Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: জুনুন

March 15, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

338
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

ফ্লোরে পড়া গ্লাসটা উঠিয়ে তাতে আরেকটু হুইস্কি ঢেলে নেয় স্নেহা। বিছানায় গিয়ে এমনভাবে বসে যেন আবির এখনো ওইখানেই শুয়ে আছে। এরমধ্যেই ওর মনে পড়ে, সকালে হালকা হুইস্কি খেয়ে ঘুমানোর আগে আবির ওইখানে শুয়ে বলতেছিল- গেট অ্যা গুড জব। আমি তোমাকে অনেক উঁচুতে দেখতে চাই। বুঝতে পারতেছো আমি কী বলতেছি? অ্যান্ড ইট'স বোথ ফর আস। নট অনলি ফর ইউ। বুঝতে পারছো? স্নেহা আসলে বুঝতে পারে নাই। আবিরের এ রকম অনেক কথাই ও বুঝতে পারে না। সোবার হওয়ার পর ওইসব বিষয়ে দুই-একবার কথা বলতে গিয়ে আনকমফোর্ট ফিল করতে দেখায় ড্রাঙ্ক আবিরের কনভার্সেশন রিলেটেড কিছু সোবার আবিরকে আর বলতে যায় নাই ও। ড্রিঙ্ক করলে ও অনেক কথাই বলে যা স্নেহা অধিকাংশ সময়ই ইগনোর করে। ড্রাঙ্ক আবির অ্যান্ড সোবার আবির আর নট দ্য সেইম পারসন। খুব অদ্ভুত শোনালেও সত্য- সোবার অবস্থাতে গত দেড় বছরে ওর সঙ্গে খুব কম সময়ই কাটানো হইছে স্নেহার।

রাকিন এটাকে বিরাট ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসাবে দেখে। এমনিতেই ও স্নেহাকে নিয়ে ভয়ংকর পজেসিভ। আবিরকে প্রথম থেকেই ওর খুব একটা পছন্দ না। যদিও স্নেহাকে এই বিষয়ে সিরিয়াসলি ও কিছু বলে না, দুষ্টুমি বা পঁচানোর ছলে নানা কিছু বলার ট্রাই করে মাঝে মাঝে। স্নেহার এতে বুঝতে অসুবিধা হয় না রাকিন যে এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে নাই। শুধু বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ায় আর ২০ বছরের বন্ধুত্বের কারণে হজম করে যাইতেছে। স্নেহার খুব ইচ্ছা ছিল ওদের দুইজনকে একবার দেখা করাবে। রাকিনের তাতে কোনো সমস্যা ছিল না কখনো, সমস্যা সব আবিরেরই। ওর জীবন আর আট-দশজন সিভিলিয়ানের মতো হলে হয়তো এত সমস্যা থাকতো না। কিংবা কে জানে, হয়তো তখনোও থাকতো! স্নেহা ওকে বুঝতে চায়; মাঝে মাঝে মনে হয় অনেকটুকুই বোঝে, আবার মাঝে মাঝে মনে হয়- যতটুকু বোঝে, এর সবটাই ভুল। এই যেমন ওইদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে আরেক পেগ হুইস্কি পেটে পড়তেই ও স্নেহাকে বলতেছিল- বিয়ে করবা? স্নেহা যখন উল্টা জিজ্ঞেস করলো- কী??? কী করবো?  তখন ও উত্তর দিছে- নাহ, কিছু না।

