ওই রাতে স্নেহা বাসায় থাকতে পারলো না। আফতাবনগরের ওই ফ্ল্যাটটায় ঢোকার পর থেকেই যেমন একটা শূন্যতা বোধ ভয়ংকরভাবে স্নেহাকে আচ্ছন্ন করতেছিল, একইসঙ্গে বিছানায়, বালিশে, সোফায়, টাওয়ালে, সমস্ত জায়গায় আবিরের শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছিল সে। ওর জামা-কাপড়ে লাগানো ক্যালভিন ক্লেইনের ঘ্রাণ না; প্রতিটা মানুষের শরীরেই আলাদা আলাদা ঘ্রাণ থাকে, আবিরের শরীরের ঘ্রাণ এতটাই তীব্র হয়ে স্নেহার নাকে লাগছিল যে সে অস্থির হয়ে উঠে।
তখনো পাসপোর্টের বোতলটা ওয়ারড্রবের উপরেই ছিল। এর অর্ধেক আবির ওইদিন সকাল থেকে খেয়েছে, পারলে পুরাটাই খেতো। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথেও পানির বোতলে ভরে খেতে খেতে গেছে। এই বোতলটা কেনা হইছিল ওর জন্মদিন উপলক্ষেই। দুই মাস আগে। স্নেহা জীবনে প্রথম আবিরের কাছে কিছু আবদার করছিল যে ওই মাসে আবির যদি ঢাকায় আসে, তাহলে যেন একটা দিনের জন্য স্নেহাকে কয়েক ঘণ্টা সময় দেয়, তবে কোনো বারে না। অন্য কোনো জায়গায়।
এমন কোথাও, যেখানে ওরা একটু কথা বলতে পারবে। যেখানে আবিরের বারবার ক্যাপে আর গ্লাসে নিজের চোখ ঢাকতে হবে না। সারাক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখতে হবে না- কেউ তাকে দেখে ফেললো কি না, চিনে ফেললো কি না, কেউ কোথাও থেকে তার ছবি তুলে ফেললো কি না, ভিডিও করলো কি না। এখন অবশ্য এটা অনেক কমছে। পাক্কা ১৬ মাস লেগে গেছে আবিরের এই ভয় থেকে বের হতে। এখনো যে পুরোপুরি বের হইছে, এমন না, তবে অনেকটাই কম।
আবির আগের চেয়ে অনেক চেঞ্জও হইছে। পরিচয়ের প্রথমদিকে স্নেহা আবিরকে ডাকতো- চ্যাট জিপিটি। অনুভূতিহীন, রোবট, রস-কসবিহীন একটা কাঠখোট্টা লোক। সেই আবির এখন জোকস বলে। স্নেহা রাগ করলে রাগ ভাঙানোর চেষ্টাও করে। টেক্সটের সঙ্গে ইমোজি পাঠায়, হাসেও। আবিরের হাসি যে কী সুন্দর! ওয়ারড্রবের উপরে রাখা বোতল থেকে এক পেগ হুইস্কি ঢালতে ঢালতে স্নেহা আবিরের হাসির কথা ভাবছিল আর হঠাৎই সামনের বিছানায় আবিরকে আধ শোয়া অবস্থায় দেখলো বলে ভ্রম হলো।
স্নেহা চোখ কচলালো- নাহ! সে ড্রাঙ্কও না। ওইদিন দিনেরবেলা সে আবিরের জ্বর আর মাথাব্যথা নিয়ে এত পেরেশানিতে ছিল, মদ স্পর্শ করার ইচ্ছাটাও করে নাই তখন। কিন্তু তাহলে সে কেন আবিরকে বিছানায় আধ শোয়া হয়ে মুচকি হাসতে দেখতেছে? আচমকাই এমন দৃশ্য দেখার পর স্নেহার হাত থেকে গ্লাসটা পড়ে গেল। অরিজিনাল হুইস্কির গ্লাস বলে ভাঙে নাই, তবে গ্লাসের সবটুকু হুইস্কি ফ্লোরে পড়ে গেছে। স্নেহার অস্থিরতা বাড়তে থাকলো।
