Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: সঙ্গত কারণে

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

414
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

আবির ভিডিও কল করলে বিছানা থেকে উঠে রুমের লাইট জ্বালায় স্নেহা। একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরা আবিরকে বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় দেখে ও। বুকের ভেতর তখন টর্নেডো বইলেও নিজেকে নরমাল দেখাতে খুব সংযত একটা হাসি দিয়ে বলে- ইট হ্যাজ বিন ফিফটি থ্রি ডেইজ আই হ্যাভেন্ট সিন ইউ! ওহ মাই গড! আবির কিছুটা লজ্জা পেয়েই উত্তর দেয়- দ্যাটস ভেরি উইয়ার্ড! এমব্যারাসিং টু! ইউ শুডেন্ট কাউন্ট ডেইজ লাইক দ্যাট। স্নেহাও লজ্জা পেয়েই কাউন্টার দেওয়ার ট্রাই করে- ওয়েল…আই ডোন্ট ডু দিজ ডেলিবরেটলি, ট্রাস্ট মি! আই জাস্ট কান্ট ফরগেট ফিউ থিংগস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। তোমার সঙ্গে লাস্ট দেখা হইছে ১৫ ডিসেম্বর। এটা ইচ্ছে করে মনে রাখি নাই, মনে থেকে গেছে। আজকে কয় তারিখ? ৬ পার হয়ে সাতে পড়বে। দ্যাট মিন্স ফিফটি থ্রি ডেইজ! অংকে আই ওয়াজ সো উইক, বাট এটা না চাইলেও মনে আছে, কী করার! 

আবির মুচকি হাসে! ওই হাসিতেই ৭ দিনের চার্জ সব একবারে পেয়ে যায় স্নেহা। ইট ফিলস লাইক টু হার অ্যা সোর্স অব পাওয়ার হাউজ! আবিরের হাসি যে ও কী প্রচণ্ড ভালোবাসে! এই কথা দেখা হওয়ার প্রথম অথবা দ্বিতীয় দিন থেকেই ও বলে আসতেছে। যদিও আবির খুব কমই হাসে; কিন্তু যখনই হাসে, একজন জেনুইন ইনোসেন্ট মানুষের হাসির প্রতিচ্ছবিই দেখতে পাওয়া যায় ওর মধ্যে। আবিরকে ভালো লাগার আরেকটা কারণ বোধহয় ওর হাসি। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ওই হাসি দেখতে দেখতেই স্নেহা ভাবতেছিল। কথা বলতে বলতেই আবির আরেকটা ফোনে ব্লু টাচের ‘ছায়া’ গানটা প্লে করে নিজেও গলা মেলানো শুরু করে। আস্তে আস্তে গুন গুন করে প্রথমে গায়- "সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি, তোমার প্রশ্নের প্রতি উত্তরে কিছু লিখতে পারিনি।" এরপর "চাঁদ কিংবা তোমার আলো আমার বড্ড লাগে চোখে, মৃত্যুর কফিন আমার মুড়ে দিয়েছি তোমার আড়ালে" লাইনটা গাইতে গিয়ে হঠাৎই ও চোখ ঢেকে কান্না শুরু করে দিলো।

এই দৃশ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্নেহা। আবির হাউ মাউ করে কাঁদতেছে। ওর বুকটা ব্যথায় মুচড়ে গেলেও আবিরকে তখন ও থামানোর চেষ্টা করে নাই। মাঝে মাঝে কান্না মানুষকে রিলিফ দেয়। কোনো কারণে হয়তো ওর কান্না পাইতেছে; কাঁদুক, কেঁদে হালকা হোক- স্নেহা ভাবে। কিন্তু ওই কান্না ওর বুকের ভেতরটা তছনছ করে ফেলতেছিল। বেশিক্ষণ ওইভাবে কাঁদতে দেখা ওর পক্ষে সম্ভব হয় না। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নেওয়ার সময় ওর চোখেও যেন কোনো অবস্থাতেই পানি না আসে, নিজেকে সংযত আর মনে মনে সতর্ক করতেছিল স্নেহা। আব্বা বলতেন- কোনো সিচ্যুয়েশনেই দুইজন মানুষের একসঙ্গে ভার্নারেবল হওয়া উচিত না। একজন দুর্বল হলে, আরেকজনের যত কষ্টই হোক, নিজেকে সংবরণ করা লাগে। ওই চেষ্টাটাই ও করতেছিল তখন।

