Posts

গল্প

The Backward Footsteps

March 13, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

41
View

অন্ধকার যে কখনো এতোটা জমাট আর ভারী হতে পারে, সেটা ডাউহিলের এই শতাব্দীপ্রাচীন বাংলোতে না এলে অনিমেষের হয়তো কখনোই জানা হতো না।

​বাইরে তখন প্রলয়ঙ্করী ঝড়। ঝোড়ো বাতাসের সাথে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে আছড়ে পড়ছে, যেন বাইরের কোনো অদৃশ্য সত্তা ভেতরে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বাংলোর একমাত্র কেয়ারটেকার, বৃদ্ধ মহিন, সূর্যাস্তের আগেই নিজের ঘরে চলে গেছে। যাওয়ার আগে তার বলা শেষ কথাগুলো অনিমেষের মস্তিষ্কে এখন বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, "বাবু, রাত-বিরেতে যাই শুনুন, নিজের ঘরের দরজা কিন্তু খুলবেন না। এই পাহাড়ের রাতের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, যা মানুষের না শোনাই ভালো।"

​অনিমেষ একজন ঔপন্যাসিক। নিরিবিলিতে নিজের নতুন থ্রিলার উপন্যাসটা শেষ করার জন্যই শহরের কোলাহল ছেড়ে এই নির্জন পাহাড়ে আসা। ঘরের মাঝখানে রাখা সেগুন কাঠের পুরনো টেবিলটায় বসে সে লিখছিল। হারিকেনের ম্লান আলোয় ঘরের কোণগুলো কেমন যেন রহস্যময় হয়ে আছে। পুরনো কাঠের মেঝে থেকে মাঝে মাঝেই এক অদ্ভুত ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আসছে, যেন কেউ অত্যন্ত সাবধানে পা ফেলে হাঁটছে।

​রাত ঠিক ১টা বেজে ১৫ মিনিট।

​হঠাৎ করেই ঘরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমতে শুরু করলো। অনিমেষের গায়ে একটা শাল জড়ানো থাকলেও, তার মনে হলো যেন একখণ্ড বরফ কেউ তার শিরদাঁড়া বরাবর ঘষে দিচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে হারিকেনের শিখাটা কোনো কারণ ছাড়াই দপ করে নিভে গেল। পুরো ঘর ডুবে গেল এক নিশ্ছিদ্র, দমবন্ধ করা অন্ধকারে।

​অনিমেষের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বিদ্যুতের ক্ষণিক আলোয় সে দেখলো, তার ঘরের ভারী পর্দাগুলো একদম স্থির, অর্থাৎ ঘরে কোনো বাতাস নেই। তাহলে হারিকেনটা নিভলো কীভাবে?

​দেশলাই খোঁজার জন্য সে হাত বাড়াতেই থমকে গেল। তার স্পষ্ট মনে হলো, ঘরের ভেতরে সে একা নয়। অন্ধকারের মধ্যে থেকে এক অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসছে—পুরনো, স্যাঁতস্যাঁতে মাটি আর পচে যাওয়া গোলাপ ফুলের গন্ধের একটা গা-ঘিনঘিনে মিশ্রণ।

​এরপর শুরু হলো সেই শব্দ।

​ঘরের বাইরের লম্বা, অন্ধকার করিডোর থেকে একটা ভারী শব্দ আসতে লাগলো। খট... ঘষট... খট... ঘষট... কেউ যেন একটা পা স্বাভাবিকভাবে ফেলছে, আর অন্য পা-টা মেঝের ওপর দিয়ে টেনে টেনে সামনের দিকে এগোচ্ছে। শব্দটা ক্রমশ অনিমেষের ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে আসছে। অনিমেষের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে গেল। সে নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি নিজের কান দিয়েই শুনতে পাচ্ছে।

​শব্দটা ঠিক তার বন্ধ দরজার ওপাশে এসে থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ডের এক প্রাণঘাতী নীরবতা। তারপর, অত্যন্ত ধীর লয়ে দরজায় টোকা পড়লো।

ঠক... ঠক... ঠক...

​অনিমেষের গলা শুকিয়ে কাঠ। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, "কে?"

​বাইরে থেকে কোনো উত্তর এলো না। শুধু দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একটা হিমশীতল বাতাস ঘরের ভেতর ঢুকে এলো, আর তার সাথে ফিসফিস করা একটা অমানবিক স্বর—যা কোনো মানুষের গলা হতে পারে না। মনে হলো যেন দুটো শুকনো হাড় একে অপরের সাথে ঘষে কেউ কথা বলছে।

​"দরজাটা খোল... আমার বড্ড শীত করছে... আমি তোকে আমার গল্পটা শোনাবো..."

​অনিমেষের শরীর ভয়ে জমে গেছে। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে পা বাড়ালো। সে দরজা খুলতে চায় না, কিন্তু তার মনে হলো কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে বাধ্য করছে ওই দরজার দিকে এগিয়ে যেতে। দরজার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে সে কাঁপা কাঁপা হাতে স্মার্টফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা অন করলো। আলোটা সে ফেললো দরজার নিচের সামান্য ফাঁকটুকুতে।

​সেখানে যা দেখলো, তাতে তার রক্ত জল হয়ে গেল। দরজার ওপাশে দুটো ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য পায়ের পাতা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পায়ের পাতাগুলো দরজার দিকে মুখ করে নেই, সেগুলো উল্টো দিকে ঘোরানো। অর্থাৎ, যে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তার পিঠটা দরজার দিকে, কিন্তু সে উল্টো পায়ে হেঁটে এসেছে।

​হঠাৎ দরজার পুরনো পিতলের হাতলটা ধীরে ধীরে, একটা তীক্ষ্ণ ধাতব শব্দ করে নিজের থেকেই ঘুরতে শুরু করলো। কেউ বাইরে থেকে তালা খোলার চেষ্টা করছে না, হাতলটা ভেতর থেকেই ঘুরছে।

Comments

    Please login to post comment. Login