আবির এই ঘরে কেন, এই শহরেই নাই এখন- সে ছাড়া আর কে বেশি ভালো জানে এটা? এর আগের তিনদিন রাজশাহীর মানুষ জানছে আবির ঢাকায়, তার নিজের বাড়িতে। আর ঢাকায় তার বাড়ির মানুষ জানছে সে রাজশাহীতে। পৃথিবীতে একমাত্র স্নেহা আর উপরে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানতো না আবির গত তিনদিন কই ছিল! কিন্তু তবুও তখন স্নেহা ঘরের যেদিকেই তাকাচ্ছিল, একেক জায়গায় একেকভাবে আবিরকে দেখতে পাচ্ছিল।
সেদিন দুপুরে জোর করে আবিরকে পরোটা দিয়ে মুরগীর স্যুপ স্নেহা নিজে মুখে তুলে খাওয়ালো। আবির খেতে চাচ্ছিল না। ওর শরীরটা তখন হালকা গরম ছিল। এরচেয়ে বেশি ছিল মাথাব্যথা। তিনদিন যাবত হুইস্কি ছাড়া কোনো সলিড খাবারই সে খায় নাই, তার মাথাব্যথা হবে না তো কার হবে- স্নেহা আবিরকে ওই সময় এসব বলে হালকা বকাঝকাও করছে। সকালে আল কাদেরীয়া থেকে মুরগীর স্যুপ আর পরোটা অর্ডার করে নিজে ওমলেট বানিয়ে এনে আবিরকে কন্ডিশন দিছে এসব খেতেই হবে, নইলে নো মোর হুইস্কি।
সকাল থেকে একটু পরে একটু পরে করতে করতে দুপুর পার হওয়ার কিছুটা আগে জোর করেই অল্প খাওয়ানোর পর স্নেহা নিচে গেল নাপা এক্সট্রা কিনতে। স্নেহার জ্বর-টর তেমন আসে না, যদি আসেও, সে মেডিসিন খাওয়ার পাব্লিক না। তাই ঘরে নাপাও রাখে না। তার ঘরে থাকে কেবল বেকলোফেন, প্রোডেপ, ওলিয়ানজ, রিভোট্রিল কিংবা ফিলফ্রেশ টাইপের ওষুধ। এগুলোও যে স্নেহা নিয়মিত খায়, এমন না। কিন্তু সেদিন ঘরে নাপা না থাকার আফসোসে সে মরে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত আবিরকে কিছুটা খাওয়ানোর পর বাইরে থেকে গেট লক করে নিচের ফার্মেসিতে গেল নাপা এক্সট্রা কিনতে।
এরমধ্যেই সে কয়েকবার টেক্সট করেছে- মাদ্ মো..য়া জেল...হোয়্যার আর ইউ? তাড়াতাড়ি আসো, আই ওয়ান্না টক। আবিরের মুড খুব বেশি ভালো থাকলে অথবা ও প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক থাকলেই কেবল স্নেহাকে মাদ্-মোয়াজেল বলে সম্বোধন করে। এর বাইরে আবিরের দেওয়া স্নেহার কোনো নাম ছিল না। স্নেহা আবিরকে টেক্সটে সম্বোধন করে আমোন। সামনাসামনি যদিও ডাকে না। এই বিষয়ে তার হালকা শাইনেস আছে। টেক্সটে তো আর চেহারা দেখা যাইতেছে না, তাই যত খুশি আমোন, আমোন পাখি লেখা যায়। আমোনটাই সে বেশি লেখে।
‘আমোন’ হলো এক এনশিয়েন্ট ইজিপ্ট দেবতার নাম। সে ছিল দেবতাদেরও রাজা। কিন্তু স্নেহা দেবতাদের রাজা হওয়ার কারণে ‘আমোন’ নামটা বাছাই করে নাই, সে বাছাই করছিল কারণ আমোনকে এনশিয়েন্ট ইজিপ্টে লাইফ গিভিং গড হিসেবে মানা হইতো, এবং আরো মজার ব্যাপার হইতেছে, আমোন নামের অর্থ হলো গোপন বা অদৃশ্য, চার্লস বুকোস্কির ওই ব্লুবার্ডটার মতো, যাকে নিয়া সে লিখছে-
"দেয়্যার ইজ অ্যা ব্লুবার্ড ইন মাই হার্ট দ্যাট ওয়ান্টস টু গেট আউট
বাট আই'ম টু টাফ ফর হিম
আই সে স্টে ইন দেয়্যার, আই'ম নট গোয়িং টু লেট এনিবডি সি ইউ...।"
