আকাশ আর মেঘলার সম্পর্কের শুরুটা ছিল খুব সাধারণ। আকাশ ছিল একটা ছোট আইটি ফার্মের সাদামাটা ছেলে, আর মেঘলা ছিল চারুকলা থেকে সদ্য পাস করা প্রাণোচ্ছ্বল এক তরুণী। মেঘলা যখন হাসত, মনে হতো চারপাশের সমস্ত বিষণ্ণতা কেটে যাচ্ছে। আকাশ মেঘলার সেই হাসির প্রেমে পড়েছিল। তাদের চার বছরের সম্পর্কে কোনো বড় দাবি ছিল না। একটা ছোট ফ্ল্যাট, দুজনে মিলে রান্না করা আর বৃষ্টির দিনে জানালার পাশে বসে কফি খাওয়া—এই ছিল তাদের স্বপ্ন। আকাশ প্রায়ই বলত, "মেঘলা, আমি হয়তো তোমাকে প্রাসাদ দিতে পারব না, কিন্তু এক আকাশ ভালোবাসা দেব।" মেঘলা হাসত। ওর হাসিটাই ছিল আকাশের পৃথিবী। বদলে যাওয়া সময়,,,,,
লেখক: মাশরাফি শিকদার
বিয়ের সব কথা ঠিকঠাক। সামনের মাসে মেঘলা আকাশের ঘরে আসবে। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন মেঘলার ঘন ঘন মাথা ব্যথা শুরু হলো। প্রথম দিকে সবাই ভাবল কাজের চাপ। কিন্তু রিপোর্ট যখন হাতে এলো, আকাশের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। মেঘলার মস্তিষ্কে এমন এক টিউমার বাসা বেঁধেছে যা শেষ পর্যায়ে। অপারেশন করা সম্ভব, কিন্তু বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র ১০%। আর যদি বেঁচেও থাকে, হয়তো কাউকেই চিনতে পারবে না। আকাশ হার মানেনি। সে তার জমানো সব টাকা, এমনকি নিজের বাইকটাও বিক্রি করে দিল মেঘলার চিকিৎসার জন্য। মেঘলা যখন হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকতো, আকাশ ওর হাত ধরে বসে থাকতো। মেঘলা জানত ওর সময় ফুরিয়ে আসছে। সে একদিন খুব দুর্বল কণ্ঠে বলল, "আকাশ, যদি আমি সব ভুলে যাই, তুমিও কি আমাকে ভুলে যাবে?" আকাশ ওর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিল, "তুমি ভুললেও আমার ভালোবাসা তোমাকে রোজ নতুন করে মনে করিয়ে দেবে যে তুমি কার।" শেষ বিকেলের বিষাদ,,,,,,,,,,
অপারেশনের দিন আকাশ দরজার বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। দশ ঘণ্টা পর ডাক্তার বের হয়ে এলেন। অপারেশন সফল, কিন্তু মেঘলা কোমায় চলে গেছে। এক মাস, দুই মাস... আকাশ রোজ হাসপাতালে যায়। মেঘলার প্রিয় রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে পাশে বসে থাকে। ওর প্রিয় গানগুলো শুনিয়ে দেয়। ছয় মাস পর একদিন মেঘলা চোখ মেলল। কিন্তু সেই চোখে চেনা কোনো ভাষা ছিল না। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব অচেনা ভাবে বলল, "আপনি কে? আমি কোথায়?" আকাশের বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কিন্তু সে হাসল। চোখের জল আড়াল করে বলল, "আমি আপনার বন্ধু।" মেঘলা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরল, কিন্তু তার স্মৃতি থেকে আকাশ চিরতরে মুছে গেছে। সে আকাশকে একজন দয়ালু অপরিচিত মানুষ হিসেবে চেনে যে তার বিপদে পাশে ছিল। মেঘলার পরিবার সিদ্ধান্ত নিল তাকে দূরে পাঠিয়ে দেবে যাতে পুরোনো স্মৃতি তাকে আর কষ্ট না দেয়। এক বছর পর আকাশ এখন একাই থাকে। সে মেঘলাকে বিরক্ত করে না। সে চায় মেঘলা নতুন করে বাঁচুক। একদিন আকাশের কাছে একটা পার্সেল এলো। ভেতরে একটা নীল খাম। মেঘলা দেশ ছাড়ার আগে তার ডায়েরির শেষ পাতাটা ছিঁড়ে আকাশের জন্য রেখে গিয়েছিল। চিঠিটা ছিল মেঘলার অপারেশনের আগের রাতে লেখা: *"প্রিয় আকাশ, আমি জানি কালকের পর হয়তো আমি তোমাকে আর চিনতে পারব না। ডাক্তার বলেছে এমনটা হতে পারে। তাই এই চিঠিটা লিখে রাখছি। যদি আমি তোমাকে দেখে না চিনি, যদি আমি তোমাকে 'আপনি' বলে ডাকি, তবে বুঝে নিও সেটা আমি নই—সেটা কেবল আমার এক অসুস্থ মস্তিষ্ক। কিন্তু আমার হৃদস্পন্দন যখনই তোমাকে দেখবে, সে ঠিকই কাঁপবে। তুমি কি আমার একটা অনুরোধ রাখবে? আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই, তুমিও আমাকে ভুলে যেও না। কিন্তু আমার কাছে থেকো না। আমাকে দূর থেকে সুখী হতে দিও। কারণ তোমাকে চিনেও না চেনার অভিনয় করাটা হবে আমার জন্য মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণার। ইতি—তোমার মেঘলা।"* আকাশ চিঠিটা বুকে জড়িয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি। মেঘলার সেই পুরনো পছন্দের গানটা পাশের কোনো বাড়ি থেকে বাজছে। আকাশ জানত, মেঘলা এখন অন্য শহরে, হয়তো অন্য কারো সাথে হাসছে, যেখানে সে একজন 'অপরিচিত'। আকাশের চোখের জল বৃষ্টির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। সে হারায়নি, কিন্তু পাওয়ার সবটুকু সম্বল হারিয়ে সে আজ নিঃস্ব। ভালোবাসা মাঝে মাঝে প্রাপ্তিতে নয়, নিঃস্বার্থ ত্যাগের মাঝেই অমর হয়ে থাকে।