Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: দ্য ব্লুবার্ড

March 15, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

361
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

ওই রাতে আর আফতাবনগরের ফ্ল্যাটটায় থাকতে পারে না স্নেহা। বাসায় ঢোকার পর মুহূর্ত হতেই একটা ভয়ংকর শূন্যতা বোধ ওকে ঘিরে রাখছিল চতুর্দিক থেকে। একইসঙ্গে; মাস্টার বেডরুমের বিছানা, বালিশ, সোফা, টাওয়াল- যেখানে যেখানে আবির বসে-শুয়ে গেছে অথবা যা যা ও ব্যবহার করছে, সবখান থেকেই ওর ঘ্রাণ এসে স্নেহার মস্তিষ্কের প্রত্যেকটা কোষে আটকে যাইতেছিল হোল্ডফাস্টের মতো। ক্যালভিন ক্লেইন কোলোনের স্মেল না; প্রতিটা মানুষের শরীরেই আলাদা আলাদা নিজস্ব প্রাকৃতিক ঘ্রাণ থাকে, আবিরের শরীরের ওই একান্ত ঘ্রাণই স্নেহার ফাঁকা ঘরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ক্রমশ অস্থির করে তুলতেছিল ওর মন আর মস্তিষ্ককে।

পাসপোর্টের বোতলটা সন্ধ্যায় যেভাবে রেখে গেছিল, ঠিক একইভাবেই অর্ধেক ফাঁকা আর একা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওয়ারড্রবের উপরে। অর্ধেকটা আবিরই শেষ করে গেছে। পারলে পুরাটাই হয়তো শেষ করে যেত। এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় পানির বোতলেও কিছুটা ভরে নিয়ে গেছে। দুই মাস আগে ওর জন্মদিন উপলক্ষেই বোতলটা কেনা হইছিল। এই বোতল কিনে স্নেহা জীবনে প্রথম আবিরের কাছে কিছু আবদার করে বলছিল- ডিসেম্বরে যদি ঢাকায় আসে, তাহলে যেন একটা দিনের জন্য হলেও স্নেহাকে কয়েক ঘণ্টা সময় দেয় ও।

স্নেহা রিকোয়েস্ট করছিল- ওইবারের দেখাটা যেন কোনো বারে না হয়ে অন্য কোথাও হয়; যেখানে ওরা একান্তে একটু কথা বলতে পারবে, যেখানে আবিরকে বারবার ক্যাপ আর গ্লাসে নিজের চোখ ঢাকতে হবে না, সারাক্ষণ এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখতে হবে না- কেউ ওকে দেখে বা চিনে ফেললো কি না, কেউ কোথাও থেকে ওর ছবি তুললো কি না, কেউ লুকিয়ে কোনো ভিডিও করলো কি না। যদিও ওই অনুরোধ আবির রাখতে পারে নাই। ডিসেম্বরে প্রায় ৫-৬ দিন ওদের দেখা হয়, প্রতিবার ওই একই বারেই।

আগের চেয়ে আবিরের সন্দেহবাতিকতা অনেকটাই কমে আসছিল। পুরাপুরি যে আজিব কিছিমের সব চিন্তা থেকে ও বের হইতে পারছিল, এমন না যদিও। তবে ওর উদ্ভট আচরণগুলা কিছুটা সহনশীল হয়ে উঠছিল ততদিনে। আগের চেয়ে ও অনেকটাই চেঞ্জ হইছিল আসলে। পরিচয়ের প্রথমদিকে স্নেহা ওকে ডাকতো- চ্যাট জিপিটি। প্রচণ্ড অনুভূতিহীন আর কাঠখোট্টা টাইপের একটা লোক ছিল তখন ও। সেই আবিরই এক সময় জোকস বলা শুরু করলো; স্নেহা রাগ করলে ভাঙানোর চেষ্টাও করতো নানা উপায়ে, নানা কিছু বলে। টেক্সটের সঙ্গে পাঠানো শুরু করলো ইমোজিও, এমন কী কথায় কথায় হা হা হা লিখেও পাঠাতে থাকলো! ওহ…আবিরের হাসি! কী যে সুন্দর…কী যে অদ্ভুত ভয়াবহ সুন্দর ওর হাসি…ওহ মাই মাই মাই!

