এই শহরে কেউ রোজা রাখে না।অন্তত এখন আর রাখে না।শহরের নাম “নূরনগর”। বহু বছর আগে এই শহর রমজান এলেই আলোকিত হয়ে উঠত। রাতের তারাবির নামাজে মসজিদ ভরে যেত, ইফতারের সময় গলিতে গলিতে বাচ্চারা খেজুর হাতে দৌড়াত।কিন্তু ধীরে ধীরে সব বদলে গেল।মানুষ ব্যস্ত হয়ে গেল, ধর্মকে পুরোনো অভ্যাস মনে করতে লাগল। একসময় এমন হলো রমজান এলেও কেউ আর খেয়াল করত না।শুধু একজন ছাড়া।সে মানাফ।
মানাফ ছিল শহরের এক পুরোনো লাইব্রেরির দেখভালকারী। লাইব্রেরিতে প্রায় কেউ আসত না। ধুলো জমা বই, ভাঙা তাক, আর পুরোনো কাগজের গন্ধ এই ছিল তার সঙ্গী।
একদিন সে লাইব্রেরির একটা পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করছিল।হঠাৎ একটা অদ্ভুত বই পেল।বইটার নাম ছিল “রমজানের গোপন ইতিহাস”
বইটা খুলতেই একটা লাইন তার চোখে পড়ল
“যে শহরে শেষ রোজাদার বেঁচে থাকে, সেই শহর এখনো ধ্বংস হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।
মানাফ থমকে গেল।
সে ভাবল এটা কি কেবল গল্প?
কিন্তু তারপর সে বুঝল একটা ভয়ংকর ব্যাপার।
পুরো শহরে হয়তো সেই একমাত্র মানুষ যে এখনো রোজা রাখে।
সেই রাতেই মানাফ অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখল।
সে দেখল শহরের ওপর একটা অন্ধকার মেঘ ঘুরছে। মেঘের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ বলছে
“মানুষরা আলো ভুলে গেছে।”
হঠাৎ একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।
আলোটা ছিল একটা ছোট্ট খেজুরের মতো।
আর সেই আলো ধরে আছে একজন মানুষ "মানাফ"
পরদিন সে স্বাভাবিক মতো রোজা রাখল।
কিন্তু সেদিন শহরে অদ্ভুত কিছু ঘটতে শুরু করল।
এই দুর্ঘটনা ঘটার কথা ছিল হলো না।
একটা বড় আগুন লাগলো এবং হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আগুন নিভে গেল। মানাফ এসব কিছুই জানত না।সে শুধু বিকেলে একটা খেজুর আর পানি দিয়ে ইফতার করল।
পরদিন আবার।আবার রোজা।আবার অদ্ভুত ঘটনা।
শহরের অনেক বিপদ যেন অদৃশ্যভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে।
একদিন লাইব্রেরিতে এক বৃদ্ধ এলেন।
তার চোখে অদ্ভুত আলো।
তিনি বললেন
“তুমি কি জানো তুমি কী করছো?”
মানাফ বলল
“আমি শুধু রোজা রাখছি।”
বৃদ্ধ হাসলেন।
“না। তুমি একটা শহর বাঁচিয়ে রাখছো।”
মানাফ অবাক।
বৃদ্ধ বইটা খুলে একটা পৃষ্ঠা দেখালেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“যে শহরে অন্তত একজন মানুষ সত্যিকারের নিয়তে রোজা রাখে, আল্লাহ সেই শহরের উপর রহমত নাযিল করেন।”
মানাফ চুপ করে রইল।
বৃদ্ধ আবার বললেন—
কিন্তু সাবধান। শেষ রোজা যদি ভেঙে যায়, শহরের আলোও নিভে যেতে পারে।
এরপর বৃদ্ধ হঠাৎ করেই চলে গেলেন।আর কখনো তাকে দেখা যায়নি।রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হলো।এই সময়েই মানাফের জীবনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এল।
একদিন সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল।
জ্বর, দুর্বলতা হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল।
সে ভাবল
আজ কি আমি রোজা রাখতে পারব?
তার সামনে পানির গ্লাস।
শরীর বলছে খেয়ে ফেলো।
কিন্তু হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই লাইন—
“শেষ রোজাদার…”সে গ্লাসটা সরিয়ে রাখল।
চোখ বন্ধ করে বলল
আল্লাহ, যদি আমার রোজা এই শহরের জন্য সামান্য উপকারও করে, তাহলে আমাকে শক্তি দিন।
সেদিনের রোজাটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন রোজা।কিন্তু সে রাখল।মাগরিবের আজান হলো।সে একটা খেজুর মুখে দিল।
ঠিক তখনই বাইরে অদ্ভুত কিছু ঘটল।
অনেকদিন পর শহরের মসজিদের মাইক থেকে কুরআন তিলাওয়াত ভেসে এলো।মানুষ অবাক হয়ে তাকাল।
কেউ বলে উঠলো
আজকে হঠাৎ কেন যেন মনে হচ্ছে রোজা রাখা উচিত…
আরেকজন বলল—
আমার দাদার কথা মনে পড়ছে… উনি রমজানে রোজা রাখতেন।
ধীরে ধীরে কয়েকজন মানুষ রোজা রাখা শুরু করল।
মানাফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার চোখে পানি চলে এলো।
সে বুঝল......
আলো কখনো পুরোপুরি নিভে যায় না।
কখনো কখনো শুধু একজন মানুষই যথেষ্ট হয়।
একটা শহরের অন্ধকারে আবার আলো জ্বালানোর জন্য।
...সমাপ্তি....
67
View