আবির কাঁদতেছে, কেঁদেই যাইতেছে। ওর হাসি যেমন একটা নিষ্পাপ শিশুর মতো সরল, কান্নাটাও ঠিক একই রকম। স্নেহা কিছু একটা টের পায়, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না। গানের লিরিক, কান্না- এইসব ডট মিলিয়ে অনেককিছুরই মিনিং দাঁড় করানো যায় চাইলে, কিন্তু ওই মুহূর্তে ওইসব ওর করতে ইচ্ছা করে না। তবে ও খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারতেছিল- কিছু একটা বলার চেষ্টা করেও কোনো এক কারণে আবির ওই কান্নার মাধ্যমে তা ডিলে করে দিলো। স্নেহা আর কান্না সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলো- হইছে তো, থামো। হইছে। আর কাঁদে না। কী হইছে? এভাবে কাঁদতেছো কেন? বলো…কিছু হইছে? আমি কষ্ট পাচ্ছি। থামো। অনেক কাঁদছো।

আবির থামে। মাথা নাড়িয়ে কিছু হয় নাই ইশারা দিয়ে বলে- অনেকদিন পর তোমার ফেসটা দেখে আই কুডেন্ট কন্ট্রোল; আই'ম সর‍্যি। কিন্তু এর পর পরই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্নেহার ভেতরে অনেক হিসাব-নিকাশই খাতা নিয়ে বসে পড়ছে তখন। অংক মিলুক বা না মিলুক, ও জানে- আজ অথবা কাল, আবিরের জীবন থেকে ওকে চলে যেতেই হবে; এইসব ঘটনাবলী ওই অন্তিম সময়ের আগে ঘটা ছোট ছোট ট্র্যাজিডি! আচমকা আবির কোনো উইয়ার্ড আচরণ করলে স্নেহা উপরে যতই শান্ত ভাব দেখাক না কেন, ভেতরে ভেতরে হারানোর ভয়ে ঠিকই ও কুঁকড়ে যেতে থাকতো সবসময়, এমন কী শেষদিন পর্যন্তও। ওই কান্নার দৃশ্য আর সম্ভাব্য বিদায়প্রস্তুতির কথা ভাবতেই ওর ফিল হয়- বুকের উপর কেউ একটা ভয়ংকর ভারি পাথর ফেলে চাপ দিয়ে ধরে রাখছে। 

বিরতিহীন ওই কান্না দেখে স্নেহা আবারও বলে- আবির; এদিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও…কী হইছে? ইউ ওয়ানা সে সামথিং? বলো, কী হইছে? বলো তো। এমন করে না, প্লিজ। কান্না থামাও। আবির নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে গিয়েই উত্তর দেয়- আই'ম সর‍্যি। স্নেহা জানতে চায়- সর‍্যি কেন, বাবা? ফোঁপাতে ফোঁপাতে ও বলতে থাকেআফটার মাই মম, প্রোবাবলি ইউ লাভ মি মোস্ট। বাট আই কান্ট রেসিপ্রোকেট। আই'ম সর‍্যি। আবারও হাউমাউ করে কান্না শুরু হয় ওর। স্নেহা কী বলবে বুঝতে পারতেছিল না। অনেক বড় একটা কথা বলে ফেলছে আবির। নিজেও ওই কথার মর্মার্থ ও জানে কি না, স্নেহার সন্দেহ হতে থাকে। ও কি ড্রাঙ্ক? কিন্তু দেখে তো সেটা মনে হয় না। তাইলে? সোবার অবস্থায় আবির এসব বলতেছে মানে তো সত্যি সত্যিই যা ফিল করতেছে, তা-ই বলতেছে, ভাবে স্নেহা। ও আগে এমনটাই করতো- মানুষ ড্রাঙ্ক হলেই বোধহয় সবচেয়ে বেশি সত্যি কথা বলে। কিন্তু আবির ওর অনেক হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে দিছে গত দুই বছরে। তবে যত যাই হোক, স্নেহা এটাও বোঝে- কিছু কিছু বিষয়ে ও ভুল না আসলে; বরং আবির নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বাস্তবতা আর পারিপার্শ্বিকতার কারণে যা যা সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে অনেক সময়, ওইগুলাই বরং অনেকাংশে মিথ্যা আর ভুল। পুরাপুরি সত্য না।