ওয়ারড্রবের ওপরে রাখা বোতলটা থেকে এক পেগ হুইস্কি ঢালতে ঢালতে স্নেহা যখন আবিরের হাসির কথা ভাবতেছিল, ঠিক তখনই সামনের বিছানায় ওকে আধশোয়া অবস্থায় দেখলো বলে মনে হলো। দুই হাত মুঠ করে স্নেহা একবার চোখ কচলায়…নাহ! ও তো ড্রাঙ্ক না। ওইদিন দিনেরবেলা আবিরের জ্বর আর মাথাব্যথা নিয়ে এত পেরেশানিতে ছিল, মদ ছোঁয়ার ইচ্ছাই হয় নাই ওর। তাইলে আবিরকে বিছানায় কেন আধশোয়া অবস্থায় মুচকি হাসতে দেখতেছে? আচমকা এমন দৃশ্য দেখায় ওর হাত থেকে হুইস্কির গ্লাসটা নিচে পড়ে যায়। অরিজিনাল ক্রিস্টালের গ্লাস বলে ভাঙলো না ঠিকই, তবে এক্সট্রা ডাবল লার্জ পেগ হিসেবে বানানো ১২০ মি.লি হুইস্কি বরবাদ হয় পুরাটাই।

একদিকে চোখের সামনে হাসি মুখে আধ-শোয়া আবিরের অবয়ব; অন্যদিকে ওর শরীরের তীব্র ঘ্রাণ ঘরের সমস্ত আসবাবপত্রে! এই ঘ্রাণ ও খুব ভালোভাবেই চেনে। দুই মাস আগে ১৫ ডিসেম্বর, ঢাকা থেকে ছুটি শেষে কুমিল্লায় ফেরার দিন কিংফিশারে বসে নিজের গায়ের টি-শার্টটা স্নেহাকে খুলে দিয়ে যায় আবির। স্নেহাই চাইছিল একদিন, ওইদিন না যদিও। তখন ওদের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠতা ছিল না মোটেও। দুইজনই ওরা কথা বলতো মেপে মেপে, ‘তাকাল্লুফ’ মেইন্টেইন করে।

ওই রকমই এক সময়, খানিকটা সারকাস্টিক মুডেই আবিরকে ও টেক্সট করে বলছিল- ম্যান, সিন্স আই'ম নট গেটিং ইউ ইন দিস লাইফটাইম, আনডাউটেডলি! আই মিন, এজ ইউ বিলং টু সামওয়ান এলস; স্যাড, বাট ট্রু! মাই ব্যাড! উইল ইউ বি জেনারাস এনাফ টু গ্রান্ট অ্যা লিটল ফেভার ইফ আই আস্ক? ইভেন ইফ আই কান্ট হ্যাভ ইউ, হোয়াট ইফ আই আস্ক ফর অ্যা স্মল কনসোলেশন প্রাইজ টু হোল্ড অন টু ইয়োর মেমোরিজ ফর দ্য রেস্ট অব মাই লাইফ? ওয়েল, ডোন্ট প্যানিক, ডুড! আই য়োন্ট আস্ক ফর ইউর কিডনি অর অ্যানিথিং টু ভ্যালুয়েবল, ফর শিওর।

