Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: সঙ্গত কারণে

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

384
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

আবির ভিডিও কল দিতেই উঠে রুমের লাইট জ্বালায় স্নেহা। একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় আবিরকে দেখলো ও। বুকের ভেতরে তখন টর্নেডো বয়ে যাইতেছিল, কিন্তু নিজেকে নরমাল দেখাতে খুব সংযত হয়ে একটা হাসি দিয়ে বলে- ইট হ্যাজ বিন ফিফটি থ্রি ডেইজ আই হ্যাভেন্ট সিন ইউ! ওহ মাই গড! আবির কিছুটা লজ্জা পেয়েই উত্তর দেয়- দ্যাটস ভেরি উইয়ার্ড! এমব্যারাসিং টু! ইউ শুডেন্ট কাউন্ট ডেইজ লাইক দ্যাট। স্নেহাও লজ্জা পেয়েই কাউন্টার দেওয়ার ট্রাই করে- আই ডোন্ট ডু দিজ ডেলিবরেটলি, ট্রাস্ট মি! আই জাস্ট কান্ট ফরগেট ফিউ থিংগস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। তোমার সঙ্গে লাস্ট দেখা হইছে ১৫ ডিসেম্বর। এটা আমি ইচ্ছে করে মনে রাখি নাই, মনে থেকে গেছে। আজকে কয় তারিখ? ৬ পার হয়ে সাতে পড়বে। দ্যাট মিন্স ফিফটি থ্রি ডেইজ। অংকে আই ওয়াজ সো উইক, বাট এটা না চাইলেও মনে আছে, কী করার! 

আবির মুচকি হাসে! ওই হাসিতেই স্নেহা ৭ দিনের চার্জ সব একবারে পেয়ে যায় যেন। ইট ফিলস লাইক অ্যা সোর্স অব পাওয়ার হাউজ! আবিরের হাসি যে ও কী প্রচণ্ড ভালোবাসে! এই কথা ও ওদের দেখা হওয়ার প্রথম অথবা দ্বিতীয় দিন থেকেই বলে আসতেছে। যদিও আবির খুবই কম হাসে, কিন্তু যখনই হাসে, একটা জেনুইন ইনোসেন্ট মানুষের হাসির প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায় সেখানে। ওকে ভালো লাগার আরেকটা কারণ বোধহয় ওর হাসি, ভিডিও কলে ওর হাসির দিকে তাকিয়েই স্নেহা ভাবতে থাকে। কথা বলতে বলতে আবির ওর আরেকটা ফোনে ব্লু টাচের ‘ছায়া’ গানটা প্লে করে। নিজেও এরপর গলা মেলানো শুরু করে। আস্তে আস্তে গুন গুন করে প্রথমে গায়- "সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি, তোমার প্রশ্নের প্রতি উত্তরে কিছু লিখতে পারিনি।" এরপর "চাঁদ কিংবা তোমার আলো আমার বড্ড লাগে চোখে, মৃত্যুর কফিন আমার মুড়ে দিয়েছি তোমার আড়ালে" লাইনটা গাইতে গিয়ে হঠাৎই ও চোখ ঢেকে কান্না শুরু করে।

এই দৃশ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্নেহা। আবির হাউ মাউ করে কাঁদতেছে। ওই দৃশ্য দেখে বুকটা ব্যথায় মুচড়ে গেলেও থামানোর চেষ্টা করলো না ও। মাঝে মাঝে কান্না মানুষকে রিলিফ দেয়। কোনো কারণে হয়তো ওর কান্না পাচ্ছে, কাঁদুক, কেঁদে হালকা হোক- স্নেহা ভাবে। কিন্তু ওই কান্না ওর বুকের ভেতরটা তছনছ করে ফেলতেছিল। বেশিক্ষণ এভাবে কাঁদতে দেখা ওর পক্ষে সম্ভব হলো না। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে গিয়ে ওর চোখ থেকেও যেন তখন কোনো অবস্থাতেই পানি না পড়ে, নিজেকে সংযত আর সতর্ক করে স্নেহা। ওর আব্বা বলতো- কোনো সিচ্যুয়েশনে দুইজন মানুষের একসঙ্গে ভার্নারেবল হওয়া ঠিক না। একজন দুর্বল হলে, আরেকজনের যত কষ্টই হোক, নিজেকে সংবরণ করা লাগে। ও ওই চেষ্টাটাই করতেছিল তখন।

আবির কাঁদতেছে, কেঁদেই যাইতেছে। ওর হাসি যেমন একটা নিষ্পাপ শিশুর মতো সরল, কান্নাটাও ঠিক একই রকম। স্নেহা কিছু একটা টের পায়, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না। গানের লিরিক, কান্না- এইসব ডট মিলিয়ে অনেককিছুর মিনিং দাঁড় করানো যায় চাইলে, কিন্তু ওর তা করতে ইচ্ছা করে না তখন। তবে ও খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারতেছিল, আবির কিছু একটা বলার চেষ্টা করেও কোনো এক কারণে এই কান্নার মাধ্যমে তা ডিলে করে দিলো। স্নেহা আর কান্না সহ্য না করতে পেরে বলে উঠে- হইছে তো, থামো। হইছে। আর কাঁদে না। কী হইছে? এভাবে কাঁদতেছো কেন? বলো…কিছু হইছে? আমি কষ্ট পাচ্ছি। থামো। অনেক কাঁদছো।

আবির থামে। মাথা নাড়িয়ে কিছু হয় নাই ইশারা দিয়ে বলে- অনেকদিন পর তোমার ফেসটা দেখে আই কুডেন্ট কন্ট্রোল; আই'ম সর‍্যি। কিন্তু এরপর আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্নেহার ভেতরে তখন অনেক হিসাব-নিকাশ খাতা নিয়ে বসে পড়ছে। অংক মিলুক বা না মিলুক, ও জানে- আজ অথবা কাল, আবিরের জীবন থেকে ওকে চলে যেতেই হবে; এইসব ঘটনাবলী ওই অন্তিম সময়ের আগে ঘটা ছোট ছোট ট্র্যাজিডি! আচমকাই আবির কোনো উইয়ার্ড আচরণ করলে স্নেহা উপরে শান্ত ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে ওকে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকতো। আবিরের কান্নার দৃশ্য আর সম্ভাব্য বিদায়প্রস্তুতির কথা ভাবতেই ওর ফিল হয়- ওর বুকের উপর কেউ একটা ভয়ংকর ভারি পাথর ফেলে চাপ দিয়ে ধরে রাখছে। 

ওই বিরতিহীন কান্না দেখে স্নেহা আবারও বলে- আবির; এদিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও। কী হইছে? ইউ ওয়ানা সে সামথিং? বলো, কী হইছে? বলো তো। এমন করে না, প্লিজ। কান্না থামাও। আবির নিজেকে সামলানোর চেষ্টা উত্তর দেয়- আই'ম সর‍্যি। স্নেহা হাসার চেষ্টা করে জানতে চায়- সর‍্যি কেন, বাবা?  আবির কাঁদতে কাঁদতেই বলতে থাকে- আফটার মাই মম, প্রোবাবলি ইউ লাভ মি মোস্ট। বাট আই কান্ট রেসিপ্রোকেট। এই কথা বলার পরই আবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। স্নেহা কী বলবে বুঝতে পারে না। আবির অনেক বড় একটা কথা বলে ফেলছে ওকে। নিজেও ওই কথার মর্মার্থ ও জানে কি না, স্নেহার সন্দেহ হয়। ও কি ড্রাঙ্ক? কিন্তু দেখে তো সেটা ওর মনে হয় না। তাহলে?

সোবার অবস্থায় আবির এসব বলতেছে মানে তো সত্যি সত্যিই ও যা ফিল করতেছে, তা-ই বলতেছে- স্নেহা ভাবে। যদিও ও আগে মনে করতো, মানুষ ড্রাঙ্ক হলেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি সত্যি কথা বলে। যদিও আবির ওর অনেক হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে দিছে গত দুই বছরে। তবে স্নেহা এটাও বোঝে- কিছু কিছু বিষয়ে ও ভুল না; বরং আবির নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বাস্তবতা আর পারিপার্শ্বিকতার কারণে সত্য বলে যা যা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে- ওইগুলাই বরং অনেকাংশে ভুল, পুরাপুরি সঠিক না।

ওর খুব মায়া হয় আবিরের জন্যে। একটা লোক কেঁদে ওকে ভালোবাসতে না পারার অসহায়ত্ব জানাইতেছে। ভালোবাসতে না পারা আর ভালো না বাসা- এই দুইয়ের মধ্যে তো পার্থক্য আছে! স্নেহা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবে। ওই যে ব্লু টাচের গানটা, ওইটা তো একটা ভুল কনসেপ্ট! ওইটা তো ঠিক বার্তা দিতেছে না। ওইখানে বলতেছে- সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি। ‘আর’ শব্দটা তো সমস্যাদায়ক এখানে। মানে কী? আগে বাসছিলা, এরপর সেটা বাদ দিছো? দিতে বাধ্য হইছো, নাকি ওই অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে গেছে? বিষয়টা তো ক্লিয়ার হয় না এইখানে।

হয় ভালোবাসো, নয় বাসো না বা কখনোই বাসো নাই। ‘আর’ পারিনি দিয়ে কী বুঝানোর চেষ্টা হলো? নিজের অপারগতা? কিন্তু অপারগ হওয়ার কারণ না বলে স্কুলের নোটিশ বোর্ডের মতো টাঙিয়ে দেওয়া হলো- অনিবার্য কারণবশত আজকের সকল ক্লাস স্থগিত করা হয়েছে! হয়েছে, ভালো কথা, কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কারণটা জানিয়ে হওয়া উচিত ছিল না, বা কারণটা জানতে পারলে ভালো হতো না? সবারই তো জানার অধিকার আছে! এরচেয়ে বড় কথা- ভালোবাসছিলা কোনো এক সময়, কোনো এক মুহূর্তের জন্য হলেও, গুপ্ত কর্মসূচির মতো ভিন্ন ভিন্ন সিগনাল দিয়ে সেটা বোঝালে তো সবার পক্ষে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা সম্ভব না। সবকিছু কেমন আবছা, স্পষ্টতা নাই। কেমন এক রহস্যে ঘেরা যেন!

স্নেহা শুধু পারে চোখ দেখে কিছু কিছু বুঝে নিতে, সেটা তো ও বহু আগেই বুঝে নিছিল। কিন্তু প্রতিবারই কাছে এসে সুন্দর সময় কাটিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে আবিরকে কেন ওইসব মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টায় নানা আবোল-তাবোল ব্যবহার করতে হইছে? কেন প্রতিবার চলে যাওয়ার আগে ওকে একটা গিলটি ফিলিং স্নেহার মধ্যে ট্রান্সফার করার ইফোর্ট দিতে হইছে? কোন অপরাধ বোধে? কোন নৈতিকতার দোহাইয়ে? স্নেহা এতে কষ্ট পায়, ওর এতে যন্ত্রণা হয় জানার পরও দিনের পর দিন আবির এটা করে গেছে। এর সিকিভাগ ইফোর্টটাও যদি ও এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে নিজেও স্বাভাবিক থাকার পেছনে দিতো, অনেক সমস্যা হয়তো বড়ই হতো না বলে স্নেহার এখনো মনে হয়। এর মানে এই না সমস্যা শুধু আবির একাই সৃষ্টি করছে আর স্নেহা অবলা নারী হিসেবে শুধু যন্ত্রণাই পেয়ে গেছে! ও জানে, স্বীকারও করে- আবিরের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা ও জীবনেও কাউকে দেয় নাই। ওর চেয়ে বেশি ভালোও তো কাউকে বাসে নাই।

ব্লু টাচের গানের ওই লাইন দুইটা খুব বিশ্রীভাবে ওকে বদার করতেছিল। আবারও ও ভাবা শুরু করে- হয় তোমাকে কখনো আমি ভালোই বাসি নাই, বা সচেতনভাবে ভালোবাসতে চাই-ই নাই। পারি নাই আবার কী? বাসছো কিন্তু চাও নাই? নাকি চাইছো কিন্তু বাসতে পারো নাই? এত কনফিউজিং মানুষের ভাবনা আর সম্পর্ক! ওই রাতে ৪৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিও কলে প্রায় ৩১ মিনিটই আবির একটু পরপর কেঁদেই গেছে। কিন্তু ও আসলে স্নেহাকে যা বলতে চাইছিল, ওইটাই ওর বলা হয় নাই, বা ও বলতে পারে নাই। সঠিক সময়ে আবিরের স্পষ্ট ভাষায় যা যা বলা দরকার, তা ও কখনোই বলতে পারে নাই, পারে না, সম্ভবত পারবেও না কখনো। আবার যখন যেটা বলার না, যে সময়ে যা বলার না, ওইটাই ও ড্রাঙ্ক হয়ে বেজায়গায় বেটাইমে বলছে বহুবার।

ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে উবারের বিল দিয়ে নামতে নামতে এসবই ভাবতেছিল স্নেহা। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ও আবারও ফোনটা এয়ারপ্লেন মোডে দিলো। এনা পরিবহনের কাউন্টার গিয়ে দেখলো কোন বাসটা তখনই ছাড়ার লাইনে প্রথমে আছে। কাউন্টার থেকে ৫ মিনিটের মধ্যেই সিলেটের বাস ছাড়বে জানায়। ৫৫০ টাকার একটা নন-এসি টিকেট কেটে ও বাসে উঠে পড়লো। গেটে ঢোকার মুখেই হেল্পারের মুখ দিয়ে ভু ভু করে ভেসে আসা সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধে গা গুলিয়ে উঠে ওর। এমন না যে ও এসি বাসে যেতে পারতো না, কিন্তু ও যত দ্রুত সম্ভব তখন ঢাকা ছাড়তে চাইতেছিল। কোনোকিছু না ভেবেই তাই ওই বাসের টিকেটটা তখন কাটতে হইছে ওর।

ওর জন্ম, বেড়ে উঠা- সব ঢাকাতেই। এই শহরের বাইরে না আছে নিজের কোনো ঠিকানা; না আছে ওর বাবা বা মায়েরও কোনো ঠিকানা। দুই পক্ষেরই পৈত্রিক বাড়ি এখানে। এ কারণেই ওর ধারণা- এই শহরের বাইরে, পৃথিবীর যেই স্বর্গেই ওকে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তিন দিনের মধ্যেই ও হোম সিকনেসে ভুগে এই নরকেই ফিরে আসবে। এই শহরে এত পলিউশন, এত শব্দদূষণ! ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে সময় চলে যায় ট্রাফিক জ্যামে বসে। তবুও এই শহরই স্নেহার নিজস্ব, খুব প্রিয়, সবচেয়ে আপন। অথচ ওই রাতে এই শহরটাই ওর কাছে ভীষণ রকম অসহনীয় হয়ে উঠছিল।

ওর খুব ইচ্ছা করে আবিরের টেক্সটগুলার উত্তর দিতে। ও নিশ্চয় খুব টেনশন করতেছে! কিন্তু ওর ইগো আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে ওই ইচ্ছা দমন করালো। একটু পরই আবার অভিমানের কাছে ওই অহং বোধ গলে পানি হয়ে যায়। স্নেহা লক্ষ্য করে- অহং বোধের চেয়ে অভিমানের অনুভূতি অনেক বেশি গভীর আর তীব্র। কিন্তু পর মুহূর্তেই ওর মনে হয়- কোন অধিকারেই বা ও এই অভিমান বুকে জমিয়ে অচেনা এক শহরে রওনা হলো ওই মধ্যরাতে? কার জন্য? একটা নাথিংনেসের ভেতর আরো বড় একটা নাথিংনেস হয়ে যেন ও পথ হারিয়ে ফেলতেছে লাগে।

বাসে উঠার কিছুক্ষণ পরই ৩৮ পেরিয়ে ৩৯ বছরে পা দিলো ও। মোবাইলের স্ক্রিনে বারোটা এক ভেসে উঠতেই নিজেকে উইশ করে বললো- হ্যাপি বার্থডে, দ্য স্যাডেস্ট লেডি অব দ্য ওয়ার্ল্ড! পাশের সিটে বসা মধ্য বয়স্ক ভদ্রমহিলা ততক্ষণে ঘুমিয়ে ওর কাঁধে ঢলে পড়ছেন। ওই বাসে খুব বেশিক্ষণ জার্নি করা যাবে না মনে হতেই ওর ভেতর একটা জেদ চেপে বসলো। নিজেকে যন্ত্রণা দেওয়ার জেদ সম্ভবত। সঙ্গে সঙ্গেই ও সিদ্ধান্ত নিলো- ওই ভদ্রমহিলার মাথার ভার কাঁধে নিয়ে, ওই বাসেই ও লাস্ট স্টপেজ পর্যন্ত যাবে এবং সব যাত্রী নামার পরই ও বাস থেকে নামবে। কিন্তু সিলেটের ঠিক কোন জায়গায় যে ওই বাসের শেষ স্টপেজ, এ ব্যাপারে ওর বিন্দুমাত্রও ইলম ছিল না।

মুখটা বাঁকিয়ে ও ভাবে- যেখানে খুশি যাক, কী যায় আসে তাতে! নিরুদ্দেশ হতেই তো ও বের হইছে! কোথায় কখন থামবে, এত ভেবে কাজ কী! ওর অপেক্ষায় কে-ই বা কোথায় বসে আছে? ওরও তো আর কোথাও যাওয়ার নাই, কিচ্ছু করারও নাই! কারই বা ওর কাছে আসার কথা আছে? স্নেহার মনে হয়, কবীর সুমনের মতো কোনো গানওয়ালাকে তখন সামনে পেলে হয়তো ও গেয়ে উঠতে পারতো- “এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই…ও গানওয়ালা আরেকটা গান গাও…আমার আর কোথাও যাবার নেই…কিচ্ছু করার নেই…।”

বাসের ভেতরের লাইটটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল। অধিকাংশ মানুষ হয় ঘুমে, নয়তো আধ ঘুমে। বাসের হেল্পার বা কন্ডাক্টর লোকটা আবারও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কমদামি সিগারেটের বিশ্রী গন্ধটা ছড়াইতেছে। স্নেহার পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি সব গুলিয়ে আসতেছিল ওই সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধে। এরমধ্যেই ড্রাইভার সাহেব কর্কশ স্পিকারে কুমার শানু ছেড়ে দিলেন। মাশআল্লাহ! শানু বাবু ওইখানে গাইতেছেন- “তু পেয়্যার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কয়ি অউর হ্যায়...তু পাসান্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কয়ি অউর হ্যায়...।”

প্যা-ত্থে-টি-ক! কিছুক্ষণ শানু আর অনুরাধার নব্বই দশকের ওই চরম প্যারাদায়ক গানটা কানে যাওয়ার পর ও একটু জোরেই বিরক্তি প্রকাশ করলো। কাঁধে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে মহানিদ্রারত সহযাত্রীর নিদ্রায় যদিও তা সামান্যও আঁচড় ফেলতে পারে নাই। উনাকে কী মলম পার্টি ধরছিল নাকি? মানুষ এমন বেহুঁশ হয়ে ঘুমায় কীভাবে! ও একবার ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো- কী যে আরামে ঘুমাচ্ছেন উনি, যেন জগতে ঘুমের চেয়ে সুখের আর কিছু নাই! আসলেই নাই মনে হয়। কবে যে ও শেষ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, মনেই করতে পারলো না। এটাও খুব প্যা-ত্থে-টি-ক বিষয়!

দুইবার সাইফুজ্জামান স্যারের মতো “প্যা-ত্থে-টি-ক” উচ্চারণ করে এত বিরক্তির মধ্যেও ওর মুখে হাসি চলে আসে। ভার্সিটির ফার্স্ট সেমিস্টারে এই শব্দ এই একই উচ্চারণে কতবার যে ও শুনছে, হিসাব নাই। ওই শব্দ ওইভাবে উচ্চারণে সাইফুজ স্যার ছিলেন বেহিসাবী! আইইউবিতে ইংলিশ ওয়ান ও ওয়ান কোর্স করাতেন উনি। স্যারের কার্টুনের মতো মুখটা স্নেহার চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনেক বছর পরে। প্রায় ২০ বছর ক্লাসে লেট করে আসা সবার উদ্দেশ্যেই স্যার একই রকমভাবে চোখের এক ভ্রু উঁচু করে চশমার উপর দিয়ে এক চোখ তুলে ওই শব্দ ওইভাবে একবার না একবার হলেও শুনাইছেন! অবশ্য শুধু ক্লাসে দেরি করে যাওয়াটাই না, জগতের সকল কিছুই সম্ভবত সাইফুজ্জামান স্যারের “প্যা-ত্থে-টি-ক” লাগতো, ঠিক যেমন স্নেহার তখন লাগতেছিল। বাসের কর্কশ স্পিকারের অত্যাচার বেশিক্ষণ আর স্যারের ভাবনায় ওকে ব্যস্ত রাখতে পারলো না।

