Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: সংগত কারণে

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

212
View

আবির ভিডিও কল দিতেই স্নেহা উঠে রুমের লাইট জ্বালিয়ে নিলো। একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় আবিরকে দেখলো স্নেহা। ওর বুকের ভেতর টর্নেডো বয়ে যাচ্ছে কিন্তু নিজেকে নরমাল দেখানোর জন্য খুব সংযত হয়ে একটা হাসি দিয়ে বললো- ইট হ্যাজ বিন ফিফটি থ্রি ডেইজ আই হ্যাভ নট সিন ইউ! ওহ মাই গড!

আবির বললো, দ্যাটস ভেরি উইয়ার্ড, এমব্যারাসিং টু! ইউ শুডেন্ট কাউন্ট ডেইজ লাইক দ্যাট। স্নেহা বললো, আই ডোন্ট ডু দিজ ডেলিবরেটলি, ট্রাস্ট মি! বাট আই ডোন্ট ফরগেট ফিউ থিংগস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। তোমার সঙ্গে লাস্ট দেখা হইছে ১৫ ডিসেম্বর, এটা আমি ইচ্ছে করে মনে রাখি নাই, মনে থেকে গেছে। আর আজকে কয় তারিখ? ৬ ফেব্রুয়ারি পার হয়ে সাতে পড়বে। দ্যাট মিন্স ফিফটি থ্রি ডেইজ। অংকে আই ওয়াজ সো উইক, বাট এটা না চাইলেও মনে থেকে যায়, কী করার! 

আবির মুচকি হাসলো! স্নেহা যেন গত ৭ দিনের চার্জ সব একবারেই পেয়ে গেল। ইট ফিলস লাইক অ্যা সোর্স অফ পাওয়ার হাউজ টু হার! আবিরের হাসি যে সে কী প্রচণ্ড ভালোবাসে! এই কথা সে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম অথবা দ্বিতীয় দিন থেকেই আবিরকে বলে আসতেছে। যদিও আবির খুবই কম হাসে। কিন্তু ও যখন হাসে, স্নেহার কাছে সেটা একজন জেনুইন, ইনোসেন্ট মানুষের হাসি মনে হয়। 

আবিরকে ভালো লাগার আরেকটা কারণ বোধহয় ওর হাসি- স্নেহা ভিডিও কলে আবিরের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। এরমধ্যেই আবির ওর আরেকটা ফোনে ব্লু টাচের ‘ছায়া’ গানটা ছেড়ে নিজেও গলা মেলানো শুরু করলো। আস্তে আস্তে গুন গুন করে প্রথমে- "সংগত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি, তোমার প্রশ্নের প্রতি উত্তরে কিছু লিখতে পারিনি।" এরপর "চাঁদ কিংবা তোমার আলো আমার বড্ড লাগে চোখে, মৃত্যুর কফিন আমার মুড়ে দিয়েছি তোমার আড়ালে" গাইতে গেয়ে একটু জোরে টান দেওয়ার পর হঠাৎ ও চোখে হাত দিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।

স্নেহা এর জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। আবির হাউ মাউ করে কাঁদতেছে। স্নেহার বুকটা ব্যথায় মুচড়ে যাচ্ছে কিন্তু আবিরকে সে থামানোর চেষ্টা করলো না। মাঝে মাঝে কান্না মানুষকে রিলিফ দেয়৷ ওর কোনো কারণে কান্না পাচ্ছে, কাঁদুক, ভাবে স্নেহা। কিন্তু এই দৃশ্য স্নেহার বুকের ভেতরটা তছনছ করে ফেলতেছে।

বেশিক্ষণ এই দৃশ্য দেখা তার পক্ষে সম্ভব না। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ অন্যদিকে সরিয়ে, তার চোখ দিয়েও যেন পানি না পড়ে, খুব সংযত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল স্নেহা। কোনো পরিস্থিতিতে দুজন মানুষের একসঙ্গে অস্থির হওয়া ঠিক না। একজন হলে আরেকজনের যত কষ্টই হোক, নিজেকে সংবরণ করা লাগে। স্নেহা সেটাই ট্রাই করে যাচ্ছিল।

