ক্যাম্পাস-প্রেম,পর্ব২৬
হুমায়ূন কবীর
একটা ভবিষ্যৎ আছে। তাছাড়া তুই তো বাপ মায়ের একমাত্র সন্তান। তোর বাপ মা তোকে নিয়ে কত আশা ভরসা করে আছে। তুই ছাড়া তাদের কোন ভরসা নেই। তুই তোর বাপ মায়ের কথা একবারও ভাববি না? তোর একটা কিছু হয়ে গেলে এই বয়সে তারা কোন ভরসায় বাঁচবে? বাপ মার প্রতি তোর কি কোন দায়িত্ব-কর্তব্য নেই?
তুষার- এসব কথা আপনি কেন বলছেন?
পাবলা- সেদিন তোর বাপ এসেছিল। একবার দেখেছিস তোর চিন্তায় তার চেহারার কি হাল হয়েছে? তোর মা তো এখন মৃত্যু শয্যায় তোর চিন্তায়। তুই কি বাপ মায়ের কথা চিন্তা করে নেশা ছাড়তে পারিস না?
তুষার- আমি ছোটবেলা থেকে দুটো একটা বিড়ি সিগারেট খেতাম। কিন্তু পুরোপুরি খাওয়া শিখেছি আপনার কাছ থেকে। মনে আছে আপনার, একদিন আপনি আর আমি রাত দুটোর সময় দড়াটানায় গিয়েছিলাম সিগারেট কেনার জন্য? আর পুলিশ সন্দেহবশত থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল।সারারাত দুজন আটকা।পরে দলীয় সুপারিশে ছাড়া পেয়েছিলাম। মনে আছে আপনার?
পাবলা- মনে আছে, সব মনে আছে। সে সব তো অতীত। যে আমি একটার পর একটা-। যে আমি একটার আগুন দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরাতাম, সেই আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।
তুষার - কি বলেন?
পাবলা- হ্যা,এখন আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি।
তুষার- শুনেছি, জেলের ভেতর গাজা, বিড়ি, সিগারেট - সব পাওয়া যায়। আপনি সিগারেট ছাড়লেন কেন?
পাবলা-৷ সে তুই বুঝবি না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ধর। দেখবি সব নেশা ছুটে গেছে। এভাবে আর নিজেকে শেষ করিস না। একটা মেয়ের জন্য তুই এভাবে নিজেকে শেষ করবি, আমি ভাবতেও পারিনা।আমি ভেবেছিলাম জেল থেকে মুক্তি পেলে তোকে নিয়ে একটা আন্দোলন করবো। চিত্রা পুনঃখনন আন্দোলন। তা তুই যেভাবে নিজেকে শেষ করছিস, তাতে মনে হয় না তা আর সম্ভব হবে।
তুষার- হ্যাঁ, চিত্রা নদী পুনরায় খনন করা দরকার। তা না হলে আমাদের এলাকায় এক সময় মরুভূমিতে পরিণত হবে।
পাবলা - ও শোন, তোর সাথে আর একটা কথা।
পাবলা ভাই তার কথা শেষ করতে পারল না। হঠাৎ ঝড়ের বেগে একজন লাল গেঞ্জি পরা মাঝ বয়সি লোক এল। তার পুলিশের মত ছোট করে চুল কাটা।এসেই পাবলা ভাইকে ভিতরের দিকে টানতে লাগলো। গম গম গম গম আওয়াজ।
পাবলা ভাই মরিয়া হয়ে বলল, কি ব্যাপার এভাবে টানছেন কেন? আমরা পাঁচ মিনিটও তো কথা বলতে পারিনি।
লোকটি শক্তভাবে বলল, আপনার সময় শেষ।
আমরা বাইরে থেকে চিৎকার করে বললাম, না, হতেই পারেনা।
শুরু হয়ে গেল তর্কাতর্কি।ছোট্ট গলিটার ভিতরে কথার বোম ফুটতে লাগলো। গম গম গম গম আওয়াজ। ছুটে এল তার সঙ্গীরা। পাবলা ভাই নিজেকে বারবার ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলো।সে পাবলা ভাইকে জেলের ভিতর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আর আমাদেরকে সমনে গালিগালাজ করছে যাচ্ছে। আমিও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যা মনে আসছে তাই বলছি। চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘর ফেটে পড়ার অবস্থা। হঠাৎ আমার পিঠে কিসের যেনো আঘাত পড়লো।