। দোল পূর্ণিমার আগের রাতে পাড়া-মহল্লায় ‘বুড়ির ঘর’ পোড়ানোর যে প্রথা, সেটিও বহুদিনের লোকায়ত সংস্কৃতির অংশ। কোথাও কোথাও অতীতে জীবন্ত মেড়া বা ভেড়া দাহ করার কথাও জনশ্রুতিতে শোনা যায়, যার ফলে অনেকে একে ‘মেড়ার ঘর’ পোড়ানো বলেও অভিহিত করেছেন। কলাগাছ বা ভেরেণ্ডা দাহের মতো উপাদানও এই আচারকে ঘিরে যুক্ত ছিল।আশ্চর্যজনক বিষয় হলো মুঘল আমলে রং খেলার কথা জানা যায়। মুঘল সাম্রাজ্যে দোলযাত্রা বা হোলি ছিল এক আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সমন্বয়ের নিদর্শন। মুঘল সম্রাটেরা ভারতীয় উপমহাদেশের বহু সনাতনী আচার–অনুষ্ঠানকে রাজদরবারে নানা উৎসব উদ্‌যাপনের মাধ্যমে সম্মান করতেন। দোল বা হোলি তার অন্যতম।আকবরের সময় থেকে এই উৎসব দিল্লির রাজপ্রাসাদে বিশেষ মর্যাদা পায়। সম্রাট আকবর হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় উৎসবের প্রতি খুবই সহিষ্ণু ছিলেন এবং নিজেও সাড়ম্বরে উৎসবে যোগ দিতেন। ফতেহপুর সিক্রি ও আগ্রা দুর্গে রাজপরিবার ও অন্তঃপুরে রং খেলার উল্লেখ উল্লেখ সমকালীন দলিলপত্রে পাওয়া যায়।ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের হিন্দু রানিরা-বিশেষত জোধাবাই-রাজদরবারে হোলি উদ্‌যাপনের পরিবেশ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।আবির, সুগন্ধি জল, সঙ্গীত ও নৃত্যের মেলবন্ধনে সে উৎসব এক সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।


জাহাঙ্গীরের আমলেও রং খেলার চিত্র মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলায় ধরা পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, জাহাঙ্গীর ও নূরজাহান রঙে রঙে রঙিন হয়ে আমোদ–প্রমোদে মত্ত। আবুল ফজল বা জাহাঙ্গীরনামার বর্ণনায় সরাসরি হোলির বিশদ বিবরণ না থাকলেও দরবারি জীবনের চিত্রে এই উৎসবের বর্ণনা স্পষ্ট।শাহজাহানের সময়েও রাজপ্রাসাদে বসন্তোৎসব ও রঙের খেলার চল ছিল, যদিও তা ছিল নিয়ন্ত্রিত ও আভিজাত্যপূর্ণ।তবে, আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ধর্মীয় কড়াকড়ি বাড়ায় রাজদরবারে হোলির জাঁকজমক হ্রাস পায়। তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল।

মুঘলদের দোলযাত্রা তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসবের অনুকরণ নয়; বরং তা ছিল সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও সহাবস্থানের প্রতীক। রাজশক্তি ও জনজীবনের এই মিলন ভারতীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে রঙের আবিরে রাজনীতি ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রচিত হয়েছিল।


