আবির ভিডিও কল দিতেই স্নেহা ওঠে রুমের লাইট জ্বালায়। একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় আবিরকে দেখলো স্নেহা। ওর বুকের ভেতর টর্নেডো বয়ে যাচ্ছিল কিন্তু তবু নিজেকে নরমাল শো করতে ও খুব সংযত হয়ে একটা হাসি দিয়ে বললো- ইট হ্যাজ বিন ফিফটি থ্রি ডেইজ আই হ্যাভ নট সিন ইউ! ওহ মাই গড!
আবির বললো- দ্যাটস ভেরি উইয়ার্ড! এমব্যারাসিং টু! ইউ শুডেন্ট কাউন্ট ডেইজ লাইক দ্যাট। স্নেহা বলে- আই ডোন্ট ডু দিজ ডেলিবরেটলি, ট্রাস্ট মি! বাট আই ডোন্ট ফরগেট ফিউ থিংগস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। তোমার সঙ্গে লাস্ট দেখা হইছে ১৫ ডিসেম্বর। এটা আমি ইচ্ছে করে মনে রাখি নাই, মনে থেকে গেছে। আজকে কয় তারিখ? ৬ ফেব্রুয়ারি পার হয়ে সাতে পড়বে। দ্যাট মিন্স ফিফটি থ্রি ডেইজ। অংকে আই ওয়াজ সো উইক, বাট এটা না চাইলেও মনে থেকে যায়, কী করার!
আবির মুচকি হাসলো! স্নেহা যেন গত ৭ দিনের চার্জ সব একবারেই পেয়ে গেল। ইট ফিলস লাইক অ্যা সোর্স অফ পাওয়ার হাউজ! আবিরের হাসি যে ও কী প্রচণ্ড ভালোবাসে! এই কথা ও আবিরের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম অথবা দ্বিতীয় দিন থেকেই বলে আসতেছে। যদিও আবির খুবই কম হাসে। কিন্তু ও যখন হাসে, স্নেহার কাছে ওইটা একজন জেনুইন, ইনোসেন্ট মানুষের হাসি মনে হয়।
আবিরকে ভালো লাগার আরেকটা কারণ বোধহয় ওর হাসি- স্নেহা ভিডিও কলে ওর দিকে তাকিয়েই ভাবতে থাকে। এরমধ্যেই আবির ওর আরেকটা ফোনে ব্লু টাচের ‘ছায়া’ গানটা প্লে করে নিজেও গলা মেলানো শুরু করে। আস্তে আস্তে গুন গুন করে প্রথমে- "সংগত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি, তোমার প্রশ্নের প্রতি উত্তরে কিছু লিখতে পারিনি।" এরপর "চাঁদ কিংবা তোমার আলো আমার বড্ড লাগে চোখে, মৃত্যুর কফিন আমার মুড়ে দিয়েছি তোমার আড়ালে" গাইতে গেয়ে একটু জোরে টান দেওয়ার পর হঠাৎই ও চোখে হাত দিয়ে কান্না শুরু করে দিলো।
স্নেহা এই দৃশ্যের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। আবির হাউ মাউ করে কাঁদতেছে। স্নেহার বুকটা ব্যথায় মুচড়ে গেলেও আবিরকে ও থামানোর চেষ্টা করলো না। মাঝে মাঝে কান্না মানুষকে রিলিফ দেয়৷ ওর কোনো কারণে কান্না পাচ্ছে, কাঁদুক- স্নেহা ভাবে। কিন্তু ওই দৃশ্য স্নেহার বুকের ভেতরটা তছনছ করে ফেলতেছিল। বেশিক্ষণ ওই দৃশ্য দেখা ওর পক্ষে সম্ভব হলো না। মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ অন্যদিকে সরিয়ে ও খুব সংযত হয়ে ওর চোখ দিয়েও যেন পানি না পড়ে, ওই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। আব্বা বলতো- কোনো সিচ্যুয়েশনে দুইজন মানুষের একসঙ্গে অস্থির হওয়া ঠিক না। একজন অস্থির হলে, আরেকজনের যত কষ্টই হোক, নিজেকে সংবরণ করা লাগে। স্নেহা ওইটাই তখন ট্রাই করতেছিল।
আবির কাঁদতেছে, কেঁদেই যাইতেছে। ওর হাসি যেমন একটা নিষ্পাপ শিশুর মতো সরল, ওর কান্নাও তা-ই। স্নেহা কিছু একটা টের পায়, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না। গানের লিরিক, ওই কান্না- ওইগুলা ডট মিলিয়ে অনেককিছুর মিনিং দাঁড় করানো যায় চাইলে, স্নেহার তখন ওইটা করতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু ও খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারতেছিল, আবির কিছু একটা বলার খুব চেষ্টা করেও কোনো কারণে এই কান্নার মাধ্যমে ওইটা ডিলে করে দিলো।
স্নেহা আর ওই কান্না সহ্য না করতে পেরে বলে ওঠে- হইছে তো, থামো। হইছে। আর কাঁদে না। কী হইছে? এভাবে কাঁদতেছো কেন? বলো…কিছু হইছে? আমি কষ্ট পাচ্ছি। থামো। অনেক কাঁদছো। আবির থামে। মাথা নাড়িয়ে বলে কিছু হয় নাই। এরপর বলে, অনেকদিন পর তোমার ফেসটা দেখে আই কুডেন্ট কন্ট্রোল। আই'ম সর্যি- বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে ও। স্নেহার ভেতরে অনেক হিসাব-নিকাশ খাতা নিয়ে এরইমধ্যে বসে পড়ে। অংক মিলুক বা না মিলুক, স্নেহা জানে- আজ অথবা কাল, আবিরের জীবন থেকে ওকে চলে যেতেই হবে এবং এইসব ঘটনাবলী ওই অন্তিম সময়ের আগে ছোট ছোট ট্র্যাজিডি!
আচমকাই আবির কোনো উইয়ার্ড আচরণ করলে স্নেহা উপরে শান্ত ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে আবিরকে হারানোর ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে। আবিরের কান্নার দৃশ্য আর সম্ভাব্য বিদায়প্রস্তুতির কথা ভাবতেই স্নেহার হঠাৎ করেই ফিল হয় কেউ যেন ওর বুকের উপর একটা ভয়ংকর ভারি পাথর ফেলে চাপ দিয়ে ধরে রাখছে। আবিরের ওই বিরতিহীন কান্না দেখে ও আবার বলে- আবির; এদিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও। কী হইছে? ইউ ওয়ানা সে সামথিং? বলো, কী হইছে? বলো তো। এমন করে না, প্লিজ। কান্না থামাও।
আবির নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলে- আই'ম সর্যি। স্নেহা হাসার চেষ্টা করে বলে- সর্যি কেন, বাবা? আবির কাঁদতে কাঁদতেই বলতে থাকে- আফটার মাই মম, প্রোবাবলি ইউ লাভ মি মোস্ট। বাট আই কান্ট রেসিপ্রোকেট। এই কথা বলার পরই ও আবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। স্নেহা কী বলবে বুঝতে পারছে না। আবির অনেক বড় একটা কথা বলে ফেলেছে। ও হয়তো নিজেও ওই কথার মর্মার্থ জানে কি না- স্নেহার সন্দেহ হয়। আবির কি ড্রাঙ্ক? কিন্তু ওকে দেখে তো মনে হচ্ছে না। তাহলে?
সোবার অবস্থায় আবির এসব বলতেছে মানে তো ও নিজে সত্যি সত্যিই যা ফিল করতেছে, তাই বলতেছে- স্নেহা ভাবে। যদিও ও আগে মনে করতো, মানুষ ড্রাঙ্ক হলেই সবচেয়ে বেশি সত্যি কথা বলে। আবির ওর অনেক হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে দিছে গত দুই বছরে। তবে স্নেহা এটাও বোঝে- কিছু কিছু বিষয়ে স্নেহা ভুল না; বরং আবির নিজের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, বাস্তবতা আর পারিপার্শ্বিকতার কারণে সত্য বলে যা যা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে- ওইগুলা পুরাপুরি ঠিক না।
আবিরের জন্য খুব মায়া হয় স্নেহার। একটা লোক কেঁদে ওকে ভালোবাসতে না পারার অসহায়ত্ব জানাইতেছে। ভালোবাসতে না পারা আর ভালো না বাসা- এই দুইয়ের মধ্যে তো পার্থক্য আছে! স্নেহা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে ভাবে। ওই যে ব্লু টাচের গানটা- ওইটা তো একটা ভুল কনসেপ্ট! এটা তো ঠিক বার্তা দিতেছে না। ওইখানে বলতেছে- সঙ্গত কারণে তোমায় আর আমি ভালোবাসতে পারিনি। ‘আর’ শব্দটা তো এখানে সমস্যাদায়ক। মানে কী? আগে বাসছিলা এরপর সেটা বাদ দিছো? দিতে বাধ্য হইছো, নাকি ওই অনুভূতিটা নষ্ট হয়ে গেছে? বিষয়টা তো ক্লিয়ার না এইখানে।
হয় ভালোবাসো, নয় বাসো না বা কখনোই বাসো নাই। ‘আর’ পারিনি দিয়ে কী বুঝানোর চেষ্টা হলো? নিজের অপারগতা? কিন্তু অপারগ হওয়ার কারণ না বলে স্কুলের নোটিশ বোর্ডের মতো জানিয়ে দেওয়া হলো- অনিবার্য কারণবশত আজকের সকল ক্লাস স্থগিত করা হলো! হলো ভালো কথা, নির্দিষ্টভাবে কারণটা জানিয়ে হওয়া উচিত ছিল না, বা ভালো হতো না? সবারই তো জানার অধিকার থাকে। এরচেয়ে বড় কথা- ভালোবাসছিলা কোনো এক সময়, কোনো এক মুহূর্তের জন্য হলেও, সেটাও তো কোনো গুপ্ত কর্মসূচির মতো ভিন্ন ভিন্ন সিগনাল দিয়ে বোঝালে সবার পক্ষে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বোঝা সম্ভব না। সবকিছু কেমন আবছা, স্পষ্টতা নাই। কেমন এক রহস্যে ঘেরা যেন!
স্নেহা শুধু পারে চোখ দেখে কিছু কিছু বুঝে নিতে, সেটা তো ও বহু আগেই বুঝে নিছিল। কিন্তু প্রতিবারই কাছে এসে সুন্দর সময় কাটিয়ে যখনই ওর চলে যাওয়ার সময় হইছে, আবিরকে কেন ওইসব মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টায় নানা আবোল-তাবোল ব্যবহার করতে হইছে? কেন প্রতিবার চলে যাওয়ার আগে ওকে একটা গিলটি ফিলিং স্নেহার মধ্যে ট্রান্সফার করার ইফোর্ট দিতে হইছে? কোন অপরাধ বোধে? কোন নৈতিকতার দোহাইয়ে? স্নেহা এতে কষ্ট পায়, ওর এতে যন্ত্রণা হয় জানার পরও দিনের পর দিন আবির এটা করে গেছে।
এর সিকিভাগ ইফোর্টটাও যদি ও এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে নিজেও স্বাভাবিক থাকার পেছনে দিতো, অনেক সমস্যা হয়তো বড় হতোই না, স্নেহার এখনো মনে হয়। এর মানে এই না সমস্যা শুধু আবির একাই সৃষ্টি করছে, আর স্নেহা অবলা নারী- ও শুধু যন্ত্রণাই পেয়ে গেছে। স্নেহা জানে, স্বীকারও করে- আবিরের চেয়ে বেশি যন্ত্রণা ও জীবনেও কাউকে দেয় নাই। আবিরের চেয়ে বেশি ভালোও ও কাউকে বাসে নাই।
ব্লু টাচের গানের ওই লাইন দুইটা এমন বিশ্রীভাবে স্নেহাকে বদার করতেছিল তখন। ও আবার ভাবা শুরু করে- হয় তোমাকে কখনো আমি ভালোই বাসি নাই, বা সচেতনভাবেই ভালোবাসতে চাই নাই। পারি নাই আবার কী? বাসছো কিন্তু চাও নাই? নাকি চাইছো কিন্তু বাসতে পারো নাই? এত কনফিউজিং মানুষের ভাবনা আর সম্পর্ক! ওই রাতে ৪৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের ভিডিও কলে প্রায় ৩১ মিনিটই আবির একটু পরপর কেঁদেই গেছে। কিন্তু ও আসলে স্নেহাকে যা বলতে চাইছিল, ওইটাই ওর বলা হয় নাই, বা ও বলতে পারে নাই। সঠিক সময়ে আবিরের স্পষ্ট ভাষায় যা যা বলা দরকার, তা ও কখনোই বলতে পারে নাই। পারে না। সম্ভবত পারবেও না কখনো। আবার যখন যেটা বলার না, যে সময়ে যা বলার না, ওইটাই ও ড্রাঙ্ক হয়ে বেটাইমে বলে বসবে!