আবির কাঁদতেছে, কেঁদেই যাইতেছে। ওর হাসি যেমন একটা নিষ্পাপ শিশুর মতো, ওর কান্নাও তা-ই। স্নেহা কিছু একটা টের পায়, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না। গানের লিরিক, এই কান্না- এসব ডটগগুলো মিলিয়ে অনেককিছুর মিনিং দাঁড় করানো যায় চাইলে, স্নেহার সেটা এখন ইচ্ছে করতেছে না। কিন্তু সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারতেছে আবির কিছু একটা বলার খুব চেষ্টা করেও কোনো কারণে তা ডিলে করে দিলো এই কান্নার মাধ্যমে।

স্নেহা আর এ কান্না সহ্য না করতে পেরে বলে ওঠে- হইছে তো, থামো। হইছে। আর কাঁদে না। কী হইছে? কেন এভাবে কাঁদতেছো? বলো…আমি কষ্ট পাচ্ছি। থামো। অনেক কাঁদছো। আবির থামে। মাথা নাড়িয়ে বলে কিছু হয়নি। এরপর বলে অনেকদিন পর তোমার ফেসটা দেখে আই কুডেন্ট কন্ট্রোল, আই'ম সর‍্যি- বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্নেহার ভেতরে অনেক হিসাব-নিকাশ খাতা নিয়ে এরইমধ্যে বসে পড়ছে। অংক মিলুক বা না মিলুক, স্নেহা জানে- আজ অথবা কাল, আবিরের জীবন থেকে তাকে চলে যেতেই হবে এবং এসব সেই অন্তিম সময়ের আগে ছোট ছোট ট্র‍্যাজিডি!

আচমকাই আবির কোনো উইয়ার্ড আচরণ করলে স্নেহা উপরে শান্ত ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে আবিরকে হারানোর ভয়ে কুঁকড়াতে থাকে। আবিরের কান্নার দৃশ্য আর সম্ভাব্য বিদায়প্রস্তুতির কথা ভাবা- দুইয়ে মিলে স্নেহার ফিল হয়, হঠাৎ করেই কেউ যেন তার বুকের উপর একটা ভয়ংকর ভারি পাথর ফেলে চাপ দিয়ে ধরে রাখছে। আবিরের এই বিরতিহীন কান্না দেখে স্নেহা জানতে চায়- আবির, এদিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও। কী হইছে? ইউ ওয়ানা সে সামথিং? বলো, কী হইছে? বলো তো। এমন করে না, প্লিজ। কান্না থামাও।

আবির নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলতে থাকে, আই'ম সর‍্যি। স্নেহা হাসার চেষ্টা করে বলে, সর‍্যি কেন, বাবা? আবির কাঁদতে কাঁদতেই বলে- প্রোবাবলি আফটার মাই মম, ইউ লাভ মি মোস্ট, বাট আই কান্ট রেসিপ্রোকেট- বলেই আবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। স্নেহা কী বলবে বুঝতে পারছে না। আবির অনেক বড় একটা কথা বলে ফেলেছে, ও হয়তো নিজেও জানে কি না, সন্দেহ আছে স্নেহার। আবির কি ড্রাঙ্ক? কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে না। তাহলে?

আবির সোবার অবস্থায় এসব বলতেছে মানে তো ও নিজে যা সত্যি ফিল করতেছে, তাই বলতেছে- স্নেহা ভাবে। যদিও স্নেহা আগে মনে করতো মানুষ ড্রাঙ্ক হলেই বেশি সত্য বলে। আবির ওর অনেক হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করছে। তবে স্নেহা এটাও বোঝে, কিছু কিছু বিষয়ে স্নেহা ভুল না, বরং আবির নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর বাস্তবতার কারণে যেটাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে- সেটাই ভুল!

আবিরের জন্য খুব মায়া হয় স্নেহার। একটা লোক তাকে ভালোবাসতে না পারার অসহায়ত্ব জানাচ্ছে কেঁদে। ভালোবাসতে না পারা আর ভালো না বাসা- দুইটার মধ্যে তো পার্থক্য আছে। স্নেহা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবে। এই যে ব্লু টাচের গানটা- এটা তো একটা ভুল কনসেপ্ট! সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি। ‘আর’ শব্দটা তো এখানে সমস্যাদায়ক। মানে কী? আগে বাসছিলা এরপর সেটা বাদ দিছো, দিতে বাধ্য হইছো নাকি ওই অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে গেছে? বিষয়টা তো ক্লিয়ার না।