স্নেহার ধারণা আবির এইগুলা ওকে পরীক্ষা করতে বলে; কিংবা ও আসলে কখন কী বলে, নিজেও জানে না। এর দুই সপ্তাহ আগে যখন স্নেহা রাজশাহীতে ওর সঙ্গে দেখা করতে গেল; পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে মদে চুর আবির বলতেছিল- চলো আমরা টেকনাফ যাই। স্নেহা জানতে চায়, টেকনাফ!!! কেন? ও খুব সিরিয়াসলি উত্তর দেয়- ওইখান থেকে বর্ডার ক্রস করে মায়ানমার চলে যাবো। ও খুব মজা পাওয়ার ভঙ্গীতে আবার জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা! তারপর? আবিরের উত্তর ছিল- নাহ, সিরিয়াসলি, ফাইজলামি না। আমি যদি ওদেরকে আমার পরিচয় দিই, দে উইল ট্রিট মি এজ অ্যা ভিআইপি! স্নেহা কৌতুক ভরা কণ্ঠেই জানতে চাইলো, তারপর? আবির একই সিরিয়াস কণ্ঠে বলতে থাকে- তারপর আর কী? আই উইল টেল দেম দ্যাট আই ওয়ানা স্পেন্ড দ্য রেস্ট অফ মাই লাইফ উইদ দিজ লেডি। চলো, আমরা মায়ানমারে পালিয়ে চলে যাই।

স্নেহা হাসতে হাসতেই বলছিল- হইছে! মাথা খারাপ! এরপর দুইজনই চুপ! পরিবেশটা হঠাৎ ভারি হয়ে উঠতেই হালকা করার জন্য স্নেহা বলে- বলবা যখন ভালো দেশের কথাই বলতা! হোয়াই মায়ানমার, ম্যান! পুউর! এই কথা বলে ও হাসতেছিল ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতরের দুমড়ানো-মোচড়ানো অনুভূতিটাও ও ঠিকই টের পাইতেছিল। স্নেহা জানতো, ওইসব কথা তখন বলতেছে ড্রাঙ্ক আবির। মদের নেশা কেটে গেলেই ওর কিছুই আর মনে থাকবে না। যদি মনে পড়েও, অ্যাংজাইটি আর গিলটি ফিলিংয়ে ও বারবার টেক্সট করবে ‘সর‍্যি’ লিখে। স্নেহা ততদিনে ওর এই স্বভাব সম্পর্কে ওয়েল অ্যাওয়ার ছিল।

অধিকাংশ সময় আবিরের ড্রাঙ্ক অবস্থায় বলা কথা ইগনোর করলেও স্নেহাও তো একটা মানুষ, তাও আবার একলা মানুষ! যে কি না জীবনের ৩৮ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর ওই ভদ্রলোককে তীব্রভাবে ভালোবাসার পর বুঝতে পারছে- সুফীজমে স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার যে সাতটা স্তর আছে, তা শুধু স্রষ্টার প্রতিই না, যেকোনো কিছু তীব্রভাবে ভালোবাসলেই অনুভব করা যায়। জীবনের এতগুলা বছর পার করার পর ওই প্রথম ও এই স্তরগুলা ফিল করতে পারতেছিল! মাঝে মাঝে আবিরকে ও মজা করে বলতোও- আই'ম ইন সিক্সথ স্টেজ- জুনুন! এরপরই কিন্তু মউত বা ফানা- যদিও সুফিজমে এই মউতের অর্থ স্রষ্টাকে ভালোবেসে অহং বা নফসের মৃত্যু ঘটানোর মাধ্যমে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়া; কিন্তু স্নেহা মজা করে এই মউত বা মৃত্যুর লিটারেল মিনিংই ইঙ্গিত করতো। ওর ওইসব টেক্সটের রিপ্লাইয়ে আবির লিখতো- আবার বাজে কথা বলতেছো!