অন্যদিকে দোল পূর্ণিমা কেবল রঙের উল্লাসে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও। ১৪৮৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ফাল্গুন পূর্ণিমা তিথিতে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-এর জন্ম এই দিনটিকে ভক্তসমাজে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরায় এ তিথি ‘গৌরপূর্ণিমা’ নামে পরিচিত এবং তাঁর আবির্ভাবকে কেন্দ্র করেই দোলযাত্রা বিশেষ ধর্মীয় আবহে উদ্‌যাপিত হয়।তবে দোলযাত্রার আদি উৎস সন্ধান করতে গেলে ফিরে যেতে হয় বৃন্দাবনের লীলাক্ষেত্রে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ও গোপীদের রঙখেলার পৌরাণিক কাহিনী এই উৎসবের সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। সেই লীলার স্মারক হিসেবেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হোলি উৎসব পালিত হয়ে থাকে-যা ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে আজ এক বিশ্বজনীন আনন্দোৎসবে পরিণত হয়েছে।আমার দৃষ্টিতে, চৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে দোলযাত্রার সম্পর্ক কেবল ঐতিহাসিক ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রেমভক্তির এক আধ্যাত্মিক বিপ্লবের স্মারক। নবদ্বীপে তাঁর জন্ম মানবমুক্তির এক নতুন বোধের সূচনা করেছিল। তাঁর প্রচারিত সংকীর্তন আন্দোলন সামাজিক ভেদাভেদ অতিক্রম করে মানুষকে একত্র করেছিল কৃষ্ণপ্রেমের সূত্রে। দোলযাত্রার দিনে মন্দিরে মন্দিরে কীর্তন, শঙ্খধ্বনি ও মৃদঙ্গের তালে যে আবেগময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা কেবল উৎসবের নয়-এটি এক অন্তর্মুখী আত্মশুদ্ধির আহ্বান।চৈতন্য মহাপ্রভুর মূর্তিতে আবির অর্পণ, শোভাযাত্রা ও নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসব যখন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, তখন স্পষ্ট হয়-রঙ এখানে প্রতীকমাত্র। প্রকৃত বার্তা হলো প্রেম, সাম্য ও ভক্তির ঐক্য। তাই আমার কাছে দোলযাত্রা শুধু বসন্তের রঙিন উৎসব নয়; এটি মানবহৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেম জাগ্রত করার এক চিরন্তন আহ্বান, যা আজও সমাজকে সহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্বের পাঠ শিখিয়ে চলেছে।

Rabindranath Tagore | Biography, Poems, Short Stories, Nobel Prize, & Facts  | Britannica
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তবে বাঙালির কাছে দোলকে জনপ্রিয় করার কারিগর ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।আধুনিককালে এই রঙের উৎসবকে বরণ করে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতিকে এক অসামান্য বসন্তোৎসব উপহার দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত উৎসব চালু করেছিলেন। তাই রঙিন এই উৎসবের দিকে মুখিয়ে থাকেন অনেকেই।লিখেছিলেন অমর গীতি ‘ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল, লাগল যে দোল!’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গান গুনগুন করতে করতেই এখন আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনে দোল আসে, বসন্তোৎসব আসে।গানে নাচে আবিরের রঙে রাঙিয়ে শালীনভাবে উদযাপন করতে তিনিই গত শতকে শিখিয়েছিলেন। ঋতুরাজ বসন্তকে কেন্দ্র করে কত যে গান তিনি লিখেছেন এবং পাশাপাশি বসন্ত উদযাপনের জন্য ফাল্গুনী, বসন্ত, নবীন নাটকগুলিও লিখেছেন।বসন্তের ছোঁয়ায় যখন মন রঙিন, তখন হোলির রঙে নিজেকে মাখিয়ে নতুনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়াই এই উৎসবের সৌন্দর্য। পুরোনো দুঃখ-কষ্ট, শত্রুতা ভুলে নতুনভাবে পথ চলতে শেখায় দোল বা হোলি। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য-এই ছয় রিপুকে জয় করার উৎসবই দোল।সাহিত‍্যের আঙিনায় বসন্তকে এভাবে স্থান একমাত্র রবীন্দ্রনাথই দিতে পেরেছেন। আজ বাংলার দিকে দিকে তাঁর দেখানো পথেই বসন্তোৎসবের উদযাপন দেখা যায়। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, বসন্তের এই রঙিন উৎসবে মানবমনের আত্মউদ্বোধন জয়মাল‍্য গাঁথা হয়।

The best ways to celebrate Holi in London this March | CN Traveller
সাত সমুদ্র পেরিয়েও রঙের বাঁধন-লন্ডনে দোলের আনন্দ।