গান অবশ্য ততক্ষণে চেঞ্জ হইছে। তবে শুধু গানটাই চেঞ্জ হইছে, শানু আর অনুরাধা বদলায় নাই। বরং আগেরটার চেয়ে তাদের পরেরবারের গান আরো বেশি ভয়ংকর! কী খেয়ে যে নব্বই দশকে ইন্ডিয়ান লিরিসিস্টরা এসব গান লিখে পুরা একটা জেনারেশনকে বরবাদ করছেন- ও ভাবে! পুরুষ কণ্ঠটটা "বিন তেরে কুছ ভি নেহিইইইইইইইইইইইইই ম্যায়…” বলে চিৎকার করতেছিল। বলা উচিত চিক্কুর পারতেছিল! এরপর সে প্রেমিকাকে অবাস্তব সব ওয়াদা করতে গিয়ে গাইতেছে- “ম্যায় হার গম উঠা লুঙ্গি, তেরি চাহাত মে”। বেকুব প্রেমিকাটাও ওই কথা বিশ্বাস করে আহ্লাদিত হয়ে বলতেছে- "তেরা সাথ যো ছুটা, এ ওয়াদা যো টুটা, মে খুদ কো মিটা দুঙ্গি, তেরে চাহাত মে…।”

মরণ! ওই মুহূর্তে স্নেহার মনে হইতেছিল, ওই গানের লিরিসিস্টের নম্বর ওর কাছে থাকলে তখনই কল করে বলতো- কিতনি জিন্দেগি তুনে বরবাদ কিয়া এয়সে ঝুটি লিরিক শুনাকে, মেরি ভাই! তুঝে কয়ি জাহান্নুম মে ভি ঘুসনে নেহি দেগি! বাহ! ওইটা বলার পর ওর মনে হলো- ও তো বেশ ভালোই হিন্দি পারে! মুখে আরেকবার হাসি আসে ওর। কিন্তু নব্বই দশকের এইসব ছ্যাঁচড়া টাইপ মিথ্যা ওয়াদার গানগুলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেলুনে, ভিসিআর আর ক্যাসেটের দোকানগুলাতে কর্কশ শব্দে বাজাতে বাজাতে একটা পুরা জেনারেশনকে প্রেমের বিষয়ে যে ফ্যান্টাসিতে ভুগাইছে- ওইটা ভাবতেই ওই টাইমের লিরিসিস্টগুলাকে একেকটা নোবেলজয়ী মাচাদো’র নামের বানান প্রথমে দেখলে যেই ভুল হয়, ওই বানানেই ডাকতে ইচ্ছা করলো ওর।

এসব লিরিকের ভুক্তভোগী মুহতারমা এসনেএএহা নিজেই! যিনি অচেনা এক নারীর মাথার ভার কাঁধে নিয়ে অচেনা শহরের দিকে গন্তব্যহীন যাত্রা করছেন ওই মধ্যরাতে! তাও একজনের জীবনে অযাচিতভাবে প্রবেশ করে, বিনা অধিকারে তার প্রতি অভিমান পুষে! চল্লিশ বছর বয়সে ব্যাপারটা মোটেও অ্যাডভেঞ্চারাস লাগার কথা না, ওর সেটা লাগতেছিলও না। কিন্তু কপাল দোষে ওইসব গান শুনেই তো ওর শৈশব পার হইছে! ব্যর্থ প্রেমে সুইসাইড করতে যাওয়া একটা জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেছে ও এখনো; এই বয়সেও, যেন ওর বয়স এখনো ওই একুশ-ই আছে! একটু আগে যেন ওর বয়স উনচল্লিশ হওয়ার বদলে একুশ হইছে! নিজের একুশ বছর বয়সে পদার্পণের শুভেচ্ছা জানাতেই যেন কিছুক্ষণ আগে ও নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘দুঃখী নারী’ বলে সম্বোধন করছিল!