রাত সাড়ে দশটা। মাথা থেকে আবির; ওর ঘ্রাণ, ফ্লাইটে উঠার পর বলা ওর শেষ কথার কিছুই সরতেছিল না। একটা লুপের ভেতর ও আটকে গেছিল। মনে হইতেছিল, চারপাশের দেয়ালগুলা চতুর্দিক থেকে ওকে চাপ দিতে আসতেছে। ফ্যানটা থেমে আছে, কিন্তু কী যেন ইশারা দিতেছে ওকে। অসম্ভব! এইভাবে বাকি রাত কাটালে জন্মের দিনই ওর মরতে হবে, মাথায় হাত দিয়ে ও ভাবে। যদিও এটা ওর ফ্যান্টাসির অংশ ছিল সবসময়। নবীজির জন্ম-মৃত্যু একইদিনে জানার পর থেকে মনে হয় ওর মাথায় ওই ফ্যান্টাসি ঢুকছিল। কিন্তু বহুদিন যাবত পুষে রাখা ওই ফ্যান্টাসিও ভালো লাগতেছিল না তখন।

গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ছোট্ট মামের বোতলে কিছুটা হুইস্কি ঢেলে ও ব্যাগ প্যাকে ঢুকালো। সঙ্গে চার্জার, হাতের কাছে থাকা একটা টি-শার্ট আর জিন্সও নিয়ে নিলো। ফোনটা অন করলো উবার কল করার জন্য। কোথায় যাবে, কিছুই জানে না তখনো। তবে কোনোভাবেই যে রাতে ওই বাসায় থাকা পসিবল না, এইটুকু ও বুঝতে পারতেছিল। ফোন অন করতেই টেলিগ্রামে হার্পপ্রিভিউয়ের নোটিফিকেশনের সাউন্ড আসা শুরু হলো ক্রমাগত। আবিরের টেক্সট। একটার পর একটা টেক্সট আসার শব্দে মনে হইতেছিল কেউ কামান দাগাইতেছে- ঢাই ঢাই ঢাই ঢাই করে! একসঙ্গে ৩৯ টা টেক্সট! নোটিফিকেশনের স্পিডে ওর মুখ থেকে অটোই বের হয়ে আসলো- ওএমজি! কিন্তু ওই মুহূর্তে টেক্সটগুলাকে ও ইগনোর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সব সময় আবিরের ড্রাঙ্ক হয়ে উল্টাপাল্টা আচরণের পর আবার সোবার অবস্থার অ্যাংজাইটিকে সহনশীলতার সঙ্গে নেওয়া ও টেকেন ফর গ্র‍্যান্টেড হিসাবে নিয়ে নিছে। দিস ইজ নট গুড এট অল- স্নেহা ভাবে। ও আসলে কী-ই বা চায় আবিরের কাছে? সময়-সুযোগ মতো কিছু মুহূর্ত শুধু! এইটুকু নিয়েই তো বাকিটা জীবন থেকে যেত পাশে। খুব জেনে আর বুঝেই এমন সিদ্ধান্তের কথা আবিরকে বলছিল। রাকিন অবশ্য এটাকে বলে পাগলের মতো সিদ্ধান্ত। আবিরের বিষয়ে রাকিনের অন্যান্য কমেন্টের মতো ওইটাও যথারীতি ও ইগনোর করে গেছে।

উবারের লোকেশন ঠিক করলো ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ড। ওইখান থেকে কোথায় যাবে, কিছুই ও ঠিক করে না, জানেও না। সমস্ত কিছু ছেড়েছুড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করতেছিল। ওই ইচ্ছাটাকেই তখন ও প্রায়োরিটি দেবে বলে ভেবে নিলো। যে শহরে আবির নাই, সেই শহরে ওর ওই মুহূর্তে সাফোকেশন হইতেছিল; কিন্তু যে শহরে আবির আছে, সেখানে যাওয়াও ওর পক্ষে সম্ভব ছিল না, উচিতও না। তবে ও বুঝতে পারতেছিল, সত্যিই হয়তো ওদের অনেকদিন দেখা হবে না ওইবার। ওই মাসেই প্রথম ও আবিরের সঙ্গে দেখা করতে রাজশাহী যায়। ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের পর ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ- পাক্কা ৫৩ দিন একে অপরের মুখটাও দেখে নাই ওরা। এর সপ্তাহ খানিক আগে হালকা মনোমালিন্য হইছিল। কথা বলাও বন্ধ ছিল টানা ৭ দিন। লং ডিসটেন্সে এই সমস্যা খুব ন্যাচারাল, কমনও। একে তো অনেকদিন দেখা হইতেছিল না, অন্যদিকে কবে আবার দেখা হবে জানাও যাইতেছিল না। নিজে থেকে স্নেহা কখনোই ওকে দেখা করার কথা বলে নাই এর আগে বা ওই সময় পর্যন্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন দেখা না হওয়ায় ওর মেজাজ ঠিকই খিটখিট হইতেছিল। কারণে-অকারণে রাগ দেখানো শুরু করছিল আবিরের উপর।

