বন্যার রাতে যে আলো জ্বলেছিল” (বড় আকার)
বাংলাদেশের একটি ছোট গ্রাম। চারপাশ সবুজ ধানক্ষেত আর সরু মাটির রাস্তা। গ্রামের নাম ছিল নাজিরপুর। এখানেই থাকত রাশেদ, ১৪ বছরের একটি সাধারণ ছেলে। তার পরিবার খুব সাধারণ—বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। রাশেদের ছিল বড় স্বপ্ন। সে চাইত পড়াশোনা করে বড় মানুষ হবে, কেউ তার গ্রামের মতো ছোট জায়গার মানুষকে অবহেলা না করতে পারবে। প্রতিদিন স্কুল যাওয়ার আগে রাশেদ বাবার সঙ্গে একটু কাজ করত—ধান কাটতে, গরু নিয়ে মাঠে যেতে। তারপর ছেঁড়া ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দৌড়ে স্কুলে যেত। শিক্ষকরা তাকে ভালোবাসতেন, কারণ সে মন দিয়ে পড়াশোনা করত।
এক বছর বর্ষাকালে বৃষ্টি থামছেই চাইছিল না। কয়েকদিন টানা বর্ষণ। খাল উপচে পানি উঠতে শুরু করল। গ্রামের মানুষ ভয় পেতে লাগল। বৃদ্ধেরা বলল, “এবার হয়তো বড় বন্যা হবে। সবাই সাবধান হও।”
এক রাতে হঠাৎ গ্রামের মাইক থেকে ঘোষণা এল—
“সতর্ক থাকুন। পানি বাড়ছে। প্রয়োজন হলে উঁচু জায়গায় চলে যান।”
রাশেদ তখন বই পড়ছিল। মা তাড়াতাড়ি এসে বললেন,
— “বাবা, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখো। মনে হয় আমাদের যেতে হবে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই পানি বাড়তে লাগল। প্রথমে উঠোন ভিজল, তারপর ঘরের ভিতর। ঠান্ডা পানি পায়ে লাগতেই রাশেদের বুক ধকধক করতে লাগল। বাবা বললেন,
— “চলো, স্কুল ভবনে আশ্রয় নিতে হবে।”
রাতের অন্ধকার, চারদিকে শুধু পানি আর মানুষের চিৎকার। কেউ শিশু কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে, কেউ গরু ছেড়ে দিয়ে কাঁদছে। বিদ্যুৎও নেই, শুধুই মাঝে মাঝে ঝলমল আলো দেখা যাচ্ছে। রাশেদ মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ছিল। মনে হচ্ছিল—সবকিছু শেষ হয়ে যাবে না তো?
স্কুল ভবনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ভোর হয়ে গেল। সেখানে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। কেউ ভিজে কাপড়ে কাঁপছে, কেউ ক্ষুধায় কাঁদছে। দুই দিন এভাবেই কাটল। রাশেদের ছোট বোন জ্বরে পড়ল। মা খুব চিন্তায় পড়লেন। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই।
ঠিক তখনই রাশেদ সিদ্ধান্ত নিল। সে বাবাকে বলল—
— “আমি নৌকা নিয়ে বাজার পর্যন্ত যাব। শুনেছি সেখানে ত্রাণ দিচ্ছে।”
বাবা ভয় দেখালেন—“না, পানি খুব বেশি। স্রোত আছে।”
কিন্তু রাশেদ জেদ করল—“যদি আমি না যাই, বোনটা অসুস্থই থাকবে।”
শেষে গ্রামের এক কাকা তাকে ছোট নৌকা দিলেন।
সকালবেলা আকাশ মেঘলা। ঝড়, ভাসমান debris—গাছের ডাল, টিন, এমনকি মরা গরু। নৌকা বারবার দুলছিল। একবার মনে হল উল্টে যাবে। হাত কাঁপছিল, বুক কেঁপে উঠছিল, কিন্তু সে থামেনি।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর বাজারে পৌঁছাল। সেখানে সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবকরা ত্রাণ দিচ্ছিল। রাশেদ লাইনে দাঁড়াল। আগে অনেক বড় মানুষ ছিল। কেউ কেউ তাকে সরিয়ে দিতে চাইল। ঠিক তখন একজন স্বেচ্ছাসেবক বললেন—
— “ছেলেটাকে আগে দাও। ও একা এত দূর এসেছে।”
রাশেদ পেল চাল, শুকনা খাবার, কিছু ওষুধ। ফিরে আসার সময় আকাশ আরও কালো হয়ে গেল, ঝড় শুরু। ঢেউ উঠতে লাগল। একবার মনে হল নৌকা উল্টে যাবে। কিন্তু সে হাল ছাড়েনি।
বিকেলে স্কুল ভবনে ফিরে এলো। মা তাকে দেখে কাঁদতে লাগলেন। বোন খুশিতে হাসল। রাশেদ আর তার বন্ধুরা মিলে গ্রামের মানুষকে সাহায্য করতে লাগল—ঘর পরিষ্কার করা, খাবার ভাগ করা।
কয়েকদিন পর পানি নামতে শুরু করল। গ্রামের মানুষ ঘরে ফিরল, কিন্তু অনেকের ঘর ভেঙে গেছে, ফসল নষ্ট হয়েছে।
স্কুলে পরে রাশেদকে সম্মাননা দেওয়া হলো। শিক্ষক বললেন—
— “সাহস মানে শুধু শক্তি নয়, অন্যের জন্য নিজের ভয়কে জয় করা।”
রাশেদ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। বলল—“আমি তো শুধু আমার পরিবারের জন্যই গিয়েছিলাম।”
কিন্তু আসলে সেই দিন সে শুধু নিজের পরিবার নয়—পুরো গ্রামের জন্য আলো জ্বালিয়েছিল।
বছর কয়েক পর রাশেদ পড়াশোনা করে বড় হল। সে সিদ্ধান্ত নিল—এমন কাজ করবে যাতে বিপদের সময় মানুষকে সাহায্য করতে পারে। কারণ সে জানল—বন্যার সেই অন্ধকার রাতে ছোট একটি সাহসও অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ।
19
View