তাকিয়ে দেখি এক হারামজাদা। লুঙ্গি পরা, গায়ে হাফহাতা গেঞ্জি। হাতে লাঠি। সেই লাঠি দিয়ে আমার পিঠে আঘাত করেছে। লোকটা কি একটানে মেঝের উপর পেড়ে ফেললাম। তারপর লাথি, চড়, কিল।ওর সাথে আরো দুজন ছিল। মারা মারিতে তারাও যোগ দিলো। তাদেরও সাইজ করলাম। এতক্ষণে আরো দুজন এসে গেছে। আমরা সবাই মিলে তাদেরও পেড়ে ফেলেছি। আর তারপর বুঝলাম যাদের সাথে মারামারি করছি এরা সবাই পুলিশ। কিন্তু ততক্ষনে দড়াম দড়াম মারামারি চলছে।আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পাশের গলিতে চলে এলাম।এই গলিতে কয়েকজন কয়েদি দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আতঙ্কে বুক ফেটে যাচ্ছে। যেদিকেই তাকাচ্ছি সেদিকেই পুলিশ। এখানে পুলিশের অভাব নেই। তাদের আস্তানায় ঢুকে তাদেরকেই মারছি।এরা মারতে মারতে আজ আমাদেরকে মেরেই ফেলবে। হঠাৎ পিঠে দড়াম করে ঘুষি পড়লো।তাকিয়ে দেখি,দুইজন রাইফেলধারী, পোশাক পরা পুলিশ। এতক্ষণ আমরা যাদের সাথে মারামারি করেছি সেই সব পুলিশদের কাছে অস্ত্র ছিল না। এদের কাছে অস্ত্র আছে। দুইজন দুই পাশ থেকে আমাকে মারতে শুরু করল। আমি প্রমাদ গুনলাম। আজ আর রক্ষা নেই। মৃত্যু অবধারিত। পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলার অসংখ্য রেকর্ড আছে পুলিশের। হঠাৎ আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। বললাম - ভাই, আমিতো মারামারি লোকনা। আমি আমার ভাইকে দেখতে এসেছি। তার জন্যই দাঁড়িয়ে আছি।
কথা শুনে সাথে সাথে দুজন আমাকে ধাক্কা মেরে গলি থেকে বের করে দিল।
- যা বাইরে যা।
বাইরে বেরিয়ে দেখি জেলখানার সামনে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশ রাইফেল নিয়ে সািরবদ্ধ ভাবে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি বেরিয়েই জনতার ভিড়ে মিশে গেলাম। ভিতরে এখন আরো পুলি ঢুকেছে। মারামারির গুড়ুম গুড়ুম শব্দ আসছে।হাউ মাউ কান্নাকাটি শোনা যাচ্ছে। আমার সংগীরা নিশ্চয়ই মার খাচ্ছে। এখন তো ওরা সংখ্যায় কম। আল্লাহই জানে, আজ ওরা সবাই মারা পড়বে কিনা।ভিড়ের ভিতর ভয়েভয়ে হারিয়ে যেতে যেতে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম - ভাই, এখানে এত লোক কেন?
- শুনলাম, যশোর থেকে সন্ত্রাসী এসে, জেল ভেঙে আসামে নিয়ে যাচ্ছে।
তার কথা শুনে আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। এক মুহূর্তে আমরা সন্ত্রাসী হয়ে গেলাম?
বুঝলাম এটা পুলিশের উর্বর মস্তিষ্কের রটনা।এখনই আমার এই স্থান ত্যাগ করা উচিত। কিন্তু পারলাম না। সবাইকে এইভাবে ফেলে রেখে আমি পালিয়ে যেতে পারি না।
কিছুক্ষণ পর আমার সঙ্গীদের বের করে আনা হলো।জেল গেটের মূল ফটকের ভিতর তাদের ঢোকানো হলো।
ভুঁড়িওয়ালা জেলার চেয়ারে বসে আছে। তিনি পেটানোর হুকুম দিলেন। শুরু হল ধুমছে মার। আমি ভিড়ের ভিতর দাঁড়িয়ে দেখছি আর ভয়ে কাঁপছি। থানা থেকে এক গাড়ি পুলিশ এল। আমার সঙ্গীদের সেই গাড়িতে তুলে দেয়া হল।
পরেরদিন পেপারে এলে -
জেল ভেঙে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা।