Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: জুনুন

March 15, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

191
View

ফ্লোরে পড়া গ্লাসটা ওঠিয়ে তাতে আরেকটু হুইস্কি ঢেলে নিলো স্নেহা। বিছানায় গিয়ে এমনভাবে বসলো যেন আবির এখনো ওইখানেই শুয়ে আছে। এরমধ্যেই ওর মনে পড়ে গেল সকালে হালকা হুইস্কি খেয়ে ঘুমানোর আগে আবির এখানে শুয়ে ওকে বলতেছিল, গেট অ্যা গুড জব। আমি তোমাকে অনেক উঁচুতে দেখতে চাই। তুমি কি বুঝতে পারতেছো আমি কী বলছি? অ্যান্ড ইটস বোথ ফর আস। নট অনলি ফর ইউ। তুমি বুঝতে পারছো?

স্নেহা আসলে বুঝতে পারে নাই। আবিরের এ রকম অনেক কথাই স্নেহা বুঝতে পারে না। সোবার হওয়ার পর সেসব নিয়ে দুই-একবার কথা বলতে গিয়ে আবিরকে আনকমফোর্ট ফিল করতে দেখায় এখন আর ড্রাঙ্ক আবিরের কথোপকথন নিয়ে সোবার আবিরের সঙ্গে কথা কমই হয় স্নেহার। ও ড্রিঙ্ক করলে অনেক কথাই বলে যেসব স্নেহা অধিকাংশ সময়ই ইগনোর করে। ড্রাঙ্ক আবির অ্যান্ড সোবার আবির আর নট দ্য সেইম পারসন। অদ্ভুত বিষয় হলো, সোবার অবস্থাতে গত দেড় বছরে আবিরের সঙ্গে খুব কম সময়ই কাটানো হইছে স্নেহার।

রাকিন এটাকে বলে বিশাল রেড ফ্ল্যাগ। রাকিন স্নেহাকে নিয়ে ভয়ংকর পজেসিভ। আবিরকে প্রথম থেকেই ও খুব একটা পছন্দ করে না। যদিও স্নেহাকে এই বিষয়ে সিরিয়াসলি ও কিছু বলে না। দুষ্টুমি বা পঁচানোর ছলে নানা কিছু বলার ট্রাই করে। এতে স্নেহার বুঝতে অসুবিধা হয় না- রাকিন এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে নাই। শুধু বেস্ট ফ্রেন্ড আর ২০ বছরের বন্ধুত্বের কারণে হজম করে যাইতেছে।

স্নেহার খুব ইচ্ছা ছিল ওদের দুইজনকে দেখা করানোর। রাকিনের তাতে কোনো সমস্যা ছিল না, সমস্যা সব আবিরের। আর আট-দশজন সিভিলিয়ানের মতো ওর জীবন থাকলে হয়তো এত সমস্যা হতো না। কিংবা কে জানে! স্নেহা আবিরকে বুঝতে চায়; মাঝে মাঝে মনে হয় ও অনেকটুকু বোঝে, মাঝে মাঝে মনে হয়- যতটুকু বোঝে, সবটাই ভুল। এই যেমন ওইদিন দুপুরে ঘুম থেকে উঠে আরেক পেগ হুইস্কি পেটে পড়তেই আবির স্নেহাকে বলতেছিল, বিয়ে করবা? স্নেহা যখন উল্টা জিজ্ঞেস করলো? কী??? কী করবো? আবির বললো, নাহ, কিছু না।

স্নেহার ধারণা আবির এগুলা ওকে পরীক্ষা করতে বলে, কিংবা ও আসলে কখন কী বলে, নিজেও জানে না। এর দুই সপ্তাহ আগে রাজশাহীতে যখন ওর সঙ্গে দেখা করতে গেল স্নেহা, পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে মদে চুর আবির বলতেছিল- চলো আমরা টেকনাফ যাই। স্নেহা বললো, টেকনাফ!!! কেন? আবির বললো- ওইখান থেকে বর্ডার ক্রস করে মায়ানমার চলে যাবো।

স্নেহা কৌতুকের ছলে জানতে চাইলো, আচ্ছা! তারপর? আবির বললো, নাহ, সিরিয়াসলি, ফাইজলামি না। আমি যদি ওদেরকে আমার পরিচয় দিই, দে উইল ট্রিট মি এজ অ্যা ভিআইপি। স্নেহা আবার কৌতুক ভরা কণ্ঠেই জানতে চাইলো, তারপর? আবির বললো, তারপর আর কী? আই উইল টেল দেম- আই ওয়ানা স্পেন্ড দ্য রেস্ট অফ মাই লাইফ উইদ দিজ লেডি। চলো, আমরা পালিয়ে মায়ানমার চলে যাই।

