
বাংলাদেশ-পাকিস্তান ওয়ানডে সিরিজের মধ্য দিয়ে আবারও ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয় দল। প্রায় পাঁচ মাসের বিরতির পর এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচই নয়, বরং সামনে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনাও। কারণ, এই সিরিজ থেকেই শুরু হচ্ছে এমন এক পথচলা-যেখানে প্রতিটি জয় ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ওয়ানডে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা হতে পারে নিজেদের মাটি। চলতি বছরে সাউথ আফ্রিকা সফর বাদ দিলে বাংলাদেশের অধিকাংশ দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজই অনুষ্ঠিত হবে দেশের মাটিতে। আর সেই সূচিতে রয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটের শক্তিধর দল অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারতের বিপক্ষে সিরিজও।এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ম্যাচগুলোর বেশিরভাগই অনুষ্ঠিত হবে মিরপুরের শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। যাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘হোম অব ক্রিকেট’ বলা হয়। যদিও ইতিমধ্যে বাংলাদেশ তাদের প্রথম জয় তুলে নিয়েছে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে দাপুটের সাথে। আর আজকের উইকেট যদি খেয়াল করে দেখা যায় উইকেট ছিলো পুরোটাই সাদা উইকেট, ঘাস সহ। অর্থাৎ স্পোর্টিং উইকেট। ঘাস থাকার কারণে উইকেট সাধারণত শক্ত ও সতেজ থাকে, যার ফলে যেখানে শুরুর দিকে বাংলাদেশী পেসাররা বেশি সুবিধা পেয়েছে।যা বিসিবি এইবার চিরচেনা জায়গা থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তাও থেকে যায়-পাকিস্তান থেকে শুরু করে আগামী দিনের সিরিজে মিরপুরে অনুষ্ঠিত ম্যাচগুলো কি শুধুই জয়ের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিতভাবে তৈরি উইকেটে খেলে পার করার চেষ্টা করবে বাংলাদেশ, নাকি আজকের ম্যাচের মতো সত্যিকারের স্পোর্টিং উইকেট তৈরি করে নিজেদের সামর্থ্যের প্রকৃত পরীক্ষায় নামার সাহস দেখাবে বাংলাদেশ? এমন একটি উইকেট, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে সমানতালে-ব্যাটসম্যান ও বোলার উভয়ের জন্যই থাকবে নিজেদের দক্ষতা মেলে ধরার সুযোগ। আর সেই মঞ্চেই হয়তো দেখা যাবে, চাপের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা তুলে ধরতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত।কিন্তু এই পিচের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উত্থান-পতনের বহু গল্প-কখনও গৌরবের, কখনও হতাশার। তাই এইবারের মিরপুরের পিচ- নামমাত্র জয়ের মঞ্চ হবে, নাকি বাংলাদেশের ভাগ্য বদলের শুরু? সেইসব বিশ্লেষণ, প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের ওয়ানডের সাম্প্রতিক অবস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মতবাক্যের সমন্বয়ে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে আজকের এই আয়োজন সাজানো হয়েছে।জানিয়ে রাখি, এই দৃষ্টিকোণটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে পড়ার আগ্রহ নাও থাকতে পারে অনেকেরই। তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত।চলুন শুরু করা যাক।

মিরপুর স্টেডিয়ামের ইতিহাস
প্রত্যেক মানুষের যেমন একটি আনুষ্ঠানিক নাম থাকে, তেমনি থাকে আরেকটি পরিচিতি- ডাকনাম। অনেক সময় সেই ডাকনামই মানুষের আসল নামকে ছাপিয়ে যায় এবং পরিচয়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই একটি আলাদা পরিচয় গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে এই ভেন্যুটি অনেকের কাছেই পরিচিত তার বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যের কারণে- ‘কালো মাটির উইকেট’ নামে।সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নামটি যেন মিরপুরের পরিচয়ের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কেউ বলুক কিংবা না বলুক, মিরপুরের পিচ নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই ‘কালো মাটির উইকেট’ কথাটি অবধারিতভাবেই উঠে আসে।ফুটবলের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মিরপুর স্টেডিয়ামকে ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দ দেয়। এরপর শুরু হয় নতুন করে গড়ে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞ। প্রায় দেড় বছরের অবিরাম প্রস্তুতির পর ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে এই মাঠেই প্রথমবারের মতো গড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট।

মাঠের একেবারে মাঝখানে বিশাল আয়তাকার গর্ত আবার সেদিকে চারদিকে বাউন্ডারি ওয়ালের মতো ইটের গাঁথুনি আউটফিল্ড থেকে জায়গাটাকে আলাদা করেছে। পরে সেই ‘বাউন্ডারি ওয়াল’ চলে গেছে মাটির নিচে। মিরপুরের পিচকে আন্তর্জাতিক মানের হাইপ্রোফাইল বানাতে মিরপুর স্টেডিয়ামের উইকেটের পরামর্শক হিসেবে আনা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার পার্থের তৎকালীন ওয়াকা গ্রাউন্ডের কিউরেটর রিচার্ড উইন্টারকে। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন, রিচার্ড উইন্টারকে।তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় মিরপুরের উইকেট নির্মাণের নতুন স্বপ্ন।

মাঠের মাঝখানের সেই আয়তাকার অংশটির দিকে ইঙ্গিত করে উইন্টার বলেছিলেন—এখানেই তৈরি হবে ওয়াকার আদলে এক গতিময় ও বাউন্সি উইকেট। ক্রিকেটবিশ্বে ওয়াকা পরিচিত তার দ্রুতগামী ও লাফিয়ে ওঠা পিচের জন্য, যেখানে ব্যাটসম্যানদের যেমন চ্যালেঞ্জ থাকে, তেমনি বড় রানের ইনিংস খেলার সুযোগও তৈরি হয়।উইকেট তৈরির জন্য বিভিন্ন অঞ্চলের মাটির নমুনা পরীক্ষা করে শেষ পর্যন্ত বেছে নেওয়া হয় সাভার অঞ্চলের কালো মাটি। এই মাটিতে ক্লে বা আঠালো উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকায় উইকেট শক্ত ও কমপ্যাক্ট হয়- যা বলের গতি ও বাউন্স বাড়াতে সহায়ক। উইন্টারের পরিকল্পনায় উইকেটের নিচে ইট, পাথর, বালু ও মাটির স্তর সাজানো হয় ধাপে ধাপে- অনেকটা ওয়াকার কাঠামোর অনুকরণেই।যা রীতিমতো নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া- ভারতরা খেলতে অভ্যস্ত।

কিন্তু যে আয়তাকার পিচ ব্লক একসময় বড় স্বপ্নের প্রতীক ছিল, সেটিই আজ অনেকের কাছে বিতর্কের কেন্দ্র। দর্শকদের কেউ কেউ রসিকতা করে একে ‘মিরপুরের ধানক্ষেত’ বলেও আখ্যা দেন।অবশ্য এমন নয় যে এই মাঠে কখনো বড় রান হয়নি। শুধুমাত্র ওয়ানডে ক্রিকেটেই ১৫ বারের বেশি তিনশ’র গণ্ডি পেরোনো স্কোর দেখেছে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম। ২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের ৩৭০ রান এখনো এই মাঠের সর্বোচ্চ ইনিংস। আবার ২০১২ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের করা ৩২৯ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডও গড়েছিল ভারত- যা মিরপুরে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার কীর্তি। অন্যদিকে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে টেস্টের এক ইনিংসে এ মাঠেই ৭৩০ রান করেছে শ্রীলঙ্কা, সেটিও ৬ উইকেট হারিয়ে। সেইসাথে খোদ বাংলাদেশের ও রয়েছে টেস্টের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ স্কোর এই মিরপুরের মাঠেই, ৫৬০ রান করেছিলো তাও কাকতালীয়ভাবে শ্রীলঙ্কার মতো ৬ উইকেট হারিয়ে। এমনকি এই পিচেই রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টি টুয়েন্টি ইনিংস ২১১ রান।
তবুও বাস্তবতা হলো, মিরপুরের ইতিহাসে বড় রানের ম্যাচের চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ব্যাটসম্যানদের সংগ্রাম আর স্পিনারদের আধিপত্য। অনেক সময় বল ঠিকমতো বাউন্স করে না, ধীরগতির পিচে রান করা কঠিন হয়ে পড়ে-এসব অভিযোগই বেশি শোনা গেছে ক্রিকেটার ও বিশ্লেষকদের মুখে।তবে মিরপুরে তিন সংস্করণের ক্রিকেটেই ব্যাটিং–ব্যর্থতা আর স্পিন-সহায়তার এমন এমন নজির আছে যে বড় রানের ম্যাচগুলো মানুষ মনে রেখেছে কমই। বল ওঠে না, স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পায়, ব্যাটসম্যানদের রান করা দুরূহ- এসবই এখানে বেশি দেখা গেছে। দায়টা আসে ঘুরেফিরে সেই কালো মাটি আর কিউরেটরদের ওপর। শুধুই কি কালো মাটির দোষ! মিরপুরের পিচ একেবারেই জঘন্যতম পিচ যে ছিলো কিন্তু তা নয়, তার প্রমাণ ওই বড় রানের ম্যাচগুলোই। এখানেই এখানেই আসে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অপ্রিয় বাস্তবতার প্রসঙ্গ। কিউরেটর উইকেট বানান, উইকেটের পরিচর্যা করেন ঠিক আছে; কিন্তু তাঁকে যদি অন্যের ইচ্ছায় ম্যাচ জেতানোর রেসিপিতে তা করতে হয়, দায়টা শুধু কিউরেটরের কেন হবে?
কারণ পিচ তৈরি ও পরিচর্যার দায়িত্ব কিউরেটরের হলেও, অনেক সময় সেই উইকেট প্রস্তুত করতে হয় অন্যদের প্রত্যাশা অনুযায়ী। ম্যাচ জয়ের নির্দিষ্ট ‘রেসিপি’ মেনে পিচ বানাতে হলে দায়টা শুধু কিউরেটরের ঘাড়ে চাপানো কতটা যৌক্তিক-সেই প্রশ্নও উঠেছে বারবার।

জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ অনেক সময় স্পিন-সহায়ক উইকেটের চাহিদা জানিয়েছেন। আবার ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রভাবশালী ক্লাবগুলোর প্রভাবেও পিচের ধরন বদলানোর ঘটনা ঘটেছে। এমনও হয়েছে, উইকেটে ঘাস রেখে পেস সহায়ক কন্ডিশন তৈরি করা হচ্ছিল, কিন্তু ম্যাচের আগের দিন নির্দেশ এসেছে ঘাস কেটে ফেলার। এইসব হস্তক্ষেপের কারণেই ওয়াকার মতো দ্রুতগতির উইকেট তৈরির যে স্বপ্ন নিয়ে মিরপুরের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেছে। ফলাফল- এই পিচ কখনোই স্থির কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে পারেনি।এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা- অতিরিক্ত খেলার চাপ। আন্তর্জাতিক ম্যাচের পাশাপাশি ঘরোয়া টুর্নামেন্ট মিলিয়ে বছরে প্রায় দেড়শ দিনের মতো ক্রিকেট হয় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। এত ঘন ঘন ব্যবহারে পিচের স্বাভাবিক গুণগত মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এই পিচে খেলা না খেলা দুটোই সমান হয়ে দাঁড়ায়। সব মিলিয়ে মিরপুরের উইকেট যেন এক জটিল গল্প- যেখানে স্বপ্ন, বাস্তবতা, চাপ এবং সিদ্ধান্তের প্রভাব একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর সেই কারণেই এই মাঠ আজও বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক আলোচিত, কখনো গর্বের, আবার কখনো বিতর্কের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
মিরপুর স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের উত্থান পতন
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম- এই পিচেই অসংখ্য জয়গাথা লেখা আছে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের। বিশেষ করে ২০১৫ সালকে বলা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্বর্ণযুগ। একে একে ক্রিকেটের তিন পরাশক্তি পাকিস্তান, সাউথ আফ্রিকা, ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জয় গোটা ক্রিকেট বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছিলো।ব্যাটিং বোলিং নৈপুণ্যে রীতিমতো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেমন অপ্রতিরোধ্য ছিলো ঠিক তেমনি মিরপুর পিচ ছিলো আন্তর্জাতিক মানের সেরাদের মধ্যে স্টেডিয়াম। কিন্তু সময়ের পালাবদলে এই স্টেডিয়াম পরিণত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির পথে কাঁটা হয়ে।বর্তমান মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে অনেকেই মজার ছলে একটি নাম দিয়েছেন। মিরপুর ধানক্ষেত স্টেডিয়াম। তিতা হলেও সত্যি যে বর্তমান মিরপুর পিচের যেই অবস্থা তাতে করে অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো দলের জন্য ক্রিকেট ম্যাচ খেলা যেমন দুর্বিষহ ঠিক তেমনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য আধুনিক ক্রিকেট থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিশেষ ধাপ বললেও খুব একটা ভুল হবার নয়। শুধু কি তাই! আইসিসি কর্তৃক এই পিচকে "নিম্নমানের" (below average) আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং ডিমেরিট পয়েন্টও যোগ হয়েছেস্পিন-বান্ধব উইকেট তৈরি করতে গিয়ে পিচটি অসঙ্গতিপূর্ণ বাউন্স তৈরি করে, যার ফলে ব্যাটারদের থিতু হতে সমস্যা হয়।সাকিব আল হাসান একবার বলেছিলে মিরপুরে খেললে যেকোনো ব্যাটারের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নামমাত্র জয়

আগেই বলেছি ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য ছিলো স্বর্ণযুগ। ব্যাটিং বোলিং নৈপুণ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যে সমীহ জাগানো শুরু করেছিলো তাতে করে যেকোনো দল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাথে খেলার আগে ছক কষতো আলাদা করে। বাংলাদেশের মতো দলের বিপক্ষে ছক কষতে হচ্ছে, ভাবা যায়!!কিন্তু পরবর্তী সময় যদি লক্ষ্য করি বিশেষ করে টি টুয়েন্টি কিংবা টেস্টে বাংলাদেশের জন্য মিরপুর স্টেডিয়াম হয়ে গিয়েছিল এক্স ফ্যাক্টর। 'মিরপুর মানেই বাংলাদেশের জয়' তা যেনো ট্র্যাডিশনাল বাক্যে পরিণত হয়েছিল।বাংলাদেশের ট্র্যাডিশনাল জয়ের কথা বললেই বেশকিছু সিরিজ অটোমেটিকলি চলে আসেই। ব্যক্তিগত ভাবে আমি আমার জায়গা থেকে কিছু সিরিজ নিয়ে কথা বলবো যা বাংলাদেশকে যেমন ক্ষতি করেছে, ঠিক তেমনি একজন গণমাধ্যমের ছাত্র হিসেবে ও একজন ক্রিকেট প্রেমী হিসেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভবিষ্যৎ এবং খেলাকে ঘিরে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কথায় ফেরা যাক, প্রত্যেকটি দল বিশ্বকাপের আগে নিজেদের শক্তিমত্তা যাচাই-বাছাই করে থাকে এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট করে থাকে। ব্যাটিং পজিশন অদলবদল থেকে শুরু করে নতুন কিছু কৌশল যুক্ত করে থাকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ও এর বাইরে নয়; তাই ২০২১ টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড দলের বিপক্ষে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ আয়োজন করেছিলো এই মিরপুরের পিচে। দর্শকশুন্য গ্যালারিতে ম্যাচ আয়োজন হলেও অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের ম্যাচ এই উত্তেজনায় ভার নিয়ে টিভি সেটের সামনে দর্শকের উপস্থিত যে থাকবে তা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না। দুবাইয়ের পিচে রান হয়ে থাকে ব্যাটিং পিচ এবং পেইস বোলিং এর দাপট থাকবে তা সবারই সাধারণ জ্ঞানের মতো পরিষ্কার। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সম্ভবত বিশ্বকাপের প্রস্তুতির নামে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটার জন্য এই সিরিজ আয়োজন করেছিলো। বর্তমান টি টুয়েন্টিতে রান হয়ে থাকে ২৫০+ বা তার নিচে ২০০, ১৯০ বা ১৮৫, ১৭০ সেখানে বাংলাদেশের টার্গেট ছিলো ১৩৫,১২৫,১৩০।

স্পিন ট্র্যাকের ভেল্কি বাজিতে এক ম্যাচ বাদে সবকটিতে জিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল খুবই বাহবা লাভ করেছিলো।এরপরের সিরিজ ছিলো, নিউজিল্যান্ডের সাথে। কিন্তু দর্শক হিসেবে সবার আগ্রহের পারদ ছিলো তলানীতে। তবে এই জায়গায় জানিয়ে রাখি, নিউজিল্যান্ড সম্ভবত এই সিরিজকে নিছকই একটি নামমাত্র অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে কাউন্ট করেছিলো কারণ এই সিরিজে নিউজিল্যান্ড দু একজন সিনিয়র খেলোয়াড় বাদে পুরো টিমই ছিলো দ্বিতীয় সারির দল, তথা বি টিম। এই সিরিজের ফলাফল তাদের কাছে তেমন গুরুত্বই রাখেনি, কারণ তারা বুঝেছিলো এই উইকেটে আর যায় হোক আদর্শ মানের ক্রিকেট খেলা অসম্ভব। যথারীতি আবারো স্পিন ট্র্যাকের ভেল্কি বাজিতে সিরিজ জয়, আর বাংলাদেশের টার্গেট সেই ১৫০ এর নিচেই আবদ্ধ। বলাই বাহুল্য যে নিউজিল্যান্ডের দেওয়া ৯৩ রানের টার্গেটে ব্যাটিং করতে নেমে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল জয়ের বন্দরে পৌঁছায় ৫ বল বাকি থাকতে। হ্যাঁ ঠিকই দেখছেন, ১২০ বলের খেলায় মাত্র ৯৮ রানের টার্গেট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জয়ের বন্দরে পৌঁছায় মাত্র ৫ বল হাতে রেখে অথচ বাংলাদেশের হাতে ছিলো ৬ উইকেট।

এই সিরিজের অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলো; ফলাফল হাতেনাতেই পেয়ে যায় বাংলাদেশ। স্পোটিং উইকেটে বাংলাদেশ অন্যান্য দলের তুলনায় কতো যে পিছিয়ে তা সেখানে প্রমাণ হয়েছিলো। ছোট দল স্কটল্যান্ডের কাছেও হারের সম্মুখীন হতে হয় বাংলাদেশের। জানিয়ে রাখি, যে অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডকে দ্বিপাক্ষিক সিরিজে হারিয়ে বাংলাদেশ আত্মতৃপ্তিতে ডুবেছিলো সেই দুটি দলই টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছিলো।এইবার আসা যাক একই বছর পাকিস্তান সিরিজের প্রসঙ্গে। এইবার বাংলাদেশ দেরীতে হলেও আবারো স্পোটিং উইকেটের ব্যবস্থা করে পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ আয়োজন করে। ফলাফল বাংলাদেশ আবারো প্রমাণ করে স্পিনিং উইকেটে বাংলাদেশ কেনো সেরা; স্পোটিং উইকেটে কেনো নয়! তিন ম্যাচের টি টুয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশ স্পোটিং উইকেটে বড্ড যে বেমানান তা প্রমাণ দেয়। পরের বিশ্বকাপ আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ এবং ২০২২ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যে কটি ম্যাচ খেলেছিলো খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স উন্নতি মিরপুরের পিচ যে কতবড় যে ক্ষতি করেছিলো তা হারে হারে বুঝতে পেরেছিলো।

তার আরো একটি প্রমাণ ২০২৪ সালে জিম্বাবুয়ে-শ্রীলঙ্কা সিরিজে। ২০২৪ বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজ আয়োজন করে বাংলাদেশ, একে তো ছোট দল তার উপর মিরপুরের স্পিনিং উইকেটে বাংলাদেশের নামমাত্র জয় যেনো ক্রিকেটের আসল জয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলো। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা সিরিজের ভেন্যু ছিলো সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। তিন ম্যাচের টি টুয়েন্টি ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে ৩-০ ব্যবধানে পরাস্ত হলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ও যে স্পোটিং উইকেটে মানিয়ে নিতে পারে তা প্রমাণ দিয়েছিলো। ২০২৪ এর শেষের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ তিন ম্যাচের টি টুয়েন্টি সিরিজ ব্যাটিং বোলিং ফিল্ডিং নৈপুণ্যে জিতে নেয়। অথচ পিচ ছিলো স্পোটিং উইকেট। স্পোটিং উইকেটে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে বাংলাদেশ যে সমান পারদর্শী এবং আত্মবিশ্বাসী তা বাংলাদেশ দেখিয়েছিলো। শুধু তাই নয় , ২০২৫ এ শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তান সিরিজেও বাংলাদেশ স্পোটিং উইকেটে ব্যাটিং বোলিং ফিল্ডিং তিন বিভাগেই নিজেদের শক্তিমত্তার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছিলো।

কথায় আছে, মানুষ অভ্যাসের দাস। বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন বারবার সেই কথাটিই নতুন করে প্রমাণ করছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ- এই দুইটি সিরিজই অনুষ্ঠিত হয়েছিল মিরপুরের শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।নামমাত্র জয় নিয়ে সেই সিরিজগুলো শেষে বাংলাদেশ দল আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছিল—যেন সবকিছুই ঠিক পথে এগোচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মাঠে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স যেমন খুব বেশি আশাব্যঞ্জক ছিল না, তেমনি প্রতিপক্ষ দলগুলোর অবস্থাও ছিল নাজুক। ফলে এই জয়গুলো কতটা প্রকৃত শক্তির প্রতিফলন আর কতটা পরিস্থিতির সুযোগ-সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
তবে ম্যাচগুলোর সামগ্রিক মান এবং দুই দলের পারফরম্যান্সের নাজুক অবস্থা নিয়ে আর না বাড়ালেই বোধহয় ভালো।একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা জরুরি। মিরপুরের স্পিননির্ভর উইকেটে বাংলাদেশ বহুবার সাফল্যের দেখা পেলেও, দেশের অন্য ভেন্যু-বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও সিলেটের তুলনামূলক স্পোর্টিং উইকেটে সেই ধারাবাহিকতা খুব একটা দেখা যায়নি। যেখানে ব্যাটিং ও বোলিং উভয় বিভাগের জন্যই সমান সুযোগ থাকে, সেখানে অনেক সময়ই লাল-সবুজের দল নিজেদের সেরা ক্রিকেটটা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।এর সাম্প্রতিক উদাহরণও রয়েছে। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের পাশাপাশি সমান সংখ্যক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশে এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তিন ম্যাচের টি টুয়েন্টি সিরিজ;সেই টি-টোয়েন্টি সিরিজেই আবারও স্পষ্ট হয়ে ওঠে একই বাস্তবতা, সমতাভিত্তিক উইকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেটে নিজেদের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ।