যারা কবি এবং একইসঙ্গে প্রেমিকা- জগতে এদের চেয়ে দুঃখী আত্মা আর একটাও থাকার কথা না, অনেক ভাবার পর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ও। কবি প্রেমে পড়বে মানেই ব্যর্থ হতেই পড়বে। ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা ফিরে পাবার কোনো অধিকার নাই এদের! প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে এরা সফল হয়ে গেলে, বিরহ যাপনের কবিতা লিখবে কে! ওই প্রথম ওর নিজের কবি সত্তার প্রতি বিরাট রাগ উঠলো। খামাখাই! অহেতুকই ও নিজেকে বলে বসলো- জগতে কবি হয়ে কী বাল ফেলে কেউ! যদিও সকল কবির প্রতি কিংবা কোনো কবির প্রতিই ওর কোনো ব্যক্তিগত বিরক্তি বা খেদ নাই, ও বিরক্ত শুধু নিজের উপরই। কিন্তু নিজের জন্মদিনের একলা রাতে ওই বিরক্তির ভাগীদার পুরা একটা কমিনিউটির উপর ঝেড়ে কিছুটা হালকা হতে চাইলো হয়তো!

জগতে একইসঙ্গে কবি-প্রেমিকা-সাংবাদিক হওয়া মানে হইতেছে দুঃখ আর দারিদ্র্যের সিম্বল হয়ে জীবনটা পার করে দেওয়া। পরবর্তী ভাবনায় আবারও ও এই রকম এক সিদ্ধান্তে আসে। আর্থিক দরিদ্র্যতা নিয়ে ওর মনে কোনো দুঃখ নাই যদিও। টাকা-পয়সাকে হাতের ময়লার মতো…না…আরেকটু ভাবে…এটা এপ্রোপ্রিয়েট তুলনা না! কিছু কিছু হাতের ময়লা এত দ্রুত মুছে না, বরং আলোর গতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ইয়েস! টাকা পয়সা কচ্ছপের গতিতে আসে, আলোর গতিতে চলে যায়। আজকে টাকা থাকবে, কালকে থাকবে না। কালকে না থাকলে পরশু আবার আসবে। এইসব বৈষয়িক দারিদ্র্যের চেয়ে ভালোবাসাহীনভাবে বেঁচে থাকাকে ওর কাছে অধিক দৈন্য দশার জীবন মনে হয়। এবং এই কিছিমের দারিদ্র্যে মহান হওয়ার কোনো খায়েশ ওর নাই বলেই ওর মনে হয়।

এতসব ভাবনাও খুব বেশিক্ষণ বাসের কর্কশ শব্দটাকে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারলো না। এরচেয়ে কানে ইয়ারবাড গুঁজে জুতসই কোনো গান শোনাটা ওই মুহূর্তের জন্য ফরজ কাজ মনে হলো। ওর স্পটিফাই একাউন্টে ‘আমোন’ নামের একটা প্লেলিস্ট আছে। তখন পর্যন্ত ওইখানে গানের সংখ্যা ছিল ৩৮৬ টা। বিরাট আর্কাইভের সমান প্লেলিস্টটা র‍্যান্ডম প্লে করতেই লিংকিং পার্কের “ইন দ্য এন্ড” শুরু হয়ে গেল। গান শুনতে শুনতেই ও ভাবলো- গত বছর ওই মাসেই ও আব্বাকে হারাইছে। ওই বছর হারাইতেছে নিজেই। আগামী বছর কি আবি…পুরাটা কল্পনা করার কথা ভাবতেই ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ওই মুহূর্তেও শুরু হলো। কিন্তু ব্যাপারটাকে ইগনোর করে ও গান শোনায় মনোযোগ দিলো-

ট্রায়িড সো হার্ড অ্যান্ড গট সো ফার
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার
আই হ্যাড টু ফল টু লুজ ইট অল
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার...

চেজিং দ্য ড্রাগন: ডার্ক কমেডি

Comments

    Please login to post comment. Login