উত্তরে আবির জানতে চেয়ে লেখে- হোয়াট? শিওর, প্লিজ আস্ক। ইফ আই'ম অ্যাবল, আই উড লাভ টু গিভ অ্যানিথিং ইউ আস্ক। স্নেহা অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও সাহস দেখিয়ে লিখেই ফেলে- উইল ইউ গিভ মি ওয়ান অব ইউর ইউজড টি-শার্টস অর অ্যানিথিং লাইক দ্যাট? আই উইল জাস্ট র‍্যাপ ইট অ্যারাউন্ড মি অ্যান্ড প্রিটেন্ড দ্যাট দিস ইজ অল আই ওয়াজ ডেস্টিনড টু গেট ফ্রম ইউ ইন দিস লাইফ। সিন্স ইসলাম হ্যাজ নো কনসেপ্ট অব রিবার্থ, আই গেইজ, আই অ্যাম আউট অব লাক হেয়ার। বাট ইফ দেয়্যার ইজ অ্যা স্লাইট চান্স অব অ্যানাদার লাইফ, অ্যান্ড আই কাম ব্যাক ইন অ্যানাদার ফর্ম, আই উইল ডেফিনিটলি ক্লেইম ইউ দেয়্যার। টু ব্যাড, ইন দিস লাইফটাইম, ইউ আর অলরেডি টেকেন। জাস্ট মাই ট্রাজিক লাক! লল! মেসেজটা সিন করে অনেকক্ষণ সাইলেন্ট থাকার পর আবির ওর ওই টাইমের ন্যাচারাল কাঠখোট্টা মেজাজেই উত্তর পাঠালো- স্নেহা, বি র‍্যাশনাল, প্লিজ!

নো ওয়ান্ডার! স্নেহা সারপ্রাইজড হয় নাই এমন উত্তর দেখার পরে। একটু কষ্ট পাইছিল যদিও। ভাঙা হৃদয়েই নিজেকে চিল প্রিটেন্ড করতে ও টেক্সট ব্যাক করে- হোয়াই ডু ইউ হ্যাভ টু বি সো সিরিয়াস অ্যাবাউট এভ্রি সিঙ্গেল থিং, ম্যান? চিল! আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনিথিং ফ্রম ইউ! হ্যাপি? আবির সাহেব কোনো কথা খুঁজে না পেলে ইউজ্যুয়ালি যা করতেন, জগদ্বিখ্যাত তার ওই বাক্য লেখার মাধ্যমে সেইভাবেই দায়সারা হলেন- ইট'স নট লাইক দ্যাট।

১৫ ডিসেম্বর কুমিল্লায় রওনা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নিজে থেকেই টি-শার্টটা খুলে দেয় ও। এর আগে ওরা ছোট্ট একটা চকলেট ব্রাউনি কেটে আবিরের অ্যাডভান্স বার্থডে সেলিব্রেট করে। এর দুইদিন পর ওর বার্থডে ছিল। দুইজন সেই সময় থাকবে দুইটা ভিন্ন শহরে। এরপর বহুক্ষণ দুইজন দুইজনকে জড়ায়ে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতেই আবির নিজের চেস্ট থাম্পিং করে স্নেহাকে বলছিল- ইউ আর পিস অব মাই হার্ট।

ওইদিন বাড়ি ফিরে জলপাই রঙের ওই মিলিটারি টি-শার্টটা খুব যত্নের সঙ্গে একটা ড্রাই ক্লিনার পলি রোলে ভরে ড্রয়ারে লক করে রাখে স্নেহা। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিজের নাক-মুখ তাতে ঘষে, নিঃশ্বাস ভরে ঘ্রাণ নেওয়াটা রিচ্যুয়ালে পরিণত হইছিল ওর। ঘ্রাণটা ফেড আউট হয়ে যাওয়ার ভয়ে প্যাকেটটা ও খুব সাবধানে, সামান্যই খুলতো। দুই বছর পরও, ওই একই ড্রয়ারে, একই প্যাকেটের ভেতর টি-শার্টটা যক্ষের ধনের মতোই ওর কাছে গচ্ছিত আছে। 