স্নেহা ফকিরাপুল বাসস্ট্যান্ডে উবারের বিল দিয়ে নামতে নামতে এসবই ভাবতেছিল। উবার থেকে নেমে ও ফোনটা এয়ারপ্লেন মোডে দিয়ে এনা পরিবহনের কাউন্টার গিয়ে দেখলো- কোন বাসটা তখনই ছাড়ার লাইনে প্রথমে আছে। কাউন্টার থেকে জানালো ৫ মিনিটের মধ্যেই সিলেটের বাস ছাড়বে। ৫৫০ টাকার একটা নন-এসি টিকেট কেটে ও বাসে গিয়ে ওঠে পড়লো। গেটে ঢোকার মুখেই বাসের হেল্পারের মুখ দিয়ে ভু ভু করে ভেসে আসা সস্তা সিগারেটের বিশ্রী গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠলো স্নেহার। এমন না যে ও এসি বাসে যেতে পারতো না। ওর উদ্দেশ্য ছিল যত দ্রুত সম্ভব ঢাকা ছাড়া। ওই কারণেই কোনোকিছু আর না ভেবে ওই বাসের টিকেটই ওর কাটতে হইছিল।
স্নেহার জন্ম, বেড়ে ওঠা- সবই ঢাকাতে। এই শহরের বাইরে না আছে ওর নিজের কোনো ঠিকানা; না আছে ওর বাবা বা মায়েরও কোনো ঠিকানা। দুই পক্ষেরই পৈত্রিক বাড়ি এখানেই। এ কারণেই ওর ধারণা- এই শহরের বাইরে, পৃথিবীর যেই স্বর্গেই ওকে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, তিন দিনের মধ্যেই ও হোম সিকনেসে ভুগে এইখানেই ফিরে আসবে। এই শহরে এত পলিউশন, এত শব্দদূষণ! ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে সময় চলে যায় ট্রাফিক জ্যামে বসে। তবুও এই শহরই স্নেহার নিজস্ব, খুব প্রিয়, সবচেয়ে আপন। অথচ ওই রাতে এই শহরটাই ওর কাছে ভীষণ রকম অসহনীয় হয়ে ওঠছিল।
স্নেহার খুব ইচ্ছে করতেছিল আবিরের টেক্সটগুলার উত্তর দিতে। ও নিশ্চয় খুব টেনশন করতেছে, স্নেহার মনে হতে থাকে। কিন্তু ওর ইগো আবারও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ওই ইচ্ছা দমন করালো। একটু পরই আবার অভিমানের কাছে ওর ওই অহং বোধ গলে পানি হয়ে গেল। স্নেহা লক্ষ্য করে- অহং বোধের চেয়ে অভিমানের অনুভূতি অনেক বেশি গভীর আর তীব্র। পর মুহূর্তেই আবার ও ভাবে, কোন অধিকারেই বা ও এই অভিমান বুকে জমিয়ে অচেনা এক শহরে রওনা হলো ওই মধ্যরাতে? কার জন্য? ওর মনে হতে থাকে, একটা নাথিংনেসের ভেতর ও আরো বড় একটা নাথিংনেস হয়ে যেন পথ হারিয়ে ফেলতেছে।
বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পরই স্নেহা ৩৮ পার হয়ে ৩৯ বছরে পা দিলো! বারোটা বাজার পর ও নিজেকে বিড় বিড় করে বলে- হ্যাপি বার্থডে, দ্য স্যাডেস্ট লেডি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড! স্নেহার পাশের সিটে বসা একজন মধ্য বয়স্ক ভদ্রমহিলা ততক্ষণে ঘুমিয়ে স্নেহার কাঁধে ঢলে পড়েন। ওই বাসে খুব বেশিক্ষণ ও জার্নি করতে পারবে না, এটা নিজেকে মনে করাতেই ওর ভেতর একটা জেদ চেপে বসলো। নিজেকে যন্ত্রণা দেওয়ার জেদ সম্ভবত।