স্নেহা হাসতে হাসতে উত্তর দিছিল- হইছে! মাথা খারাপ! এরপর দুইজনই চুপ! পরিবেশটা হঠাৎ ভারি হয়ে ওঠতেই হালকা করার জন্য স্নেহা বলছিল- বলবা যখন ভালো দেশের কথাই বলতা! হোয়াই মায়ানমার, ম্যান! পুউর! এসব বলে স্নেহা হাসতেছিল ঠিকই, কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। স্নেহা জানতো, ওই কথাটা বলছে ড্রাঙ্ক আবির। মদের নেশা কেটে গেলেই ওর এসবের কিছুই মনে থাকবে না। যদি মনেও পড়ে, ও অ্যাংজাইটি আর গিলটি ফিলিংয়ে বারবার স্নেহাকে টেক্সট করতে থাকবে সর‍্যি সর‍্যি লিখে।

আবিরের এই স্বভাব সম্পর্কে স্নেহা এখন মোটামোটি পরিচিত। তাই ও চেষ্টা করে অধিকাংশ সময় আবিরের ড্রাঙ্ক অবস্থার কথা ইগনোর করতে। কিন্তু স্নেহাও তো মানুষ, তাও আবার একলা মানুষ! যে কি না জীবনের ৩৮ বছর বয়সে এসে এক ভদ্রলোককে তীব্রভাবে ভালোবাসার পর বুঝতে পারছে- সুফীজমে স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসার যে সাতটা স্তর আছে, ওইটা শুধু স্রষ্টার প্রতিই না, যেকোনো কিছু তীব্রভাবে ভালোবাসলেই ওই স্তরগুলা অনুভব করা যায়। জীবনের এতগুলা বছর পার করার পর স্নেহা ওই প্রথম ওই স্তরগুলা ফিল করতে পারতেছিল!

ও মাঝে মাঝে আবিরকে মজা করে টেক্সটে লিখতো- আই'ম ইন সিক্সথ স্টেজ- জুনুন! এরপরই কিন্তু মউত বা ফানা। যদিও সুফিজমে এই মউতের অর্থ স্রষ্টাকে ভালোবেসে অহং বা নফসের মৃত্যু ঘটিয়ে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন হয়ে যাওয়া, কিন্তু স্নেহা মজা করে এই মউতকে বা মৃত্যুকে লিটারেল মিনিংই ইঙ্গিত করতো। স্নেহার ওইসব টেক্সটের রিপ্লাইয়ে আবির লিখতো- আবার বাজে কথা বলতেছো!

রাত সাড়ে দশটা। মাথা থেকে আবির; আবিরের ঘ্রাণ, আবিরের ফ্লাইটে ওঠার পর শেষ কথাগুলা-কিছুই সরতেছিল না। সব মাথার ভেতর ঘুরপাক খাইতেছে আর ক্রমশ স্নেহার অস্থিরতা বেড়েই যাইতেছিল। ওর মনে হচ্ছিল- চারপাশের দেয়ালগুলা ওকে চারদিক থেকে চাপ দিতে আসতেছে।

ফ্যানটা থেমে আছে, কিন্তু কী যেন ইশারা দিতেছে। অসম্ভব! এভাবে বাকি রাত ওইখানে কাটালে জন্মের দিনই ওর মরতে হবে- মাথায় হাত দিয়ে ও ভাবলো। যদিও এটা ওর একটা ফ্যান্টাসির অংশ। নবীজীর জন্ম ও মৃত্যু দিন একইদিনে- এটা জানার পর থেকে মনে হয় স্নেহার মাথায় ওই ফ্যান্টাসি ঢুকছিল। কিন্তু ওই ফ্যান্টাসি ওই মুহূর্তে ওর ভালো লাগলো না।

ছোট্ট মামের বোতলে কিছুটা হুইস্কি পানি দিয়ে মিক্সড করে হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতেই ব্যাগপ্যাকে ঢুকালো, সঙ্গে চার্জার। হাতের সামনে থাকা একটা টি-শার্ট আর জিন্সও নিয়ে ফোনটা অন করলো উবার কল করতে। কোথায় যাবে, তখননো জানে না ও। তবে কোনোভাবেই ওইখানে রাতে থাকা পসিবল না, এইটুকু ও বুঝতেছিল। ফোনটা অন করতেই টেলিগ্রামে হার্পপ্রিভিউয়ের নোটিফিকেশনের সাউন্ড আসা শুরু হলো ক্রমাগত।