মাঝে মাঝে মিরপুরের উইকেট বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। কিন্তু কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে এক উল্টো ধাঁধা, যা দলের পরিকল্পনাকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দেয়। ২০২৩ সালে নিউজিল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ যখন পরিচিত স্পিনিং উইকেট কম্বিনেশন সাজিয়েছিল, সেই মিরপুর এবার কথা বললো না। বরং নিউজিল্যান্ডের নিখুঁত বোলিংয়ে টাইগাররা ৪ উইকেটের পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হলো।একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটলো ২০২৪ সালে, যখন সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ। তবে সাউথ আফ্রিকার বিশ্বমানের স্পিন বোলিংয়ের কাছে মিরপুরের সেই পরিচিত পিচও কেবল স্বাভাবিক প্রতিপক্ষের সুবিধা হিসেবে কাজে এল-বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিখুঁতভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হতে হলো।স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসেই, বাংলাদেশ কি আসলেই বাইরের দেশে স্পোটিং উইকেটে খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে নাকি বাইরের দ্বিপাক্ষিক সিরিজের হারের শোক ভুলতে নিজেদের হোম ভেন্যুর নাজায়েজ ফায়দা তোলে?
সমালোচনা

লিটন কুমার দাস
যবে থেকে বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টির অধিনায়কত্ব পেয়েছে লিটন কুমার দাস, ওখান থেকে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে নতুন করে পালা বদল শুরু হয়। পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজ আফগানিস্তান সহ বড় বড় দলের বিপক্ষে মুন্সিয়ানা দেখানোর সাহস করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু তার কন্ঠেও রয়েছে মিরপুরের পিচ নিয়ে আক্ষেপ। তার ভাষায়- বাংলাদেশ দলে আসার আগে আমি প্র্যাকটিস করতাম রংপুরে, বগুড়ায়, চট্টগ্রাম, রাজশাহীতে- সবই খুব ভালো উইকেটে। বিকেএসপিতেও ভালো উইকেট। আপনি ও রকম উইকেটে যখন নিয়মিত খেলবেন, আপনার খেলার প্যাটার্নটাও থাকবে ও রকম। জাতীয় দলে চলে আসার পর আমি প্র্যাকটিস করছি এখানে (মিরপুরে)। এখানকার উইকেটে যদি কোনো খেলোয়াড় এক মাস ব্যাটিং প্র্যাকটিস করে, তার ভালো হওয়ার চেয়ে খারাপ হওয়ার চান্সটা একটু বেশি। বলছি না সবার এমন হবে। আমি এখানে নিয়মিত প্র্যাকটিস করাতে আমার যে নিজস্ব কিছু শট ছিল, সেই শটগুলো কমে গিয়ে আস্তে আস্তে মনে ডাউট আসা শুরু হয়েছে। ওই ডাউট থেকে আস্তে আস্তে আমার স্কিল লেভেল নিচে নেমে এসেছে।
একজন ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনি যদি জানেন বল সুইং হবে, টার্ন করবে, সেটা কিন্তু খুব বড় সমস্যা না। কিন্তু যখন পিচে বল পড়ার বল কী হবে আপনি জানেন না, তাহলে খুব কঠিন। কারণ, একজন ব্যাটসম্যানের জন্য সেকেন্ডেরও কম সময় থাকে। আমি কেন বারবার এই কথাটা বলছি, যদি এমন হতো যে এটা শুধু আমার ক্ষেত্রেই হচ্ছে, আমি ম্যানেজ করতে পারছি না, তাহলে ভিন্ন কথা ছিল। সমস্যা তো সবারই হচ্ছে।তাছাড়াও অ্যাডজাস্টমেন্ট বলেও বিষয় আছে। আমরা যখন বিদেশে খেলতে যাই, কথার কথা, আমরা যখন নিউজিল্যান্ডে যাই, অস্ট্রেলিয়ায় আমার কখনো সৌভাগ্য হয়নি যাওয়ার, ওয়েস্ট ইন্ডিজে যাই, আমরা স্ট্রাগল করি না, তা না। তবে সাত-আট দিন করার পর একটু অ্যাডজাস্ট করতে পারি। যদি একদমই করতে না পারতাম, তাহলে আমরা কেউ ওখানে একদমই দাঁড়াতে পারতাম না।
নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশন বাউন্সি ও সুইং-ই, লো বাউন্সের কোনো চান্স নেই। বল বেশি ঘোরারও কোনো চান্স নেই। তার মানে আমরা প্রস্তুতি নেব বাউন্সি উইকেটের জন্য। মিরপুর যদি আমাকে বলত তোমার শুধু বল ঘুরবে, তাহলে কিন্তু আমরা সে জন্য প্রস্তুতি নিতাম। কিন্তু মিরপুর আমাকে বলছে, বল ঘুরবে, বল সোজা যাবে, বল নিচু হবে, বল হঠাৎ লাফাবে। এখানে আপনি কীভাবে অ্যাডজাস্ট করবেন? একই জায়গায় বল পড়ছে, বোলারও হয়তো বলটা ছাড়ছে একইভাবে, তারপরও একটা বলটা পড়ার পর হয়তো অফ স্পিন করেছে, আরেকটা সোজা যাচ্ছে। বোলারও জানে না কী হবে।
মিরপুর তো তাহলে আমাদের ক্রিকেটের বড় ক্ষতি করছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে কী, বিশ্বব্যাপী আপনি যদি দেখেন পাঁচ বছর আগেই কিন্তু ওয়ানডে ৩২০-৩৩০ রানে খেলা হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা জানি, মিরপুরে কোনো দল যদি আড়াই শ করে, ডমেস্টিকেও আপনি দেখেন, ২৫০ করলেই সেই দল জানে, যদি দ্রুত দুইটা উইকেট ফেলে দিতে পারি, টার্গেট ২৭০ হয়ে যাবে, আরেকটা উইকেট ফেলতে পারলে ২৯০। ২৯০ বা ২৭০ কিন্তু অনেক রান মিরপুরের জন্য।আমি আবারও বলছি, আমাদের বাঙালিদের তো লিমিটেড শট, লিমিটেড স্কিল, আমরা হয়তো ব্যাকফুটের বল অনেক কষ্ট করে এক নিই। বাইরের যারা পাওয়ার হিটার, অনেকে তো ছয়ও মারে। তারাও কিন্তু ওই রান তাড়া করতে পারে না। শুধু একটা কারণেই, তাদের মধ্যেও ওই ডাউটটা তৈরি হয়ে যায়।
আরেকটা ক্ষেত্রে আমি সবচেয়ে বেশি স্ট্রাগল করি, আমরা সবাই জানি ভালো উইকেটের প্যাটার্নটা একটু আলাদা। খারাপ উইকেটে খেলতে খেলতে ভালো উইকেটের প্যাটার্ন বিশেষ করে আমি ধরতে পারি না। ভালো উইকেটে কখন অ্যাটাক করব, কখন আমি নিজেকে সময় দেব…। খারাপ উইকেটে আমি জানি বেশিক্ষণ টিকতে পারব না, আমাকে রান বের করে নিতে হবে। তখন তাড়াহুড়া থাকে এবং তা করতে গিয়ে অনেক শট আছে, যেটা ওই বলের না, সেটাও আপনি খেলে ফেলেন। ভালো উইকেটে কিন্তু যত স্থির থাকা যায়, তত ভালো। কারণ, আপনার ওই ইনিংসটাকে বড় করার সুযোগ থাকে। আমি মনে করি, ভালো উইকেটে খেলার সময় আমি সেটিকে ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারিনি, যেটা মিরপুরের লো উইকেট বাধাগ্রস্ত করেছে। ভালো উইকেটে ব্যাটিং করার সময় প্ল্যানিংটা আরও ভালো হতে হয়।

বিসিবির কোচ সোহেল ইসলাম
বিসিবির বেতনভুক্ত কোচ সোহেল ইসলামকে মিরপুরে জাতীয় দলের অনুশীলনে প্রায়ই দেখা যায়৷ কিন্তু তার কন্ঠে ও মিরপুরের পিচ নিয়ে শোনা গেলো আক্ষেপের কথা।এই উইকেট এবং খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তার ধারণা অনেক বেশি। ভালো উইকেটে খেলা কেন জরুরী এবং মিরপুরের মতো উইকেটে খেলা ক্রিকেটার ও দলের জন্য কেন ক্ষতিকর, সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।মিরপুর শের-ই বাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। এখানকার স্লো এবং লো বাউন্সের উইকেটে সাময়িকভাবে সাফল্য পেলেও বড় মঞ্চে এই মন্ত্র কাজে আসছে না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও মিরপুরের পিচ নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। তবে কখনোই খুব একটা ভ্রুক্ষেপ করেনি বিসিবি। গেলো বছর পাকিস্তানের সাথে টি টুয়েন্টি সিরিজে পাকিস্তান দলের কোচ এবং অধিনায়ক মিরপুরের পিচ নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটাররদের অনেকেই সরাসরি না বললেও আদর্শ মানতে পারছেন না মিরপুরের এই পিচকে। এবার কোচ সোহেল ইসলামও উইকেট নিয়ে সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেছেন।
দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে মিরপুরের উইকেট সাধারণত বোলিং সহায়ক হয়। স্পিনারদের টার্ন পেতে দেখা গেলেও পেসাররা প্রত্যাশা অনুযায়ী বাউন্স পান না। ব্যাটারদেরও খেলতে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয়। ফলে মিরপুরের উইকেট একটি ধাঁধার মতো মনে হয় বাইরের দেশের ক্রিকেটারদের কাছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা নিয়মিত অনুশীলন করে এখানে কিছুটা মানিয়ে নেয়ার সুযোগ পেলেও বাইরের দল পিচ বুঝে ওঠার সুযোগই পায় না।এই মন্ত্রে দেশের মাটিতে অনেকবছর সাফল্য পেয়ে গেলেও বড় মঞ্চে ব্যর্থ বাংলাদেশ। গত ৮ বছরে কোনো টুর্নামেন্টেই বড় সাফল্য নেই টাইগারদের। দেশের বাইরে দলের এই বিপর্যয়ের পেছনে মিরপুরের এই উইকেটকে দায়ী করেন অনেকে।উইকেটের ওপর নির্ভর করে একটা ব্যাটারের ব্যাটিং প্যাটার্ন কেমন হবে। লো বাউন্স উইকেট হলে ব্যাটিংটাও তেমন হয়ে যায়। সেখানে শট খেলতে ব্যাটাররা ভয় পায়। শট খেলতে হলে একটু ঝুঁকি নিতে হবে। আমাদের (বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের) মধ্যে এটা ঢুকে যায়। এর ফলে আমরা ভুগি। এমন না যে সবসময় ফ্লাট উইকেটে খেলতে হবে। সব ধরনের উইকেটেই মানিয়ে নেয়া শিখতে হিবে। ভিন্ন উইকেটে কিভাবে মানিয়ে নিচ্ছে (দল) সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।'

অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের নির্বাচক এহসানুল হক সেজান:
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে দুই বারের এশিয়া কাপ এবং একবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। আরও একবার বিশ্বকাপের আগে যুব পর্যায়ের ক্রিকেটাররা ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে আফ্রিকার মাটিতে। সাফল্য পেয়েছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাওয়ে সিরিজে। সাফল্যের মন্ত্রটা তাহলে কোথায়? সেজান জানিয়েছেন উত্তরটা।জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার এহসানুল হক সেজানের কথাতেই স্পষ্ট, দেশের ক্রিকেটে পুরনো অভিযোগের নাম ‘পিচ’। মিরপুরের ধীরগতির উইকেট বাংলাদেশকে থিতু হতে দিচ্ছে না বৈশ্বিক আসরে। তাই তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের ক্রিকেটারদের প্রস্তুতি হিসেবে ব্যবহার করছেন ঢাকার বাইরের পিচ। যে পিচ জাতীয় দলের পরিসংখ্যান করে সমৃদ্ধ, সেই পিচ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন খোদ বিসিবির অধীনে থাকা নির্বাচকই।বর্তমান অনূর্ধ্ব-১৯ এবং ভবিষ্যত যুব পর্যায়ের ক্রিকেটারদের তৈরি করতে তার নজর ঢাকার বাইরে।
অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের নির্বাচক এহসানুল হক সেজান বলেছিলেন এক সাক্ষাৎকারে, ‘আমি রাজশাহীতে প্র্যাকটিস করেছি। আমি তাদের বলেছি আমার এক মাসের প্র্যাকটিস আছে আপনি ছয়টি উইকেট বানান, যে ছয়টি উইকেট বাউন্স উইকেট থাকবে। সেসব উইকেটে আমাদের প্লেয়ারদের টেস্ট দিয়েছে। সিলেটে বলেছি আমার জন্য তিনটি উইকেট রেডি করে রাখবেন। স্পোটিং উইকেটে নিজেদের এমন মানানসই আচরণের গুণেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের খেলোয়াড়রা সাফল্য উপহার দিচ্ছেন বিশ্বের নানা প্রান্তে। ফলে খোদ নির্বাচক দল নিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়ে।
সিজান নিজে ক্রিকেটারদের তৈরি করতে ছুটছেন ঢাকার বাইরে। দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তৈরি করতেও বিভিন্ন জেলা এবং বিভাগীয় স্টেডিয়ামে নজর তার।তিনি বলেন বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন উইকেট বানিয়ে যে আধুনিক খেলাটার সাথে নিজেদের তৈরি করার চেষ্টা করেছি এতে করে খেলোয়াড়রা বাইরের কন্ডিশন এবং পিচ নিয়ে ধারণা পাচ্ছেন এবং ব্যাটিং পজিশন সেভাবে পরিবর্তন করতে হবে সে ধারণা পাচ্ছেন। এবং মিডওডার ব্যাটসম্যানরা পারফর্ম করছে না দেখে আমরা যেই প্রবলেমে ছিলাম সেই জায়গা থেকে আমরা ওভারকাম করেছি।তাছাড়াও মিরপুরের পিচ বর্তমান আধুনিক ক্রিকেটের জন্য মানানসই নয় ঠিক তেমনি ভবিষ্যৎ জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারাটাই চ্যালেঞ্জিং কারণ বিশ্বকাপ কিংবা এশিয়া কাপ খেলতে বেশিরভাগ সময় দলকে বাইরের দেশে যেতে হয় সেখানে গিয়ে এমন পিচ পাওয়ায় যায় না। দ্রুতগতির বোলিং এর পাশাপাশি দ্রুতগতিতে রান তুলতে হয় যা এই পিচে কোনোদিন সম্ভব নয়।

অস্ট্রেলিয়ান স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা
২০২১ সালে টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল। ওই সিরিজেই অজিদের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টিতে জয় পায় বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়াকে ৪-১ বড় সিরিজও হারিয়েছিলো টাইগাররা। এরপর বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসে সুবিধা করতে সুবিধা করতেই পারেনি তৎকালীন রাসেল ডোমিঙ্গোর শিষ্যরা। কোনোমতো বিশ্বকাপের মূলপর্বে উঠার পর হেরেছে প্রথম তিন ম্যাচেই। তাতেই সেমিতে উঠার স্বপ্ন শেষ হয়েছিল মাহমুদউল্লাহদের।২০২১ সালে বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি সিরিজের সময় অস্ট্রেলিয়ার স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা মিরপুরের পিচকে ‘জঘন্য’ বলে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, ঢাকা ও বাংলাদেশে তাদের মুখোমুখি হওয়া পিচগুলো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অত্যন্ত খারাপ এবং টি-টোয়েন্টি খেলার জন্য অনুপযুক্ত ছিল। এক কথায় ‘খুব সম্ভবত ঢাকার উইকেট আন্তর্জাতিক উইকেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য। তিনি বলেছিলেন এই পিচে রয়েছে বোলিংয়ের ধরনে বৈচিত্র্যের অভাব। অতিরিক্ত স্পিন নির্ভরতা দলের পেস বোলিংয়ের উন্নতিতে বাধার সৃষ্টি করে। ফলে ঘরের মাঠে এমন ধীরগতির পিচে খেলে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায়, পেস ও বাউন্স সমৃদ্ধ বিদেশের পিচে বাংলাদেশ দল মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়।

পাকিস্তান কোচ মাইক হেসন
বর্তমান ক্রিকেটে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফরম্যাটে হচ্ছে টি টুয়েন্টি। ওয়ানডে এবং টেস্টের তুলনায় এই শর্টার ফরম্যাটে দর্শকদের চাহিদার আগ্রহের শীর্ষে থাকে। ওয়ানডে এবং টেস্টে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন নড়বড়ে ঠিক তেমনি টি টুয়েন্টিতে বড্ড বেমানান।টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে সামগ্রিক পরিসংখ্যান ঘাঁটলে বের হয়ে আসবে হতাশার প্রতিচ্ছবি। এমনই হাতে গোনা কয়েকটা সাফল্য ছাড়া বড় কিছু নেই বাংলাদেশের ঝুলিতে। বরং তিন ফরম্যাট মিলিয়ে টাইগারদের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স এই টি-টোয়ন্টিতে। আইসিসি আয়োজিত যেকোনা ইভেন্টে ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করেছে বাংলাদেশ। এসব ব্যর্থতার পেছনে দায়ী করা হয় মিরপুরের স্লো আর লো উইকেটে খেলা।২০২৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ টি টুয়েন্টি সিরিজ জিতেছে এই মিরপুরের মাঠে। উইকেট নিয়ে রীতিমতো সমালোচনা হয়েছিলো।পাকিস্তানের কোচ মাইক হেসন তো বলেই দিয়েছেন এটা কোনো আন্তর্জাতিক মানের পিচ হতে পারে না। তবে খেলা দেখে মনে হয়েছে পিচ খারাপ হলেও খুব বেশি খারাপ নয়। উইকেটে সময় কাটালে ভালো করা সম্ভব।

বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট
বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট মনে করেন এ ধরনের উইকেটে খেলে কোনোভাবেই বিশ্ব ক্রিকেটের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশের এই উইকেটে আমরা ম্যাচ জিতেছি, সিরিজ জিতেছি, আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছি সব ভালো। কিন্তু এটা দিয়ে আবার বিচার করলে হবে না যে আমরা বিশ্ব মঞ্চে ভালো দল হয়ে গেছি। উইকেটে আপনাকে অনেক হেল্প করেছে। বর্তমান পিচের যে অবস্থা তাতে করে বর্ষাকালের মৌসুমে মিরপুর পিচ আরো স্লোতে পরিণত হয় তখন ভালো উইকেট আর হয়ে উঠে না।ফলে মিরপুরের পিচে ১৫০-এর ওপরে রান হওয়াটা অস্বাভাবিক। তাই মিরপুরের এই লো পিচে ১৫০ রানের টার্গেটে যেভাবে স্লো ব্যাটিং করে টিকে থাকা যায় উইকেট বাঁচিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ঠিক তাই করে থাকে। কারণ এখানে আপনি দ্রুত গতিতে রান তুলতে গেলেই স্বেচ্ছায় উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসা হবে। তাই অন্য দল তেমন খেলতে পারছে না, বাংলাদেশ দল কিন্তু সেভাবে খেলেছে। বিশ্ব ক্রিকেটে কিন্তু এখন ২০ ওভারে ২২০ থেকে ২৫০ রান এমনিতেই হয়ে যায়। সেই কথা চিন্তা করলে আমাদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে।
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের অধারাবাহিকতা

ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটের কোনটি বেশি প্রিয় বাংলাদেশের? এমন প্রশ্নের জবাবে সমর্থকদের প্রায় সবাই বলবেন- ওয়ানডে ফরম্যাট।একটা সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট মানেই ছিলো ওয়ানডে ফরম্যাটে দাপুটে জয় এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। ৫০ ওভারের ক্রিকেটটা বাংলাদেশ খুব ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলো। এই ফরম্যাটে বাংলাদেশকে সমীহ করতো যেকোনো প্রতিপক্ষ।টেস্টে হোক কিংবা টি-টোয়েন্টিতে ব্যর্থতা- বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা ভরসা রাখতেন ওয়ানডের উপর। তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ ও মাশরাফির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিলো এক সোনালি অধ্যায়; যে অধ্যায়ে ভারত, পাকিস্তান কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকেও হারিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। এই ওয়ানডে ফরম্যাটের উপর ভর করেই চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সেমিফাইনাল, ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ফরম্যাটে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জয় কিংবা এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলার কৃতিত্ব দেখিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আজ সেই গল্প যেন অতীতের ধুলোমলিন অধ্যায়ে ঠাঁই নিয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যেনো সেই ‘প্রিয়’ সংস্করণেই খেই হারিয়েছে। যেন জিততে ভুলে গেছে একদিনের ম্যাচ।
গত এক বছরে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে জয়ের মুখ দেখেছে হাতে গোনা কয়েকটি ম্যাচে। ধারাবাহিক পরাজয় যেন এখন নিত্যসঙ্গী। দলের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়- বাংলাদেশ এখন এক রূপান্তরের সঙ্কটে। ‘পঞ্চপাণ্ডব’দের যুগ শেষ হয়েছে, কিন্তু তাদের বিকল্প হিসেবে প্রস্তুত হয়নি মানসম্মত কোনো প্রজন্ম। তরুণ ক্রিকেটাররা মেধাবী হলেও অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার অভাবে ভুগছেন। একইসাথে বোর্ডের পরিকল্পনার ঘাটতি, কোচিং প্যানেলের অনিশ্চয়তা, ও ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগে অপরিকল্পিত খেলোয়াড় উন্নয়ন-সব মিলিয়ে এক বিভ্রান্ত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ওয়ানডে দল।প্রশ্ন একটাই- এই অবস্থার দায় কার? পঞ্চপাণ্ডব যুগে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল, তরুণদের গড়ে তোলার প্রক্রিয়া নেই বললেই চলতো। তৎকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, ভারতের মতন দলগুলো যখন বিভিন্ন ফরম্যাটে ভিন্ন খেলোয়াড় তৈরি করতে প্রস্তুত ছিলো সে সময় বড় দল থেকে শুরু করে খর্ব শক্তির দল আয়ারল্যান্ড হোক কিংবা জিম্বাবুয়ের সাথেও বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তখন তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ ও মাশরাফির নেতৃত্বের উপর আস্থা রেখে চলতো। এতে করে নতুন যেমন নেতৃত্ববান আসেনি, ঠিক তেমনি বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি হয়নি।তাছাড়াও তৎকালীন বর্তমান সময় থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নির্বাচক কমিটির অদূরদর্শিতা, অনিয়মিত দলগঠন তো রয়েছেই। সেইসাথে যুক্ত হয়েছে নতুন করে ঘন ঘন নেতৃত্ব পরিবর্তন। যা দলকে আরও দুর্বল করেছে। বর্তমান প্রজন্মের মিরাজ, শান্ত, সোহান বা জাকের আলিরা নিষ্ঠাবান, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক সহায়তা ছাড়া তাদের পক্ষে সেই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে উঠে আসবে বাংলাদেশের ওয়ানডে ফরম্যাটের অম্লমধুর চিত্রের অবস্থা। ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে ১২ টি ওয়ানডে খেলেছেন মিরাজ-লিটনরা দাসরা। তার মধ্যে জয় কেবল দুটিতে।একটি ছিলো ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া শ্রীলঙ্কার সাথে ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে এবং ২০২৪ সালে শারজায় আফগানিস্তানের বিপক্ষেই। অন্যদিকে শেষবারের মতো ওয়ানডে সিরিজ জয়ের দেখা পেয়েছিলো ২০২৪ সালে নিজেদের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। এখানেই শেষ নয় গত নভেম্বর-ডিসেম্বর হওয়া দুটি সিরিজে হেরেছিল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হারের আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজ পরাজয় ২-১ ব্যাবধানে। কাকতালীয়ভাবে ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে এই আফগানিস্তানের কাছেই ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ।২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হওয়া চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে দুটি ম্যাচ খেলে একটিতেও জেতেনি বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশ ৩০০ বা ৩০০ অধিক কিংবা ২৮০ রান তোলার মতো ক্ষমতা রাখে, সে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ২৫০ এর উপর রান তুলতে পারেনি। শেষ কবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল, ৫০ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করেছে তা হয়তো নিজেরাও ভুলে গিয়েছে।
আর বর্তমানে ওয়ানডে থেকে শুরু যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের অবস্থা অনেকটাই এইরকম কোনোদিন বোলিং ভালো হচ্ছে না, কোনোদিন ফিল্ডিং বা কোনোদিন ব্যাটিং। আবার কোনোদিন তিনটাই খারাপ। বর্তমান দলের যে পারফরম্যান্স তাতে মনে হতেই পারে জয়ের ক্ষুধাটাও যেনো তাদের নেই বললেই চলে।এমন হতাশাজনক পারফরম্যান্সের জন্য অনেকাংশেই দায়ী ব্যাটিং পারফরম্যান্স। সব মিলিয়ে গত একবছরে ১২ ম্যাচে আড়াইশ’ পেরোয় মাত্র তিনবার। ২০২৪ সালে ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে আড়াইশ’ পেরোয় দুইবার; আর নভেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে একবার। এর মধ্যে উইন্ডিজের বিপক্ষে দলীয় স্কোর একবার তিনশ’ পেরোয়। এমনকি স্বল্প রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে প্রয়োজনহীন শট খেলে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসছে। ব্যাটিং ব্যর্থতা এমন নাজুক অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, ১০০ এর নিচে অর্থাৎ ৯৩ রানে অলআউট হতে হয়েছে একসময়ে ওয়ানডেতে সোনালী যুগ পার করা বাংলাদেশ দলকে।