তাছাড়াও দোলযাত্রা হিন্দু বৈষ্ণবদের উৎসব। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকা ও তাঁর সখীদের সঙ্গে আবির খেলেছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি। এ কারণে দোলযাত্রার দিন এ মতের বিশ্বাসীরা রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আবিরে রাঙিয়ে দোলায় চড়িয়ে নগরকীর্তনে বের হন। এ সময় তারা রং খেলার আনন্দে মেতে ওঠেন। পুষ্পরেণু ছিটিয়ে রাধা-কৃষ্ণ দোল উৎসব করতেন। সময়ের বিবর্তনে পুষ্পরেণুর জায়গায় এসেছে রং বা ‘আবির’।অন্যদিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বাপর যুগের কথা। দুই দৈত্যের অত্যাচারে অতিষ্ঠ মানুষ। ফাল্গুনী পূর্ণিমার আগের দিন শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম মিলে ওই দুই দৈত্যকে হত্যা করেন। এরপর সন্ধ্যার সময় শুকনো কাঠ, খড়কুটো দিয়ে তাদের আগুনে পুড়িয়ে দেন। সেই দিন থেকে ন্যাড়া পোড়া প্রচলিত হয়। এ ভাবে শ্রীকৃষ্ণ দুই দৈত্যের অত্যাচার থেকে মথুরাসাবীকে মুক্তি দিলেন। মথুরাবাসী তাদের এই মুক্তির দিনটি শ্রীকৃষ্ণ ও বলরামের সঙ্গে রং খেলে উদযাপন করেন। সে দিন থেকেই শুরু হয় এই দোল উৎসব। তবে বৈষ্ণব বিশ্বাসটাই বেশি গেঁথে গেছে। এই দিনে রাধাকৃষ্ণ নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠে। বাড়িতে-বাড়িতে, মন্দিরে পূজা হয়।

দোল বা হোলির অর্থ এক হলেও দুটি ভিন্ন অনুষ্ঠান। দোল ও হোলি কখনোই একদিনে পড়ে না। দোলযাত্রা বা বসন্তোৎসব একান্তই বাঙালির রঙিন উৎসব। আর হোলি হলো অবাঙালিদের উৎসব। মূলত উত্তর, পশ্চিম ও মধ্য ভারত এবং নেপালে এই উৎসব ‘হোলি’ নামে পরিচিত। বাঙালিদের মধ্যে দোলযাত্রাকে বসন্তের আগমনী বার্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।এমন নানা গল্প-কাহিনিতে মোড়ানো দোল বা হোলি উৎসব।তবে দোল উৎসবের বড় মহোৎসব যেনো হয় উত্তর প্রদেশে বৃন্দাবনের গ্রাম বরসানার (রাধার বাসভূমি) রাধারানী মন্দিরে।উত্তর প্রদেশের বরসানা-রাধার বাসভূমি হিসেবে পরিচিত সেই জনপদ—দোল উৎসবকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, এক মহোৎসবের রূপ দিয়েছে। বৃন্দাবনের আকাশ-বাতাসে যখন বসন্তের আবির মেশে, তখন রাধারানী মন্দিরকে ঘিরে যে রঙিন আবহ তৈরি হয়, তা নিছক উৎসবের দৃশ্য নয়; তা শাশ্বত প্রেমের এক জীবন্ত পুনর্নির্মাণ।এখানে দোল বা হোলি এই দুইয়ের সঙ্গেই শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা জড়িয়ে আছেন। এ হলো শাশ্বত প্রেমের উৎসব।এখন বলব উত্তর ভারতের বিখ্যাত লাঠমার হোলির গল্প।এই বরসানাতেই অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত ‘লাঠমার হোলি’-মূল হোলির প্রায় এক সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এক অনন্য লোকউৎসব।লাঠমার হোলি’ হয় মূল হোলি বা দোলের এক সপ্তাহ আগে। এখানে রঙের উৎসব চলে এক সপ্তাহ ধরে। পুরাণমতে, এই দিনে শ্রীকৃষ্ণ নন্দগাঁও (কৃষ্ণের বাসভূমি) থেকে এসেছিলেন শ্রীরাধিকার পিছু নিয়ে বৃন্দাবনের বরসানা গ্রামে। রাধিকা ও তাঁর সখীদের উত্ত্যক্ত করেছিলেন বিস্তর। ফলে সখীরা রেগে যান ও শ্রীকৃষ্ণকে লাঠি দিয়ে মারতে উদ্যত হন।