আবিরের টেক্সট। মনে হইতেছিল কেউ কামান দাগাচ্ছে- ঢাই ঢাই ঢাই ঢাই করে ৩৯ টা টেক্সট! স্নেহার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল- ওএমজি! কিন্তু ওই মুহূর্তে ও টেক্সটগুলাকে ইগনোর করার সিদ্ধান্ত নিলো। সব সময় আবিরের ড্রাঙ্ক হয়ে উল্টাপাল্টা আচরণের পর আবার সোবার অবস্থার অ্যাংজাইটিকে সহনশীলতার সঙ্গে নেওয়াটা ও টেকেন ফর গ্র‍্যান্টেড হিসেবে নিয়ে নিতেছে। দিস ইজ নট গুড এট অল- স্নেহা ভাবে।

স্নেহা কী চায় আবিরের কাছে? ওর সময়-সুযোগ মতো কিছু মুহূর্ত, এইটুকু নিয়েই তো ও বাকিটা জীবন থেকে যেত পাশে। খুব জেনে, বুঝেই এমন সিদ্ধান্তের কথা আবিরকে ও বলছিল। রাকিন অবশ্য এটাকে বলে পাগলের মতো সিদ্ধান্ত। আবিরের বিষয়ে রাকিনের অন্যান্য মন্তব্যর মতো ওইটাও যথারীতি স্নেহা ইগনোর করে গেছে। 

উবারের লোকেশন ঠিক করলো ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ড। ওইখান থেকে কোথায় যাবে, কিছুই ঠিক করে না, কিছু জানেও না স্নেহা। ওর সমস্ত কিছু ছেড়েছুড়ে দূরে চলে যেতে ইচ্ছা করতেছে। ও ওর ওই ইচ্ছাটাকেই তখন প্রায়োরিটি দেবে বলে ভেবে নেয়। যে শহরে আবির নাই, সেই শহরে ওর ওই মুহূর্তে সাফোকেশন হইতেছিল। কিন্তু যে শহরে আবির আছে, সেখানে যাওয়াও ওর পক্ষে সম্ভব না, উচিতও না। তবে স্নেহা বুঝতে পারতেছিল, সত্যিই হয়তো ওদের অনেকদিন দেখা হবে না এবার।

ওই মাসেই প্রথম আবিরের সঙ্গে দেখা করতে রাজশাহী যায় স্নেহা। ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের পর ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ- পাক্কা ৫৩ দিন একে অপরের মুখটা দেখে নাই ওরা। এর সপ্তাহ খানিক আগে হালকা মনোমালিন্য হইছিল। কথা বলাও বন্ধ ছিল ৭ দিন। লং ডিস্টেন্সে এই সমস্যা খুব ন্যাচারাল। অনেকদিন দেখা হইতেছিল না, কবে আবার দেখা হবে জানাও যাইতেছিল না। নিজে থেকে স্নেহা কখনোই আবিরকে দেখা করার কথা বলে নাই এর আগে বা ওই সময় পর্যন্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন না দেখা হওয়ায় ওর মেজাজও খিটখিট হইতেছিল। কারণে-অকারণে ও আবিরের উপর রাগ দেখানো শুরু করলো ওই সময়।

সব ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য একটু কম, এটা স্নেহা বুঝতো আবিরের নানা আচরণে। কিন্তু অদ্ভুত কোনো একটা কারণে, স্নেহার ব্যাপারে আবিরের ধৈর্য্য মাঝে মাঝে প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু সবারই তো ধৈর্য্যের সীমা থাকে। ওইবার এক কথায় দুই কথায় আবির স্নেহাকে হঠাৎ লিখে বসলো- আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর। যদিও এই একই কথা এরপর আবিরকে আরো বহুবার বলতে হইছে স্নেহাকে। শুরুটা হইছিল ওইবারই। তারিখটাও মনে আছে স্নেহার- ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫!

