ফ্লোরে পড়া গ্লাসটা উঠিয়ে তাতে আরেকটু হুইস্কি ঢেলে নিলো স্নেহা। বিছানায় গিয়ে এমনভাবে বসলো যেন আবির এখনো ওইখানেই শুয়ে আছে। এরমধ্যেই ওর মনে পড়ে গেল সকালে হালকা হুইস্কি খেয়ে ঘুমানোর আগে আবির এখানে শুয়ে তাকে বলতেছিল, গেট অ্যা গুড জব। আমি তোমাকে অনেক উঁচুতে দেখতে চাই। তুমি কি বুঝতে পারছো আমি কী বলছি? অ্যান্ড ইটস বোথ ফর আস, নট অনলি ফর ইউ। তুমি বুঝতে পারছো?
স্নেহা আসলেই বুঝতে পারে নাই। আবিরের এ রকম অনেক কথাই স্নেহা বুঝতে পারে না। সোবার হওয়ার পর সেসব নিয়ে দুই একবার কথা বলতে গিয়ে আবিরকে আনকমফোর্ট ফিল করতে দেখায় এখন আর ড্রাঙ্ক আবিরের কথোপকথন নিয়ে সোবার আবিরের সঙ্গে কথা কমই হয় স্নেহার। ও ড্রিঙ্ক করলে অনেক কথাই বলে যেসব স্নেহা অধিকাংশ সময়ই ইগনোর করে। ড্রাঙ্ক আবির অ্যান্ড সোবার আবির আর নট দ্য সেইম পারসন। অদ্ভুত বিষয় হলো, সোবার অবস্থাতে গত দেড় বছরে আবিরের সঙ্গে খুব কম সময়ই কাটানো হইছে স্নেহার।
রাকিন এটাকে বলে বিশাল রেড ফ্ল্যাগ। রাকিন স্নেহাকে নিয়ে ভয়ংকর পজেসিভ। আবিরকে প্রথম থেকেই ও খুব একটা পছন্দ করে না, যদিও স্নেহাকে এই বিষয়ে সিরিয়াসলি কিছু বলে না, দুষ্টুমির ছলে, পঁচানোর ছলে নানা কিছু বলার ট্রাই করে, কিন্তু তাতে স্নেহার বুঝতে অসুবিধা হয় না- রাকিন এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। শুধু বেস্ট ফ্রেন্ড আর ২০ বছরের বন্ধুত্ব বলে হজম করে যাচ্ছে।
স্নেহার খুব ইচ্ছে ছিল ওদের দুজনকে একবার দেখা করিয়ে দেওয়ার। রাকিনের তাতে কোনো সমস্যা নাই, সমস্যা সব আবিরের। আর আট-দশজন সিভিলিয়ানের মতো ওর জীবন থাকলে হয়তো এত সমস্যা ওর থাকতো না, কিংবা কে জানে! স্নেহা আবিরকে বুঝতে চায়; মাঝে মাঝে মনে হয় ও অনেকটুকু বোঝে, মাঝে মাঝে মনে হয়- যতটুকু বোঝে, সবটাই ভুল।
এই যেমন ওইদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে আরেক পেগ হুইস্কি পেটে পড়তেই আবির স্নেহাকে বলতেছিল, বিয়ে করবা? স্নেহা যখন উল্টা জিজ্ঞেস করলো? কী??? কী করবো? আবির বললো, নাহ, কিছু না। স্নেহার ধারণা আবির এগুলা তাকে পরীক্ষা করতে বলে, কিংবা ও আসলে কখন কী বলে, ও নিজেও জানে না। এর দুই সপ্তাহ আগে রাজশাহীতে যখন ওর সঙ্গে দেখা করতে গেল স্নেহা, পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে মদে চুর আবির বলতেছিল- চলো আমরা টেকনাফ যাই।
স্নেহা বললো, টেকনাফ!!! কেন? আবির উত্তর দিলো, ওইখান থেকে বর্ডার ক্রস করে মায়ানমার চলে যাবো। স্নেহা কৌতুকের ছলে জানতে চাইলো, আচ্ছা! তারপর? আবির বললো, নাহ, সিরিয়াসলি, ফাইজলামি না। আমি যদি ওদেরকে আমার পরিচয় দিই, দে উইল ট্রিট মি এজ অ্যা ভিআইপি। স্নেহা আবার কৌতুক ভরা কণ্ঠেই জানতে চাইলো, তারপর? আবির বললো, তারপর আর কী? আই উইল টেল দেম- আই ওয়ানা স্পেন্ড দ্য রেস্ট অফ মাই লাইফ উইদ দিজ লেডি। চলো, আমরা পালিয়ে চলে যাই।