হয় ভালোবাসো, নয় বাসো না বা কখনোই বাসো নাই। ‘আর’ পারিনি দিয়ে কী বুঝানোর চেষ্টা হলো এখানে? নিজের অপারগতা? কিন্তু অপারগ হওয়ার কারণ না বলে স্কুলের নোটিশ বোর্ডের মতো জানিয়ে দেওয়া হলো- অনিবার্য কারণবশত আজকের সকল ক্লাস স্থগিত করা হলো! হলো ভালো কথা, নির্দিষ্টভাবে কারণটা জানিয়ে হওয়া ভালো না? সবারই তো জানার অধিকার থাকে। এরচেয়ে বড় কথা, ভালোবাসছিলা কোনো সময়, কোনো এক মুহূর্তের জন্য হলেও, সেটাও তো কোনো গুপ্ত কর্মসূচির মতো ভিন্ন ভিন্ন সিগনাল দিয়ে বোঝালে সবার পক্ষে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা সম্ভব না।

স্নেহা শুধু পারে চোখ দেখে কিছু কিছু বুঝে নিতে। সেটা তো সে বহু আগেই বুঝে নিছে। আবিরকে কেন সেটা মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টায় যখনই কাছে এসে চলে যাওয়ার সময় হইছে- ওই ইফোর্টটা দিতে হয়? কোন অপরাধ বোধে? কোন নৈতিকতার দোহাইয়ে? দিনের পর দিন এটা জেনেও যে তাতে স্নেহার যন্ত্রণা হয়?

এর সিকিভাগ ইফোর্টটা যদি ও এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে নিজেও স্বাভাবিক থাকার পেছনে দিতো, অনেক সমস্যা হয়তো বড় হতোই না৷ এর মানে এই না সমস্যা শুধু আবির একাই সৃষ্টি করছে আর স্নেহা অবলা নারী, সে শুধু যন্ত্রণাই পেয়ে গেছে। স্নেহা জানে, সে জীবনে আবিরের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা কাউকে দেয় নাই, আবিরের চেয়ে বেশি কাউকে ভালোও বাসে নাই।

গানের ওই লাইনটা এমন বিশ্রীভাবে স্নেহাকে বদার করতেছে, ও আবার ভাবা শুরু করলো- হয় তোমাকে কখনো আমি ভালোই বাসি নাই বা ভালোবাসতে চাই নাই সচেতনভাবে। পারি নাই আবার কী? চাইছো কিন্তু পারো নাই, নাকি বাসছো কিন্তু চাও নাই? এত কনফিউজিং মানুষের ভাবনা আর সম্পর্ক! ওই রাতে ৪৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিও কলে প্রায় ৩১ মিনিটই আবির কেঁদেই গেছিল, কিন্তু সে আসলে যা বলতে চাইছিল, তা-ই বলতে পারে নাই।

কিংবা সঠিক সময়ে আবিরের স্পষ্ট ভাষায় যা যা বলা দরকার- তা সে কখনোই বলতে পারে নাই, পারে না, সম্ভবত পারবেও না কখনো। আবার যখন যেটা বলার না, যে সময়ে যা বলার না, সেটা সে সবসময় ড্রাঙ্ক হয়ে বলবেই বলবে- স্নেহা ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে উবারের বিল দিয়ে নামতে নামতে এসবই ভাবতেছিল।

উবার থেকে নেমে ফোনটা এয়ারপ্লেন মোডে দিয়ে এনা পরিবহনের কাউন্টার গিয়ে দেখলো কোন বাসটা তখন ছাড়ার লাইনে প্রথমে আছে। কাউন্টার থেকে বললো, সিলেটের। ৫৫০ টাকার একটা নন-এসি টিকেট কেটে বাসে গিয়ে উঠে পড়লো স্নেহা। গেটে ঢোকার মুখেই বাসের হেল্পারের মুখ দিয়ে ভু ভু করে সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধ ভেসে আসতেই গা গুলাতে থাকলো তার। এসি বাসে সে যেতে পারতো না, এমন না। তার উদ্দেশ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা ছাড়া।

স্নেহার জন্ম, বেড়ে ওঠা- সবই ঢাকাতেই। ঢাকার বাইরে না আছে তার নিজের কোনো ঠিকানা, না আছে তার বাবা বা মায়ের কোনো ঠিকানা। দুই পক্ষেরই পৈত্রিক বাড়ি ঢাকায়। এ কারণেই স্নেহার ধারণা ঢাকার বাইরে পৃথিবীর যেই স্বর্গেই তাকে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তিন দিনের মধ্যেই সে হোম সিকনেসে ভুগে এই শহরেই ফিরে আসবে। এই শহরে এত পলুশন, এত শব্দদূষণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ শহরে সময় চলে যায় ট্রাফিক জ্যামে, তবুও এই শহরই স্নেহার নিজস্ব, খুব প্রিয়। অথচ ওই রাতে ওই শহরটাই তার কাছে অসহনীয় লাগতেছিল।