এরপর টানা ৭ দিন সব চুপচাপ। স্নেহাও টেক্সট দেয় না। আবিরও দেয় না। তবে ঘণ্টায় ঘণ্টায় স্নেহার টেলিগ্রাম স্টোরি দেখতে আবির ভুল করে না। স্নেহার মাঝে মাঝে রাগ ওঠে। কয়েকবার ও ফোনটা হাতে নিয়ে লিখতেও চায়- কথা না বললে স্টোরি দেখতে হয় কেন ঘণ্টায় ঘণ্টায়? কিন্তু ও রাগ সংবরণ করে। ওর অহং বোধের কাছে ওই রাগ পানি হয়ে যায়। আত্মসম্মান খোঁয়াতে নিজে থেকে ও টেক্সট করবে? মাথা খারাপ!!! আই কান্ট টেক দিজ এনিমোর বলার পর??? অ-স-ম্ভ-ব! আবিরকে কখনোই স্নেহা নিজে থেকে টেক্সট করতো না প্রথম থেকেই। কে জানতো- একদিন বেঁচে থাকার জন্য আবিরের কাছেই ওর শুধু একটাবার কথা বলার ভিক্ষা চাইতে হবে কয়েকশতবার, নানা মাধ্যমে!

বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে লাইটার-সুঁইয়ের দোস্তি না করাতে পারার ফ্রাস্ট্রেশনে স্নেহা নিজেকেই চিৎকার করে বলে ওঠে- ই-উ-জ-লে-স! এরমধ্যে ভিক্ষা চাওয়ার স্মৃতি ওর মনটাকে করলার চেয়েও তিতা করে তুললো। ও একবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবলো- ধ্যাৎ বাল! হোয়াই আই ইউজ মেটাফোর অফ করলা হেয়্যার! করলা তো আমার প্রিয়! আবার মাথার মাঝখানটা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে বসে যায়- নিজেকে আসলেই ওর একটা পাক্কা ইউজলেস মনে হয় ওই মুহূর্তে।

মিষ্টি আছে আরো পাঁচটা, কিন্তু সুঁই-আগুনের দুশমনী জগতের আর সকল দুঃখকেও তিতা বানিয়ে দিতেছে চিরতার রসের মতো। ইয়েস, চিরতার রস ইজ এপ্রোপ্রিয়েট ফর দিজ মেটাফোর। স্নেহা একা একাই কিছুটা উচ্চস্বরেই বলে- আই হেইট চিরতার রস। চিরতার ইংরেজি কী? ও একবার চিন্তা করে বলে- হোয়্যাটএভার! ওর ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। একবার আম্মা জোর করে ওর মুখে আপেলের জুস বলে চিরতার রস দিয়ে দিছিলেন, যদিও গেলাতে পারেন নাই। স্নেহা ইয়াআআআক থুউউউউউউ বলে মুখের লালা-টালাসহ বের করে দিছিল।

এরপর বহু বছর পর্যন্ত সত্যিকারের আপেল জুসের প্রতিও ওর ভীতি তৈরি হইছিল! ছোটবেলায় স্নেহার আরো অনেককিছুতেই ভীতি ছিল। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর বহু বছরের চেষ্টায় ও নিজের একটা শক্ত আবরণ তৈরি করতে পারছিল। কিন্তু এই ৪০ বছর বয়সে এসে ওই আবরণকে বহুকাল অযতনে থাকা বাড়ির দেয়ালের পলেস্তারের মতো ও খসে খসে পড়তে দেখতেছে।

স্নেহা আবার ফিরে যায় আগের বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি। আচমকাই ওই রাতে দশটার কাছাকাছি সময় ওর টেলিগ্রামে আবিরের টেক্সট আসে- ওয়ান্না টক? আউট অফ নো হোয়্যার! অবশ্য এর ঘণ্টা খানিক আগেই স্নেহার স্টোরিতে দেওয়া হুইস্কির গ্লাসের সঙ্গে বুকোস্কির বিখ্যাত কোট "আই ওয়ান্টেড দ্য হোল ওয়ার্ল্ড অর নাথিং" সিন করে বসে ছিল ও। কিন্তু আচমকা ‘ওয়ান্না টক’ লেখা টেক্সট দেখে স্নেহার বুক এত জোরে ধুক ধুক শুরু করে যে ওর মনে হইতেছিল কিংফিশারের হৈ হুল্লোড় আর লাউড মিউজিকে শ'ন মেন্ডেজ-ক্যামেলা কাবেয়োর "সেনোরিটা"র চেয়েও ওর হার্ট বিটের সাউন্ড বেশি ফাস্ট অ্যান্ড লাউড। ওইখানে থাকা সবাই ওর হার্ট বিটের সাউন্ড শুনতে পারতেছিল বলে ওর মনে হইতেছিল। নিজের ওই অহেতুক ভাবনায় কিছুটা লজ্জাও পেল ও। উত্তেজনা সংবরণ করে ও টেক্সট ব্যাক করলো- হাউ আর ইউ?

