Posts

গল্প

নিশির ডাক

March 15, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

38
View

বাইরে তখন শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ। একশো পঞ্চাশ বছরের পুরোনো জমিদার বাড়ির ছাদের টিন আর কড়িকাঠে বৃষ্টির শব্দগুলো যেন এক একটা চাপা আর্তনাদের মতো শোনাচ্ছে। রাত ঠিক কটা বাজে, অনির্বাণের জানা নেই। লোডশেডিং হয়েছে সেই সন্ধেবেলায়। একটা টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোয় সে বসে আছে দোতলার একেবারে শেষ প্রান্তের ঘরটায়। এই বিশাল, গোলকধাঁধার মতো বাড়িতে সে আজ সম্পূর্ণ একা।

​অনির্বাণ চিরকালই প্রবল যুক্তিবাদী মানুষ। ভূত, প্রেত বা অলৌকিকতায় তার কোনোকালেই বিশ্বাস নেই। কিন্তু আজ, এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে, স্যাঁতসেঁতে পুরোনো ইঁটের গন্ধ আর চারপাশের দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতার মাঝে তারও কেমন যেন শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে। হ্যারিকেনের হলদেটে আলোটা বাতাসে কাঁপছে, আর উলটোদিকের দেওয়ালে তার নিজের ছায়াটাই যেন এক অদ্ভুত, বিকট দানবের মতো দেখাচ্ছে।

​হঠাৎ, বৃষ্টির একটানা শব্দের মাঝেই একটা অন্যরকম শব্দ তার কানে এল।

খুব মৃদু, কিন্তু একদম স্পষ্ট।

ছপ... ছপ... ছপ...

​শব্দটা আসছে একতলার কাঠের সিঁড়ির গোড়া থেকে। কেউ যেন ভারী, ভিজে পায়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছে। অনির্বাণের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সদর দরজা ভেতর থেকে ভারী লোহার খিল দিয়ে বন্ধ করা। জানলাগুলোও সব শক্ত করে আটকানো। এই দুর্যোগের রাতে, এই পরিত্যক্ত প্রায় বাড়িতে ভেতর কে ঢুকবে?

​শব্দটা ক্রমশ কাছে আসছে। ছপ... ছপ...

প্রতিটা পদক্ষেপে যেন একটা স্যাঁতসেঁতে, মৃত্যুশীতল হাওয়া উপরে উঠে আসছে। অনির্বাণের মনে হলো, ঘরের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় বেশ কয়েক ডিগ্রি কমে গেছে। তার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠতে চাইল, কিন্তু পারল না। কে যেন তার শরীরটাকে অদৃশ্য কোনো বরফের শেকল দিয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে রেখেছে।

​এবার একটা তীব্র গন্ধ পেল সে। পচা শ্যাওলা, অনেক দিনের পুরোনো বদ্ধ জলাশয়ের পঙ্কিল কাদা আর মরা মাছের এক বমি-আনা, কটু দুর্গন্ধ। গন্ধটা এতই তীব্র যে অনির্বাণের নাড়ীভুঁড়ি যেন উলটে আসতে চাইল।

পায়ের শব্দটা দোতলার বারান্দা পেরিয়ে এবার এসে থামল ঠিক তার ঘরের বন্ধ দরজার ওপাশে।

সব শান্ত। নিস্তব্ধ। শুধু বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ। অনির্বাণের মনে হলো, তার নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক আওয়াজটা বোধহয় দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই 'অদৃশ্য কেউ' শুনতে পাচ্ছে।

​ঠিক তখনই, খুব ধীরে, অদ্ভুত এক ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে দরজার পুরনো পেতলের হাতলটা ঘুরতে শুরু করল।

কেউ একজন বাইরে থেকে খুব সন্তর্পণে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছে। অনির্বাণের চোখ দুটো ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। তার গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোল না, পেশীগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। হাতলটা পুরো ঘুরে যাওয়ার পর, একটা কনকনে ঠান্ডা, পচা হাওয়া ঘরের ভেতর হুড়মুড় করে ঢুকে এল। হ্যারিকেনের আলোটা শেষবারের মতো একবার কেঁপে উঠেই দপ করে নিভে গেল। পুরো ঘর ডুবে গেল জমাট, অন্ধকারের এক অতল খাদে।

​হঠাৎ, বাইরে একটা প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল। আর সেই তীব্র বিদ্যুতের নীলচে আলোয়, জানলার ফাঁক দিয়ে আসা এক চিলতে আলোয় অনির্বাণ দেখল তাকে।

​দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে একটা অবয়ব। অসম্ভব লম্বা, মাথাটা প্রায় ছাদের কড়িকাঠ ছুঁয়ে ফেলেছে। তার সারা শরীর থেকে টপটপ করে ঘোলাটে, কালো জল ঝরছে মেঝের ওপর। গায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো পচা কচুরিপানা আর পাক। চামড়াটা ফ্যাকাসে, সাদাটে, যেন অনেক দিন জলের তলায় ফুলে ফেঁপে বিকৃত হয়ে গেছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ানক হলো তার মুখটা। সেখানে কোনো চোখ নেই, শুধু দুটো গভীর, কালো গর্ত। আর সেই শূন্য গর্ত দুটো থেকেই অনির্বাণের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এক আদিম, ক্ষুধার্ত শূন্যতা।

​বিদ্যুতের আলো নিভে গেল। ঘর আবার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

কিন্তু সেই জমাট অন্ধকারের মাঝেই অনির্বাণ শুনতে পেল, সেই অবয়বটা তার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। ছপ... ছপ...

আর তারপর, একদম তার ডান কানের কাছে, গলার ভেতর জলের বুদবুদ ফাটার মতো একটা ঘড়ঘড়ে, পৈশাচিক গলা ফিসফিস করে বলে উঠল,

"আমার ঘরটা... এবার ছাড়বি?"

Comments

    Please login to post comment. Login