ওর খুব মায়া হয় আবিরের জন্যে। একটা লোক কেঁদে ওকে ভালোবাসতে না পারার অসহায়ত্ব জানাইতেছে। ভালোবাসতে না পারা আর ভালো না বাসা- এই দুইয়ের মধ্যে তো পার্থক্য আছে! স্নেহা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে শুরু করে। এই যে ব্লু টাচের গানটা, এইটা তো একটা ভুল কনসেপ্ট! ঠিক বার্তা তো দিতেছে না গানের প্রথম লাইনটা। এইখানে বলতেছে- সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি। ‘আর’ শব্দটা তো সমস্যাদায়ক এইখানে। এর মানে কী? আগে বাসছিলা, এরপর সেটা বাদ দিছো? দিতে বাধ্য হইছো, নাকি ওই অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে গেছে? বিষয়টা তো ক্লিয়ার হয় না এইখানে। হয় ভালোবাসো, নয় বাসো না, বা কখনো বাসোই নাই। ‘আর’ পারিনি দিয়ে কী বুঝানোর চেষ্টা হইছে? নিজের অপারগতা? কিন্তু অপারগ হওয়ার কারণ না বলে স্কুলের নোটিশ বোর্ডের মতো টাঙিয়ে দেওয়া হলো- অনিবার্য কারণবশত আজকের সকল ক্লাস স্থগিত করা হলো! হইছে- ভালো কথা, কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কারণটা জানিয়ে হওয়া উচিত ছিল না? বা কারণটা নির্দিষ্টভাবে সকল পক্ষের কাছে ক্লিয়ার থাকলে ভালো হতো না? সবারই তো জানার অধিকার আছে, না কি? এরচেয়ে বড় কথা- ভালোবাসছিলা কোনো এক সময়; কোনো এক মুহূর্তের জন্য হলেও, কিন্তু ওইটা তুমি আবার নিজ থেকে প্রকাশ করবা না! গুপ্ত কর্মসূচির মতো ভিন্ন ভিন্ন সিগনাল দিয়ে কোনোকিছু বোঝালে কি আর সবার পক্ষে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা সম্ভব? স্নেহার কাছে কেমন আবছা লাগে সবকিছু! স্পষ্টতা নাই। কেমন এক রহস্যে ঘেরা যেন!