স্নেহার খুব ইচ্ছে করতেছিল আবিরের টেক্সটগুলার উত্তর দিতে। ও নিশ্চয় খুব টেনশন করতেছে। কিন্তু তার ইগো আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠে সেটা ঠেকালো। একটু পরই অভিমানের কাছে আবার ওই অহং বোধ গলে পানি হয়ে গেল। স্নেহা লক্ষ্য করলো, অহং বোধের চেয়ে অভিমানের অনুভূতি অনেক বেশি গভীর আর তীব্র। পর মুহূর্তেই আবার ভাবলো, কোন অধিকারেই বা সে এই অভিমান বুকে জমিয়ে অচেনা এক শহরে রওনা হলো ওই মধ্যরাতে! কার জন্য? তার মনে হতে থাকে, একটা নাথিংনেসের ভেতর সে আরো বড় একটা নাথিংনেস হয়ে যেন পথ হারিয়ে ফেলতেছে।

কিছুক্ষণ আগেই স্নেহা ৩৮ পার হয়ে ৩৯ বছরে পা দিলো! বারোটা বাজতেই বিড় বিড় করে নিজেকে বললো- হ্যাপি বার্থডে, দ্য স্যাডেস্ট লেডি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড! বাসের পাশের সিটে একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা ইতোমধ্যেই ঘুমে স্নেহার কাঁধে ঢলে পড়ছেন। এই বাসে খুব বেশিক্ষণ যে সে জার্নি করতে পারবে না, তা নিজেকে মনে করাতেই কী এক জেদ চাপলো তার। নিজেকে যন্ত্রণা দেওয়ার জেদ বোধহয়। সিদ্ধান্ত নিলো- পাশের সিটের ভদ্রমহিলার মাথার ভার কাঁধে নিয়ে, এই বাসে করেই সে লাস্ট স্টপেজ পর্যন্ত যাবে। বাসের সব যাত্রী নামার পরই সে নামবে।

কিন্তু সিলেটের ঠিক কোন জায়গায় যে এই বাসের শেষ স্টপেজ, এ ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্রও ইলম নাই। স্নেহা মুখটা বাঁকিয়ে ভাবে, যেখানে খুশি যাক। নিরুদ্দেশ হতেই তো সে বের হইছে, কোথায় কখন থামবে, এত ভেবে কাজ কী! তার অপেক্ষায় কোথায় বা কে বসে আছে! তার কোথাও যাওয়ার নেই, তার কাছেও কারোর আসার নেই।

বাসের ভেতরের লাইটটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল। অধিকাংশ মানুষ হয় ঘুমে, নয়তো আধ ঘুমে। বাসের হেল্পার বা কন্ডাক্টর লোকটা আবার গেটের কাছে কমদামি সিগারেট ধরিয়ে বিশ্রী গন্ধ ছড়িয়ে দিছে। স্নেহার পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়ি সব গুলাচ্ছে সস্তা সিগারেটের গন্ধে। এরমধ্যেই ড্রাইভার সাহেব কর্কশ স্পিকারে কুমার শানু ছেড়ে দিছেন, মাশআল্লাহ! কুমার শানু গেয়ে যাইতেছেন- “তু পেয়্যার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কয়ি অউর হ্যায়...তু পাসান্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কয়ি অউর হ্যায়...।”

প্যা-ত্থে-টি-ক- কিছুক্ষণ কুমার শানু আর অনুরাধা পাড়োয়ালের নব্বই দশকের এই ন্যাকা গান কানে যাওয়ার পর স্নেহা একটু জোরেই বিরক্তি প্রকাশ করে ফেললো। কাঁধে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে মহানিদ্রারত সহযাত্রীর নিদ্রায় যদিও তা একটুও আঁচড় ফেলতে পারে নাই। উনাকে কী মলম পার্টি ধরছিল নাকি? মানুষ এমন বেহুঁশ হয়ে ঘুমায় কীভাবে! স্নেহা একবার ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো- কী যে আরামে ঘুমাচ্ছেন, যেন জগতে ঘুমের চেয়ে সুখের আর কিছু নাই! আসলেই নাই মনে হয়। কবে যে স্নেহা শেষ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, মনেই করতে পারলো না। এটাও খুব প্যা-ত্থে-টি-ক বিষয়!