Lathmar Holi - Wikipedia
 ‘লাঠমার হোলি’

সেইমতো ও প্রথা অনুযায়ী বর্তমানে নন্দগাঁও থেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরে কৃষ্ণের বেশে দল ধরে পুরুষেরা আসেন বরসানা গ্রামে। নারীরা ঘাগরা-চোলিতে সজ্জিত হয়ে হাতে একটি শক্ত লম্বা লাঠি নিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সেই লাঠি পড়ে পুরুষদের ওপরে—সে এক মজার দৃশ্য। চামড়ার গোল, মোটা ঢালের মতো একটি বস্তু দিয়ে পুরুষেরা সেই আঘাত থেকে নিজেদের রক্ষা করেন। কিন্তু দৈবাৎ যদি কেউ নিজেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হন এবং শরীরে লাঠির ঘা লাগে তবে তাকে পেতে হয় শাস্তি। বসে সভা। নারীরা শাড়ি পরিয়ে দেন এবং জনসমক্ষে সেই পুরুষকে নেচে দেখাতে হয়। এই লাঠির মার থেকেই ‘লাঠমার’ কথাটির উৎপত্তি। এই উৎসবে কদিনের জন্য গ্রামের প্রতিটি পুরুষই কৃষ্ণ এবং নারীরা সকলেই রাধা। পুরাকালে রাধা-কৃষ্ণের হোলি খেলার স্মৃতিতে এই কটা দিন ফাগের রঙে ডুবে যায় বরসানা-নন্দগ্রামের আকাশ–বাতাস।তব বর্তমানে আঘাতের আড়ালে এখানে রাগ নেই; আছে লোকঐতিহ্যের হাস্যরস, আছে নারী-পুরুষের ভূমিকাবিনিময়ের প্রতীকী আনন্দ।বরসানা গ্রামের হোলিই ‘লাঠমার’ হোলি। লাঠমার হোলি’ পৃথিবী বিখ্যাত একটি উৎসব। দেশ-বিদেশের অসংখ্য শৌখিন ও প্রথিতযশা আলোকচিত্রী এ সময় বরসানায় ভিড় জমান-কারণ এই উৎসব কেবল দেখা নয়, ধারণ করারও এক দুর্লভ মুহূর্ত।লোকঐতিহ্যের অভিনবত্ব, রঙের উচ্ছ্বাস এবং নারী–পুরুষের প্রতীকী ভূমিকাবিনিময়ের এই উৎসব আজ আন্তর্জাতিক কৌতূহলের কেন্দ্রে।যদি কেউ লাঠমার বৃন্দাবনে যায় তাহলে লাঠমার হোলি দেখার জন্য দুই রাত থাকতে হবে। অনেক হোটেল বা ধর্মশালা আছে ছোট, বড়, মাঝারি মানের। নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে বাস বা গাড়ি ছাড়ে আগ্রা-মথুরার। পথে পড়বে বৃন্দাবন। সেখানে নেমে অটোরিকশা ধরে কিছুদূর গেলেই মূল বৃন্দাবন শহর। খাবারের প্রসঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি-বৃন্দাবন মূলত নিরামিষভোজীদের শহর; আমিষ আহারের সুযোগ এখানে নেই বললেই চলে।তাতে কি? তবে সেটি কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এক ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় দর্শনার্থীরা।বৃন্দাবনের নিরামিষ ভোজন আপনাকে নিরামিষ ভোজনের ঘ্রাণে মোহিত করতে বাধ্য করবে।দুটো দিন দিব্যি ডাল, পনির, সবজি খেয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়। আর পাওয়া যায় লস্যি, রাবড়ি, পেঁড়া, কুলফি মালাই। সেসব অতি উত্তম ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন-যা উৎসবের রঙিন আবহে স্বাদেরও এক আলাদা পরত যোগ করে।

