Posts

চিন্তা

ধর্মীয় শিক্ষা: সৌদি আরব বনাম বাংলাদেশ

March 6, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

27
View

আমাদের ধর্মীয় সূতিকাগার সৌদি আরবে মাদ্রাসা আছে, তবে সেগুলো বাংলাদেশের বা দক্ষিণ এশিয়ার মতো আলাদা “মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড”ভিত্তিক বড় নেটওয়ার্ক হিসেবে সাধারণত দেখা যায় না। দেওবন্দি, আলিয়া, কওমি -এসব ঘরাণা সৌদি আরবে নেই। সেখানে ইসলামী শিক্ষা মূলত সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। সৌদি আরবের সাধারণ স্কুলগুলোতে (প্রাইমারি থেকে হাইস্কুল) বাধ্যতামূলকভাবে ইসলামিক বিষয় পড়ানো হয়, যেমন—
• কুরআন
• হাদিস
• ফিকহ
• তাওহিদ

গত ১৫–২০ বছরে সৌদি আরব তাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও পাঠ্যক্রমে বেশ কিছু বড় সংস্কার করেছে। এর পেছনে রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক ও সামাজিক—তিন ধরনের প্রেষণা কাজ করেছে।

২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন অ্যাটাকের পর বিশ্বজুড়ে নজর পড়ে সৌদি আরবের শিক্ষা ও ধর্মীয় মতাদর্শের দিকে। কারণ হামলায় জড়িত বেশ কয়েকজন ছিল সৌদি নাগরিক।
এর পর ইউএসএ ও পশ্চিমা দেশগুলো সৌদি আরবকে তাদের পাঠ্যপুস্তক ও ধর্মীয় শিক্ষা সংস্কারের জন্য চাপ দিতে শুরু করে। ফলে কিছু পাঠ্যবই থেকে উগ্র বা অসহিষ্ণু বক্তব্য বাদ দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান “Saudi Vision 2030” ঘোষণা করেন। এর লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি ও সমাজকে আধুনিক করা।
এই নীতির অংশ হিসেবে—
• শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ানো
• ধর্মীয় বিষয়ের পরিমাণ কিছুটা কমানো এবং 
• সমালোচনামূলক চিন্তা ও আধুনিক জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া দেয়া হয়।

এক সময় সৌদি সমাজে ধর্মীয় পুলিশের প্রভাব ছিল খুব শক্তিশালী। এই প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল Committee for the Promotion of Virtue and the Prevention of Vice। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সমাজে কিছুটা উদার পরিবেশ তৈরি হয়।
এখন সৌদি আরবে—
• STEM (Science, Technology, Engineering, Mathematics) শিক্ষা বাড়ানো হচ্ছে
• বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে এবং 
• নারী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বস্তুত সৌদি আরব পুরোপুরি ধর্মীয় শিক্ষা বাদ দেয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ, স'ন্ত্রাসবিরোধী রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের কারণে তারা তাদের মাদ্রাসা-ধর্মী শিক্ষা কাঠামোকে আরও আধুনিক ও বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করছে।

পক্ষান্তরে আমরা দেশের আনাচে কানাচে পাড়া মহল্লায় এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা জিইয়ে রেখেছি যার সাথে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কোনো লেশমাত্র সংযোগ নাই। এসব নিবন্ধনবিহীন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক যোগাযোগের ধার ধারে না। এই ভূমির চিরায়ত কৃষ্টি কালচারকেও অস্বীকার করে। দেশাত্মবোধ, জাতীয় সঙ্গীত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সুকৌশলে এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরে রাখা হয়। ভিন্নধর্মী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের পরিবর্তে তীব্র ঘৃণাবোধ নিয়ে বেড়ে উঠে এখানকার শিশুরা। আমরা আরবভূমি থেকে আসা ধর্মটা মানি -কিন্তু সৌদি আরবের আধুনিকতাকে অস্বীকার করি। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে টিকে থাকতে হলে ঔদার্য, পরমতসহিষ্ণুতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আধুনিকতায় দীক্ষা নিতে আমরা সবাই বাধ্য। উগ্রবাদ এই পৃথিবীর আর নিতে পারছে না। এবার শান্তি ও স্বস্তি দরকার।

বর্তমান সরকার দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দিকে নজর দিতে পারে। কেন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে -এটা নিয়ে রিসার্চ করতে পারে। সাব কন্টিনেন্টের কনভেনশনাল শিক্ষার পরিবর্তে সৌদি মডেল অনুসরণ করতে পারে। ধর্মীয় শিক্ষা জীবনের একমাত্র অনিবার্য সত্য নয়। তাই যদি হতো ধর্মপুস্তকগুলোকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ বা বুয়েটে পাঠ্য করে দেয়া যেত। তা যেহেতু করা যাচ্ছে না -মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক ও আধুনিক পাঠগ্রহণে অভ্যস্ত না করবার কোনোই বিকল্প নাই।

লেখক: সাংবাদিক 
৬ মার্চ ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login