ক্যাম্পাসপ্রেম,পর্ব২৫
হুমায়ূন কবীর
মনে কোন সন্দেহ থাকলে, দোলাচল থাকলে, এত দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করা সম্ভব না। আমি বিশ্বাস করি,রাসমিন একদিন না একদিন আমার হবেই। আমার ভালোবাসা যদি সত্যি হয়ে থাকে তো একদিন না একদিন আমি তাকে পাবোই।
তৌফিক- হ্যাঁ, পাবি তবে তোর জীবদ্দশায় না। মৃত্যুর পর। তার আগে না।
তুষার - এই পৃথিবী শেষ পৃথিবী নয় রে পাগলা। এই জীবন শেষ জীবন নয়। মৃত্যুর পরেও পৃথিবী আছে, জীবন আছে। রাসমিনকে আমি যদি এই পৃথিবীতে, এই জীবনে না পাই তবে তার জন্য পরবর্তী পৃথিবীতে, পরবর্তী জীবনে অপেক্ষা করব।
সুখ সুখ আমেজে, মাইক্রোবাসের ঝাঁকুনিতে নেশার শান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতেই পারিনি।
জেগে উঠে দেখি মাইক্রোই লোক অর্ধেক। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, ওরা কোথায় গেছে?
ড্রাইভার- এমপি সাহেবের কাছে ।
অবশ্য আমি আগেই অনুমান করেছিলাম এরকম একটা কিছু হবে।ইদানিং আমি লক্ষ্য করছি, সবকিছুতেই কেমন জানি একটা চেষ্টা পার্টি করতেছে।নেতারা আমাকে এড়িয়ে চলতে চাই। আগে কোন প্রোগ্রাম হলে, বড় নেতা বা এমপির বাসায় গেলে বড় ভাইয়েরা আমাকে সাথে নিতে চাইতো বেশি বেশি। এখন ইদানিং নেশা করার পর থেকে দেখছি, তারা বেশি বেশি আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এতে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদেরই লাভ হচ্ছে। আগামীতে তারা দলে ভালো জায়গা পাবে আমি ছিটকে পড়বো কমিটি থেকে। কত ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে যশোর জেলা কমিটিতে একটা পথ পেয়েছি সেটা হারাতে হবে। আজ যে চারজন এমপি সাহেবের বাসায় গেল সেখানে আমার কথা চলবে বলবে আমি নেশা করি মাইক্রোরের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছি এমপি সাহেবের চোখে আমি খারাপ হয়ে যাব। ফায়দা লুটবে আমার প্রতিপক্ষ। অবশ্য ইদানিং আব্কবার কলেজের কারণে এমপির সাথে আমার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। আব্বা কলেজ থেকে এমপি কে নিয়োগ বাণিজ্য করতে দেইনি। এমপির রাগ আছে আব্বার উপরে এবং আমার উপরে।
দ্রুতগতির একটা হোন্ডা এসে আমার সামনে খ্যাঁচ করে ব্রেক কষে থামলো।হোন্ডায় ২ জন আরোহী। চালকের মাথায় হেলমেট। গাড়ি দাড় করিয়ে চালক মাথা থেকে হেলমেট খুললে দেখলাম -
ছাত্রনেতা আপন। আমরা জেলখানায় যে ছাত্রনেতা পাবলাকে দেখতে এসেছি এ তার চাচাতো ভাই। অর্থাৎ আমাদের সবার উদ্দেশ্যই এক, পাবলা ভাইয়ের সাথে দেখা করা।
বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। আর দেরি করা ঠিক না। আমরা টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম। এখন আমরা মোট ছয় জন। ছয়টা টিকিট কাটলাম।
জেলখানায় কয়েদিদের সাথে দেখা করতে হলে,প্রথমে একটা সরু গলির ভেতর দিয়ে ঢুকতে হয়। এই লম্বা গলির কয়েকটা ছোট ছোট উপগলি আছে। একটা উপগলিতে আমরা অবস্থান নিলাম। আমাদের সামনে মোটা মোটা লোহার রড। তার ওপর লোহার নেট। এই রড এবং নেট থেকে এক হাত পর আরো মোটা মোটা লোহার রড এবং নেট। তারপর জেলের কয়েদিদের দাঁড়ানোর স্থান। কয়েদি এবং দর্শনার্থীদের মাঝে দুই হাতের ব্যবধান, কিন্তু তা লোহার রড এবং বেট দ্বারা সুরক্ষিত ।
আরে ও কে আসছে? পাবলা ভাই না?হ্যাঁ, পাবলা ভাই। কিন্তু তার এ কি দশা। মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফ, মাথায় টুপি? একি অবস্থা তার? জেলের ভিতর এই ভন্ডামির কি মানে? এতো ঘন্টায় দশটা গোল্ডলিফ সিগারেট খায়। নামাজ পড়া তো দূরের কথা, এ কোনোদিন ভুল করে পিছলেও পশ্চিম দিকে পড়েনি। নামাজ কালামের ধারে কাছেও যায় না। সে কিনা প্রায় এক হাত লম্বা দাড়ি রেখেছে?হলে দুজন তাস খেলে ঘন্টার পর ঘন্টা একসাথে সময় কাটিয়েছি।সে আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্ধু। পাশাপাশি গ্রামে আমাদের বাড়ি।
আমার হঠাৎ বাম পাশের চোখের পাতা নাচতে শুরু করল। বাম পাশের চোখের পাতা নাচা মানে, যে কোন একটা ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা। না জানি আজকে কী দুর্ঘটনা ঘটে?একেতো এখানে পুলিশের ছড়াছড়ি। পুলিশের সাথে চিরদিনই আমার দা কুমড়া সম্পর্ক। এজন্য পুলিশ যেখানে থাকে তার ধারে কাছেও আমি যাই না।পাবলা ভাই লোকের মাধ্যমে সংবাদ দিয়েছিল বলেই দেখা করতে এসেছি।তাছাড়া তার সাথে আমার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। জেলে আসার পর তার সাথে একদিনও দেখা করিনি। একটাই কারণ জেলখানা বা তার আশেপাশে পুলিশ গিজগিজ করে, ওদের দেখলে ঘৃণার বোধ জন্মায়। তাই পাবলা ভাইয়ের সাথে একবারও দেখা করতে আসিনি। এখন সে সংবাদ দিয়েছে কি জন্য দেখি।
দীর্ঘ বিরহের পর পাবলা ভাই যেন আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে চাইলো, আমারও সেই অবস্থা। কিন্তু লোহার শিকগুলোর জন্য তা সম্ভব হলো না। শুধু চোখে চোখে মিলন হল। কুশলাদি বিনিময়ের পর পাগলা ভাই সবাইকে সরে যেতে বলল। সবাই চলে গেল। তারপর সে বলতে শুরু করলো -
শোন তুষার। ছোটবেলা থেকে আমরা একই স্কুলে লেখাপড়া করেছি। সারা জীবন তোকে নম্রভদ্র ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে চিনি। দেখ রাজনীতি করতে যেয়ে আমরা লেখাপড়া শেষ হয়ে গেছে। অনার্সটা পাস করতে পারিনি। অথচ তুই তুখোড়ভাবে রাজনীতি করেও দিব্যি ভালোভাবে পাস করে গেলি।