Lathmar Holi 2023 Date: 'Lathmar Holi' 2023 in Barsana: Date, History and  Celebrations - The Economic Times
 ‘লাঠমার হোলি’

মজার বিষয় হলো, বরসানায় হোলি খেলতে কোনো রং বা আবির নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, স্থানীয় মানুষেরাই এত রং মাখিয়ে দেবে যে দর্শনার্থীরা ঢুকে সাফসুতরো হয়ে এবং বেরোবেন রঙিন ভূত হয়ে।বসন্তের সমাগমে প্রচুর পলাশ ফুটে থাকে। বরসানায় কৃত্রিম রঙের পাশাপাশি পলাশ ফুলের গেরুয়া রংও ব্যবহার করা হয়। ফুলকে ডলে যে রং বেরোয়, তাই মাখিয়ে দেয়। পথে পড়ে থাকে পলাশের পাপড়ি আর মানুষের পায়ের চাপে রস বেরিয়ে পথ হয়ে ওঠে গেরুয়া।রাধারানী মন্দিরের কিছুদূর থেকেই ভেসে উঠে গানের সুর, সঙ্গে ঢোল, খঞ্জনির মিঠে তাল। মন্দির প্রাঙ্গণে আশেপাশে বিভিন্ন জায়গায় গানের আসর বসেছে। সবই গ্রামের প্রচলিত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের গান। যেকোনো আসরে অনায়াসে ভিড়ে যাওয়া যায়, গানের তালে নাচা যায় বা ঢোল তুলে নিয়ে বাজানোও যায়।

বৃন্দাবন-এর প্রায় প্রতিটি মন্দিরেই হোলির আবির ছড়িয়ে পড়ে সমান উচ্ছ্বাসে। সেখানে রঙ কেবল উৎসবের অনুষঙ্গ নয়; তা এক সামষ্টিক আনন্দের প্রকাশ। কারণ যেকোনো আনন্দোৎসবের মূল দর্শন হওয়া উচিত অংশগ্রহণের সমতা-উৎসবের অধিকার কারও একার নয়।এই ভাবনাকেই নতুন অর্থ দিয়েছে চারশো বছরের ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথজির মন্দির। ২০১৩ সাল থেকে এখানে বিধবারা হোলি খেলছেন-যা দীর্ঘদিনের সামাজিক কুসংস্কার ও বঞ্চনার বিপরীতে এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। যে সমাজ একসময় তাদের জীবনকে সাদা শাড়ির একরঙা গণ্ডিতে আবদ্ধ রেখেছিল, সেই সমাজের ভেতরেই আজ তাদের হাতে ধরা পড়ছে রঙিন আবির।বৃন্দাবনে বহু বিধবার বসবাসের জন্য আলাদা আশ্রয় রয়েছে। পারিবারিক অবহেলা, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক বাস্তবতার চাপে অনেকেই এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন; ভিক্ষাবৃত্তিই তাদের জীবিকার অবলম্বন। বছরের অধিকাংশ সময় যাদের জীবন নিস্তরঙ্গ ও রঙহীন, হোলির দিনে তাদের মুখে যে হাসি ফুটে ওঠে, তা কেবল এক দিনের উল্লাস নয়-তা আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার।সাদা থান ঢাকা যে বাড়ি সারা বছর নীরব ও বিবর্ণ, সেখানে এক দিনের জন্য হলেও যখন রঙ লাগে, তখন বোঝা যায়-উৎসবের প্রকৃত শক্তি কোথায়। শুষ্ক হৃদয়ে ভালোবাসার স্পর্শ পৌঁছে দেওয়াই যদি হোলির উদ্দেশ্য হয়, তবে এই রঙিন মুহূর্তগুলোই তার সবচেয়ে বড় স্বার্থকতা।আমার দৃষ্টিতে, এই দৃশ্যই বৃন্দাবনের হোলিকে অনন্য করে তোলে। কারণ এখানে রঙ কেবল গায়ে লাগে না-লাগে সমাজের মানসিকতায়। আর সেই পরিবর্তনের স্পর্শই হয়তো উৎসবের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এইবার আসা যাক বর্তমান শিক্ষার্থী প্রজন্মের কাছে দোল পূর্ণিমার তাৎপর্য ভূমিকা কতোটুকু কার্যকর নিয়ে। প্রশ্ন উঠতেই পারে-ডিজিটাল বিভ্রান্তি, বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রবল প্রভাব এবং দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার এই সময়ে বর্তমান শিক্ষার্থী প্রজন্মের কাছে দোল পূর্ণিমার তাৎপর্য ঠিক কতখানি কার্যকর? উৎসব কি তাদের কাছে কেবল একটি রঙিন ‘ইভেন্ট’, নাকি এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক বার্তাও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক?

