নিস্তব্ধতার যে একটা নিজস্ব, ভারী শব্দ আছে, সেটা পুরনো ওই জমিদার বাড়িতে পা রাখার আগে রাতুল কখনো কল্পনাও করেনি।
শহরের কোলাহল থেকে বহুদূরে, গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা বাড়িটা যেন শতকের পর শতক ধরে কিছু একটা গিলে খাওয়ার অপেক্ষায় ওঁত পেতে আছে। রাতুলের এখানে আসার কারণ নেহাতই বৈষয়িক—বাবার মৃত্যুর পর এই পুরনো সম্পত্তিটা বিক্রি করে দেওয়া। কিন্তু সদর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই তার মনে হলো, সে যেন একটা জীবিত প্রাণীর পেটের ভেতর ঢুকে পড়েছে।
চারপাশে স্যাঁতসেঁতে একটা গন্ধ। বহুদিনের বদ্ধ বাতাস, পচা কাঠ আর ভেজা মাটির একটা বুনো গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। টর্চের আলো ফেলে হলরুমে এসে দাঁড়াতেই ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পুরনো আসবাবপত্রগুলো যেন সচকিত হয়ে উঠল। মেঝের কাঠের তক্তাগুলো প্রতিটা পদক্ষেপে 'ক্যাঁচ-ক্যাঁচ' করে এমনভাবে আর্তনাদ করছিল, যেন কেউ তাদের গায়ের ওপর দিয়ে জুতো পায়ে হেঁটে যাচ্ছে।
রাতটা কাটানোর জন্য দোতলার শেষ মাথার ঘরটা বেছে নিল রাতুল। বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জানালার শার্শিতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল তার। কোনো দুঃস্বপ্ন দেখে নয়, বরং একটা তীব্র, বমি-উদ্রেককারী গন্ধে।
বদ্ধ জলাশয়ের পচা জল আর মরা মাছের গন্ধের মতো একটা তীব্র দুর্গন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘুমের রেশ নিমেষেই কেটে গেল। রাতুল বিছানায় উঠে বসল। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে, প্রতিটা নিশ্বাসে সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
তখনই সে শব্দটা শুনতে পেল।
ঘরের ঠিক বাইরের বারান্দায় কেউ একজন হাঁটছে। থপ... পচাৎ... থপ... পচাৎ। শব্দটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের হাঁটার নয়। মনে হচ্ছে ভারী, ভেজা কোনো নরম মাংসপিণ্ড কাঠের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ছে। প্রতিটা শব্দের সাথে মেঝের কাঠগুলো যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠছে। পদধ্বনিটা ক্রমশ তার ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।
রাতুলের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সে দ্রুত হাত বাড়িয়ে সাইড টেবিল থেকে টর্চটা তুলে নিল, কিন্তু আঙুলের কাঁপুনিতে সুইচটা ঠিকমতো চাপতে পারল না। দরজার ওপাশে এসে থমকে দাঁড়াল শব্দটা। নিস্তব্ধতা আবার গ্রাস করল পুরো বাড়িটাকে। শুধু একটা ভারী, ঘড়ঘড়ে নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে দরজার নিচ থেকে।
রাতুল বিছানা থেকে নেমে পা টিপে টিপে দরজার দিকে এগোল। দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে করিডোরের আবছা আলো আসছে। আর সেই আলোর রেখায় সে দেখতে পেল একজোড়া পা। কিন্তু সেগুলো মানুষের পা নয়। ফ্যাকাশে, ছাইরঙা চামড়া। পায়ের পাতাগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, আর আঙুলের মাঝখানে হাঁসের মতো পাতলা পর্দা। আর সেই পা বেয়ে কালচে, কাদাটে জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে মেঝের ওপর।
রাতুল পিছিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু তার পা দুটো যেন মেঝের সাথে পেরেক দিয়ে আটকে গেছে। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ।
হঠাৎ, প্রচণ্ড একটা শব্দে পুরো দরজাটা কেঁপে উঠল। কেউ যেন বাইরে থেকে পুরো শরীর দিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে। একবার। দুবার। তিনবার। পুরনো কাঠের দরজাটা মড়মড় করে উঠল।
রাতুল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, পিছিয়ে গিয়ে সোজা জানালার কাছে চলে গেল। তখনই একটা বিকট শব্দে দরজার ছিটকিনি ভেঙে ছিটকে পড়ল মেঝের ওপর। দরজাটা ধীরেসুস্থে, একটানা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে খুলে গেল।
করিডোরের জমাট বাঁধা অন্ধকারের ভেতর থেকে ঘরে ঢুকল জিনিসটা।
ওটার কোনো নির্দিষ্ট আকার ছিল না। মানুষের মতো একটা কাঠামো, কিন্তু উচ্চতায় অন্তত সাত ফুট। পুরো শরীরটা ভেজা, লম্বা, জট পাকানো কালো চুলে ঢাকা। সেই চুল বেয়ে অনবরত পচা জল ঝরছে। মুখ বলে কিছু নেই, চুলের ফাঁক দিয়ে শুধু দুটো গর্তের মতো চোখ জ্বলজ্বল করছে—যাতে কোনো মণি নেই, পুরোটাই ঘোলাটে সাদা।
জিনিসটা দুই পায়ে হাঁটছিল না। এর লম্বা, হাড়গিলে হাত দুটো মেঝে স্পর্শ করে ছিল। মাকড়সার মতো অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় সেটা ঘরের ভেতর ঢুকে এল। মুখ থেকে একটা ফিসফিসে আওয়াজ বেরোচ্ছে, যা শুনতে অনেকটা শুকনো পাতায় বাতাস লাগার মতো।
রাতুল চিৎকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না। জিনিসটা ধীরে ধীরে ঘাড় বাঁকা করে রাতুলের দিকে তাকাল। তারপর, তার লম্বা, স্যাঁতসেঁতে হাতটা বাড়িয়ে দিল রাতুলের দিকে। সেই হাত থেকে খসে পড়ছে পচা মাংসের টুকরো।
টর্চের আলোটা হঠাৎ দপ করে নিভে গেল। পুরো ঘরটা তলিয়ে গেল এক নিরেট, জমাট বাঁধা অন্ধকারে। আর সেই অন্ধকারের ঠিক ভেতর থেকে, রাতুলের একেবারে কানের কাছে কেউ একজন বরফের মতো ঠাণ্ডা নিশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলে উঠল...
"এতদিন পর... এলি?"