বাংলাদেশের ওয়ানডে ফরম্যাটের এই করুণ অবস্থা দেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে এখন ভাবতে হচ্ছে ২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলতে না পারার আশঙ্কা। অবশেষে বাংলাদেশের হাতে ওয়ানডেতে অনাকাঙ্ক্ষিত জয় হাতে ধরা দেয় এই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই। মিরপুরে মাটিতে স্পিনিং উইকেট কম্বিনেশনে ১০৪৬ দিন পর অবশেষে মিরপুরে জয় ধরা দিল বাংলাদেশের হাতে সেইসাথে ৫৮২ দিন পর অবশেষে একটি ওয়ানডে সিরিজ জয়।আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, ২০২৩ বিশ্বকাপের পর মিরপুরের মাঠে কোনো ওয়ানডে ম্যাচই খেলেনি বাংলাদেশ। ৬৯২ দিন পর এই মাঠে ম্যাচ খেলতে নেমেছিলেন মিরাজরা। অবশেষে এই ম্যাচই অধিনায়ক মিরাজের মুখে হাসি ফোটাল। এই সিরিজের আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর পায়ের তলার সরে যাওয়ার মাটিটা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে এনে দিয়েছে এই জয়।
প্রায় দেড় বছর পর পাওয়া এই ওয়ানডে সিরিজ জয় ছিলো সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রশ্ন উঠে, এই সিরিজ জয়ের প্রকৃত প্রাপ্তি দলটির জন্য দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে?সেই সিরিজে বাস্তবিক অর্থে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক দিক বলতে গেলে তৃতীয় ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্সই সামনে আসে। এর বাইরে পুরো সিরিজজুড়ে স্পিন সহায়ক উইকেটের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা বরং দলটির সীমাবদ্ধতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। কারণ, প্রতিযোগিতামূলক বা “স্পোর্টিং” কন্ডিশনে দলটি এখনো কতটা দুর্বল, সেই বাস্তবতাই এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।ওয়ানডে ক্রিকেটে যেমন স্পিন সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পেস বোলিংয়ের প্রভাবও সমানভাবে অপরিহার্য। কিন্তু বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের স্পিনাররা কেন বারবার প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন- তার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয় মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে-এর উইকেটকে। মিরপুরের এই পিচ দীর্ঘদিন ধরেই এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যা দেশের স্পিনারদের ঘরের মাঠে সুবিধা দিলেও বিদেশের ভিন্ন কন্ডিশনের জন্য তাদের প্রকৃত অর্থে প্রস্তুত করে না।
বাংলাদেশের ওয়ানডে ফরম্যাটের এমন জয়হীন পারফরম্যান্স ১৯৯৯ সালের প্রেক্ষাপটকে মনে করিয়ে দেয়। কারণ, ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানো বাংলাদেশের ওয়ানডেতে পরের জয় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর।২০০৪ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ের আগে টানা ৪৭টি ম্যাচে বাংলাদেশ কোনো জয় পায়নি। হেরেছে এর ৪৫টিই। এর সঙ্গে টেস্টে জয়হীন থাকা ম্যাচের সংখ্যা যোগ করলে সংখ্যাটা হয় ৭৫, যা টানা না জেতার রেকর্ড। মানে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ থেকে ২০০৪ সালের জিম্বাবুয়ে সিরিজের মধ্যে টানা ৭৫টি ম্যাচে জয়হীন থেকেছিল বাংলাদেশ।
তাছাড়াও আধুনিক যুগের ক্রিকেটে এসে বাংলাদেশ দল সর্বশেষ টানা ৪টি ওয়ানডে সিরিজে হেরেছে ২০১১ সালে। সেবার অস্ট্রেলিয়া, জিম্বাবুয়ে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর ঠিক ৩ বছর পর অর্থাৎ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আবারো ম্যাচ হারতে শুরু করে সেইবার ওয়ানডে ফরম্যাটে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ এবং এশিয়া কাপ মিলিয়ে টোটাল ১২ ম্যাচে অব্দি পরাজিত ছিলো বাংলাদেশ।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের অক্টোবর পর্যন্তও টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজে জয়হীন ছিল বাংলাদেশ। তবে ২০১৭ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩ ম্যাচের একটি সিরিজ ১-১ ড্র করেছিল। তাই টানা পাঁচটি ওয়ানডে সিরিজ হারের স্বাদ পেতে হয়নি বাংলাদেশকে। পরিসংখ্যানের বিচারে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে নিজেদের সেরা সময় কাটিয়েছে ২০১৫, ২০২১ ও ২০২২ সালে। ২০২১ সালের মে থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা ৫টি ওয়ানডে সিরিজে জিতেছিল। ২০২২ সালের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতেও বাংলাদেশ প্রোটিয়াদের বিপক্ষে সিরিজ জেতে। সেবার টানা পাঁচ সিরিজ জয়ের ধারাবাহিকতা ভাঙে বাংলাদেশের জিম্বাবুয়ের কাছে সিরিজ হারে।
স্বাভাবিকভাবে দেশের ক্রিকেটে কিছুটা হলেও এগিয়েছে। সেই সময়ের সঙ্গে এখনকার দলের তুলনা হবে না। তবে পারফর্ম্যান্সভেদে এইবার কিছু ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। বাংলাদেশ ক্রিকেটে এখন শুধু যেকোনো এক ফরম্যাটে ভালো করতে শিখেছে, অতীতে ২০১৫ সালের অবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় বাংলাদেশ ওয়ানডে ফরম্যাটে রীতিমতো দাপুটে দল হয়ে উঠেছিলো, কিন্তু টি টুয়েন্টি অথবা টেস্ট ফরম্যাটের ম্যাচ আসলেই বাংলাদেশকে নাকানিচুবানি খেতে হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশ এখন টি টুয়েন্টিতে হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য দল, তবে ওয়ানডে আর টেস্ট ফরম্যাটের বাংলাদেশ দল সময়ের তুলনায় এখনো অনেক পিছনেই অবস্থান করছে।
তবে মূল প্রসঙ্গ হলো কেনো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সময়ের সেরা ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে গিয়েছে? এর কারণ হলো আমাদের ঘরোয়া ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল)।বরাবরের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের মান যেনো ক্রিকেটের উন্নতিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের গুণগত মানের দিকে তাকালেই ফুটে আসবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাথে অসামঞ্জস্যতা।বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পিচের মান, প্রতিযোগিতার তীব্রতা না থাকা।বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখনো পর্যন্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরিতে স্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেনি। অনূর্ধ্ব-১৯ স্তর থেকে উঠে আসা প্রতিভাবানদের পরবর্তী ধাপে ধরে রাখার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে এখনো মানসম্মত পিচ, কোচিং ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর অভাব রয়েছে। এতে করে তরুণরা আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না।সেইসাথে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত এক দল নিয়ে খেলিয়ে যাচ্ছে, যা খেলোয়াড়দের স্কিল সমস্যা এবং ইনজুরি প্রবণতা বেড়েই চলেছে।আমাদের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) এ ২৩০-২৫০ এখনো উইনিং স্কোর। কাজেই এদের ধারণা কোনোরকমে ওই পর্যন্ত গেলেই তো হয়। নাহলে দেখেন যেখানে ২০ ওভার থেকে শেষ ওভার অব্দি দিয়ে ধরে খেলে দ্রুত রানের চাকা সচল রাখতে হয় সেখানে বাংলাদেশ দল থাকে কচ্ছপ গতিতে। এইভাবেই চলছে ব্যাটিং লাইনআপ।
আপনি কারে বাদ দিয়ে কারে আনবেন? বিকল্প কে আছে? আর তাঁদের ফর্মই বা কেমন? ধরেন ওপেনিং হিসেব করলে ইমন আর সৌম্য, মিডল অর্ডারে লিটন আর আফিফ, আর ফিনিশিং ধরলেন মোসাদ্দেক। এর বাইরে আর কোন প্লেয়ারকে নিয়ে ভাবতে পারেন বা বলতে পারেন? এর পিছনে কারণ একটাই বিকল্প খেলোয়াড় তৈরিতে উদাসীনতাটায় ফুটে উঠবে। আর বাকিসব যেসব রেগুলার খেলোয়াড় রয়েছে তানজিদ তামিম-শামীম পাটোয়ারী-জাকের আলী-নুরুল হাসান সোহানদের মতো যেসব প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছেন তাদের নিজেদের নিয়ে নেই কোনো ভালো প্রস্তুতি কিংবা ভার্সেটাইল ভাবে লম্বা ইনিংস খেলার চিন্তা।অন্যদিকে রীতিমতো মাহিদুল অংকন এবং ইয়াসির রাব্বির মতোন খেলোয়াড়কে যাস্ট নষ্ট করা হচ্ছে। ইয়াসির রাব্বি যদিও ছিলেন বাংলাদেশের একসময়ের নিয়মিত খেলোয়াড় কিন্তু তার পটেনশীয়ালিটি নষ্ট করা হয়েছিল একসাথে ৩ ফরম্যাটে দলে নেয়ায়। ফলস্বরূপ একই সাথে ৩ ফরম্যাট থেকে বাদ দেয়া হয় তাকে।বলা হয়ে থাকে ডিপিএলকে জাতীয় দলের ঢুকার টিকেট কিন্তু যেসব বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করার নামে এবং অফ ফর্মে থাকা খেলোয়াড়দেরকে ট্র্যাকে ফেরানোর কথা বলা হয় তারাই দিনশেষ থেকে যায় নামকাওয়াস্তে খেলোয়ার মতন। শুধুমাত্র কয়েকটি সিরিজে ভালো রান এবং কোনমতে দলে টিকে থাকার জন্য মনমানসিকতা নিয়ে খেলে। বিশ্বমঞ্চে কিভাবে খেলতে হয়, কিভাবে দলকে জেতাতে হয় সহজভাবে এবং কিভাবে বড়দলের বিপক্ষে বড় রান চেজ করতে হয় সে শিক্ষাটা বা সেই ধরনের কোচিং তাদের দেওয়া হয় না। তাই তাদের কাছে ২৩০ অথবা ২৫০ টি টার্গেট হলো সবচেয়ে বড় পুঁজি। তার চেয়েও বড় কথা একই ফরম্যাটের খেলোয়াড়দের নিয়ে সাজানো হয়ে থাকে টেস্ট কিংবা টি টুয়েন্টি সিরিজ, ফলে সেইসব ফরম্যাটের সাথে অনেক খেলোয়াড় নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে না, এতে করে দলের সুনামই নষ্ট হয়।মমিনুল হকের মতো সলিড ব্যাটসম্যান বাংলাদেশের ওয়ানডে ফরম্যাটে থিতু হতে পারেননি শুধুমাত্র দলের পঞ্চপাণ্ডবের দিকে অতি প্রাধান্য দেওয়ায়, অথচ তিনিও হতে পারতেন টেস্টের পর তামিম-সাকিবের মতো ওয়ানডেতে সেরা বামহাতি ব্যাটার। অথচ এই মমিনুল হক-সাব্বির-মোসাদ্দেক-সৌম্য সরকার-আফিফ, ইয়াসির রাব্বি কিংবা অনুর্ধ্ব ১৯ দল পার করে আসা খেলোয়াড়দের নিয়ে বাংলাদেশ তৈরি করতে পারতো বাংলাদেশ বি টিম। তৈরি হতো বিকল্প খেলোয়াড়। কিন্তু সিলেক্টররা সেই সাহস না দেখিয়ে বছরের পর বছর উইনিং কম্বিনেশন তৈরি রাখতে মেইনস্ট্রিম খেলোয়াড়দের ব্যবহার করেছেন।তাহলে তো আজ এই অথই নদীতে পরা লাগতো না।
আর এখন মমিনুলদের মতো খেলোয়াড়দের নিতে চাইলে নির্বাচকরা বিচারবুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিয়ে বলে উঠবে যে এইসব ক্রিকেটারদের ক্যারিয়ার শেষের দিকে, এর পিছনে ইনভেস্ট না করে নতুন ছেলের পিছনে ইনভেস্ট করতে হবে।বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল নিয়মিতভাবে ভালো পারফর্ম করে, এমনকি ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপও জিতেছে। সেইসাথে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে পরপর দুইবার এশিয়া কাপ জেতার কর্তৃত্বও দেখিয়েছে। তবে সিনিয়র দলে এসে অনেক ক্রিকেটার প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারে না। এর কারণ হলো সঠিক মনিটরিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং মানসিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করলেও জাতীয় দলে জায়গা পেতে দেরি হয় বা নিয়মিত সুযোগ পান না।তাছাড়া এইচপি বা অনূর্ধ্ব-১৯-এর খেলোয়াড়দের লক্ষ্য সবসময়ই স্বপ্ন থাকে জাতীয় দলে খেলার। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো স্বপ্নটা কিন্তু ওখানেই থেমে যায়।জাতীয় দলে খেললে এরপর কীভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে সেটা তাঁরা জানে না। তাদের আসলে কী ধরনের লক্ষ্য হওয়া উচিত, মেন্টালিটি হওয়া উচিত, কীভাবে আরও বড় খেলোয়াড় হওয়ার জন্য নিজেকে মোটিভেট করা উচিত এই বিষয়ে তাদের ধারণা থাকে না।বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আরো একটি বড় সমস্যা হলো যুক্তির চেয়ে আবেগকে প্রাধান্য দেয় বেশি। বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। মাঠে অযথা উত্তেজনা, স্লেজিংয়ে জড়িয়ে পড়া বা সিদ্ধান্তে বেশি প্রতিক্রিয়াতে জড়িয়ে যায়।অন্যদিকে একটি ম্যাচে কোনো খেলোয়াড় ভালো করলেই তাকে রীতিমতো পজিশন পরিবর্তন করে খেলিয়ে থাকে এতে করে সেই খেলোয়াড় যোগ্য পজিশন থেকে যেমন বঞ্চিত হয় ঠিক তেমনি দলের কঠিন সময়ে হাল ধরতে যোগ্য পার্টনারশিপ করার মতো সঙ্গী খুঁজে পায় না। ফলে, পরবর্তীতে অতিরিক্ত পজিশন পরিবর্তনের ফলে কোনো পজিশনেই সঠিকভাবে ব্যাটিং করতে পারে না।আবার সামান্য খারাপ করলেই বাদ- তাই এখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ ও জনমতের প্রভাব বেশি কাজ করে।