সব ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য একটু কম, এটা ওর নানা আচরণে স্নেহা বুঝতো। কিন্তু অদ্ভুত কোনো একটা কারণে, ওর ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য ছিল রীতিমতো প্রশংসনীয়। তবে সবারই তো ধৈর্য্যের সীমা থাকে। এক কথায় দুই কথায় ওইবার আবির ওকে হঠাৎ একদিন লিখে বসে- আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর। যদিও এই একই কথা এরপর আরো বহুবার ওকে বলতে হইছে আবিরের। শুরুটা হইছিল ওইবারই। তারিখটাও মনে আছে ওর- ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫! এরপর টানা ৭ দিন সব চুপচাপ। স্নেহাও টেক্সট দেয় নাই, আবিরও না। তবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্নেহার টেলিগ্রাম স্টোরি আবার ঠিকই ও স্টক করে গেছে। মাঝে মাঝে আবিরের ওই সাইলেন্ট অবজারভেশনে স্নেহার রাগ উঠতেছিল। কয়েকবার ও ফোন হাতে নিয়ে লিখতেও চাইছে- কথা না বললে স্টোরি দেখতে হয় কেন ঘণ্টায় ঘণ্টায়? কিন্তু সামহাউ রাগটা সংবরণ করতে পারছে। ওর অহং বোধের কাছে ওই রাগ পানি হয়ে যায়। আত্মসম্মান খোঁয়াতে নিজে থেকে ও টেক্সট করবে? মাথা খারাপ!!! “আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর” বলার পরও??? অ-স-ম্ভ-ব! আবিরকে কখনোই ও নিজে থেকে টেক্সট করতো না শুরু থেকেই। কে জানতো, একদিন বেঁচে থাকার জন্য আবিরের কাছেই ওকে একটাবারের জন্য কথা বলার ভিক্ষা চাইতে হবে কয়েকশতবার, নানাভাবে, নানা মাধ্যম থেকে!

বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে লাইটার-সুঁইয়ের দোস্তি না করাতে পারার ফ্রাস্ট্রেশনে নিজেকেই স্নেহা চিৎকার করে বলে উঠে- ই-উ-জ-লে-স! এরমধ্যে ওই ভিক্ষা চাওয়ার স্মৃতি ওর মনটাকে করলার চেয়েও তিতা করে তুললো। এরপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে ও ভাবলো- ধ্যাৎ বাল! হোয়াই আই ইউজ মেটাফোর অব করলা হেয়্যার! করলা তো আমার প্রিয়! আবার মাথার মাঝখানটা চুলকাতে চুলকাতে ও ভাবতে বসে যায়। নিজেকে আসলেই ওর একটা পাক্কা ইউজলেস মনে হয় ওই মুহূর্তে। আরো পাঁচটা মিষ্টি এখনো বাকি আছে, কিন্তু সুঁই-আগুনের এই দুশমনী জগতের আর সকল দুঃখকে তিতা বানিয়ে দিতেছে চিরতার রসের মতো। ইয়েস! চিরতার রস ইজ এপ্রোপ্রিয়েট ফর দিস মেটাফোর। একা একাই ও কিছুটা উচ্চস্বরে বলে- আই হেইট চিরতার রস। চিরতার ইংরেজি কী? একবার চিন্তা করে, তারপর মনে হয়- হোয়্যাটএভার! চিরতা সংক্রান্ত ছোটবেলার একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেল ওর। একবার আম্মা জোর করে আপেলের জুস বলে মুখে চিরতার রস দিয়ে দিছিলেন, যদিও গেলাতে পারেন নাই। স্নেহা ইয়াআআআক থুউউউউউউ বলে মুখের লালা-টালাসহ সবটুকু রসই বের করে দেয়। এরপর বহু বছর পর্যন্ত সত্যিকারের আপেল জুসের প্রতিও ওর ভীতি তৈরি হইছিল! এখনো ও আপেলের জুস খায় না অবশ্য। ছোটবেলায় আরো অনেককিছুতেই ওর ভীতি ছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর বহু বছরের চেষ্টায় ব্যক্তিত্বের ভেতর একটা শক্ত আবরণ ও তৈরি করতে পারছিল। কিন্তু এই ৪০ বছর বয়সে এসে ওই আবরণটাকেও বহুকাল অযত্নে থাকা কোনো পুরানা বাড়ির দেয়ালের পলেস্তারের মতো খসে খসে পড়তে দেখতেছে।

আগের বছরের ৬ ফেব্রুয়ারির মেমোরিতে আবারও ফিরে যায় ও। আচমকাই ওই রাত দশটার কাছাকাছি সময় টেলিগ্রামে আবিরের টেক্সট আসে- ওয়ানা টক? আউট অব নো হোয়্যার! অবশ্য এর ঘণ্টা খানিক আগেই ও স্টোরিতে দেওয়া হুইস্কির গ্লাসের সঙ্গে বুকোস্কির বিখ্যাত কোট "আই ওয়ান্টেড দ্য হোল ওয়ার্ল্ড অর নাথিং" সিন করছিল। কিন্তু আচমকা ‘ওয়ানা টক’ লেখা দেখে স্নেহার বুকে প্রচণ্ড জোরে শুরু হওয়া ধুক ধুক শব্দে ওর নিজেরই মনে হইতেছিল- কিংফিশারের হৈ হুল্লাড় আর লাউড স্পিকারে বাজতে থাকা শ'ন মেন্ডেজ-ক্যামেলা কাবেইয়ো'র "সেনোরিটা"র চেয়েও ওই হার্ট বিট বেশি ফাস্ট অ্যান্ড লাউড সাউন্ড করতেছে। ওইখানে থাকা সবাই ওর হার্ট বিটের সাউন্ড শুনে ফেলতেছে বলে মনে হইলো ওর। নিজের ওই অহেতুক ভাবনায় কিছুটা লজ্জাও পায় ও। উত্তেজনা সংবরণ করে টেক্সট ব্যাক করে- হাউ'জ গোয়িং অন?

৩০ তারিখ থেকে প্রতিটা দিন এই একটা কথা জানার জন্যই ওর প্রাণটা ছটফটাইতেছিল, কিন্তু নিজের ইগোর কাছে ওই ছটফটানিকে ও বেশিক্ষণ টিকতে দেয় নাই তেমন। তড়পাইলে একা তড়পাক, আরেকজনকে কেন সেটা বুঝতে দিতে হবে- প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি অসংখ্যবার নিজেকে ওর এই কথা বুঝাতে হইছে ওই কয়দিন। যদিও অস্থিরতার কারণে খুব ঘন ঘন ও টেলিগ্রামে স্টোরি দিতেছিল। ওইসব স্টোরি আবার মুহূর্তের মধ্যেই সিনও করতেছিল আবির। প্রথম এক দুইদিনের পর রাগটা মরে পানি হয়ে যায় স্নেহার। কথা না বলেও স্টোরি দেখতে থাকায় আবিরকে ও প্রথম দুইদিন যেমন কথা শোনাবে ভাবছিল; তৃতীয় দিন থেকে উল্টা ওর মনে হওয়া শুরু হয়- থাক, দেখুক! তবুও তো কোনো না কোনোভাবে কানেক্ট আছে। স্টোরি যেহেতু দেখতেছে, ঠিকই আছে নিশ্চয়! থাকুক, এভাবেই থাকুক। যেমনভাবে ওর ইচ্ছা হয় থাকতে, থাকুক। তবুও থাকুক, থেকে যাক।