ওই একই রকম তীব্রতায় এখনো একই শরীরের ঘ্রাণই ছড়ানো-ছিটানোর ওর ভেতরে। কিন্তু ওই রাতে; ড্রয়ারের লকারে থাকা টি-শার্টটা না ছুঁয়েও, নাকে-মুখে ঘষে নিঃশ্বাস ভরে এর ঘ্রাণ না নিয়েও সমস্ত ঘরটাই এর বিকল্প হয়ে উঠে। এমনই তীব্র বিকল্প, স্নেহার ভেতরে যা ভয়ংকর হাহাকার জাগিয়ে তোলে। ও বুঝতে পারে- দিস ইজ নট সামথিং অর্ডিনারি ফিলিং! দিস মাস্ট বি সামথিং নৌন এজ ‘অলফ্যাক্টরি হন্টিং’ ইন সাইকোলজিক্যাল টার্মস! ইজ দিস হাউ অ্যা স্পেসিফিক স্মেল কনজিউমস অ্যান্ড চেজেস সামওয়ান ফ্রম উইদিন? এই প্রশ্ন মাথার ভেতর পপ আপ করতেই জঁ ব্যাপিস্ত গ্রেনুইয়ের কথা মনে পড়ে ওর সমস্ত শরীর হিম হয়ে আসে! পারফিউম! আবিরের ঘ্রাণ তীব্র বিষাক্ত নেশার মায়ায় ওর মস্তিষ্কে দশ পার হয়ে এগারো নম্বর বিপদ সংকেতের সাইরেন বাজানো শুরু করে। সমস্ত দুনিয়াদারি থেকে ওর বিছিন্নতার শুরু তখন থেকেই।

ওই ঘরে কেন, আবির তখন ওই শহরেই নাই- এটা ও ছাড়া আর কে-ই বা ভালো জানতো? এর আগের তিনদিন রাজশাহীর মানুষ জানছে; আবির ঢাকায় ওর নিজের বাড়িতে অবস্থান করতেছে। আর ঢাকায় ওর বাড়ির মানুষ জানছে; আবির রাজশাহীতে আছে, ওর ওয়ার্কস্টেশনে। পৃথিবীতে একমাত্র স্নেহা আর উপরে আল্লাহ ছাড়া কেউই জানতো না আবির কোথায় ছিল, বা ওই কয়দিন ও আসলে কী করতেছিল! কিন্তু তবুও ঘরের যে কোণাতেই স্নেহা চোখ রাখতেছিল, সব জায়গাতেই একেকভাবে, একেক ভঙ্গীতে, মুখের একই হাসি নিয়ে হাজির হয়ে যাইতেছিল ও!

ওইদিন বিকালের একটু আগে, স্নেহা অনেকটা জোর করেই পরোটা আর মুরগীর স্যুপ মুখে তুলে খাওয়ায় আবিরকে। খাওয়ার রুচি ওর একদমই ছিল না। শরীরটাও হালকা গরম ছিল, সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথাও। তিনদিন যাবত হুইস্কি ছাড়া কোনো সলিড খাবারই ও খায় নাই। ওর মাথাব্যথা হবে না তো কার হবে- স্নেহা এইসব বলে হালকা বকাঝকাও করতেছিল সে সময়। সকালে ফুডপান্ডায় অর্ডার করে আল কাদেরীয়া থেকে মুরগীর স্যুপ আর পরোটা আনিয়ে ডিমের ওমলেট বানায় স্নেহা। এরপর খাওয়ার জন্য কতবার যে ও তাগাদা দিতে থাকে আবিরকে! এপিটাইট নাই বলে বারবার খাবার এড়াতে থাকলেও পেগের পর পেগ হুইস্কি খাওয়া বন্ধ ছিল না ওর। স্নেহা বাধ্য হয়েই এক পর্যায়ে কন্ডিশন দেয়- নো ফুড, নো মোর হুইস্কি। খাবার খাওয়ার পরই কেবল হুইস্কি দেওয়া হবে।