আবার, টি২০ টিমকে যখন জোর করে ওডি+টেস্ট ফরম্যাট খেলতে নামিয়ে দেওয়া হয়। কেউ এক ফরম্যাটে ভালো খেললে তিন ফরম্যাটে চালিয়ে দেওয়ায় যেনো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এভাবে অনেকের ক্যারিয়ার ধ্বংস করেছে বিসিবি, এখনো করছে।
বর্তমান বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের অবস্থা অনেকটাই মিল পাওয়া যায় বর্তমান শ্রীলঙ্কার দলের সাথে। শ্রীলঙ্কা যখন কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, তিলকরত্নে দিলশান, লাসিথ মালিঙ্গা—এই ‘গোল্ডেন জেনারেশন’-এর অধীনে সাফল্যের শীর্ষে ছিল, তখন দল ব্যবস্থাপনা মূলত তাদের ওপরই নির্ভর করত।তারা ছিলেন এতটাই নির্ভরযোগ্য যে নতুন খেলোয়াড়দের খুব একটা সুযোগ দেওয়া হতো না। ফলে বিকল্প তৈরি হয়নি,তরুণরা আন্তর্জাতিক মানে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেনি।ফলাফল-এই তারকাদের বিদায়ের পর দলের মধ্যে হঠাৎ এক ‘শূন্যতা’ তৈরি হয়, যা পূরণ করতে শ্রীলঙ্কা আজও লড়ছে।সাঙ্গাকারা-মাহেলা-দিলশানরা বিশ্বমানের খেলোয়াড় হলেও তাদের উত্তরসূরি তৈরি বা মেন্টরশিপ কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো মতো ‘বি’ টিম সংস্কৃতি গড়ে না ওঠায় তরুণদের প্রস্তুত করা যায়নি।যেমন, ভারত দলের মধ্যে যখন বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মারা সিনিয়র হচ্ছিলেন, তখনই ভারতের পরবর্তী প্রজন্ম (সুরিয়াকুমার ইয়াদব-লোকেশ রাহুল-শুভমান গিল-নীতেশ কুমার রেড্ডি, যশস্বী জয়সওয়াল)প্রস্তুত হচ্ছিল। শ্রীলঙ্কায় এই ধারা দেখা যায়নি।
বর্তমান শ্রীলঙ্কা দলে কুশল মেন্ডিস, পাথুম নিসাঙ্কা, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গারা প্রতিভাবান হলেও দল হিসেবে এখনো ধারাবাহিক নয়।ঘরে-বাইরে মিলিয়ে বেশকিছু সিরিজ জিতলেও বৈশ্বিক আসরে গিয়ে পরাজয়ের বৃত্তে বন্দি থাকতেই হচ্ছে। যা অভিজ্ঞতার অভাব,দীর্ঘমেয়াদী দলের কাঠামো না থাকা, বিকল্প খেলোয়াড় না থাকার প্রভাব এবং ফরম্যাট ভিত্তিক খেলোয়াড় না রাখার মন মানসিকতা।এই চিত্রটিই যেন এখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে প্রতিফলিত হচ্ছে।সিনিয়ররা যখন দলের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে, তখন তরুণরা পর্যাপ্ত সুযোগ ও আত্মবিশ্বাস পায় না নিজেদের প্রমাণের ফলাফল,তাদের বিদায়ের পর দল হারিয়ে ফেলে ভারসাম্য, দিকনির্দেশনা এবং অভিজ্ঞতার আলো।আজকের বাংলাদেশ দলও তাই খুঁজছে নিজেদের পরিচয়। তরুণদের প্রতিভা আছে, কিন্তু ধারাবাহিকতা নেই; আছে উদ্যম, কিন্তু নেই নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা। একসময় শ্রীলঙ্কার মতোই বাংলাদেশও এখন পড়েছে পুনর্গঠনের সংকটে।অন্যদিকে, বাংলাদেশ ক্রিকেটে ফরম্যাটভিত্তিক মানসিকতা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। একসময় ওয়ানডেতে ভালো করলেই সেটাই সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হতো; তখন টি-টুয়েন্টি কিংবা টেস্টের ব্যর্থতাকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন সেই চিত্র উল্টো। সাম্প্রতিক কিছু টি-টুয়েন্টি জয়ে যখন সান্ত্বনা খোঁজা হচ্ছে, তখন আর ওয়ানডে এবং টেস্টে পরাজয়ের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ফরম্যাটভিত্তিক এই মানসিকতা দেশের ক্রিকেট কাঠামোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক ফরম্যাটে সাফল্য দিয়ে আরেক ফরম্যাটের ব্যর্থতা ঢেকে রাখলে সামগ্রিক ক্রিকেট বিকাশ সম্ভব নয়। খেলোয়াড় নির্বাচন, প্রস্তুতি, এবং কোচিং—সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকতে হবে।এইবার আসা যাক কোচিং প্রসঙ্গে।বর্তমান কোচিং প্যানেলের দিকে যদি তাহলে তাকানো যায় ফিল সিম্মন্স থেকে শুরু করে মুসতাক আহমেদ, সালাউদ্দিনের মতো কোচরা রয়েছেন, কিন্তু তাদের কোচিং অবস্থা যেনো অনেকটাই আধুনিক ক্রিকেটের সঙ্গে চলনসই নয়। যদি ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো দলের দিকে খেলোয়াড়ের দিকে যদি লক্ষ্য করা যায় তাতে দেখা যায় কোচরা খেলোয়াড়দের ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং এ ভার্সেটাইলিটি আনার চেষ্টা করে থাকেন। পাওয়ার হিটার ব্যাটসম্যান তৈরি, প্রয়োজন অনুযায়ী বোলিং ডিপার্টমেন্টকেও ব্যাটিং শেখানো, স্ট্রাইক রেট, শর্ট বাউন্সার সামলানোর দক্ষতা শেখানো হয়।ব্যাটসম্যানদের শিখানো হয় কীভাবে ১০ বলে ২০ রান তোলা যায়, বোলারদের শেখানো হয় শেষ ওভারে ৮/২০ রান রক্ষা করা। "Pressure Simulation Camps" হয় যেখানে খেলার মতো পরিবেশে খেলোয়াড়দের মানসিক সহনশীলতা পরীক্ষা করা হয়।প্রতিটি দলে আছে Strength & Conditioning Coach, Sports Nutritionist, Sports Psychologist, Biomechanics Analyst. যেমন: ইংল্যান্ডের “Bazball” দর্শন— ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অধীনে টিম অ্যানালিটিক্স থেকে সিদ্ধান্ত নেয় কোন বোলারের বিপক্ষে কোন ব্যাটার আক্রমণাত্মক হবে। এর ফলে তারা দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে যেমন দাপুটের সাথে সিরিজ খেলে থাকে অন্যদিকে বৈশ্বিক আসরে নিজেদের সেই অ্যাগ্ৰেসিভ আধিপত্য দেখায়।
কিন্তু বাংলাদেশে এখনো সেই আদিম কালের কোচেই বিশ্বাসী। তাদের কোচিং এর অবস্থা শুধু নামমাত্র কয়েকটি সিরিজ জিতে আত্মতুষ্টি থাকার জন্য, যা বৈশ্বিক আসরগুলোর সেরা প্রস্তুতি নির্ভর নয়। এইদিকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সঠিকভাবে ব্যাটিং শেখাতেও ব্যর্থ হচ্ছে, কাউকেই যেনো কোনো পজিশনেই থিতু করাতে পারছেন না। কেউ ম্যাচ খারাপ করলেই তাকে এরপরের ম্যাচেই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়, তাকে নিয়ে আলাদা সময় দেওয়া হয় না।অন্যদিকে আবার কোনো কোনো খেলোয়াড় ম্যাচের পর ম্যাচ খারাপ করলেও রেখে দেওয়া হয়। অন্যদিকে মিডল অর্ডারে এখনো বাংলাদেশের হার্ডহিটাল ব্যাটর থেকে সেরা ফিনিশার উঠে আসতে পারেনি।এইভাবেই চলছে বাংলাদেশের কোচিং ব্যবস্থা।নেটে শুধু বল মারা, বল করা, ফিল্ডিং ড্রিল— কিন্তু ম্যাচ সিচুয়েশন অনুশীলন হয় না।ব্যাটসম্যানকে কেবল টেকনিক শেখানো হয়, কিন্তু “শট ইন্টেন্ট” বা “স্ট্রাইক রেট বাড়ানোর পদ্ধতি” শেখানো হয় না।পেশাদার Strength Coach বা Nutritionist প্রায়ই নেই বা গুরুত্ব পায় না।অনেক তরুণ ক্রিকেটার এখনও আন্তর্জাতিক ফিটনেস স্ট্যান্ডার্ডে পৌঁছাতে পারে না, ফলে পাওয়ার হিটিং বা স্পিডে পিছিয়ে।এক-দুই ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বাদ দেওয়া যেনো বাংলাদেশের পুরোনো সংস্কৃতি, এর আগেও সাব্বির-সৌম্য-মোসাদ্দেকের সাথে এমনটা করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। যেখানে ভারত বা অস্ট্রেলিয়া একজন খেলোয়াড়কে ১৫-২০ ম্যাচ সুযোগ দেয় “গ্রোথ” মাপার জন্য। ভিডিও অ্যানালাইসিস, ডেটা সফটওয়্যার, বা পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার খুব সীমিত।দেশে এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত কোচ ও অ্যানালিস্টের অভাব রয়েছে।ফলাফল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোচিং পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে।
এক-দুই ম্যাচে ব্যর্থ হলেই বাদ দেওয়া যেনো বাংলাদেশের পুরোনো সংস্কৃতি, এর আগেও সাব্বির-সৌম্য-মোসাদ্দেকের সাথে এমনটা করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। যেখানে ভারত বা অস্ট্রেলিয়া একজন খেলোয়াড়কে ১৫-২০ ম্যাচ সুযোগ দেয় “গ্রোথ” মাপার জন্য। ভিডিও অ্যানালাইসিস, ডেটা সফটওয়্যার, বা পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার খুব সীমিত।দেশে এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত কোচ ও অ্যানালিস্টের অভাব রয়েছে।ফলাফল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোচিং পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে।বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, কোচদের খেলোয়াড় সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা না দেওয়া, অনেক কোচকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক সময় কোচদের সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হয়, যা তারা পছন্দ করেন না।শীর্ষস্থানীয় কোচরা সাধারণত এমন দলে কাজ করতে চান যেখানে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে।বাংলাদেশে কোচদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধৈর্যের অভাব দেখা যায়। ফলাফল দ্রুত চাইতে গিয়ে কোচদের ওপর চাপ দেওয়া হয়, যা অনেক বিশ্বমানের কোচ পছন্দ করেন না। তারা সাধারণত এমন দল খোঁজেন যেখানে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় দেওয়া হবে। যার ফলে জেমি সিডন্স, অ্যানাল ডোনান্ড, স্টিভ রোডসের মতো অনেক হাইপ্রোফাইল কোচরা বাংলাদেশে খন্ডকালীন দায়িত্বে এসেই অল্পতেই হারিয়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট এখনো বিদেশি ফর্মুলাতে বিশ্বাসী। যার ফলে অনেক সময় বিদেশি খেলোয়াড়রা ক্রিকেটারদের সঠিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় থেকে শুরু করে সমস্যা গুলো নিয়ে কাউন্সিলিং করতে পারে না। এর আরো একটি কারণ ভাষাগত সমস্যা।কিন্তু সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের মানসিক এবং শারীরিক চাপের উপর লক্ষ্য না রেখে খেলানো যাচ্ছে। এতে করে তাদের ধারাবাহিক পারফর্মেন্সে ঘাটতি হচ্ছে ।
তামিম বা সাকিবের বিকল্প তৈরি করতে সময়মতো কাউকে প্রস্তুত করা হয়নি; সুযোগ পেলেও তরুণরা পায়নি নিয়মিত খেলার নিশ্চয়তা। সৌম্য সরকার, নাঈম শেখ, নুরুল হাসান সোহান, ইয়াসির আলী রাব্বি, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, এনামুল হক বিজয় এই নামগুলো একসময় ছিল আশা জাগানো। কিন্তু তারা প্রত্যেকে বারবার সুযোগ পেয়েও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। কখনো দল নির্বাচনে অস্থিরতা, কখনো ব্যাটিং অর্ডারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আবার কখনো এক ম্যাচ ব্যর্থ হলেই বাদ-সব মিলিয়ে তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।অন্যদিকে নেতৃত্ব সংকটও এখন বড় বাস্তবতা। মাশরাফি বিন মর্তুজা-তামিম ইকবাল কিংবা সাকিব আল হাসানদের বিদায়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব যেন এক ‘অস্থায়ী দায়িত্ব’। কেউই যথেষ্ট সময় পাননি দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সঞ্চার করার। ফলে দলে তৈরি হয়নি দৃঢ় নেতৃত্ব কিংবা দিকনির্দেশনা।

