ইরান ও ভেনিজুয়েলা পৃথিবীর ৩১ শতাংশ তেলের মালিক। ইরানে তেলের ডিপোতে ইসরায়েলি হামলার পর বিরাট গোস্যা করেছেন ইউএস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেছেন -এটা তোমরা কী করলে? কারণ তিনি তেল পোড়াতে নয়, অধিকার করতে চান। যুদ্ধ রাজনীতির বড় একটা কারণ তেল সম্পদ। এবং এই তেলের মূল্য চোকাতে হয় খামেনি কিংবা মাদুরোর মতো নেতাদের জীবন দিয়ে।
যুদ্ধকে সাধারণত আমরা দেখি ভূরাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষ হিসেবে। ইতিহাসের পাঠও তাই বলে। কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি নির্মম বাস্তবতা আছে -এটি আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির এক ধরনের বাস্তব পরীক্ষাগার।
পরাশক্তিগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মারণাস্ত্র তৈরি করছে। ড্রোন, হাইপারসনিক মিসাইল, সাইবার অস্ত্র, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–নির্ভর যুদ্ধব্যবস্থা -এসব প্রযুক্তি ল্যাবরেটরি বা কম্পিউটার সিমুলেশনে পরীক্ষা করা যায় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা সেখানে থাকে না। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের প্রতিক্রিয়া, ভৌগোলিক জটিলতা, আবহাওয়া, শত্রুর পাল্টা কৌশল -সব মিলিয়ে অস্ত্রের প্রকৃত কার্যকারিতা বোঝা যায়। ফলে সংঘাত শুরু হলে সেটি হয়ে ওঠে প্রযুক্তি যাচাইয়ের নির্মম ক্ষেত্র।
ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। World War I–এ প্রথমবারের মতো ট্যাংক, সাবমেরিন ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আর World War II–এ জেট বিমান, রাডার ও পারমাণবিক অস্ত্র মানবসভ্যতাকে নতুন এক ভয়ের যুগে ঠেলে দেয়। যুদ্ধের প্রতিটি অভিজ্ঞতা অস্ত্র প্রযুক্তিকে আরও নিখুঁত ও বিধ্বংসী করেছে।
শীতল যুদ্ধের সময় এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরাসরি মুখোমুখি সংঘর্ষে না গিয়ে দুই পরাশক্তি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরখ করেছে। যেমন Vietnam War কিংবা Soviet–Afghan War শুধু ভূরাজনৈতিক লড়াইই ছিল না; এগুলো ছিল সামরিক কৌশল ও অস্ত্রের বাস্তব পরীক্ষার ক্ষেত্রও।
অবশ্যই রাষ্ট্রগুলো সাধারণত কেবল অস্ত্র পরীক্ষা করার জন্য যুদ্ধ শুরু করে না। যুদ্ধের পেছনে থাকে ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সেটি দ্রুতই পরিণত হয় নতুন প্রযুক্তি ও কৌশলের “লাইভ ল্যাবরেটরি”-তে। সেই পরীক্ষার ফলাফল হিসেব করা হয় মানুষের জীবন, ধ্বংস হওয়া শহর এবং ছিন্নভিন্ন মানবিকতার পরিসংখ্যানে।
অতএব যুদ্ধের প্রতিটি নতুন অধ্যায় শুধু রাজনৈতিক মানচিত্র বদলায় না; বদলে দেয় অস্ত্র প্রযুক্তির ভবিষ্যৎও। কিন্তু সেই অগ্রগতির মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ -যারা কখনোই এই পরীক্ষার স্বেচ্ছাসেবক কিংবা অনুঘটক কোনোটাই থাকে না।
এই কারণেই যুদ্ধকে অনেক সমর বিশ্লেষকই বলেন -পরাশক্তিদের সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষাগার, যেখানে প্রযুক্তির উন্নতি ঘটে মানুষের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে। যেখানে ক্ষমতা বিকিকিনি হয় বিপন্ন মানবতার দামে।
লেখক: সাংবাদিক
১০ মার্চ ২০২৬