কথাগুলা অস্পষ্ট থাকলেও চোখ দেখে কিছু কিছু বুঝে নিতে পারে স্নেহা, সেটা তো ও বহু আগেই বুঝে নিছিল। কিন্তু প্রতিবারই একসঙ্গে সুন্দর সময় কাটিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্ত হলেই কেন আবিরকে ওইসব বোঝাপড়া মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টায় নানা আবোল-তাবোল ব্যবহার করতে হইছে? কেন চলে যাওয়ার আগে প্রতিবারই একটা গিলটি ফিলিং স্নেহার মধ্যে ট্রান্সফার করার ইফোর্ট দিতে হইছে ওকে? কোন অপরাধ বোধে? কোন নৈতিকতার দোহাইয়ে? স্নেহা এতে কষ্ট পায়, ওর এতে যন্ত্রণা হয় জানার পরও দুইটা বছর, প্রায় প্রতিটা বিদায়ের মুহূর্তেই আবির ওই একই কাজ করে গেছে। এর সিকিভাগ ইফোর্টটাও যদি এই সম্পর্ককে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে, ও নিজেও স্বাভাবিক থাকার পেছনে দিতো, অনেক সমস্যা হয়তো বড়ই হতো না- স্নেহার এখনো এমনটাই মনে হয়। এর মানে এই না যে সমস্যা শুধু আবির একাই সৃষ্টি করছে আর স্নেহা অবলা নারী হিসাবে শুধু যন্ত্রণাই পাইছে এই সম্পর্কে! ও জানে, স্বীকারও করে- আবিরের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা ওর সমস্ত জীবনেও কাউকে দেয় নাই ও। আবিরের চেয়ে বেশি ভালোও কাউকে বাসে নাই।

ব্লু টাচের গানের ওই লাইন দুইটা খুব বিশ্রীভাবে স্নেহাকে বদার করতেছিল। আবারও ও ভাবা শুরু করে- হয় কখনো তোমাকে আমি ভালোই বাসি নাই, অথবা সচেতনভাবে ভালোবাসতে চাই-ই নাই। পারি নাই আবার কী? বাসছো কিন্তু চাও নাই? নাকি চাইছো কিন্তু বাসতে পারো নাই? এত কনফিউজিং মানুষের ভাবনা আর সম্পর্ক! ৪৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিও কলে আবির প্রায় ৩১ মিনিটই কিছুক্ষণ পর পর পজ দিয়ে কেঁদে গেছে। কিন্তু ও আসলে স্নেহাকে যা বলতে চাইছিল, ওইটাই ওর বলা হয় নাই, বা ও বলতে পারে নাই আসলে। সঠিক সময়ে স্পষ্ট ভাষায় যা যা বলা দরকার, আবির তা বলতে পারে নাই কোনোদিনই; সম্ভবত পারবেও না কখনো। কিন্তু যখন যেটা বলার না, ওইটা ও ড্রাঙ্ক হয়ে বেজায়গায় বেটাইমে ঠিকই বলছে বহুবার। ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে উবারের বিল দিয়ে নামতে নামতে এসবই ভাবতেছিল স্নেহা। এরপর ফোনের এয়ারপ্লেন মোড চালু করে সামনে থাকা এনা পরিবহনের কাউন্টারে গিয়ে কোন বাসটা সবার আগে ছাড়বে জানতে চায়। ৫ মিনিটের মধ্যেই সিলেটের বাস ছাড়বে জেনে ৫৫০ টাকায় নন-এসি ওই বাসের টিকেট কেটে উঠে পড়ে গাড়িতে। গেটে ঢোকার মুখে হেল্পারের মুখ দিয়ে ভু ভু করে ভেসে আসা সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধে গা গুলিয়ে উঠে ওর। এমন না যে কোনো এসি বাসে ও যেতে পারতো না, তবে ওই মুহূর্তে যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা ছাড়ার দিকেই ওর বেশি মনোযোগ ছিল। কোনোকিছু না ভেবে তাই ওই বাসের টিকেটটাই তখন কাটতে হইছে।