একটু পর খাবো, একটু পর খাবো করতে করতে দুপুর পার করে দেওয়ার পর খানিকটা জোর করেই স্নেহা মুখে তুলে খাওয়ায়। এরপর নিচে চলে যায় নাপা এক্সট্রা কিনতে। ওর যেহেতু জ্বর-টর তেমন একটা আসে না, আসলেও ওষুধপত্রের ধার ধারে না বলে ঘরে নাপাও থাকে না। কেবল বেকলোফেন, প্রোডেপ, ওলিয়ানজ, রিভোট্রিল কিংবা ফিলফ্রেশ টাইপের কিছু ওষুধই ঘরের কোথাও না কোথাও মজুদ থাকে মাঝেমধ্যে। ওইগুলাও যে ও নিয়মিত খায়, এমন না। কিন্তু ওইদিন ঘরে নাপা না থাকার আফসোসে ও মরে যাইতেছিল। ফার্মেসিতে ওষুধের পেমেন্ট করার সময় আবিরের টেক্সট আসে ফোনে- মাদমোয়াজেল...হোয়্যার আর ইউ? কাম সুন, আই ওয়ানা টক।

মুড খুব বেশি ভালো থাকলে অথবা প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক হলেই কেবল স্নেহাকে মাদ্-মোয়াজেল বলে ডাকে ও। এর বাইরে ওর দেওয়া কোনো নাম ছিল না স্নেহার। ওহ নাহ, মাঝে মাঝে অবশ্য ‘বেব’ বলেও ডাকতো, তবে ওইটাও কেবল প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক অবস্থায় থাকলেই! স্নেহা ওকে টেক্সটে ডাকে আমোন। সামনাসামনি যদিও ডাকে না। এই বিষয়ে ওর হালকা শাইনেস আছে। টেক্সটে তো আর চেহারা দেখা যাইতেছে না, তাই যত খুশি ‘আমোন’ বা ‘আমোন পাখি’- যা ইচ্ছা লেখা যায়।

এনশিয়েন্ট এক ইজিপ্ট দেবতার নাম ‘আমোন’। উনি আবার নরমাল দেবতা না, সকল দেবতাদের রাজাও ছিলেন। কিন্তু এই কারণে ‘আমোন’ নামটা স্নেহা বাছাই করে নাই। আমোনকে এনশিয়েন্ট ইজিপ্টে ‘লাইফ গিভিং গড’ হিসেবে মানা হতো বলেই বাছাই করছিল। আরো মজার ব্যাপার হইতেছে- আমোন নামের অর্থ ‘গোপন’ বা ‘অদৃশ্য’। চার্লস বুকোস্কির ওই ব্লুবার্ডটার মতো; যাকে নিয়ে উনি লিখছেন-

দেয়্যার ইজ অ্যা ব্লুবার্ড ইন মাই হার্ট দ্যাট ওয়ান্টস টু গেট আউট
বাট আই'ম টু টাফ ফর হিম
আই সে স্টে ইন দেয়্যার, আই'ম নট গোয়িং টু লেট এনিবডি সি ইউ...

স্নেহার খুব পছন্দের কবিতা। আবিরও ওর জীবনে ওই ব্লুবার্ডের মতোই, এমনটাই ও মনে করতো। গোপনীয়, কিন্তু খুব আদরের। আরেকটা নামও আবিরকে দিছিল ও- আমাদো আলিয়েন্তো। স্প্যানিশ নাম। আমাদো অর্থ বিলাভড, আর আলিয়েন্তো অর্থ ব্রিথ। নামটা অত্যন্ত সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও কঠিন বলে টেক্সটে তেমন একটা ইউজ করা হয় নাই। দুই-একবার করছিল মনে হয়। অনেক খুঁজে খুঁজে নামগুলা স্নেহা বাছাই করছিল অনেক সময় নিয়ে, অনেক আদর আর যত্নের সঙ্গে।

