Posts

গল্প

চায়ের কাপেই শেষ প্রেম

March 5, 2026

Radia

Original Author Radia

47
View

পকেটে থাকা রুমালটা বের করে ঘাম মুছতে মুছতে জীবনে হয়ে যাওয়া ঘটনা নিয়ে ভাবছি।
আমি মানাফ, ২৯ বছরের একজন অপদার্থ যুবক। বয়স শুধু সংখ্যায় বাড়লেও বাস্তবে তার প্রতিফলন শূন্য। জীবনে যা করেছি, কিছুতেই সফল হতে পারিনি। আমাকে ব্যর্থতায় মানায়; সফলতায় আমি বড্ড বেমানান।চারদিকের ব্যর্থতা বাদ দিয়ে একদিকের কাহিনি শুনুন, তাহলে বুঝবেন আমি কতটা অভাগা।
আমার বয়স যখন ১৮, তখন আমার জীবনে আসে নাবিহা পুষ্পা ইসরাতুল মাসুমা। তাকে আমি ভালোবেসে ডাকতাম নাপুসা।
তার সাথে আমার সম্পর্কের শত্রুতা ছিল চা নিয়ে। আমার চা খাওয়াটা নাপুসার মোটেও পছন্দ ছিল না। তা ব্যতীত আমরা বেশ সুখীই ছিলাম। অবশ্য নাপুসা নাকি আমার  চুকচুক করে চা খাওয়া দেখেই প্রেমে পড়ে ছিল।
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড জয়। ছোটবেলার বন্ধু। আমার আর নাপুসার যতবার ঝগড়া হতো, জয়ই সেটা মিটমাট করত। জয় বরাবরই ভাগ্যবান মানুষ ছিল— যেখানে যায়, সেখানেই সফল।শেষ দুই বছর ধরে বাসা থেকে নাপুসার ওপর বিয়ে নিয়ে প্রচুর চাপ ছিল। আমাকে বারবার বলতো বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি সাহস পেতাম না।
আমি গিয়ে কী বলব? আমার যোগ্যতাই বা কী? আমি তো আর ৩২ দাঁত বের করে বলতে পারব না— এই দুনিয়ায় মগ ভরে চা খাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো যোগ্যতা নাই।শেষ যেদিন নাপুসা আমার সাথে ঝগড়া করল, সেদিন রাগ করে এক মগ চা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে গায়ে ঢেলে দিয়ে দুই গালে চারটা থাপ্পর মেরে হনহন করে চলে গেল।আমি সেদিন কষ্টে কান্না করতে করতে ফার্মেসিতে গিয়ে ড্রেসিং করে বাসায় এসে আরও কাঁদলাম।
কষ্টটা হালকা করতে এক কাপ চা বানিয়ে যেই বসেছি খেতে, তখনই নাপুসা ভিডিও কল দিল। তাড়াহুড়ো করে চায়ের কাপ সরাতে গিয়ে বিছানায় ঢেলে ফেললাম।কল রিসিভ করতেই সে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাইল। আমিও আর কথা বাড়াইনি, হাসিমুখে মেনে নিলাম।
সে জিজ্ঞেস করল—
নাপুসা: কী করো?
আমি: এই তো, তোমার সাথে কথা বলি।
নাপুসা: আমার সাথে কথা বলার আগে কী করছিলা??
আমি চুপ করে রইলাম, কারণ মিথ্যা কথা আমি বলতে পারি না।
নাপুসা: হা****জাদা, তুই আবার চা গিলতে ছিলি?? তুই মর চা নিয়ে। তুই চা নিয়ে সংসার কর। আমার সাথে আর যোগাযোগ করবি না। আমি যারেই বিয়ে করি, তোরে বিয়ে করব না।
এটা বলেই সে আমাকে ব্লক করে দিল।
আমিও আর গায়ে লাগাইনি। এসব আমার জন্য নতুন না। এভাবেই কেটে গেল চার মাস।
এই চার মাসে আমি তেমন একটা যোগাযোগ করিনি। চাকরি নিয়ে বেশ সিরিয়াসভাবে সময় কাটিয়েছি।