স্নেহা হাসতে হাসতে উত্তর দিলো- হইছে! মাথা খারাপ! এরপর দুইজনই চুপ! পরিবেশটা হঠাৎ ভারি হয়ে উঠতেই তা হালকা করার জন্য স্নেহা বললো, বলবা যখন ভালো দেশের কথাই বলতা! হোয়াই মায়ানমার, ম্যান! পুউর! এসব বলে স্নেহা হাসতেছিল ঠিকই, কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। স্নেহা জানতো, একটু আগের কথাটা বলছে ড্রাঙ্ক আবির। মদের নেশা কেটে গেলেই ওর এসবের কিছুই মনে থাকবে না। যদি মনেও পড়ে, ও এনজাইটি আর গিলটি ফিলিংয়ে বারবার স্নেহাকে টেক্সট করতে থাকবে সর্যি সর্যি লিখে।
আবিরের এই স্বভাব সম্পর্কে স্নেহা এখন মোটামোটি পরিচিত, তাই চেষ্টা করে অধিকাংশ সময় ওর ড্রাঙ্ক অবস্থার কথা ইগনোর করতে। কিন্তু স্নেহাও তো মানুষ, তাও আবার একলা মানুষ, যে কি না জীবনের ৩৮ বছর বয়সে এসে এক ভদ্রলোককে তীব্রভাবে ভালোবাসার পর বুঝতে পারছে- সুফীজমে স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার যে সাতটা স্তর আছে, সেটা শুধু স্রষ্টার প্রতিই না, যেকোনো কিছু তীব্রভাবে ভালোবাসলেই এই স্তরগুলো অনুভব করা যায়।
স্নেহা মাঝে মাঝে আবিরকে মজা করে টেক্সটে লেখে- আই'ম ইন সিক্সথ স্টেজ- জুনুন! এরপরই কিন্তু মউত বা ফানা। যদিও সুফিজমে এই মউতের অর্থ স্রষ্টাকে ভালোবেসে অহং বা নফসের মৃত্যু ঘটিয়ে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়া। কিন্তু স্নেহা মজা করে এই মউতকে বা মৃত্যুকে লিটারেল মিনিংই ইঙ্গিত করে। আবির রিপ্লাই দেয়- আবার বাজে কথা বলতেছো!
রাত সাড়ে দশটা। মাথা থেকে আবির, আবিরের ঘ্রাণ, আবিরের ফ্লাইটে উঠার পর শেষ কথাগুলা-কিছুই যাচ্ছে না। সব ঘুরপাক খাচ্ছে আর অস্থিরতা বেড়েই যাচ্ছে। স্নেহার মনে হচ্ছে, চারপাশের দেয়ালগুলা তাকে চাপ দিতে আসতেছে চারদিক থেকে। ফ্যানটা থেমে আছে, কিন্তু কী যেন ইশারা দিতেছে।
অসম্ভব! এভাবে বাকি রাত এখানে কাটালে জন্মের দিনেই তার মরতে হবে- মাথায় হাত দিয়ে ভাবলো সে। যদিও এটা তার একটা ফ্যান্টাসির অংশ। নবীজীর জন্ম ও মৃত্যু দিন তো একইদিনে। এটা জানার পর থেকে মনে হয় স্নেহার মাথায় এই ফ্যান্টাসি ঢুকছিল। কিন্তু ওই ফ্যান্টাসি এই মুহূর্তে ভালো লাগছে না।
হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতে ব্যাগপ্যাক নিয়ে ছোট্ট মামের বোতলে কিছুটা হুইস্কি পানি দিয়ে মিক্সড করে ঢুকালো। সঙ্গে চার্জার, হাতের সামনে থাকা একটা টি-শার্ট আর জিন্সও নিয়ে ফোনটা অন করলো উবার কল করতে। কোথায় যাবে, এখনো জানে না। তবে কোনোভাবেই এখানে রাতে থাকা পসিবল না। ফোনটা অন করতেই টেলিগ্রামে হার্পপ্রিভিউয়ের নোটিফিকেশনের সাউন্ড। আবিরের টেক্সট। মনে হচ্ছে যেন কামান দাগাচ্ছে কেউ- ঢাই ঢাই ঢাই ঢাই করে ৩৯ টা টেক্সট! স্নেহার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল- ওএমজি! কিন্তু স্নেহা ওই মুহূর্তে টেক্সটগুলোকে ইগনোর করার সিদ্ধান্ত নিলো। সব সময় আবিরের ড্রাঙ্ক হয়ে উল্টাপাল্টা আচরণের পর আবার সোবার অবস্থার এনজাইটিকে সহনশীলতার সঙ্গে নেওয়াটা আবির টেকেন ফর গ্র্যান্টেড হিসেবে নিয়ে নিচ্ছে। দিস ইজ নট গুড এট অল।