আবার টেক্সট করে আবির- অই! আর কতক্ষণ লাগবে? ওষুধ আর দেড় লিটারের দুইটা মাম পানির বোতল এক হাতে ধরে, আরেক হাতে স্নেহা টাইপ করে- আসছি, বাবা, ওয়েট। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতেই ও বাসায় উঠে। লিফট ফিফথ ফ্লোরে ছিল বলে সিঁড়ি দিয়ে হেঁটেই উপরে চলে যায়। গেটের লক খুলে হাঁপাতে হাঁপাতে আবিরের কাছে গিয়ে একটা নাপা এক্সট্রা ওর মুখে ঢুকিয়ে পানির বোতলটা সামনে ধরে। এরমধ্যে যে আবির ওকে আবার টেক্সট করে বলছিল- মাদ্-মোয়াজেল, দ্যাট স্যুপ ওয়াজ ডিলিশাস৷ আই ওয়ানা হ্যাভ সাম মোর। হাতে জিনিস থাকায় আর তাড়াহুড়ায় সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে টেক্সটটা ও মিস করে ফেলে।

বিকালবেলা অবশ্য হোটেলে মুরগীর স্যুপ পাওয়াও যায় না। সাধারণত সকালের নাস্তার জন্যই এই আইটেম তৈরি করা হয়। তবুও বাইরে বাইরে থাকা অবস্থায় টেক্সটটা পেলে অন্তত একটা খোঁজ নিয়ে দেখা যেত। বেচারা দুইদিন যাবত কিছুই খায় নাই; একটা জিনিস মজা লাগায় আবার খেতে চাইলো, কিন্তু সেটা হাজির করতে পারতেছে না ও! এই আফসোস করতে করতেই ও ফুডপান্ডায় মুরগীর স্যুপ খোঁজার চেষ্টা চালাতে গেলে আবির থামিয়ে ওকে পাশে বসায়।

ফার্মেসিতে যাওয়ার আগে আবিরের শাওয়ারের জন্য পানি গরম বসিয়ে গেছিল স্নেহা। ওই ফ্ল্যাটের কোনো ওয়াশরুমেই গিজারের ব্যবস্থা ছিল না। ফেব্রুয়ারি মাস, ওয়েদার তখনো হালকা ঠান্ডা। চারিদিকে বসন্ত বাতাস। নরমাল পানিতে শাওয়ার নিলে ঠান্ডা লাগতে পারে ভেবে স্টোভেই পানি গরম বসায়। দুইদিন যাবত কিছু না খাওয়ার পাশাপাশি, শাওয়ারও নেয় নাই আবির। শাওয়ারটা নিলে শরীর ভালো লাগতো তোমার- বলতে বলতেই স্নেহা বিছানায় বসে।

আবির ওর দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। ওর চোখে স্নেহা একইসঙ্গে দেখতে পেল মায়া আর অসহায়ত্ব। বেশিক্ষণ ওইদিকে তাকাতে পারলো না। চোখ সরিয়ে খুব ক্যাজুয়ালিই জানতে চায়- বলেন, স্যার! কী জরুরি কথা আপনার? আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন, এটাই বলবেন, তাই তো? আমি তা জানি তো। আর কতবার বলবা, আবির? সঙ্গে সঙ্গেই আবির বলে- স্নেহা...নাহ! তুমি কেন আমার মতো একটা মানুষকে ভালোবাসো? আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারি না। কিছু দিতে পারবোও না কোনোদিন।

একটু পজ দিয়ে ও আবার শুরু করে- হোয়্যাই ইউ আর ওয়েস্টিং ইউর লাইফ? ইউ আর ইন্টেলিজেন্ট, ইউ আর প্রিটি। আ...মি...আ..আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারি না, এটা যে কত যন্ত্রণার! আবিরকে থামিয়ে স্নেহা প্রশ্ন করে- আমি কী চাই তোমার কাছে, আবির? ও মাথা নাড়ায়- কিছুই না। এটাই তো সমস্যা। তুমি আমার কাছে কিছুই চাও না। এরজন্য তো আমার আরো বেশি কষ্ট হয়, খারাপ লাগে। অপরাধ বোধ জাগে।