দুইবার সাইফুজ্জামান স্যারের মতো “প্যা-ত্থে-টি-ক” উচ্চারণ করে স্নেহার মুখে হাসি চলে আসলো। ভার্সিটির ফার্স্ট সেমিস্টারটা এই শব্দ এই উচ্চারণে স্নেহা কতবার যে শুনছে, এর কোনো হিসাব নাই। এই শব্দ এইভাবে উচ্চারণে সাইফুজ স্যার ছিলেন বেহিসাবী! সাইফুজ্জামান ইংলিশ ওয়ান ও ওয়ান কোর্স করাতেন আইইউবিতে। স্যারের কার্টুনের মতো মুখটা স্নেহার চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনেকদিন পর।

স্যার ওই একই রকমভাবে চোখের এক ভ্রু উঁচু করে চশমার উপর দিয়ে এক চোখ তুলে ক্লাসে লেট করে আসা সবাইকে এই শব্দ এই উচ্চারণে একবার না একবার হলেও শুনাইছেন! অবশ্য শুধু ক্লাসে দেরি করে আসলেই না, সাইফুজ স্যারের কাছে মনে হয় জগতের সকল কিছুই “প্যা-ত্থে-টি-ক” লাগে, ঠিক যেমন এখন স্নেহার লাগতেছে।

বাসের কর্কশ স্পিকারের অত্যাচার বেশিক্ষণ সাইফুজ স্যারের ভাবনায় স্নেহাকে ব্যস্ত রাখতে পারলো না। এখন অবশ্য গান চেঞ্জ হইছে, তবে শুধু গানটাই চেঞ্জ হইছে, শানু আর অনুরাধা বদলায় নাই। বরং আগের চেয়ে এবারের গান আরো বেশি ভয়ংকর! কী খেয়ে যে নব্বই দশকে ইন্ডিয়ান লিরিসিস্টরা এসব গান লিখে পুরা একটা জেনারেশনকে বরবাদ করছে- ভাবতেছে স্নেহা! পুরুষ কণ্ঠটা “বিন তেরে কুছ ভি নেহিইইইইইইইইইইইইই ম্যায়…” বলে চিৎকার করতেছে, বলা উচিত চিক্কুর পারতেছে!

এরপর সে আবার প্রেমিকাকে অবাস্তব সব ওয়াদা করতে গিয়ে জানাইতেছে- “ম্যায় হার গম উঠা লুঙ্গি, তেরি চাহাত মে”। আর বেকুব প্রেমিকা আবার ওইটা বিশ্বাস করে প্রেমিককে আহ্লাদিত হয়ে বলতেছে, "তেরা সাথ যো ছুটা, এ ওয়াদা যো টুটা, মে খুদ কো মিটা দুঙ্গি, তেরে চাহাত মে…।” 

ওই মুহূর্তে স্নেহার মনে হইতেছিল এই গানের লিরিসিস্টের নম্বর তার কাছে থাকলে সে এখনই কল করে বলতো- কিতনি জিন্দেগি তুনে বরবাদ কিয়া এয়সে ঝুটি লিরিক শুনাকে, মেরি ভাই! তুঝে কয়ি জাহান্নুম মে ভি ঘুসনে নেহি দেগি! বাহ! হিন্দি তো সে ভালোই পারে! মুখে আরেকবার হাসি আসলো স্নেহার।

কিন্তু এই নব্বই দশকের এইসব ছ্যাঁচড়া টাইপ মিথ্যা ওয়াদার গানগুলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেলুনে, ভিসিআর আর ক্যাসেটের দোকানগুলাতে কর্কশ শব্দে শুনাতে শুনাতে একটা পুরা জেনারেশনকে প্রেমের বিষয়ে ফ্যান্টাসিতে ভুগাইছে ভাবতেই ওই টাইমের লিরিসিস্টগুলাকে একেকটা নোবেলজয়ী মাচাদো'র নামের বানান প্রথমে দেখলে যেই ভুল হয়, সেই ভুল নামে ডাকতে ইচ্ছে করলো তার।

এসব লিরিকের ভুক্তভোগী এই যে…মুহতারামা এসনেএএহা…যিনি অচেনা এক নারীর মাথার ভার কাঁধে নিয়ে অচেনা শহরের দিকে গন্তব্যহীন যাত্রা করতেছেন, তাও আবার একজনের জীবনে অযাচিতর মতো বিনা অধিকারের অভিমান পুষে! চল্লিশ বছর বয়সে ব্যাপারটা মোটেও অ্যাডভেঞ্চারাস লাগার কথা না, স্নেহার সেটা লাগতেছেও না। কিন্তু কপাল দোষে এসব গান শুনেই তো তার শৈশব পার হইছে- একটা ব্যর্থ প্রেমে সুইসাইড করা জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেছে সে এখনো, এই বয়সেও, যেন তার বয়স এখনো ওই একুশ-ই আছে!