স্নেহার জন্ম, বেড়ে উঠা- সব ঢাকাতেই। এই শহরের বাইরে না আছে ওর নিজের কোনো ঠিকানা, না আছে ওর আব্বা-আম্মারও। উনাদের দুই পক্ষের পৈত্রিক বাড়িই এই শহরে। স্নেহার ধারণা- ঢাকার বাইরে, পৃথিবীর যেই স্বর্গেই ওকে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তিন দিনের মধ্যেই হোম সিকনেসে ভুগে এই নরকেই ফিরে আসবে ও। এই শহরে এত পলিউশন; এত শব্দদূষণ, এত মিথ্যা, এত কপটতা, এই শহরের মানুষদের মুখোশের আড়ালে কত কত বিচিত্র চেহারা, এখানে এত এত ভণিতা, এত বিভ্রম! ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় এই শহরে চলে যায় ট্রাফিক জ্যামে বসে। তবুও এই শহরই ওর নিজস্ব, খুব প্রিয়, সবচেয়ে বেশি আপন। অথচ ওই রাতে এই শহরও ভীষণ রকম অসহনীয় হয়ে উঠছিল ওর কাছে।

আবিরের টেক্সটগুলার উত্তর দিতে খুব ইচ্ছা করে ওর। নিশ্চয় ও খুব টেনশন করতেছে! কিন্তু আবারও ওর ইগো মাথা চাড়া দিয়ে এইসব মায়ার জালের ইচ্ছাকে দমন করায় কোনোমতে। যদিও একটু পরই অভিমানের কাছে ওই অহং বোধ স্রোতস্বিনীর পানির মতো ভেসে যাওয়াও টের পেলো ও। স্নেহা লক্ষ্য করে, অভিমানের অনুভূতি অহং বোধের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র আর গভীর। কিন্তু কোন অধিকারেই বা ও ওই অভিমান বুকে জমিয়ে অচেনা এক শহরে রওনা হলো ওই মধ্যরাতে? কার জন্যই বা? ও ভাবে! একটা নাথিংনেসের ভেতর আরো বড় একটা নাথিংনেস হয়ে ও পথ হারিয়ে ফেলতেছে লাগে।

বাসে উঠার কিছুক্ষণ পরই ৩৮ পার হয়ে ৩৯ বছরে পা দিলো স্নেহা। মোবাইলের স্ক্রিনে বারোটা এক মিনিট ভেসে উঠতেই নিজেকে উইশ করে বললো- হ্যাপি বার্থডে, দ্য স্যাডেস্ট লেডি অব দ্য ওয়ার্ল্ড! পাশের সিটে বসা মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা ঘুমিয়ে ওর কাঁধে ঢলে পড়ছেন ততক্ষণে। ওই বাসে খুব বেশিক্ষণ জার্নি করা যাবে না মনে হতেই ওর ভেতর একটা জেদ চেপে বসলো। নিজেকে যন্ত্রণা দেওয়ার জেদ সম্ভবত। সঙ্গে সঙ্গেই ও সিদ্ধান্ত নিলো- ওই ভদ্রমহিলার মাথার ভার কাঁধে নিয়ে, ওই বাসেই ও লাস্ট স্টপেজ পর্যন্ত যাবে। সব যাত্রী নামার পর একদম শেষ যাত্রীটা হিসাবেই বাস থেকে নামবে ও। কিন্তু সিলেটের ঠিক কোন জায়গায় যে বাসের শেষ স্টপেজ, এ ব্যাপারে ওর বিন্দুমাত্রও ইলম ছিল না। লাস্ট স্টপেজের গন্তব্যর কথা চিন্তায় আসতেই মুখটা বাঁকিয়ে ও ভাবে- যেখানে খুশি যাক, কী যায় আসে তাতে! নিরুদ্দেশ হতেই তো বের হইছে ও!