অনেক বড় দল, বিশেষ করে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, বা দক্ষিণ আফ্রিকা সহজেই বাংলাদেশের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে চাই না। তার কারণ, তারা জানে যে বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময় তাদের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে না। বড় দলগুলো আইসিসির বিভিন্ন ইভেন্টে প্রস্তুতির জন্য তাদের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বেছে নেয়, যাতে পরবর্তী টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির জন্য উপযুক্ত প্রতিপক্ষ হতে পারে। সে জায়গায় বাংলাদেশ খেলে থাকে জিম্বাবুয়ের মতো দলের সাথে।বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপাণ্ডব (মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) এর অবসরের মধ্যে দিয়ে একটি সোনালী যুগের সমাপ্তি। তারা দলকে যা দিয়ে গিয়েছে, তা ধরে রাখতে তারুণ্যেদের দক্ষতার সহিত দায়িত্ব নিতে হবে। তাই বাংলাদেশ ওয়ানডে দলকে নতুনভাবে ভিন্নরকম পদ্ধতিতে তৈরি করতে হবে।প্রতিটি ফরম্যাটের জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা করতে হবে। ওয়ানডে, টেস্ট ও টি-টুয়েন্টিতে আলাদা দল, আলাদা কৌশল এবং বিশেষায়িত কোচিং প্রয়োজন।
তাছাড়াও এখন থেকেই প্রতিটি ফরম্যাটে বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করে বিকল্প টিম তৈরি করতে হবে। মমিনুল হক-সাব্বির-মোসাদ্দেক-সৌম্য সরকার, এইচপি ইউনিট এবং অনুর্ধ্ব ১৯ দল পার করে আসা খেলোয়াড়দের নিয়ে সম্মিলিতভাবে 'বি' টিম তৈরি করতে হবে। এতে করে বিপক্ষ দল অনুসারে টিম মাঠে নামানো সহজ হবে, খেলোয়াড়দের পরীক্ষণ-নিরীক্ষণ করা যাবে খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেওয়া যাবে এবং ইনজুরি কাটানো সম্ভব হবে।তরুণদের এক-দুই ম্যাচে ব্যর্থ হলে বাদ দেওয়া নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে অন্তত ৮–১০ ম্যাচের সুযোগ দিতে হবে।তরুণদের মধ্যে ভয়-ভীতিহীন ক্রিকেট খেলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, এবং হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান তৈরি করতে হবে যাতে করে কিছু ওভার যাওয়ার পর থেকেই স্লো ব্যাটিং করার পাশাপাশি আক্রামণাত্বক ব্যাটিং করতে পারে।বিশেষ করে শেষ ১০ ওভারে দ্রুত রান তোলার কৌশল)।স্পিন বোলিংয়ে স্ট্রাইক রোটেশন শেখানো (এখানে আমাদের ব্যাটাররা দুর্বল)।
অন্যদিকে বোলারদের জন্য ডেথ ওভারে ইয়র্কার ও স্লোয়ার ভ্যারিয়েশন অনুশীলন।ম্যাচের অবস্থা অনুযায়ী ফিল্ড সেটিং ও বোলিং প্ল্যানিং শেখানো।
জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় তৈরি হবে ঘরোয়া ক্রিকেট থেকেই। তাই ঘরোয়া লীগকে প্রতিযোগিতামূলক ও টেকনিক্যালি শক্তিশালী করতে হবে।জাতীয় দলের কোচিং প্যানেল যেন ঘরোয়া ক্রিকেটে নজর রাখে, এমন ব্যবস্থা থাকা উচিত।লিগে পারফর্মাররা কিভাবে অনুশীলন করছে, তা জানলে জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ তাদের স্কিল সেট ও মানসিকতা অনুযায়ী প্রস্তুত করতে পারবে।অধিনায়ক তৈরি হয় না, তাকে তৈরি করতে হয়। একাধিক সম্ভাবনাময় তরুণকে এখন থেকেই নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিদেশি দলগুলোতে “Strength & Conditioning Coach” থাকে যারা ব্যক্তি অনুযায়ী ট্রেনিং চার্ট তৈরি করে। বাংলাদেশেও ‘Player-specific fitness mapping’ চালু করতে হবে (বোলার ও ব্যাটসম্যানের জন্য আলাদা প্রোগ্রাম)।প্রতিটি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স ভিডিও ও ডেটা বিশ্লেষণ করা শেখাতে হবে।যেমন: কোথায় আউট হচ্ছে, কোন বোলার বা কোন লাইন-লেংথে দুর্বল, ইত্যাদি।প্র্যাকটিস সেশনে শুধু নেটে ব্যাটিং নয়; বরং সিচুয়েশন-ভিত্তিক অনুশীলন (যেমন “৫০ বলে ৭০ রান দরকার” বা “শেষ ৫ ওভারে ৪ উইকেট হাতে”)।এতে খেলোয়াড়ের ম্যাচ সেন্স ও প্রেশার হ্যান্ডলিং বাড়ে।
ওপেনিং এ তানজিদ তামিম, পারভেজ ইমন, লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত এরাই আমাদের নিয়মিত খেলোয়াড় কিন্তু বিকল্প হিসেবে সৌম্য সরকার, মেহেদী হাসান মিরাজ, মাহমুদুল হাসান জয়, এনামুল হক বিজয় থেকে শুরু করে এইচপি ইউনিট এবং অনুর্ধ্ব ১৯ দল থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের কাজে লাগাতে হবে।সেইসাথে মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ, পজিশনভিত্তিক বিকল্প খেলোয়াড় ও টেকনিক্যালি দক্ষ ব্যাটসম্যান দরকার। যেমন উইকেট কিপিং ব্যাটসম্যান ওপেনিং হিসেবে লিটন দাস থিতু হলেও এখনো মিডল অর্ডারে উইকেট কিপিং ব্যাটসম্যান হিসেবে নুরুল হাসান সোহান, জাকের আলীরা ভরসার নাম হয়ে উঠতে পারিনি। তাই এখন থেকে তাদেরকে স্কুপ, রিভার্স, সুইপ ও রানিং বিটুইন দ্য উইকেট প্র্যাকটিস জোরদার করতে হবে।সিচুয়েশন-ভিত্তিক ব্যাটিং প্র্যাকটিস করাতে হবে। যেমন:“৪০ ওভারে ১৮০/৫” বা “শেষ ৫ ওভারে ৫০ রান দরকার” এমন প্র্যাকটিকাল ম্যাচ সিমুলেশন। এতে ম্যাচ সেন্স ও রানের হিসাব বুঝতে শিখবে।Standing-up keeping drills — বিশেষ করে স্পিনারদের বিপক্ষে কিপিং দক্ষতা বাড়ানো। Video review analysis — নিজেদের ইনিংস দেখে ভুলগুলো চিহ্নিত করা। Mind simulation practice — কল্পনায় ম্যাচের কঠিন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন।