এরমধ্যে অনেকবারই ওর ভাবনায় আসছে- আচ্ছা, আবিরের কি ওর কথা একবারও মনে পড়ে না? ও কি কখনো ওকে মিসও করে না আসলে? এইসব প্রশ্নের উত্তর সোবার আবিরের মুখ থেকে শোনা আর বাঘের মুখ থেকে শিকার ছাড়িয়ে আনা একই সমান রিয়েলাইজ করার পর, এইসব ভাবনা ও মাথা থেকে বাদই দিতে চাইছিল আসলে, কিন্তু ততদিনে; অফিসের কাজের বাইরে পুরা জীবনটাই ওর আবির কেন্দ্রিক হয়ে উঠছিল। নিজের ওই অবস্থাকে তখন ও তুলনা করতো জীবনানন্দের বোধ কবিতার ওই লাইনগুলার সঙ্গে-

পথে চ’লে পারে- পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে; মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে, তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি- সেও থেমে যায়...

প্রথম টেক্সটের কিছুক্ষণ পর আবারও আবির জানতে চায়- ইউ ওয়ানা টক? স্নেহা উত্তরে বলে- আই'ম ইন কিংফিশার, উইল গো হোম সুন। ক্যান আই নক ইউ লেটার? আবির খুব অথোরিটির টোনে লিখে পাঠায়- গো হোম, ইটস লেইট। বাসায় ফেরার পথে ওর পাঠানো স্পটিফাইয়ের একটা গানের লিংক পায় স্নেহা। ব্লু টাচ ব্যান্ডের “ছায়া”। নরমালি আবির কোনো গানের লিঙ্ক পাঠালে ও শুনে সঙ্গে সঙ্গেই ফিডব্যাক দিতো। কিন্তু এই গানের শুরুর দুইটা লাইন শোনার পর ওই প্রথম ও কিছু না লিখে চুপ থাকে।

বেশ ভালোই ড্রাঙ্ক ছিল স্নেহা ওই রাতে। বাসায় এসে আবিরকে নক দেবে বললেও কী লিখবে ভেবে পাইতেছিল না। যেহেতু আবির ওকে একটা গান পাঠাইছে, ও নিজেও একটা গান পাঠাবে বলেই ঠিক করে। কিছুক্ষণ ভেবে ইন্ডালোর "১৯৯৬" এর স্পটিফাই লিঙ্ক পাঠিয়ে নিজেও গুন গুন করে গাইতে থাকে- "তুমি ভালোবেসো, আমার ভালোবাসা, যখন কখনো আমি থাকবো না।" আবির ওই লিঙ্কের রেসপন্সে লেখে- নাইস সং। হোম? স্নেহা হুম লিখলে আবির জানতে চায়- ক্যান আই ভিডিও কল ইউ, ম্যাডাম? আরও একবার হকচকায় স্নেহা। এ রকম এপ্রোচ কিংবা রিকোয়েস্ট আবিরের কাছ থেকে একদমই আনএক্সপেক্টেড! ও শিওর লিখে টেক্সট পাঠানোর পর পরই আরেকটা টেক্সটে লেখে- বাট আই'ম গেটিং ওল্ড অ্যান্ড আগলি দিস ডেইজ। আবির উত্তর দেয়- কাম অন!

চেজিং দ্য ড্রাগন: সঙ্গত কারণে

Comments

    Please login to post comment. Login