কোথায় কখন থামবে, এত ভেবে কাজ কী! ওর অপেক্ষায় কোথায় কে-ই বা বসে আছে? ওরও তো কোথাও যাওয়ার নাই আর, না আছে কোনোকিছু করারও! কারই বা ওর কাছে আসার কথা ছিল? কে-ই বা ওর কাছে আসবে কখনো? ওই সময় কবীর সুমনের মতো কোনো গানওয়ালাকে সামনে না পাওয়ায়, এই লাইনগুলা গাইতে না পারার আফসোসটা থেকে যাবে ওর- “এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই…ও গানওয়ালা আরেকটা গান গাও…আমার আর কোথাও যাবার নেই…কিচ্ছু করার নেই…।” কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসের ভেতরে থাকা লাইটটা বন্ধ হয়ে গেল। অধিকাংশ মানুষই তখন ঘুমে, নয়তো আধ ঘুমে। বাসের হেল্পার বা কন্ডাক্টর লোকটা আবারও কমদামি সিগারেটের বিশ্রী গন্ধটা ছড়ালো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। বিশ্রী ওই গন্ধে স্নেহার পেটের ভেতর নাড়িভুঁড়ি সব গুলিয়ে আসতেছিল। এরমধ্যেই কর্কশ স্পিকারে ড্রাইভার সাহেব ছেড়ে দিলেন কুমার শানুকে। মাশআল্লাহ! শানু বাবু তখন গাইতেছিলেন- "তু পেয়্যার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কয়ি অউর হ্যায়...তু পাসান্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কয়ি অউর হ্যায়...।”

প্যা-ত্থে-টি-ক! শানু আর অনুরাধার নব্বই দশকের ওই চরম প্যারাদায়ক গানটা কিছুক্ষণ কানে যাওয়ার পর স্নেহা একটু জোরেই বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলে। কাঁধে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে মহানিদ্রারত ওর সহযাত্রীর নিদ্রায় যদিও তা সামান্য আঁচড়ও ফেলতে পারে নাই। উনাকে কী মলম পার্টি ধরছিল নাকি? মানুষ এমন বেহুঁশ হয়ে কীভাবে ঘুমায়! একবার ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে ও দেখে- কী যে আরামে ঘুমাইতেছেন উনি! জগতে ঘুমের চেয়ে বেশি সুখ যেন নাই আর কিছুতে! আসলেই নাই মনে হয়। কবে যে ও শেষ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, কিছুতেই ভেবে মনে করতে পারলো না। এটাও খুব প্যা-ত্থে-টি-ক বিষয়!

দুইবার সাইফুজ্জামান স্যারের মতো “প্যা-ত্থে-টি-ক” উচ্চারণ করে এত বিরক্তির মধ্যেও স্নেহার মুখে হাসি চলে আসে। ভার্সিটির ফার্স্ট সেমিস্টারে এই শব্দ একই উচ্চারণে কতবার যে ও শুনছে, হিসাব নাই। এই শব্দ এই একইভাবে উচ্চারণে, সাইফুজ স্যার ছিলেন বেহিসাবী! আইইউবিতে উনি ইংলিশ ওয়ান ও ওয়ান কোর্স করাতেন। স্যারের কার্টুনের মতো মুখটা স্নেহার চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনেক বছর পর। প্রায় ২০ বছর তো হবেই! ক্লাসে লেট করে আসা সবার উদ্দেশ্যেই একই রকমভাবে চশমার উপর দিয়ে চোখের এক ভ্রু উঁচু করে একবার না একবার হলেও স্যার “প্যাত্থেটিক" বলছেন! অবশ্য শুধু ক্লাসে দেরি করে আসাটাই না, জগতের সকল কিছুই সম্ভবত উনার “প্যা-ত্থে-টি-ক” লাগতো, ঠিক যেমন স্নেহার তখন লাগতেছিল। বাসের কর্কশ স্পিকারের অত্যাচার বেশিক্ষণ আর স্যারের ভাবনায় ব্যস্ত রাখতে পারলো না ওকে।