স্নেহা কী চায় আবিরের কাছে? ওর সময়-সুযোগ মতো কিছু মুহূর্ত, এইটুকু নিয়েই তো ও সারা জীবন থেকে যেত পাশে। খুব জেনে, বুঝেই এমন সিদ্ধান্তের কথা আবিরকে সে বলেছিল। রাকিন অবশ্য এটাকে বলে পাগলের মতো সিদ্ধান্ত। আবিরের বিষয়ে রাকিনের অন্যান্য কমেন্টের মতো যথারীতি এটাও স্নেহা ইগনোর করে গেছে।
উবারের লোকেশন ঠিক করে ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ড। কিন্তু সেখান থেকে স্নেহা কোথায় যাবে, কিছুই ঠিক করে নাই, কিছু জানেও না। তার সমস্ত কিছু ছেড়েছুড়ে দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করতেছে, সে তার ওই ইচ্ছেকে এখন প্রায়োরিটি দেবে। যে শহরে আবির নাই, সেই শহরে তার এই মুহূর্তে সাফোকেশন হচ্ছে। কিন্তু যে শহরে আবির আছে, সেখানেও যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না, সেটা উচিতও না। তবে স্নেহা বুঝতে পারছিল, এবার হয়তো সত্যিই অনেকদিন আর তাদের দেখা হবে না।
ওই মাসেই প্রথম আবিরের সঙ্গে দেখা করতে রাজশাহী গেল স্নেহা। ডিসেম্বরের ১৫ এর পর ফেব্রুয়ারির ৬- পাক্কা ৫৩ দিন ওদের দেখা হয় নাই। এর সপ্তাহ খানিক আগে হালকা মনোমালিন্য হইছিল, কথাও বন্ধ ছিল ৭ দিন। লং ডিস্টেন্সে এই সমস্যা খুব ন্যাচারাল। অনেকদিন দেখা হচ্ছিল না, কবে আবার দেখা হবে জানাও যাচ্ছিল না, আর নিজে থেকে স্নেহা কখনোই আবিরকে দেখা করার কথা বলে নাই, তাই অল্পতেই তার মেজাজ খিটখিট লাগতেছিল।
কারণে-অকারণে রাগ দেখাচ্ছিল আবিরের উপর। সব ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য একটু কম, এটা স্নেহা বোঝে, কিন্তু অদ্ভুত কোনো একটা কারণে স্নেহার ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য মাঝে মাঝে প্রশংসার দাবিদার। তবে সবারই তো ধৈর্য্যের সীমা থাকে। ওইবার এক কথায় দুই কথায় আবিরও লিখে দিলো- আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর। যদিও এই একই কথা এরপর আবিরকে আরো বহুবার বলতে হইছে স্নেহাকে। শুরুটা হইছিল সেবারই। তারিখটাও মনে আছে স্নেহার। ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫।
এরপর টানা ৭ দিন সব চুপচাপ। স্নেহাও টেক্সট দেয় না। আবিরও দেয় না। তবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্নেহার টেলিগ্রাম স্টোরি দেখতে আবির ভুল করে না। স্নেহার মাঝে মাঝে রাগ উঠে, সে কয়েকবার ফোনটা হাতে নিয়ে লিখতেও চাইছে- আমার সঙ্গে কথা না বললে, আমার স্টোরি দেখতে হয় কেন ঘণ্টায় ঘণ্টায়! কিন্তু রাগ সংবরণ করে।
স্নেহার অহং বোধের কাছে এই রাগ পানি হয়ে যায়। আত্মসম্মান খোঁয়াতে নিজে থেকে সে টেক্সট করবে? মাথা খারাপ!!! আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর বলার পর??? অ-স-ম্ভ-ব! কে জানতো একদিন বাঁচার জন্য আবিরের কাছেই স্নেহার শুধু একটাবার কথা বলার ভিক্ষা হাজারবার চাইতে হবে!
বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে লাইটার-সুঁইয়ের দোস্তি না করাতে পারার ফ্রাস্ট্রেশনে স্নেহা নিজেকেই চিৎকার করে বলে উঠে- ই-উ-জ-লে-স! এরমধ্যে ভিক্ষা চাওয়ার স্মৃতি স্নেহার মনটাকে করলার চেয়েও তিতা করে তুললো। স্নেহা একবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবলো, ধ্যাৎ বাল! হোয়াই আই ইউজ মেটাফোর অফ করলা হেয়্যার! করলা তো আমার প্রিয়।
আবার মাথার মাঝখানটা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে বসে যায়-নিজেকে আসলেই তার একটা পাক্কা ইউজলেস মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। মিষ্টি আছে আরো পাঁচটা, কিন্তু সুঁই-আগুনের দুশমনী জগতের আর সকল দুঃখকেও তিতা বানিয়ে দিচ্ছে চিরতার রসের মতো।
ইয়েস, চিরতার রস ইজ এপ্রোপ্রিয়েট ফর দিজ মেটাফোর। স্নেহা একা একাই কিছুটা উচ্চস্বরেই বলে- আই হেইট চিরতার রস। চিরতার ইংরেজি কী? সে একবার চিন্তা করে বলে- হোয়্যাটএভার। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে গেল স্নেহার। একবার আম্মা ছোটবেলায় চিরতার রসকে আপেলের জুস বলে স্নেহার মুখে জোর করে দিয়ে দিছিলেন, কিন্তু গেলাতে পারেন নাই।
স্নেহার এরপর বহু বছর পর্যন্ত সত্যিকারের আপেল জুসের প্রতি ভীতি ছিল! ছোটবেলায় স্নেহার আরো অনেক ভীতিই ছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর সে নিজের বাইরে একটা শক্ত আবরণ তৈরি করতে পেরেছে বহু বছরে, কিন্তু এই ৪০ বছর বয়সে এসে সেই আবরণ বহুকাল অযতনে থাকা বাড়ির দেয়ালের পলেস্তারের মতো খসে খসে পড়তে দেখতেছে।
স্নেহা আবার ফিরে যায় আগের বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি। আচমকাই সেদিন রাত দশটার কাছাকাছি সময় আবিরের টেক্সট আসে- ওয়ান্না টক? আউট অফ নো হোয়্যার! অবশ্য তার বহু আগেই কিংফিশারে বসে স্নেহার স্টোরিতে দেওয়া হুইস্কির গ্লাসের সঙ্গে বুকোস্কির বিখ্যাত কোট "আই ওয়ান্টেড দ্য হোল ওয়ার্ল্ড অর নাথিং" সিন করে বসে আছে আবির।
কিন্তু আচমকা ওয়ান্না টক লেখা দেখে স্নেহার হার্ট এত জোরে বুক ধুক ধুক শুরু হলো, তাতে ওর মনে হচ্ছিল কিংফিশারের এই হৈ হুল্লোড় আর লাউড মিউজিকে শ'ন মেন্ডেজ আর ক্যামেলা কাবেয়োর "সেনোরিটা"র চেয়েও তার হার্ট বিটের সাউন্ড বেশি ফাস্ট অ্যান্ড লাউড। নিজের উত্তেজনা সংবরণ করে স্নেহা লিখে পাঠালো- হাউ আর ইউ?