সঙ্গে সঙ্গেই ও সিদ্ধান্ত নিলো- পাশের সিটের ওই ভদ্রমহিলার মাথার ভার কাঁধে নিয়ে ওই বাসেই ও লাস্ট স্টপেজ পর্যন্ত যাবে। বাসের সব যাত্রী নামার পরই ও লাস্ট স্টপেজে গিয়ে বাস থেকে নামবে। কিন্তু সিলেটের ঠিক কোন জায়গায় যে ওই বাসের শেষ স্টপেজ, এ ব্যাপারে ওর বিন্দুমাত্রও ইলম ছিল না। স্নেহা মুখটা বাঁকিয়ে ভাবে- যেখানে খুশি যাক, নিরুদ্দেশ হতেই তো ও বের হইছে! কোথায় কখন থামবে, এত ভেবে কাজ কী! ওর অপেক্ষায় কোথায় বা কে বসে আছে? ওর কোথাও যাওয়ার নাই, কিচ্ছু করার নাই! ওর কাছেও আসার কথা নাই কারো। ওর মনে হয়, কবীর সুমনের মতো কোনো গানওয়ালাকে তখন সামনে পেলে সেও বলে ওঠতে পারতো- “এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই…ও গানওয়ালা আরেকটা গান গাও…আমার আর কোথাও যাবার নেই…কিচ্ছু করার নেই…"।
বাসের ভেতরের লাইটটা কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল। অধিকাংশ মানুষ হয় ঘুমে, নয়তো আধ ঘুমে। বাসের হেল্পার বা কন্ডাক্টর লোকটা আবার গেটের কাছে কমদামি সিগারেট ধরিয়ে বিশ্রী গন্ধটা ছড়িয়ে দিল। স্নেহার পেটের ভেতর আবার নাড়িভুঁড়ি সব গুলিয়ে আসলো ওই সস্তা সিগারেটের গন্ধে। এরমধ্যেই ড্রাইভার সাহেব কর্কশ স্পিকারে কুমার শানু ছেড়ে দিলেন, মাশআল্লাহ! কুমার শানু ওইখানে গাইতেছেন- “তু পেয়্যার হ্যায় কিসি অউর কা, তুঝে চাহতা কয়ি অউর হ্যায়...তু পাসান্দ হ্যায় কিসি অউর কি, তুঝে মাঙ্গতা কয়ি অউর হ্যায়...।”
প্যা-ত্থে-টি-ক! কিছুক্ষণ কুমার শানু আর অনুরাধা পাড়োয়ালের নব্বই দশকের ওই চরম প্যারাদায়ক গানটা কানে যাওয়ার পর স্নেহা একটু জোরেই বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলে। কাঁধে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে মহানিদ্রারত সহযাত্রীর নিদ্রায় যদিও তা একটুও আঁচড় ফেলতে পারে নাই। উনাকে কী মলম পার্টি ধরছিল নাকি? মানুষ এমন বেহুঁশ হয়ে ঘুমায় কীভাবে! স্নেহা একবার ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো- কী যে আরামে ঘুমাচ্ছেন উনি, যেন জগতে ঘুমের চেয়ে সুখের আর কিছু নাই! আসলেই নাই মনে হয়। কবে যে স্নেহা শেষ ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে, মনেই করতে পারলো না। এটাও খুব প্যা-ত্থে-টি-ক বিষয়!