ঘড়ির কাঁটা পৌনে পাঁচটার ঘরে। স্নেহার ফোনে এলার্ম দেওয়া ছিল যেন ওরা দুই ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টের জন্য ওরা বের হতে পারে। কিন্তু আবিরের হাবভাব দেখে মনে হইতেছিল ৭ নম্বর ফ্লাইটটাও ও মিস করার ধান্ধায় আছে। পরদিন চিফের যদি রাজশাহী যাওয়ার প্রোগ্রাম না থাকতো, ওইদিনও মনে হয় না ও যাওয়ার জন্য উঠতো। ওর যে যেতে ইচ্ছা করতেছে না, চোখ দেখেই বোঝা যাইতেছিল। তবে না যেয়েও উপায় ছিল না। ২৪ এর রাত থেকে রাজশাহী যাওয়া পেছাতে পেছাতে ওইদিন ২৬ এর বিকাল প্রায় পাঁচটা। কয়েকবার ও বলছেও- আমার যেতে ইচ্ছা করতেছে না। পর মুহূর্তেই আবার বলছে- কিন্তু যেতে হবে। চিফ আসবে। দে উইল কিক ইন মাই অ্যাস!

ওইদিন সকালে ঘুমানোর ট্রাই করতে যাওয়ার আগে নিজের শরীরে ও স্নেহার পরনের শাড়ি জড়িয়ে রাখে। নিজেই শাড়িটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়ানোর সময় বলে- আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রাখো। এভাবে কেউ ধরার মতো নাই আমার। আবিরের এসব কথা যে ও পুরাপুরি বিশ্বাস করতো, এমন না। কিন্তু ওর অবচেতন মনের কোনো একটা অংশ মাঝে মাঝে এসব বিশ্বাসও করতে চাইতো সরল মনে। আবিরের ব্যক্তিগত বিষয়-আশয় নিয়ে কখনোই কোনো প্রশ্ন করে নাই স্নেহা, কিছু জানতেও চায় নাই। নিজে থেকে কিছু বললে শুধু শুনে গেছে। যেই মুহূর্তটা আবির ওর সঙ্গে, ওর পাশে থাকতেছে- ওর কাছে ওই মুহূর্তটুকুই কেবল গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর বাইরে আবিরের ব্যক্তিগত জীবন; ওর পরিবার, ওর জব- এসবের প্রতি তখনো স্নেহা কোনো আগ্রহই দেখায় নাই। দেখানোর প্রয়োজনও হয় নাই।

প্রতি মাসেই ওদের দেখা হইতেছিল, কথাও হইতেছিল নিয়মিত। যদিও রাজশাহীতে পোস্টিংয়ের পর ওইবার প্রায় দুই মাস পর দেখা হইছে ওদের। সামনেও বোধহয় অনেকদিন দেখা হবে না, অথবা কে জানে- হয়তো আর কখনোই দেখা হবে না! এমনটাই সম্ভবত বলার জন্য ফার্মেসি থেকে জরুরি তলব দিয়ে ওকে ডেকে আনছিল আবির। কিন্তু ওই মুহূর্তে ওইটা বলার মতো নির্দয় ও হতে পারে নাই, বা ওর সাহসে কুলায় নাই তখন। এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর ফ্লাইটে উঠে ওই সাহসটা ও জোগাতে পারছিল, কিংবা নির্দয় হতে। তখন তো দৃষ্টির সীমানা থেকে ও অনেক দূরে চলে গেছে। স্নেহার যন্ত্রণা তো আর ওকে সামনে থেকে দেখতে হইতেছিল না আসলে!

চেজিং দ্য ড্রাগন: জুনুন

Comments

    Please login to post comment. Login