একটু আগে যেন সে উনচল্লিশ না, একুশ বছর বয়সে পদার্পণের জন্য নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী নারী সম্বোধন করে উইশ করছে! যে কবি এবং একইসঙ্গে প্রেমিকা, জগতে এদের চেয়ে দুঃখী আত্মা আর একটাও থাকার কথা না, অনেক ভাবার পর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছালো স্নেহা। কবি প্রেমে পড়বে মানেই ব্যর্থ হতেই পড়বে। কবিদের কোনো অধিকার নাই ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা ফিরে পাবার।

এ বিষয়ে সফল হয়ে গেলে বিরহ যাপন করে কবিতা লিখবে কে! স্নেহার এই প্রথম নিজের কবি সত্তার প্রতি বিরাট রাগ উঠলো। খামাখাই! অহেতুকই সে নিজেকে বলে উঠলো- কী বাল ফেলে কেউ জগতে কবি হয়ে! আসলে সে জগতের সকল কবির প্রতি বিরক্ত না, বিরক্ত শুধু নিজের উপরই, কিন্তু নিজের জন্মদিনের এই একলা রাতে এই বিরক্তির ভাগীদার পুরা একটা কমিনিউটির উপর ঝেড়ে একটু হালকা হওয়া গেল আর কী!

এরপর স্নেহার মনে হলো জগতে একইসঙ্গে কবি-প্রেমিকা আর সাংবাদিক হওয়া মানে হচ্ছে দুঃখ আর দারিদ্র্যের সিম্বল হয়ে জীবন পার করা। আর্থিক দরিদ্র্যতা নিয়ে স্নেহার মনে কোনো দুঃখ নাই। টাকা-পয়সাকে স্নেহা হাতের ময়লার মতো…না…স্নেহা আরেকটু ভাবে…এটা এপ্রোপ্রিয়েট তুলনা না! কিছু কিছু হাতের ময়লাও এত দ্রুত যায় না, বরং আলোর গতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

ইয়েস…টাকা পয়সা কচ্ছপের গতিতে আসে, আলোর গতিতে চলে যায়। আজকে টাকা থাকবে, কালকে থাকবে না। কালকে না থাকলে পরশু আবার আসবে- এইসব বৈষয়িক দারিদ্র্যের চেয়ে ভালোবাসাহীনভাবে বেঁচে থাকাকে তার কাছে অধিক দৈন্য দশার জীবন মনে হয়। এবং এই দারিদ্র্যে তার মহান হওয়ার কোনো খায়েশ নাই।

এতসব ভাবনাও খুব বেশিক্ষণ বাসের কর্কশ শব্দটাকে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে নাই। এরচেয়ে কানে এয়ারবাড দিয়ে স্পটিফাইতে জুতসই কোনো গান শোনাটাকে স্নেহার ওই মুহূর্তের জন্য ফরজ কাজ মনে হলো। তার স্পটিফাইতে ‘আমোন’ নামের একটা প্লেলিস্ট আছে। তখন পর্যন্ত ওই প্লেলিস্টে গানের সংখ্যা ২৩৩ টা।

এটা একটা বিরাট আর্কাইভের মতো কাজ করে। আমোন প্লে করতেই লিংকিং পার্কের “ইন দ্য এন্ড” শুরু হলো। স্নেহা গান শুনতে শুনতেই ভাবতে লাগলো- গত বছর এই মাসে সে আব্বাকে হারাইছে, এই বছর নিজেই হারায়ে যাচ্ছে, আগামী বছর কি আবি…পুরাটা কল্পনা করার কথা ভাবতেই তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ওই মুহূর্তেও শুরু হইলো। কিন্তু সে ব্যাপারটা ইগনোর করে শুনতে থাকলো-

"ট্রায়িড সো হার্ড অ্যান্ড গট সো ফার

বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার

আই হ্যাড টু ফল টু লুজ ইট অল

বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার...।"

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login