অন্যদিকে অলরাউন্ডিং পজিশনে সাইফ হাসান, রিশাদ হোসেন, শামীম পাটোয়ারীদের দায়িত্ব নিয়ে খেলতে হবে এবং বিপক্ষ দল অনুযায়ী ব্যাটিং এ ভিন্নরকমভাবে পারদর্শী করে তুলতে হবে। এবং সময়ের সাথে সাথে সাব্বির-মোসাদ্দেক এর মতোন বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনমতো খেলাতে হবে।তাছাড়া ওয়ানডে এবং টি টুয়েন্টিতে পাওয়ার হিটিংয়ে বড় সমস্যায় পড়ে বাংলাদেশ। জাকের আলী সেই চাহিদা পূরণ করলেও এমন আরও ক্রিকেটার দরকার। রিশাদ হোসেন, তানজিম সাকিবকে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি পাওয়ার হিটিংয়ে মনযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমার দৃষ্টিতে রিশাদকে ভবিষ্যতের পাওয়ার হিটিংয়ে তৈরি করা উচিত। তানজিম সাকিবও ভালো ব্যাটিং করতে পারে। তাকে ভালো অলরাউন্ডার তৈরি করায় যেতে পারে। ব্যাটিং কোচের উচিত তাদের দিকেও ভালোভাবে নজর দেয়া। জানিয়ে রাখি, মিরপুরের এই পিচে যে পাওয়ার হিটার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা অসম্ভব তা হয়তো খোদ খেলোয়াড়ও নিজেদের সম্পর্কে অবগত, তাই মিরপুরের বাইরের পিচেও প্র্যাকটিস করার মন মানসিকতা এবং টেকনিক্যাল বিষয় জানতে হবে।
খেলোয়াড়দের বাইরের দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ দিতে হবে। এতে করে অনেক ধরনের উপকার হতে পারে।বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে খেলার মাধ্যমে টেকনিক ও কৌশল উন্নত হয়।তাছাড়াও বর্তমান কোচের পাশাপাশি টেকনিক্যাল দিক উন্নতির জন্য বাংলাদেশ যদি সত্যিকারের শীর্ষস্থানীয় কোচদের আনতে চায়; তাহলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, কোচদের স্বাধীনতা, ভালো পারিশ্রমিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। শীর্ষস্থানীয় কোচের পাশাপাশি দেশীয় কোচদের নিয়োগ দিতে হবে। এতে করে দেশীও কোচরাও ভিন্ন কিছু বিষয় রপ্ত করার সুযোগ পাবে, সেইসাথে দেশীয় কোচদেরও সঠিক মূল্যায়ণ হবে। দেশীয় কোচদের প্রশিক্ষণ জরুরি বিদেশি কোচের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় কোচদের বিদেশে প্রশিক্ষণ পাঠানো দরকার।এইসব বিষয় যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব এবং তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরো শক্তিশালীভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মিরপুর স্টেডিয়ামের পিচ কি সম্ভব নয়?

প্রত্যেকটি দেশই নিজেদের হোম গ্রাউন্ডের সুবিধা কাজে লাগাতে চায়- এটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। ঘরের মাঠের কন্ডিশন, দর্শকদের সমর্থন এবং পরিচিত পরিবেশ- সব মিলিয়ে দলগুলো এখানে বাড়তি আত্মবিশ্বাস পায়। কিন্তু এই সুবিধা নেওয়ার নামে যদি পরিকল্পিতভাবে এমন উইকেট তৈরি করা হয়, যা কেবল সাময়িক জয়ের পথ সহজ করে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা দলের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে।বাংলাদেশ ক্রিকেট এর আগেও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। মিরপুরের কিছু সিরিজে স্বল্পমেয়াদি সাফল্য এলেও, বৈশ্বিক আসরে কিংবা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিরপেক্ষ বা স্পোর্টিং উইকেটে খেলতে গিয়ে অনেক সময়ই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে টাইগারদের। কারণ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকতে হলে শুধু ঘরের মাঠে সুবিধা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং এমন পরিবেশে নিজেকে প্রস্তুত করা জরুরি, যেখানে প্রতিটি বিভাগ-ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং-সমানভাবে পরীক্ষার মুখে পড়ে।সেই কারণেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টিং উইকেটে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। এমন একটি উইকেট, যেখানে ব্যাটসম্যানদের জন্য রান করার সুযোগ থাকবে, আবার বোলাররাও নিজেদের দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ পাবে। যেখানে ম্যাচের ফল নির্ধারিত হবে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে, পিচের একতরফা আচরণে নয়।এক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে পিচ প্রস্তুতকারীরা। উইকেট তৈরির সময় ভারসাম্যপূর্ণ কন্ডিশনের দিকে নজর দিতে হবে-যেখানে শুরুতে পেসাররা কিছু সহায়তা পাবে, মাঝের ওভারে স্পিনাররা খেলায় প্রভাব ফেলতে পারবে, আর ব্যাটসম্যানদের জন্যও থাকবে দীর্ঘ ইনিংস গড়ার সুযোগ।
একই সঙ্গে টিম ম্যানেজমেন্ট ও ক্রিকেট বোর্ডেরও একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সিরিজ জয়ের লক্ষ্য নয়, বরং ভবিষ্যতের বড় টুর্নামেন্টের কথা মাথায় রেখে খেলোয়াড়দের প্রস্তুত করার মানসিকতা থাকতে হবে। স্পোর্টিং উইকেটে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা থাকলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কঠিন পরিস্থিতি সামলানো অনেক সহজ হয়ে যায়।ওয়াকা না হোক, অন্তত ব্যাটসম্যানদের বিভীষিকা হিসেবে মিরপুরের উইকেটের যে দুর্নাম, সেটি ঘোচানো সম্ভব। বিসিবির হেড অব টার্ফ ম্যানেজমেন্ট ও অস্ট্রেলিয়ান কিউরেটর টনি হেমিংয়ের ভাবনাটা যদি আউট অফ দ্যা বক্স যদি হয়। হেমিং নাকি অস্ট্রেলিয়া থেকে মাটি এনে নতুন করে উইকেট বানাতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ম্যাচ না কমালে অস্ট্রেলিয়ান মাটিরও তা কতোটুকুই বা সহ্য করবে?তার চেয়ে বিসিবি চাইলে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে পথ খুঁজতে পারে। প্রথমত, খেলার পরিমাণ কমিয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে উইকেটকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে প্রাধান্য দিয়ে এ মাঠে কমিয়ে দিতে হবে ঘরোয়া ও অন্যান্য ম্যাচ। সিলেট, রংপুর, চট্টগ্রাম, বরিশালের মাঠে রীতিমতো ম্যাচ আয়োজন করতে হবে, তাও স্পোটিং উইকেটে। যাতে করে বৈশ্বিক আসরের টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে এক ভেন্যুর উপর নির্ভর করে না থাকতে হয়।উইকেটে গজাতে দিতে হবে ঘাস এবং ঘাসের মাপটা কিউরেটরের স্কেলের মাপেই হতে হবে; কারও বিশেষ অনুরোধে নয়। উইকেটে ওয়াটারিং আর রোলিং ঠিকঠাকভাবে হলে কালো মাটি কোনো সমস্যা নয়।সবশেষে বলা যায়, মিরপুর বাংলাদেশের ক্রিকেটের আবেগ, ইতিহাস ও পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই ভেন্যুকে শুধু জয়ের শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার না করে, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। স্পোর্টিং উইকেটে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারলেই বাংলাদেশ দল সত্যিকার অর্থে বিশ্ব ক্রিকেটে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
আর তাই বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ওয়ানডে সিরিজের মধ্য দিয়ে মিরপুরে একটি সত্যিকারের স্পোর্টিং উইকেটের সূচনা ঘটেছে। গেলো বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে স্পিন উইকেট কম্বিনেশনে সিরিজ জিতে সমালোচনার মুখে পড়েছিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, এইবার পাকিস্তান সিরিজে স্পোর্টিং উইকেট কম্বিনেশনে এবং সেইসাথে বাংলাদেশ দলের অলরাউন্ডিং নৈপুণ্যের জয়ে বাংলাদেশ সেই সমালোচনার জবাব দিতে পেরেছে।কিন্তু দেখার বিষয় হলো এই সিরিজ এবং আগামী দিনের আসন্ন সিরিজগুলিতে দুই দলই নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দেখানোর সুযোগ পাবে? নাকি আবারও স্বল্পমেয়াদি জয়ের স্বস্তিকে প্রাধান্য দিয়ে এমন উইকেটেই ম্যাচ আয়োজন করা হবে, যেখানে ফলাফল যতটা না ক্রিকেটীয় দক্ষতায়, তার চেয়ে বেশি নির্ধারিত হবে কন্ডিশনের একতরফা প্রভাবেই? সুতরাং বাংলাদেশ–পাকিস্তান সিরিজটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক লড়াই নয়; এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনারও এক পরীক্ষা।এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। সামনের দিনেও স্পোটিং উইকেটের দেখা পেতে যাচ্ছি নাকি নামমাত্র জয় নিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপে চিরচেনা হারের বৃত্তে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার খেলা দেখতে যাচ্ছি তা হয়তো সময়ই হয়তো শেষ পর্যন্ত বলে দেবে—বাংলাদেশ ক্রিকেট কোন পথে হাঁটতে যাচ্ছে।মিরপুরের উইকেট যেহেতু আগেও এভাবেই রানের বন্যা বসেছে, তাই মিরপুরের মাঠে আবারো রানের বন্যা দেখার আনন্দ দেখার স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি কী!
লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।