Posts

গল্প

অপার হয়ে বসে রই

March 6, 2026

Rakib Shafqat Reza

Original Author My original post

16
View

জ্বরে মনে হয় আবোল-তাবোল বকছিলাম। আমার মা জননী হাউ-মাউ করে ভোরবেলা হাসপাতালে নিয়ে আসছেন। হার্টে রিং বসানোর পরে আজকাল মানুষ আমার খুব যত্ন নেয়। আগে নানী ছাড়া কেউ দুই পয়সা পাত্তা দিতো না। মানুষের আচরনে তাই চোখে পানি চলে আসে।

একই সাথে এই পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষের আদরে বড় হওয়া আমি, হাতের কাছেই দুনিয়ার কুৎসিত রূপ দেখে ফেলায়, মানুষের আগ্রহতে বিব্রত হই।

খুব একটা শোধবোধ ছিল না। কিন্তু এম্বুল্যান্সে চড়ে যে এসেছি মনে আছে। খুব অল্প যে জ্ঞান কাজ করছিল, সম্ভবত এম্বুল্যান্সে চড়ার লোভে হাসপাতালে আসতে রাজী হয়েছে। চিপা গলিতে বাড়ির সামনে এ্যাম্বুলেন্স আসে না। দুইজন ভাই স্ট্রেচারে করে আমাকে নিতে এসেছেন। হাতি মার্কা মানুষ, আমাকে আলগানো কি চাট্টি খানা কথা ? পিটপিটে চোখে তাদের দেখে মায়াই লেগেছে।

বেগুনী আকাশের সুবাহ সাদিক। গায়ে এসে লাগে বেহেস্তি লিলুয়া বাতাস। আম্মু হাউ-মাউ করছে বুঝতে পারছি। লোকজন বের হয়ে এসেছে টের পাচ্ছি। ‘একটু চুপ করেন ভাই ‘ বলেছি অনেকবার। লোকে কেন জানি শুনতে পায়নি !

দুনিয়া টের পেয়েছি দুপুরের পরে। ছোট মামা তাকিয়ে আছেন। উনার হাসপাতালেই নিয়ে এসেছে। তার চেহারা দেখলে মানুষের এমনিতে ভয় লাগার কথা। মুখের ভাষাও ফার্স্ট ক্লাস। আজকাল আমাকে কেউ কিছু আর বলে না। দুঃখিত চোখে তাকিয়ে থাকে।

প্রতাপশালী মানুষের চোখে দুঃখবোধ মায়া নাকি হতাশা – আমার জানা নেই।

বেশিদিন হয় নাই এমবিবিএস পাস করেছেন, এমন এক ডাক্তার আসেন। কিতাবে যা শিখেছেন, সে প্রটোকল অনুযায়ী আমাকে কাউন্সিলিং করবার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে এইসবের নজীর খুব একটা নাই। খুকী খুকী গলায় আমাকে জিজ্ঞেস করেন -


-জ্বর কিভাবে বাধিয়েছেন ?

- রক্তে কোন কারনে ইনফেকশান বা ইনফ্লেমেশান হইসে, ব্রেইনের হাইপো-থ্যালামাস তাই বডি টেম্পারেচার বাড়ায়ে দিসে। বডিতে জন্ম থেকে এন্টিবডি কম। এটাকে বলে হাইপো-গ্যামাগ্লোবুলিনেমিয়া।

আপায় ভ্রু কুচকায়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আপার কপালে ত্যাদর রোগী এখনো জুটে নাই মনে হচ্ছে। নাক দিয়ে পানি পড়ছে বলে লজ্জা পাচ্ছি। মেয়ে মানুষের সামনে নাক দিয়ে পানি পড়া আর প্যান্টের পোস্ট অফিস খোলা থাকা মানে মান-ইজ্জতের ফালুদা।

- আপনি ডক্টর নাকি ডাক্তার ?

- একচান্সে বিসিএস পাস দিসিলাম তো, তাই জানি। তাছাড়া ইন্টারে বায়োলজি ছিল।

আপায় চোখ সরু করে আমার দিকে তাকায়ে থাকেন। শাস্তি হিসেবে, গায়ের তীব্র ব্যাথা কমানোর নামে ঘুমের ঔষুধ দিয়েছেন। নন-মেডিক্যাল যারা ডাক্তার বৌ বিয়ে করেন, তাদের যে কি কষ্ট – ইশ !

ইফতারের পর ঘুম যখন ভাঙ্গবে, ভাসা ভাসায় কেন জানি মনে হল কেউ আমাকে জড়িয়ে কাঁদছে। বাম কানে স্পষ্ট তার পাজরের হাড্ডি টের পাচ্ছি। চোখের পানি আমার চুলে জমছে। বহুবছর আগে ক্যাডেট কলেজের লিখিত পরীক্ষায় চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। জনকন্ঠে আমার রোল ছাপা হয়েছে, ১২০৯২ – আরেহ কি বি-রা-ট ব্যাপার ! কিন্তু ২ মাস পরের পহেলা বৈশাখের সকালে যে পেপার বেরোলো, তন্নতন্ন করেও সেখানে আর আমার রোল খুজে পাওয়া গেল না।

সোফায় চিৎ-পটাং হয়ে ‘লজ্জায়’ হাউ-মাউ করে কাদি। কেউ কিছু বলে না। বিকেল বেলা আব্বু কাছে আসলো। ছুটির দিনে আমাকে জড়িয়ে ইংরেজী বই পড়ে শোনানো তার একটা হবি। একলাইন বই পড়ে, সে লাইনের বাংলা করে বোঝায়। তার হাতে ‘The old man and the sea’

'আব্বু, তুমি কান্না করলে আব্বুর খুব খারাপ লাগে যে বাবা ... আব্বু তো কাঁদতে পারি না বাবা !' আমি তাকে জড়িয়ে হু-হু করে কেদে বুক ভাসাই। বাম কানে তার পাজরের হাড্ডি এসে লাগে। তার চোখের পানি আমার চুলে। চোখ মুছে, নাক টেনে তিনি পড়া শুরু করেন,' ... a man can be destroyed, but not defeated ! '

ঘুম ভাঙলে প্রিয় মানুষদের আর খুজে পাওয়া যায় না। আমার সব প্রিয় মানুষরা থাকে গভীর ঘুমের দেশের কোন মায়াদ্বীপে। ঝুম বৃষ্টির দিনে, সে দ্বীপ কদম্ব ফুলে ছেয়ে যায়। মাঝে মাঝে গাছের আড়াল থেকে তারা আমাকে ডাকে। আমি তাদের পদরেখা দেখি, স্পষ্ট গলার আওয়াজ শুনি। একটা মায়াবী নীলের সন্ধ্যায়, আমি দুহাতে জোনাকের ঝাঁক বেয়ে তাদের খুজতে দৌড়াই – কোথাও কেউ নেই !

বরং কি এক অদ্ভুত তৃষ্ণা নিয়ে আমাকে জেগে ওঠা লাগে। এই পৃথিবীর রং-রূপ-রহস্য আমাকে তখন আর টানে না। আমার তখন আর কিচ্ছু ভালো লাগে না। 

-রাকীবামানিবাস
৬ই মার্চ,২০২৬ 

Comments

    Please login to post comment. Login