গ্রামটার নাম হাড়িপাড়া। নামটা শুনলেই কেমন যেন একটা গা ছমছমে অনুভূতি হয়। গ্রামের ঠিক শেষ মাথায়, যেখানে ঘন বাঁশবাগান আর পুরনো বটগাছটা মিলে একটা অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো তৈরি করেছে, তার ওপারেই শ্মশান। অমাবস্যার রাতে সেই শ্মশানের দিক থেকে আসা পোড়া মাংসের গন্ধ আর শেয়ালের ডাক যে কারও রক্ত হিম করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এই গ্রামেই বাস করত রতন। বাইরে থেকে দেখলে তাকে অত্যন্ত সাধারণ একজন মানুষ মনে হবে, কিন্তু তার ভেতরের অন্ধকার এতটাই গভীর ছিল যে, সেখানে আলো পৌঁছানোর কোনো উপায় ছিল না। রতনের বড় ভাই, লোকমান, ছিল অত্যন্ত ধনী এবং দয়ালু। ভাইয়ের এই উন্নতি আর সুখ রতনের সহ্য হতো না। সম্পদের লোভ আর অন্ধ ঈর্ষা রতনকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখান থেকে আর ফেরার পথ নেই। সে সিদ্ধান্ত নিল, লোকমানকে শুধু পৃথিবী থেকে সরালেই হবে না, তার পুরো বংশ নির্বংশ করতে হবে, আর সেটা করতে হবে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক উপায়ে।
রাত তখন ঠিক দুটো। বৃষ্টির তোড়ে চারপাশের পৃথিবী যেন ধুয়ে মুছে যাচ্ছে। রতন এক হাঁটু কাদা ভেঙে পৌঁছাল শ্মশানের একেবারে শেষ প্রান্তে, যেখানে বাস করত অঘোরী তান্ত্রিক কালভৈরব। কালভৈরবের চেহারায় মানুষের কোনো ছাপ নেই; সারা গায়ে চিতার ভস্ম, চোখ দুটো জবার মতো লাল, আর গলায় মরা সাপের হাড়ের মালা।
"কী চাস তুই?" ভৈরবের গলাটা যেন পাতাল থেকে উঠে এল।
"আমার ভাইয়ের সব কিছু চাই। ওর মৃত্যু চাই। ওর পরিবারের প্রতিটি সদস্যের মৃত্যু চাই... তিলে তিলে, ধুঁকে ধুঁকে।" রতনের গলায় কোনো কাঁপুনি নেই, আছে শুধু এক পৈশাচিক আক্রোশ।
ভৈরব এক বিকট হাসি হাসল। "কালোজাদুর দুনিয়ায় এমনি এমনি কিছু মেলে না রতন। পিশাচ জাগাতে হলে তাকে রক্ত আর কাঁচা মাংস দিতে হয়। আর তার দাম দিতে হয় নিজের আত্মাকে বিকিয়ে।"
রতন রাজি হলো। মানুষ তার লোভের বশবর্তী হয়ে কতটা নিচে নামতে পারে, তার প্রমাণ হিসেবে রতন সেদিন এক সদ্যমৃত শিশুর লাশের অংশবিশেষ তুলে দিল ভৈরবের হাতে। শুরু হলো এক বীভৎস পূজা। চিতার আগুনে ঘি আর মরা মানুষের হাড়ের গুঁড়ো ঢালতেই আগুনের রং হয়ে গেল নীল। ভৈরবের মন্ত্রোচ্চারণের সাথে সাথে চারপাশের বাতাস বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল। বাঁশবাগান থেকে হাজার হাজার বাদুড় একসাথে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল। একটা কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী শ্মশানের মাটি ফুঁড়ে উঠল, আর সেই ধোঁয়ার ভেতর থেকে দুটো জ্বলজ্বলে হলুদ চোখ রতনের দিকে তাকাল।
চুক্তি সম্পন্ন হলো। পিশাচ মুক্ত হয়েছে।
পিশাচের প্রথম শিকার হলো লোকমানের ছোট ছেলে, আট বছরের রাতুল।
পরদিন সকালে তাকে পাওয়া গেল তাদের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে। তার মৃত্যুটা কোনো সাধারণ মৃত্যু ছিল না। ছেলেটার হাত-পায়ের হাড় এমনভাবে ভাঙা ছিল, যেন কোনো অতিকায় দানব তাকে দু'হাতে ধরে নিংড়ে দিয়েছে। তার চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছিল, আর মুখটা হাঁ হয়ে ছিল—যেন মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে সে এমন কিছু দেখেছিল যা মানুষের কল্পনারও অতীত।