আমার দৃষ্টিতে, আজকের প্রজন্ম দোলকে দেখছে ভিন্ন এক পরিসরে। তাদের কাছে এটি যেমন আনন্দ ও সামাজিক মেলবন্ধনের উপলক্ষ, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজস্ব উপস্থিতি জানান দেওয়ারও একটি ক্ষেত্র। ফলে উৎসবের বহিরঙ্গ-রঙ, ছবি, আয়োজন-অনেক সময় অন্তর্নিহিত দর্শনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এখানেই দোল পূর্ণিমার চিরন্তন তাৎপর্য নতুনভাবে অনুধাবনের প্রয়োজন রয়েছে।বলে রাখা ভালো যে, বর্তমান শিক্ষার্থী প্রজন্মের প্রেক্ষাপটে দোল পূর্ণিমার তাৎপর্য ঠিক কতখানি কার্যকর-এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ক্রমশ উৎসবের অন্তর্গত দর্শন ও আধ্যাত্মিক মর্মবাণী আড়ালে পড়ে যাচ্ছে, আর সামনে চলে আসছে উচ্চ শব্দের ডিজে পার্টি, উন্মত্ত রঙ ছোড়াছুড়ি কিংবা কখনও বেপরোয়া মদ্যপানের সংস্কৃতি। তাহলে কি দোল আজ কেবলমাত্র একদিনের বিনোদন-নির্ভর উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে?আসলে, সমস্যাটি উৎসবে নয়-উপলব্ধিতে। দোলের মূল দর্শন ছিল ভেদাভেদ ভুলে প্রেম, সহিষ্ণুতা ও সাম্যের চর্চা; ছিল আত্মিক মিলনের আহ্বান। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যে প্রেমভক্তির কথা বলেছিলেন কিংবা শ্রীকৃষ্ণ-এর রঙখেলার যে প্রতীকী ব্যঞ্জনা-তা কখনোই উচ্ছৃঙ্খলতার পক্ষে ছিল না। বরং তা ছিল হৃদয়ের পরিশুদ্ধি ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা।কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম বৈশ্বিক সংস্কৃতির প্রভাবে উৎসবকে অনেকাংশে ‘ইভেন্ট সংস্কৃতি’র অংশে পরিণত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দৃশ্যমানতা, ট্রেন্ড অনুসরণ, কিংবা মুহূর্তের উত্তেজনা অনেক সময় উৎসবের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে ছাপিয়ে যায়। ফলে প্রশ্ন জাগে-দোল কি তবে কেবল ডিজে আর রঙিন ফোমের উচ্ছ্বাসেই সীমাবদ্ধ?