বুকোস্কির এই কবিতাটা স্নেহার খুব পছন্দ। আবিরও তার জীবনের এই ব্লুবার্ডটার মতো, এমনটাই স্নেহা মনে করতো। গোপনীয় কিন্তু খুব আদরের। আরেকটা নামও আবিরের জন্য রাখছিল স্নেহা। "আমাদো আলিয়েন্তো"। স্প্যানিশ নাম। আমাদো অর্থ হলো বিলাভড, আর আলিয়েন্তো অর্থ ব্রিথ। নামটা অত্যন্ত সুন্দর হলেও কঠিন হওয়ায় এই নামের সম্বোধনে তেমন একটা টেক্সট পাঠায় না স্নেহা। দুই-একবার পাঠাইছিল মনে হয়। নামগুলা সে খুঁজে খুঁজে বের করছে বহু সময় নিয়ে, বহু যত্ন নিয়ে।
আবার আবির টেক্সট করে- অই! কতক্ষণ লাগবে? স্নেহা ওষুধ আর দেড় লিটারের দুইটা মাম পানির বোতল হাতে নিয়ে আরেক হাতে- আসছি, বাবা, ওয়েট- বলে অনেকটা দৌড়াতে দৌড়াতে বাসায় উঠলো। লিফট ফিফথ ফ্লোরে ছিল বলে হেঁটেই বাসায় উঠে লক খুলে গেল আবিরের কাছে। নাপা এক্সট্রার প্যাকেট থেকে একটা খুলে আবিরের মুখে নিজেই দিয়ে পানির বোতলটা এগিয়ে দিলো। এরমধ্যে যে আবির আবার টেক্সট করছিল- মাদ্-মোয়াজেল, দ্যাট স্যুপ ওয়াজ দিলিশাস৷ আই ওয়ান্না হ্যাভ সাম মোর। গেট খুলতে গিয়ে ওই টেক্সট মিস হয়ে গেছে স্নেহার। ওই বিকেলে অবশ্য কোনো হোটেলেই মুরগীর স্যুপ পাওয়াও যেত না।
সাধারণত সকালের নাস্তাতেই হোটেলগুলোতে মুরগীর স্যুপ পাওয়া যায়। ১২টার পর আর স্যুপ থাকে না। তবুও বাইরে থাকলে সে খোঁজ তো নিতে পারতো। বেচারা দুইদিন কিছুই খায় নাই, আজকে একটা জিনিস খেয়ে আবার খেতে চাইলো, স্নেহা সেটা জোগাড় করতে পারলো না- এই আফসোস করতে করতে ফুডপাণ্ডায় মুরগীর স্যুপ খুঁজতে লাগলো সে।
আবির স্নেহাকে থামিয়ে পাশে বসালো। নিচে যাওয়ার আগে আবিরের শাওয়ারের জন্য চুলায় পানি গরম দিয়ে গেছিল স্নেহা। এই ফ্ল্যাটে গিজারের ব্যবস্থা নাই। ফেব্রুয়ারি মাস, হালকা ঠান্ডা। চারিদিকে বসন্ত বাতাস। নরমাল পানিতে শাওয়ার নিতে গেলে যদি আবিরের ঠান্ডা লাগে। দুইদিন যাবত সে শাওয়ারও নেয় নাই। শাওয়ারটা নিলে শরীরটা ভালো লাগতো তোমার বলতে বলতে আবিরের সামনে বসলো স্নেহা।
আবির স্নেহার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখে স্নেহা মায়া আর অসহায়ত্ব দুইটাই দেখতে পেল। বেশিক্ষণ তাই চোখের দিকে তাকাতে না পেরে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো- বলো, কী তোমার জরুরি কথা? আমাকে ছেড়ে চলে যাবা, এটাই তো বলবা? এটা তো আমি জানি। আর কতবার বলবা, আবির? আবির বলে ওঠলো- স্নেহা...নাহ! তুমি কেন আমার মতো একটা মানুষকে ভালোবাসো? আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারি না। কিছু দিতে পারবোও না কোনোদিন।