একদিন সকালে হঠাৎ আমার ঠিকানায় একটা খাম এলো। খুলে দেখলাম জয়েনিং লেটার। সেদিন বেশ খুশি হলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম— আগে চাকরি করি ১ মাস, তারপর নাপুসাকে সারপ্রাইজ দিয়ে ওর বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাব।চাকরিতে জয়েন করলাম। দিনকাল আরও খারাপ কাটতে লাগল। ছাতার মাথা কিছুই বুঝি না। কাজে প্রচুর ভুল করতে লাগলাম। চাকরির ৮ দিনের মাথায় আমার চাকরি চলে গেল।
কষ্টে বাসায় এসে গলা থেকে টাইটা খুলে ছুড়ে একা একা চিৎকার করতে লাগলাম। তখনই দরজায় আরেকটা খাম এলো। খুলে দেখি বিয়ের কার্ড।
বিয়ের কার্ডটা দেখে বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাড়াতাড়ি কার্ড খুলে দেখি— নাপুসার বিয়ের কার্ড। আগামী ৬ই মার্চ তার বিয়ে।
বরের নামের জায়গায় জয়ের নাম দেখে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম।
রাত ৮টায় জ্ঞান ফিরতেই জয়কে কল দিলাম।
আমি: জয়, তুই নাপুসাকে বিয়ে করছিস?
জয়: হ্যাঁ।
আমি: তুই এত বড় বেইমানি করতে পারলি?
জয়: দেখ, ওর এদিন বিয়ে হতোই। কিন্তু তোর সাথে হতো না। আর আমি ওরে বহু আগের থেকে পছন্দ করি, তাই ৩ মাস আগে ওরে জানাই। ও রাজি হয়, এবং বিয়ে পর্যন্ত যায় সম্পর্কটা।
আমি চুপ করে শুনছি, কান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।
জয়: আরে প্যারা নাই, চিল। মেনে নে। বিয়েতে চলে আসিস।
আমি খামটা হাতে নিয়ে দেখলাম ভিতরে একটা চিঠি। তাতে লেখা—
“তোমার এসব পাগলামি গত এগারো বছর সহ্য করছি। এখন আমি ক্লান্ত। তোমাকে চায়ের সাথে মানায়। তুমি চা নিয়ে ভালো থেকো।”
ইতি,
তোমার না হওয়া
নাপুসা।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের বিয়েতে আমি যাব। একটাবার তাকে বউ সাজে দেখব।
এই কয়দিন প্রচুর কাঁদলাম। যথারীতি ৬ তারিখ সকালে সাদা পাঞ্জাবি পরে সুন্দর করে সেজে বের হতেই এক কুকুরের লেজে পা দিয়ে বসলাম।
কুকুরটা ক্ষেপে আমাকে দিল দৌড়। এক দৌড়ে স্লিপ খেয়ে পড়ে গেলাম ড্রেনে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম— উপরওয়ালা চায় না আমি তাদের বিয়েতে যাই।
বাসায় এসে গোসল করে বের হলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম— যে চায়ের জন্য এত কিছু, সেটাই আমার জীবন হবে।
সব সরঞ্জাম কিনে ৮ তারিখ সকাল থেকে চায়ের ব্যবসা শুরু করলাম।
কেটে গেছে ১ বছর। এখন আমি সফল ব্যবসায়ী।
এই ১ বছরে জয় বা নাপুসার সাথে যোগাযোগ হয়নি। তবে আমি ভালোই আছি।
তারা যদি বেইমানি করে ভালো থাকে, আমি পারব না কেন? আমার শুধু একটাই প্রশ্ন এগারো বছর অপেক্ষা করার পরও কি আমি নাপুসাকে বেইমান বলতে পারি? এতটুকু আক্ষেপ দুনিয়ায় এত ছেলে থাকতে কেনো আমারই বেস্ট ফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে হলো?
নাপুসা, তুমি ঠিক বলেছিলে—
“আমাকে চায়ের সাথে ভালো মানায়।”
সমাপ্ত।

Comments

    Please login to post comment. Login