Photo: Focus Bangla
দোলের নতুন রঙে রাঙিয়ে, রঙিন জীবনের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা।

আমি মনে করি, পুরো প্রজন্মকে এক ছাঁচে ফেলা অন্যায় হবে। আজও বহু শিক্ষার্থী দোলকে উপলক্ষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কীর্তন, আলোচনাচক্র কিংবা ঐতিহ্যচর্চায় যুক্ত হচ্ছে। তবে সংখ্যায় তারা হয়তো কম দৃশ্যমান। তাই প্রয়োজন সমালোচনা নয়, সচেতনতা। উৎসবকে আধুনিকভাবে উদ্‌যাপন হোক-কিন্তু তার শিকড় যেন বিচ্ছিন্ন না হয়।আমার কাছে দোল পূর্ণিমা কেবল রঙের বাহারি আয়োজন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পুনরাবিষ্কারের দিন। যদি বর্তমান প্রজন্ম সেই বোধে ফিরে যেতে পারে, তবে দোল কখনোই কেবল ডিজে পার্টি বা মদ্যপানে সীমাবদ্ধ থাকবে না-বরং হয়ে উঠবে সামাজিক সম্প্রীতির এক সচেতন ও প্রাণবন্ত উৎসব।পূজা কেবল আনুষ্ঠানিক আচার নয়; এটি এক ধরনের আত্মিক অভ্যর্থনা-ঈশ্বরকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি নিজের অন্তর্গত অশুদ্ধতাকে পরিশীলিত করার প্রক্রিয়া। মনের কালিমা ঝেড়ে ফেলে আত্মশুদ্ধির যে সাধনা, পূজার মূল তাৎপর্য সেখানেই নিহিত। ঠিক তেমনি দোলের রঙও নিছক বাহ্যিক রাঙানো নয়; এটি জীবনের পুরোনো গ্লানি ভুলে নতুন সূচনার প্রতীক। রঙের আবরণ তাই আসলে অন্তরের পুনর্জন্মেরই ইঙ্গিত বহন করে।কিন্তু যখন এই পবিত্র উপলক্ষ উচ্ছৃঙ্খলতার আড়ালে বিকৃত হয়ে পড়ে, তখন উৎসবের মূল চেতনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পূজা কিংবা দোলের মতো আধ্যাত্মিক তাৎপর্যময় দিনে মদ্যপান, অশোভন আচরণ, ইভটিজিং বা মারামারি কোনোভাবেই সভ্য সমাজের পরিচায়ক হতে পারে না। বরং তা ব্যক্তি, পরিবার এবং ধর্মীয় আচার-সবকিছুকেই বিব্রত ও কলুষিত করে।

আমার দৃষ্টিতে, উৎসব মানে উন্মুক্ত আনন্দ-কিন্তু সেই আনন্দ কখনোই অসচেতনতার ছাড়পত্র নয়। উৎসবের সৌন্দর্য তার শালীনতায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধায় এবং মানবিক সংযমে। যদি আমরা পূজার আধ্যাত্মিক শুদ্ধতা ও দোলের রঙিন বার্তাকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পারি, তবে উৎসব কেবল উদ্‌যাপনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না-এটি হয়ে উঠবে আত্মসমালোচনা ও মানবিক উৎকর্ষের এক অনন্য উপলক্ষ।আমি মনে করি, পুরো প্রজন্মকে এক ছাঁচে ফেলা অন্যায় হবে। আজও বহু শিক্ষার্থী দোলকে উপলক্ষ করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কীর্তন, আলোচনাচক্র কিংবা ঐতিহ্যচর্চায় যুক্ত হচ্ছে। তবে সংখ্যায় তারা হয়তো কম দৃশ্যমান। তাই প্রয়োজন সমালোচনা নয়, সচেতনতা। উৎসবকে আধুনিকভাবে উদ্‌যাপন হোক-কিন্তু তার শিকড় যেন বিচ্ছিন্ন না হয়।আমার কাছে দোল পূর্ণিমা কেবল রঙের বাহারি আয়োজন নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পুনরাবিষ্কারের দিন। যদি বর্তমান প্রজন্ম সেই বোধে ফিরে যেতে পারে, তবে দোল কখনোই কেবল ডিজে পার্টি বা মদ্যপানে সীমাবদ্ধ থাকবে না-বরং হয়ে উঠবে সামাজিক সম্প্রীতির এক সচেতন ও প্রাণবন্ত উৎসব। তাই দোল পূর্ণিমা যেনো উৎসবে আবদ্ধ না হয়ে, হয়ে উৎসব থেকে আত্মউদ্বোধন।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে  সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login