দুইবার সাইফুজ্জামান স্যারের মতো “প্যা-ত্থে-টি-ক” উচ্চারণ করে এত বিরক্তির মধ্যেও স্নেহার মুখে হাসি চলে আসে। ভার্সিটির ফার্স্ট সেমিস্টারটা ওই শব্দ ওই উচ্চারণে ও যে কতবার শুনছে, এর কোনো হিসাব নাই। ওই শব্দ ওইভাবে উচ্চারণে সাইফুজ স্যার ছিলেন বেহিসাবী! আইইউবিতে সাইফুজ্জামান স্যার ইংলিশ ওয়ান ও ওয়ান কোর্স করাতেন। উনার কার্টুনের মতো মুখটা স্নেহার চোখের সামনে ভেসে ওঠলো অনেকদিন পরে।
স্যার ওই একই রকমভাবে চোখের এক ভ্রু উঁচু করে চশমার উপর দিয়ে এক চোখ তুলে ক্লাসে লেট করে আসা সবাইকে ওই শব্দ ওই উচ্চারণে একবার না একবার হলেও শুনাইছেন! অবশ্য শুধু ক্লাসে দেরি করে গেলেই না, সাইফুজ স্যারের কাছে মনে হয় জগতের সকল কিছুই “প্যা-ত্থে-টি-ক” লাগে, ঠিক যেমন তখন স্নেহার লাগতেছিল। বাসের কর্কশ স্পিকারের অত্যাচার বেশিক্ষণ সাইফুজ স্যারের ভাবনায় স্নেহাকে ব্যস্ত রাখতে পারলো না।
গান অবশ্য ততক্ষণে চেঞ্জ হইছে। তবে শুধু গানটাই চেঞ্জ হইছে, শানু আর অনুরাধা বদলায় নাই। বরং আগের চেয়ে পরেরবারের গান আরো বেশি ভয়ংকর! কী খেয়ে যে নব্বই দশকে ইন্ডিয়ান লিরিসিস্টরা এসব গান লিখে পুরা একটা জেনারেশনকে বরবাদ করছে- স্নেহা ভাবে! পুরুষ কণ্ঠটা “বিন তেরে কুছ ভি নেহিইইইইইইইইইইইইই ম্যায়…” বলে চিৎকার করতেছিল। বলা উচিত চিক্কুর পারতেছিল! এরপর সে প্রেমিকাকে অবাস্তব সব ওয়াদা করতে গিয়ে জানাইলো- “ম্যায় হার গম উঠা লুঙ্গি, তেরি চাহাত মে”। আর বেকুব প্রেমিকাও ওইটা বিশ্বাস করে প্রেমিককে আহ্লাদিত হয়ে বললো- "তেরা সাথ যো ছুটা, এ ওয়াদা যো টুটা, মে খুদ কো মিটা দুঙ্গি, তেরে চাহাত মে…।”
মরণ! ওই মুহূর্তে স্নেহার মনে হইতেছিল ওই গানের লিরিসিস্টের নম্বর ওর কাছে থাকলে তখনই ও কল করে বলতো- কিতনি জিন্দেগি তুনে বরবাদ কিয়া এয়সে ঝুটি লিরিক শুনাকে, মেরি ভাই! তুঝে কয়ি জাহান্নুম মে ভি ঘুসনে নেহি দেগি! বাহ! ওইটা বলার পর স্নেহার মনে হলো- ও তো হিন্দি বেশ ভালোই পারে! মুখে আরেকবার হাসি আসে ওর। কিন্তু নব্বই দশকের এইসব ছ্যাঁচড়া টাইপ মিথ্যা ওয়াদার গানগুলা রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেলুনে, ভিসিআর আর ক্যাসেটের দোকানগুলাতে কর্কশ শব্দে বাজাতে বাজাতে একটা পুরা জেনারেশনকে প্রেমের বিষয়ে যে ফ্যান্টাসিতে ভুগাইছে- ওইটা ভাবতেই ওই টাইমের লিরিসিস্টগুলাকে একেকটা নোবেলজয়ী মাচাদো'র নামের বানান প্রথমে দেখলে যেই ভুল হয়, ওই ভুল দেখা বানানে ডাকতে ইচ্ছা করলো ওর।
এসব লিরিকের ভুক্তভোগী…মুহতারামা এসনেএএহা নিজে…যিনি অচেনা এক নারীর মাথার ভার কাঁধে নিয়ে অচেনা শহরের দিকে গন্তব্যহীন যাত্রা করছেন, তাও আবার একজনের জীবনে অযাচিতর মতো বিনা অধিকারের অভিমান পুষে! চল্লিশ বছর বয়সে ব্যাপারটা মোটেও অ্যাডভেঞ্চারাস লাগার কথা না, স্নেহার ওইটা লাগতেছিলও না। কিন্তু কপাল দোষে ওইসব গান শুনেই তো ওর শৈশব পার হইছে! একটা ব্যর্থ প্রেমে সুইসাইড করা জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করতেছে ও এখনো, এই বয়সেও, যেন ওর বয়স এখনো ওই একুশ-ই আছে!