৩০ তারিখ থেকে প্রতিটা দিন এই একটা উত্তর জানার জন্য তার প্রাণটা ছটফটাচ্ছিল, কিন্তু নিজের ইগোর কাছে এই ছটফটানিকে সে বেশিক্ষণ টিকতে দেয় নাই। তড়পালে একা তড়পাক, আরেকজনকে কেন সেটা বুঝতে দিতে হবে- নিজেকে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি তার অসংখ্যবার এটা বুঝাতে হইছে। যদিও অস্থিরতায় খুব ঘন ঘন সে স্টোরি দিচ্ছিল আর দেওয়ার পর মুহূর্তেই আবির সেগুলো সিনও করতেছিল।
প্রথম এক দুইদিনের পর রাগটা মরে গিয়ে পানি হয়ে গেল। প্রথম দুইদিন যেমন স্টোরি দেখতেছিল বলে কথা শোনাবে ভাবছিল, এরপর থেকে স্টোরি দেখলে বরং ওর মনে হতো, তবুও তো কোনো না কোনোভাবে কানেক্ট আছে, স্টোরি যেহেতু দেখতেছে, ঠিকই আছে নিশ্চয়! থাকুক, এভাবেই থাকুক। যেমনভাবে ওর ইচ্ছা হয় থাকতে, তবুও থাকুক।
এরমধ্যেও অনেকবার স্নেহার মনে হইছে- আচ্ছা, আবিরের কি তার কথা একবারও মনে পড়ে না? আবির কি তাকে কখনো মিস করে না? এসব কথা সোবার আবিরের মুখ থেকে শোনা আর বাঘের মুখ থেকে শিকার ছাড়িয়ে আনা একই সমান ভেবে- এই ভাবনা মাথা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে সে। কিন্তু অফিসের কাজের বাইরে স্নেহার পুরা জীবনটাই আবির কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে গত দেড় বছরে। নিজের এই অবস্থাকে স্নেহা তুলনা করে জীবনানন্দের বোধ কবিতার ওই লাইনগুলার মতো-
"পথে চ’লে পারে- পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে; মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে, তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে; আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে। আমি থামি-সেও থেমে যায়...।"
আবির আবার লিখে পাঠায়- ইউ ওয়ান্না টক? স্নেহা লেখে, আই'ম ইন কিংফিশার। উইল গো হোম সুন, ক্যান আই নক ইউ লেটার? আবির উত্তর লেখে- গো হোম, ইটস লেইট। বাসায় যেতে যেতে আবির একটা গান পাঠায়। ব্লু টাচ ব্যান্ডের "ছায়া"। অন্য সময় আবির গান পাঠানোর পর সেটা শুনে স্নেহা ফিডব্যাক দেয়।
ওই প্রথম গানের শুরুর দুইটা লাইন শোনার পর স্নেহা চুপচাপ বাসায় ফিরে ফ্রেশ হওয়ার বদলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। সে হালকা ড্রাঙ্ক। বাসায় এসে নক দেবে বলছিল, কিন্তু কী বলে নক দেবে ভেবে পাচ্ছিল না দেখে ইনদালোর "১৯৯৬" গানটা পাঠিয়ে নিজেই গুন গুন করে উঠলো- "তুমি ভালোবেসো, আমার ভালোবাসা, যখন কখনো আমি থাকবো না।"
একটু পর আবিরের রেসপন্স আসলো, নাইস সং। হোম? স্নেহা লিখলো- হুম। একটু পর আবির আবার লিখলো, ক্যান আই ভিডিও কল ইউ, ম্যাডাম? স্নেহা আরও একবার হকচকিয়ে গেল। এ রকম অফার অর রিকোয়েস্ট আবিরের কাছ থেকে একদমই আনএক্সপেক্টেড! স্নেহা শিওর লিখে পাঠিয়ে আবার টাইপ করতে থাকলো- কিন্তু এই কয়দিনে আই'ম গেটিং ওল্ড অ্যান্ড আগলি। টেক্সটটা দেখে আবির লিখলো- কাম অন!
চলবে…