একটু পজ দিয়ে আবির আবার বলে- হোয়্যাই ইউ আর ওয়েস্টিং ইউর লাইফ? ইউ আর ইন্টেলিজেন্ট, ইউ আর প্রিটি। আ...মি...আ..আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারি না, এটা যে কত যন্ত্রণার! স্নেহা আবিরকে থামিয়ে বললো, আমি কী চাই তোমার কাছে, আবির? আবির মাথা নাড়িয়ে বললো, কিছুই না। এটাই তো সমস্যা। তুমি আমার কাছে কিছুই চাও না স্নেহা। এরজন্য তো আমার আরো খারাপ লাগে। অপরাধ বোধ হয়।
ঘড়ির কাঁটায় পৌঁনে পাঁচটা বাজতেছে, এলার্ম দেওয়া ছিল স্নেহার ফোনে যেন দুই ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টের জন্য বের হতে পারে। কিন্তু আবিরের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে ৭ নম্বর ফ্লাইটটাও সে মিস করার ধান্ধায় আছে। যদি ওর চিফ পরদিন হেড কোয়ার্টার থেকে রাজশাহী না যেত, আবিরের ওইদিনও রাজশাহী না যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ওর চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওর যেতে ইচ্ছা করতেছে না, তবে না যেয়েও উপায় নাই।
২৪ এর রাত থেকে রাজশাহী যাওয়া পেছাতে পেছাতে সেদিন ২৬ এর বিকাল পাঁচটা। কয়েকবার আবির বলছেও, আমার যেতে ইচ্ছা করতেছে না। পর মুহূর্তেই আবার বলে উঠেছে- কিন্তু যেতে হবে। চিফ আসবে। দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস! ওইদিন সকালে আবির যখন একটু ঘুমানোর ট্রাই করলো, এর আগে স্নেহার শাড়ি গায়ে জড়িয়ে নিলো। নিজেই শাড়িটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়ালো আর স্নেহাকে বললো- আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাখো। এভাবে আমাকে কেউ ধরার মতো নাই।
আবিরের এসব কথা স্নেহা যে পুরাপুরি বিশ্বাস করে, এমন না। আবার স্নেহার অবচেতন মনের কোনো একটা অংশ মাঝে মাঝে এসব বিশ্বাসও করতে চায় সরল মনে। আবিরের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় নিয়ে স্নেহা কখনোই কোনো প্রশ্ন করে না, কিছু জানতেও চায় না। আবির কিছু বললে শুধু শোনে। স্নেহার কাছে ওই মুহূর্তটুকুই গুরুত্বপূর্ণ, যেই মুহূর্তে আবির ওর সঙ্গে, ওর পাশে থাকতেছে।
এর বাইরে ওর ব্যক্তিগত জীবন, ওর পরিবার, ওর জব- এসবে কখনোই স্নেহা আগ্রহ দেখায় নাই ততদিন পর্যন্ত। দেখানোর প্রয়োজনও হয় নাই। প্রতি মাসেই দেখা হচ্ছে, নিয়মিত কথা হচ্ছে। যদিও ওইবার রাজশাহীতে বদলী হবার পর দুই মাস পর দেখা হলো।
সামনেও বোধহয় অনেকদিন দেখা হবে না অথবা আর কখনোই দেখা হবে না- এমনটাই সম্ভবত বলার জন্য ফার্মেসি থেকে জরুরি তলব দিয়ে স্নেহাকে ডেকে আনছিল আবির। কিন্তু ওই মুহূর্তে ওইটা বলার মতো নির্দয় সে হতে পারে নাই, বা তার সাহসে কুলায় নাই। এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর ফ্লাইটে উঠে সাহস জোগাতে পারছিল কিংবা নির্দয় হতে। তখন তো দৃষ্টির সীমানা থেকে সে বাইরে চলে গেছে, স্নেহার যন্ত্রণা হলেও আবিরকে তা কাছ থেকে তো আর দেখতে হইলো না।
চলবে…