এর একটু আগেই ওর বয়স যেন উনচল্লিশ না, একুশ হইছে! আর ও নিজের একুশ বয়সে পদার্পণের জন্য নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী নারী সম্বোধন করে উইশ করছে! যে কবি এবং একইসঙ্গে প্রেমিকা- জগতে এদের চেয়ে দুঃখী আত্মা আর একটাও থাকার কথা না, অনেক ভাবার পর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায় স্নেহা। কবি প্রেমে পড়বে মানেই ব্যর্থ হতেই পড়বে। কবিদের কোনো অধিকার নাই ভালোবাসার বদলে ভালোবাসা ফিরে পাবার।
এ বিষয়ে সফল হয়ে গেলে বিরহ যাপন করে কবিতা লিখবে কে! স্নেহার ওই প্রথম নিজের কবি সত্তার প্রতি বিরাট রাগ ওঠে। খামাখাই! অহেতুকই ও নিজেকে বলে ওঠে- জগতে কবি হয়ে কী বাল ফেলে কেউ! আসলে ও জগতের সকল কবির প্রতি বিরক্ত না, বিরক্ত শুধু নিজের উপরই। কিন্তু নিজের জন্মদিনের ওই একলা রাতে ওই বিরক্তির ভাগীদার পুরা একটা কমিনিউটির উপর ঝেড়ে একটু হালকা হতে চাইলো আর কী!
এরপর স্নেহার মনে হলো, জগতে একইসঙ্গে কবি, প্রেমিকা এবং সাংবাদিক হওয়া মানে হচ্ছে দুঃখ আর দারিদ্র্যের সিম্বল হয়ে জীবনটা পার করে দেওয়া। আর্থিক দরিদ্র্যতা নিয়ে স্নেহার মনে কোনো দুঃখ নাই। টাকা-পয়সাকে ও হাতের ময়লার মতো…না…ও আরেকটু ভাবে…এটা এপ্রোপ্রিয়েট তুলনা না! কিছু কিছু হাতের ময়লা এত দ্রুত মুছে না, বরং আলোর গতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ইয়েস! টাকা পয়সা কচ্ছপের গতিতে আসে, আলোর গতিতে চলে যায়।
আজকে টাকা থাকবে, কালকে থাকবে না। কালকে না থাকলে পরশু আবার আসবে- এইসব বৈষয়িক দারিদ্র্যের চেয়ে ভালোবাসাহীনভাবে বেঁচে থাকাকে ওর কাছে অধিক দৈন্য দশার জীবন মনে হয়। এবং এই দারিদ্র্যে ওর মহান হওয়ার কোনো খায়েশ নাই বলেই ওর মনে হলো। এতসব ভাবনাও খুব বেশিক্ষণ বাসের কর্কশ শব্দটাকে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারলো না। এরচেয়ে কানে এয়ারবাড দিয়ে স্পটিফাইতে জুতসই কোনো গান শোনাটাকে ওর ওই মুহূর্তের জন্য ফরজ কাজ মনে হলো। ওর স্পটিফাইতে ‘আমোন’ নামের একটা প্লেলিস্ট আছে। তখন পর্যন্ত ওই প্লেলিস্টে গানের সংখ্যা ৩৮৬ টা! এটা একটা বিরাট আর্কাইভের মতো কাজ করে।
আমোন প্লেলিস্টটা প্লে র্যান্ডম প্লে করতেই লিংকিং পার্কের “ইন দ্য এন্ড” শুরু হয়ে গেল। গান শুনতে শুনতেই স্নেহা ভাবতে লাগলো- গত বছর ওই মাসেই ও আব্বাকে হারাইছে। এই বছর নিজেই হারায়ে যাচ্ছে। আগামী বছর কি আবি…পুরাটা কল্পনা করার কথা ভাবতেই ওর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ওই মুহূর্তেও শুরু হলো। কিন্তু ও ব্যাপারটাকে ইগনোর করে শুনতে থাকলো-
ট্রায়িড সো হার্ড অ্যান্ড গট সো ফার
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার
আই হ্যাড টু ফল টু লুজ ইট অল
বাট ইন দ্য এন্ড, ইট ডাজেন্ট ইভেন ম্যাটার...