ক্যাম্পাস-প্রেম,পর্ব২৭
হুমায়ূন কবীর
আজ দশ দিন হাসপাতালে পড়ে আছি। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতলে ভর্তি হলাম। ছোটবেলায় একবার মেনিনজাইটিস হয়েছিল। তখন সাত দিন ছিলাম। এইবার দশ দিন ধরে পড়ে আছি। জ্বর এবং জন্ডিস একসাথে হয়েছে। নড়তে চড়তে পারছি না। মা আমার সেবা করে করে সেও শয্যাগত হয়েছে। এখন আব্বা লেগেছে। আর আমি সুযোগ পেলেই সিগারেট টানছি। এক পুরনো চ্যালাকে দিয়ে ফেনসিডিল এনে খাচ্ছি।
বাইরে হালকা হালকা বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আব্বা বিড়ি সিগারেট খায় না।
ইদানিং দেখছি সিগারেট খাওয়া ধরেছে। কিছুদিন যাবত কলেজ নিয়ে খুব সমস্যা যাচ্ছে তো । আব্বা কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। এমপি টাকা খেয়ে অযোগ্য লোককে কলেজে ঢোকাতে চাই। আব্বা তা হতে দেবে না। এই নিয়ে ঝামেলা।
আব্বা মনে হয় সিগারেট খেতে বাইরে গেছে। হাসপাতালের ভিতর আব্বাস সিগারেট টানে না। সে হয়তো হাসপাতালে সামনে কোন চায়ের স্টলে বসে সুখ করে সিগারেট টানছে। এই সুযোগে আমিও একটা ধরাই। এখন আব্বা আসবে না। তার কাছে কোন ছাতা নেই। আব্বা না আসলেও, হাসপাতালে সিগারেট খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু আমি এই হাসপাতালের আইন মানি না। আমাকে কোন ডাক্তার বা নার্স ঘাটাতে আসে না। কারণ, তারা দেখেছে ইতিমধ্যে শহরের বড় বড় নেতারা আমার সাথে দেখা করতে আসে। তারা আমার সাথে দীর্ঘ সময় হাসিমুখে গল্প করে। ডাক্তার এবং নার্সরা গদগদ হয়ে তাদের সালাম দেয়। নেতারা ডাক্তারদের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। ডাক্তাররা আমার কাছে এসে, ধীরে সুস্থ সব কিছু শুোনে। চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের কোন গাফিলতি নেই।
সিগারেট খাওয়া আমার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই অবস্থায় সিগারেট খাওয়া নাকি খুবই বিপদজনক। কিন্তু আমি না খেয়ে থাকতে পারিনা। সিগারেট টানার পর বেশ ক্লান্ত ক্লান্ত আরাম আরাম লাগে। চোখে ঘুম চলে আসে। শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ি। এইভাবে ১০ দিন চলছে। শরীরের কোন উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
একটা গোল্ড সিগারেট ধরিয়ে দুটো টান দিয়েছি। পেছনে মাথার কাছে, পা ভাঙা রোগী তার কাছে, কে যেন জানতে চাইলো- ১০ নাম্বার বেড কোনটা?
আমি তো ১০ নম্বর বেডের রোগী। আমাকে আবার এই অসময়ে কে খোঁজ করছে? মুহূর্তে চিন্তার তার ছিন্ন করে মুখ থেকে জ্বলন্ত সিগারেট ছিনতাই হয়ে গেল। নাকি ভেসে এলো রজনীগন্ধার বুক ভরা ফুরফুরে সুবাস। দীর্ঘশ্বাস টেনে বুক ভোরের বাতাস নিলাম। পরক্ষণে বাম পাশে তাকিয়ে দেখি রাসমিন। আমি বিস্ময় হা হয়ে গেলাম। তার মুখে সেই চির পরিচিত হাসি। চোখে হাজার কথার ছুটোছুটি। মাশকারা লাগানোর ফলে চোখ দুটি এত মোহনীয় হয়েছে যে সে বলার না।চোখের পাতায় লাগিয়েছে গোলাপি রঙ। কাজ করার সুতির শাড়ি, বেগুনি রঙের। গোলাপি রঙের ব্লাউজ। চুলগুলো ছাড়া। আজ আমি খেয়াল করলাম, রাসমিনের চুল প্রায় মাটি ছুঁই ছুঁই। চুলগুলো যেমন লম্বা তেমন ঘন, কালো আরো বেশি। রাসমিনের শরীর থেকে মিষ্টি একটা পারফিউমের বাতাস ভেসে আসছে। আমি যেন মুহূর্তের ভেতর সুস্থ হয়ে গেলাম।
- রাসমিন,কখন এসেছ?
- হ্যাঁ, আমি। কেমন আছেন?
রাসমিনের এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট অন্য হাতে রজনীগন্ধা স্টিক। সিগারেটে দুটো টান মেরে সে খক খক করে কাশতে শুরু করল। এবার সে কঠিন হয়ে প্রশ্ন করল,কই, বললেন না কেমন আছেন?
- আলহামদুলিল্লাহ। আল্লার রহমতে খুব ভালো আছি।
- ভালো? তার এখানে এই হাসপাতালের রোগীদের বেড দখল করে আছেন কেন?
যেন আমার উপর তার কত অধিকার, সেই অধিকারের বলে সে কৈফিয়ত চাইছে। আমি তার কথাবার্তার কোন কুল কিনারা করতে পারছি না।সে এতদিন পর হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হলো? এই ফুলেল শুভেচ্ছা কার জন্য? কেনই বা তার এই মোহনীয় সাজ? সে কি এই ফুল দিয়ে আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে? আমাকে, নাকি আমার এই দুরারোগ্য ব্যাধিকে?কাকে সে স্বাগত জানাতে চায়?