গান অবশ্য ততক্ষণে চেঞ্জ হইছে। তবে শুধু গানটাই চেঞ্জ হইছে, শানু আর অনুরাধা বদলান নাই। বরং আগেরটার চেয়ে পরেরবারের গানটা ছিল আরো বেশি ভয়ংকর! কী খেয়ে যে নব্বই দশকে ইন্ডিয়ান লিরিসিস্টরা এইসব গান প্রসব করে পুরা একটা জেনারেশনকে বরবাদ করছেন- স্নেহা ভাবে! পুরুষ কণ্ঠটা ওইখানে “বিন তেরে কুছ ভি নেহিইইইইইইইইইইইইই ম্যায়…” বলে চিৎকার করতেছিল। বলা উচিত চিক্কুর পারতেছিল! এরপর সে প্রেমিকাকে অবাস্তব সব ওয়াদা করতে গিয়ে গাইতেছে- “হো দুশমন যামানা…মুঝে না ভুলানা…মে খুদ কো মিটা দুঙ্গা…তেরি চাহাত ম্যায়…।" বেকুব প্রেমিকাটাও আবার ওই কথা বিশ্বাস করে আহ্লাদিত হয়ে বলতেছে- ”ম্যায় হার গম উঠা লুঙ্গি, তেরি চাহাত মে…তেরা সাথ যো ছুটা, এ ওয়াদা যো টুটা, মে খুদ কো মিটা দুঙ্গি, তেরি চাহাত মে…।”

মরণ! ওই মুহূর্তে স্নেহার মনে হইতেছিল, ওর কাছে যদি লিরিসিস্টের নম্বর থাকতো, তখনই কল দিয়ে বলতো- কিতনি জিন্দেগি তুনে বরবাদ কিয়া এয়সে ঝুটি লিরিক শুনাকে, মেরি ভাই! তুঝে কয়ি জাহান্নুম মে ভি ঘুসনে নেহি দেগা! বাহ! ভালোই তো হিন্দি বলতে পারে- ভাবতেই মুখে আরেকবার হাসি আসে ওর। কিন্তু নব্বই দশকের এইসব ছ্যাঁচড়া টাইপ মিথ্যা ওয়াদার গানগুলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেলুনে, ভিসিআর আর ক্যাসেটের দোকানগুলাতে কর্কশ শব্দে বাজতে বাজতে একটা পুরা জেনারেশনকে প্রেমের যে ফ্যান্টাসিতে ভুগাইছে- তা মনে পড়তেই ওই সময়ের লিরিসিস্টগুলাকে একেকটা নোবেলজয়ী মাচাদো’র নামের বানান বাংলায় প্রথমবার দেখলে যেই ভুল হয়, ওই ভুল উচ্চারণেই ডাকতে ইচ্ছা করলো ওর।

এইসব লিরিকের ভুক্তভোগী মুহতারমা এসনেএএহা নিজেই! যিনি অপরিচিত এক নারীর মাথার ভার কাঁধে নিয়ে অচেনা এক শহরের দিকে গন্তব্যহীন যাত্রা করছেন ওই মধ্যরাতে! তাও আবার একজনের জীবনে অযাচিতভাবে প্রবেশ করে, এবং খুব সুন্দরমতো বিনা অধিকারের অভিমান পুষে রেখে! চল্লিশ বছর বয়সে ব্যাপারটা মোটেও অ্যাডভেঞ্চারাস লাগার কথা না, ওর সেটা লাগতেছিলও না। কিন্তু কপাল দোষে ওইসব গান শুনেই তো ওর শৈশব পার হইছে আসলে! ব্যর্থ প্রেমে সুইসাইড করতে যাওয়া একটা জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেছে ও এখনো; এই বয়সেও! ওর বয়স এখনো যেন ওই একুশে আটকে আছে! একটু আগে যেন ওর উনচল্লিশ বছর হওয়ার বদলে একুশ বছর হইছে! একুশ বছর বয়সে পদার্পণের শুভেচ্ছা জানাতেই নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ‘দুঃখী নারী’ বলে ও সম্বোধন করছিল যেন!