৩০ তারিখ থেকে প্রতিটা দিন ওই একটা কথা জানার জন্য স্নেহার প্রাণটা ছটফটাচ্ছিল, কিন্তু নিজের ইগোর কাছে এই ছটফটানিকে ও বেশিক্ষণ টিকতে দেয় নাই। তড়পালে একা তড়পাক, আরেকজনকে কেন সেটা বুঝতে দিতে হবে- প্রতিদিন সকাল থেকে রাত অব্দি অসংখ্যবার নিজেকে ওর এটা বুঝাতে হইছে ওই কয়দিন। যদিও অস্থিরতায় খুব ঘন ঘন ও টেলিগ্রামে স্টোরি দিতেছিল। ওর স্টোরি দেওয়ার পর মুহূর্তে আবির আবার ওইগুলা সিনও করতেছিল।

প্রথম এক দুইদিনের পর স্নেহার রাগটা মরে গিয়ে পানি হয়ে যায়। প্রথম দুইদিন যেমন স্টোরি দেখতেছিল বলে আবিরকে ও কথা শোনাবে ভাবছিল, এরপর থেকে স্টোরি দেখলে বরং ওর মনে হতো- তবুও তো কোনো না কোনোভাবে কানেক্ট আছে। স্টোরি যেহেতু দেখতেছে, ঠিকই আছে নিশ্চয়! থাকুক, এভাবেই থাকুক। যেমনভাবে ওর ইচ্ছা হয় থাকতে, তবুও থাকুক, থেকে যাক।

এরমধ্যেও অনেকবার স্নেহার মনে হইছে- আচ্ছা, আবিরের কি ওর কথা একবারও মনে পড়ে না? আবির কি ওকে কখনো মিস করে না? এসব কথা সোবার আবিরের মুখ থেকে শোনা আর বাঘের মুখ থেকে শিকার ছাড়িয়ে আনা একই সমান ভেবে, এই ভাবনা মাথা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করে ও। কিন্তু অফিসের কাজের বাইরে স্নেহার পুরা জীবনটাই আবির কেন্দ্রিক হয়ে ওঠে গত দেড় বছরে। নিজের এই অবস্থাকে স্নেহা তুলনা করে জীবনানন্দের বোধ কবিতার ওই লাইনগুলার মতো-

পথে চ’লে পারে- পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে; মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে, তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি-সেও থেমে যায়...

আবির আবার লিখে পাঠায়- ইউ ওয়ান্না টক? স্নেহা লেখে- আই'ম ইন কিংফিশার, উইল গো হোম সুন। ক্যান আই নক ইউ লেটার? আবির উত্তর লেখে- গো হোম, ইটস লেইট। বাসায় যাওয়ার পথে আবিরের পাঠানো স্পটিফাইয়ের একটা গানের লিংক পায় ও। ব্লু টাচ ব্যান্ডের “ছায়া”। অন্য সময় আবির গান পাঠানোর পর শুনে স্নেহা ফিডব্যাক দেয়। ওই প্রথম গানের শুরুর দুইটা লাইন শোনার পর চুপচাপ বাসায় ফিরে ফ্রেশ হওয়ার বদলে বিছানায় গিয়ে ও শুয়ে পড়ে।

ওই রাতে স্নেহা বেশ ভালোই ড্রাঙ্ক ছিল। বাসায় এসে আবিরকে নক দেবে বললেও কী বলে নক দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। যেহেতু আবির ওকে একটা গান পাঠাইছে, স্নেহাও তাই একটা গান পাঠাবে বলেই ঠিক করে। কিছুক্ষণ ভেবে ও ইনদালোর "১৯৯৬" গানটা আবিরকে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেও গুন গুন করে গায়- "তুমি ভালোবেসো, আমার ভালোবাসা, যখন কখনো আমি থাকবো না।"

একটু পর আবিরের রেসপন্স আসে- নাইস সং। হোম? স্নেহা লেখে- হুম। আবির হঠাৎই লেখে- ক্যান আই ভিডিও কল ইউ, ম্যাডাম? স্নেহা আরও একবার হকচকিয়ে যায়। এ রকম এপ্রোচ কিংবা রিকোয়েস্ট আবিরের কাছ থেকে একদমই আনএক্সপেক্টেড! স্নেহা ‘শিওর’ লিখে পাঠিয়ে আবার টেক্সট করে- বাট আই'ম গেটিং ওল্ড অ্যান্ড আগলি দিজ ডেইজ। টেক্সটটা দেখে আবির লেখে- কাম অন!

চেজিং দ্য ড্রাগন: সংগত কারণে

Comments

    Please login to post comment. Login