গল্পের শুরু হয় অর্পণের হাত ধরে। অর্পণ পেশায় একজন শৌখিন আলোকচিত্রী। পুরনো স্থাপত্যের ছবি তোলার নেশায় সে এসে পৌঁছায় উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রামে, যার নাম 'কালীপুর'। গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে এক বিশাল পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি, যাকে স্থানীয়রা চেনে 'রক্তিম প্রাসাদ' নামে। লোকমুখে শোনা যায়, একশ বছর আগে এই বাড়ির ছোট রাজকুমারী অকালমৃত্যুর পর থেকে বাড়িটি অভিশপ্ত।
অর্পণ স্থানীয়দের বারণ শোনেনি। সে তার ক্যামেরা আর ব্যাগ নিয়ে এক সন্ধ্যায় গিয়ে উঠল সেই ভগ্নপ্রায় প্রাসাদে।
প্রাশাদে প্রথম রাত,,,,,,,
বাড়ির ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই এক ভ্যাপসা গন্ধে অর্পণের নাক কুঁচকে এল। ধুলোর আস্তরণ আর মাকড়সার জালে চারপাশ ঢাকা। মাঝরাতের দিকে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ, অর্পণ দোতলার এক বড় ঘরে বিছানা পাতল। বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে।
হঠাৎ করেই নিচতলায় ভারী কোনো আসবাবপত্র সরানোর শব্দ শোনা গেল। খস... খস... ধপ! অর্পণ ভাবল হয়তো চোর বা কোনো বন্য প্রাণী। টর্চ নিয়ে সে নিচে নেমে এল। কিন্তু সদর দরজায় মস্ত বড় তালাটা যেমন ছিল তেমনই আছে। তাহলে শব্দটা এল কোথা থেকে? সে যখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে, হঠাৎ অনুভব করল তার ঘাড়ে কেউ যেন ঠান্ডা নিঃশ্বাস ফেলল। সে চট করে পেছনে ফিরল, কিন্তু কেউ নেই। শুধু হাড়হাঁপানো একটা ঠান্ডা হাওয়া তাকে ঘিরে ধরল।
রহস্যময়ী নারী ও জলরঙের কান্না,,,,,,
রাত তখন দুটো। অর্পণ হঠাৎ শুনতে পেল পাশেই কোনো এক ঘর থেকে নুপূরের শব্দ আসছে। খুব মৃদু কিন্তু ছন্দবদ্ধ। সে কৌতূহলী হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে খুঁজতে একদম কোণার একটা ঘরে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য খোলা। ভেতরে উঁকি দিতেই অর্পণের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল।
ঘরের মাঝখানে একটা ভাঙা ইজেলের সামনে ধবধবে সাদা শাড়ি পরা এক তরুণী বসে আছে। সে দেয়ালে কিছু একটা আঁকছে। অর্পণ কাঁপাকাঁপা হাতে ক্যামেরাটা বের করল। ফ্ল্যাশ জ্বলে উঠতেই মেয়েটি স্থির হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল।
অর্পণ দেখল, মেয়েটির চোখ নেই। চোখের জায়গায় কেবল দুটো কালো গর্ত, যেখান থেকে জল নয়—বরং কালো আলকাতরার মতো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে আর্তনাদ করে পেছাতে গেল, কিন্তু তার পা যেন মেঝেতে আটকে গেছে। মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, "তুমি এসেছ? আমার চোখের রঙটা কি ঠিক হয়েছে?"
দেয়ালে বন্দি আত্মা
অর্পণ পাগলের মতো দৌড়ে তার ঘরে ফিরে এল। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে আরও বেশি চমকে গেল। তার বিছানাপত্র সব ওলটপালট। দেয়াল জুড়ে লাল রঙ দিয়ে কিছু একটা লেখা হয়েছে। সে টর্চ জ্বালিয়ে দেখল লেখাটা ছিল: "ফিরে যেও না, তোমার রক্ত দিয়ে ছবিটা শেষ করতে হবে।"
হঠাৎ পুরো বাড়িটা যেন কেঁপে উঠল। নিচতলা থেকে হাজারো মানুষের কান্নার শব্দ শোনা যেতে লাগল। মনে হচ্ছিল শত শত আত্মা মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। অর্পণ জানালার দিকে ছুটে গেল লাফ দেওয়ার জন্য, কিন্তু দেখল জানালাগুলো লোহার শিক ছাড়াই নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে।
দেয়ালে টাঙানো পুরনো সব ছবিগুলোর চোখ নড়তে শুরু করল। তারা সবাই যেন অর্পণকে বিদ্রূপ করে হাসছে। সেই সাদা শাড়ি পরা তরুণীটি আবার ঘরের কোণায় আবির্ভূত হলো। এবার তার হাতে একটা ধারালো তুলি। সে ধীরে ধীরে অর্পণের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার পায়ের নূপুর এবার প্রচণ্ড জোরে বাজছে, যা অর্পণের কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
1
অর্পণ নিজের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করল। সে তার ক্যামেরাটা তুলে সজোরে মেয়েটির দিকে ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথেই এক বিকট আর্তনাদে পুরো প্রাসাদ কেঁপে উঠল। মুহূর্তের জন্য সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
অর্পণের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ভোরের আলো ফুটেছে। সে দেখল সে শুয়ে আছে প্রাসাদের বাইরের জঙ্গলে। সারা শরীরে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। স্থানীয় গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল। ওঝা বা কবিরাজ যখন তার শরীরে হাত দিল, তারা চমকে উঠল। অর্পণের জামার পেছনে ঠিক পিঠের মাঝখানে একটা হাতের ছাপ বসানো ছিল—যেটা মানুষের হাতের নয়, বরং হাড়ের কঙ্কালের ছাপ।
পরবর্তীতে জানা যায়, কালীপুরের ওই বাড়ির ছোট রাজকুমারী অন্ধ ছিলেন এবং তার মৃত্যুর পর তার আত্মা নাকি চোখের খোঁজে এখনো ওই প্রাসাদে ঘুরে বেড়ায়। অর্পণ বেঁচে ফিরলেও আজও সে মাঝরাতে নূপুরের শব্দ শুনতে পায় এবং অন্ধকারে তার নিজের চোখের মণিতে অন্য কারো ছায়া দেখতে পায়।
37
View
Comments
-
Mashrafi Shikdar 1 month ago
আশা করি পাঠকের গল্পটি পরে রোমাঞ্চকর অনুভব হবে।