যারা কবি এবং একইসঙ্গে প্রেমিকা- জগতে এদের চেয়ে দুঃখী আত্মা আর একটাও থাকার কথা না! অনেক ভাবার পর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ও। কবি প্রেমে পড়বে মানেই ব্যর্থ হতেই পড়বে। ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা ফিরে পাবার কোনো অধিকার নাই এদের! প্রেম সংক্রান্ত বিষয়ে এরা সফল হয়ে গেলে, বিরহ যাপনের কবিতা লিখবে কে! ওই প্রথম নিজের কবি সত্তার প্রতি ওর বিরাট রাগ উঠলো। খামাখাই! অহেতুকই ও বলে বসলো- জগতে কবি হয়ে কী বাল ফেলে কেউ! যদিও সকল কবির প্রতি কিংবা কোনো স্পেসেফিক কবির প্রতিই ব্যক্তিগত বিরক্তি বা খেদ ওর নাই, ও বিরক্ত শুধু নিজের উপরই। কিন্তু জন্মদিনের ওই একলা রাতে, নিজের উপর বিরক্তির ঝালটা পুরা কমিনিউটির উপর ঝেড়ে কিছুটা হালকা হতে চাইতেছিল মনে হয়!

জগতে একইসঙ্গে কবি-প্রেমিকা-সাংবাদিক হওয়া মানে আরো ভয়াবহ- দুঃখ আর দারিদ্র্যের সিম্বল হয়েই জীবন পার করে দেওয়া। পরবর্তী ভাবনায় ও এই রকম আরেকটা সিদ্ধান্তে আসে। আর্থিক দরিদ্র্যতা নিয়ে ওর মনে কোনো দুঃখ-অনুতাপ নাই যদিও। টাকা-পয়সাকে হাতের ময়লার মতো…না…আরেকটু ভাবে ও…এটা এপ্রোপ্রিয়েট তুলনা না! কিছু কিছু হাতের ময়লা এত দ্রুত মুছে না, না চাইলেও বহুদিন হাতের মধ্যে থেকেই যায়। বরং আলোর গতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ইয়েস! টাকা পয়সা কচ্ছপের গতিতে আসে, আলোর গতিতে চলে যায়। আজকে টাকা থাকবে, কালকে থাকবে না। কালকে না থাকলে পরশু আবার আসবে। এইসব বৈষয়িক দরিদ্রতার চেয়ে ভালোবাসাহীনভাবে বেঁচে থাকাকে অধিক দৈন্য দশার জীবন মনে হয় ওর। এই কিছিমের দারিদ্র্যে মহান হওয়ার কোনো খায়েশ ওর নাই বলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তেও আসে ও।

এতসব ভাবনাও বাসের ভেতরে বাজতে থাকা কর্কশ স্পিকারের শব্দকে সহনশীল পর্যায়ে আনতে পারলো না কোনোভাবে। এরচেয়ে কানে ইয়ারবাড গুঁজে জুতসই কোনো গান শোনাকে ওই মুহূর্তের জন্য ফরজ কাজ মনে হলো স্নেহার। ‘আমোন’ নামের একটা প্লেলিস্ট আছে ওর স্পটিফাই অ্যাকাউন্টে। তখন পর্যন্ত ওই প্লেলিস্টে ৩৮৬ টা গান আর্কাইভ করা ছিল। র‍্যান্ডম ওইটা প্লে করতেই বেজে উঠলো লিংকিং পার্কের “ইন দ্য এন্ড”। গান শুনতে শুনতে স্নেহা ভাবলো- গত বছর ওই মাসে ও আব্বাকে হারাইছে। ওই বছর হারাইতেছে নিজেই। আগামী বছর কি আবি…!! পুরাটা কল্পনা করার আগেই ও শ্বাসকষ্ট টের পায়। ব্যাপারটাকে ওই মধ্যরাতের বাস জার্নিতে কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না মনস্থির করে গান শোনায় মনোযোগী হলো ও-

ট্রায়িড সো হার্ড অ্যান্ড গট সো ফার
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার
আই হ্যাড টু ফল টু লুজ ইট অল
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার...

চেজিং দ্য ড্রাগন: ডার্ক কমেডি

Comments

    Please login to post comment. Login