একরাশ প্রশ্ন আর বেদনার জমাট স্তুপ বুকের ভিতরে ফুল উঠছে।
- রাসমিন দাঁড়িয়ে কেন? বসো।
ফুলগুলো তার হাতেই ধরা আছে। সিগারেটটা ফেলে দিয়েছে। সিগারেট টেনে টেনে তার চোখ এখন লাল।
রাসমিন আমার মুখোমুখি বসলো। তার দুটো পরিষ্কার ফোলাফোলা গাল যেন রসালো জামরুলের মত, টসটসে হয়ে, আস্বাদিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ডান হাতের নখ খোঁটা বন্ধ করে মাথাটা বামদিকে ঝাঁকিয়ে চুল ঠিক করল।তারপর ধীরে সুস্থ বলল - আপনার, আপনার মোবাইল ফোন বন্ধ কেন? ঢুকাতেই পারি না।
- তুমি তো ঢোকাতে পারবে না।
- কেন?
- ঢোকানো তো আমার কাজ।
- মানে?
- মানে কিচ্ছু না।তোমার সাথে মোবাইলে আমার যতবার কথা হয়েছে আমিই ঢুকিয়েছি।তুমি কখনো আমাকে কল দাও নি। আফটার অল তুমি এই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে। আর সুন্দরী মেয়েরা কখনো ছেলেদের ঢুকায়া না।এটাই নিয়ম।
রাসমিন ঘোর লাগা চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আবার নখ খুটতে শুরু করেছে। কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কি লজ্জা পেয়েছে?
রাসমিন - আমি আজ ১৫-২০ দিন ধরে আপনার মোবাইলে ট্রাই করছি। কিন্তু একটাই উত্তর পাচ্ছি, এই মুহূর্তে মোবাইলে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
আমি বললাম, কম্পিউটারের ওই মেয়েটি সবসময় দুঃখিতই থাকে। কখনো শুনেছো, আপনার কলটি পেয়ে খুব আনন্দিত হয়েছি। না, কখনো বলে না। কম্পিউটারের ওই মেয়েটির কাজই হল দুঃখ পাওয়া। সে দুঃখ পাওয়ার চাকরি করে। তাই সে সব সময় তোমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে।
রাসমিন একটু ম্লান হেসে বলল, শুনলাম আপনি ভয়ংকর রকম অসুস্থ। এখন দেখছি আপনি ভয়ঙ্কর রকম সুস্থ। না হলে এত রসিকতা করছেন কিভাবে?
- ঠিক আছে , আর রসিকতা করবো না। এখন থেকে শুধু ভেউ ভেউ করে কাঁদবো। তাহলে তো প্রমাণিত হবে আমি ভয়ংকর রকম অসুস্থ?
- না, আপনাকে কোন প্রমাণ করা করি করতে হবে না। শুধু বলেন, মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছেন কেন?
-মোবাইল বন্ধ করিনি। সে হারিয়ে গেছে।
- জেলখানার ভিতরে ঢুকে পুলিশের সাথে মারামারি করলে তো মোবাইল হারাবেই। ভাগ্য ভালো তাই জীবনটা নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছেন।
মোবাইল আমার হারিয়েছে সত্য, কিন্তু জেলখানার মারামারিতে না। ১৫ দিন আগের কথা, নেশা করে রাতের বেলা পৌর পার্কের ব্রিজের উপর শুয়ে ছিলাম। সকাল হলে দেখি মোবাইল নেই, হাতের আংটি নেই, গায়ে গেঞ্জিও নেই। হারামজাদারা প্যান্ট ও খোলার চেষ্টা করেছিল। দেখি বেল্ট খোলা। আর দামি সুজোড়া তো নিয়েই গেছে। কিন্তু এ কাহিনী তো আর সবার সাথে বলে বেড়ানো যায় না।
বললাম- আরে, না না। মোবাইল চুরি হয়ে গেছে।
হঠাৎ রামিনের মোবাইল বেজে উঠলো। সে মোবাইল রিসিভ করল।
- হ্যালো, স্লামালেকুম। কে বলছেন প্লিজ। কি ব্যাপার কথা বলছেন না কেন?
আমি বললাম, দেখো কোন বোবা টোবা হয়তো।
রাশমিন- মোবাইলে তো আপনার কথাই শোনা যাচ্ছে।
- কথা বললে তো শোনা যাবেই।
- আপনি যা বলছেন তাই তো শুনতপ পাচ্ছি।
- শুনতে তো পাবেই। তুমি তো আর কালা না।
রাশমিন হোহো করে হেসে উঠলো। বলল, ও এই কেস? দাঁড়ান, দেখাচ্ছি মজা।
আমার মাথার কাছে মোবাইল মেজে উঠলো। ধরে দেখি রাসমিনের কল। তারমানে সে আমার চালাকি ধরে ফেলেছে। কথা বলতে বলতে আমিই তার সেটে রিং দিয়েছিলাম। সেভ করা নাম্বার। সহজেই রিং ঢুকে গেল। এখন রাসমিন আমার চালাকি ধরে ফেলেছে। ধরে ফেলে বিজয়ের হাসি হাসছে। কি সুন্দর লাগছে তাকে। চুলের অরণ্যে হারিয়ে যেতে যেতে মুখ নয় যেন পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়ালে আড়ালে উঁকি দিচ্ছে।