গ্রামের মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। কিন্তু এটা তো ছিল কেবল শুরু।
ঠিক তিন দিন পর, লোকমানের স্ত্রী রহিমা বেগমের পালা। মাঝরাতে লোকমানের ঘুম ভাঙল স্ত্রীর গোঙানির শব্দে। সে দেখল, রহিমা খাটের উপর ছটফট করছে। তার গলা দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ বের হচ্ছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—তার নাক আর মুখ দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে কালো, আঠালো মাটি। ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ, অথচ রহিমার ফুসফুস কীভাবে যেন সেই শ্মশানের মাটিতে ভরে যাচ্ছে। চোখের সামনে দম বন্ধ হয়ে, আক্ষরিক অর্থেই মাটি বমি করতে করতে মারা গেলেন রহিমা বেগম।
লোকমান পাগলপ্রায় হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না এই অদৃশ্য, নির্মম শত্রু কে। কিন্তু রতন তখন মনে মনে হাসছে। ভাইয়ের এই যন্ত্রণা তার কাছে অমৃতের মতো লাগছিল।
ধীরে ধীরে লোকমানের পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেল। একেকজনের মৃত্যু ছিল আগের জনের চেয়েও ভয়াবহ। কাউকে পাওয়া গেল নিজের আঙুল নিজে চিবিয়ে খাওয়া অবস্থায়, আবার কাউকে পাওয়া গেল ঘরের সিলিং থেকে চামড়া ছাড়ানো অবস্থায় ঝুলতে। এক মাসের মধ্যে লোকমানের সাজানো সংসার পরিণত হলো এক মৃত্যুপুরীতে। শেষ পর্যন্ত শোক আর আতঙ্কে লোকমান নিজেই একদিন গলায় দড়ি দিল।
সব সম্পত্তি এখন রতনের। সে এখন হাড়িপাড়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ। তার মুখে এক অহংকারী হাসি। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল কালোজাদুর সবচেয়ে বড় নিয়ম—পিশাচের ক্ষুধা কখনো মেটে না। তাকে একবার জাগালে, সবার রক্ত পান করার পর সে তার মনিবের দিকেই ফেরে।
অমাবস্যার রাত আবার ফিরে এসেছে। রতন তার নতুন প্রাসাদের দোতলায় মখমলের বিছানায় শুয়ে ছিল। হঠাৎ চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে এল। সেই চেনা, পচা মাংসের গন্ধটা তার নাকে এল। ঘরের কোণে রাখা প্রদীপটা দপ করে নিভে গেল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে ফিসফিস করে কেউ একজন বলে উঠল, "রতন... আমার খুব খিদে পেয়েছে রে..."
রতনের শরীরের সমস্ত রক্ত হিম হয়ে গেল। সে দৌড়ে ঘরের দরজা খুলতে গেল, কিন্তু দরজাটা যেন দেয়ালের সাথে মিশে গেছে। ঘরের ছায়াগুলো দীর্ঘ হতে শুরু করল। একটা অদৃশ্য, শীতল হাত খপ করে রতনের পা চেপে ধরল। রতন চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
অদৃশ্য শক্তিটা রতনকে শূন্যে তুলে আছড়ে ফেলল মেঝেতে। রতন অনুভব করল, তার শরীরের ভেতরের শিরা-উপশিরাগুলো কেউ যেন একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলছে। পিশাচ তাকে খুন করার আগে উপভোগ করতে চাইছিল। রতনের যে সোনার প্রতি এত লোভ ছিল, পিশাচ তার সিন্দুক থেকে সেই সোনার কয়েনগুলো বের করে আনল। রতনের মুখটা জোর করে হাঁ করিয়ে, একটার পর একটা জ্বলন্ত সোনার কয়েন তার গলার ভেতর ঢুকিয়ে দিতে শুরু করল। রতনের গলা, খাদ্যনালী পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল। যন্ত্রণায় তার চোখ দুটো ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। মানুষ যতটা নিচে নেমেছিল, তার শাস্তিও হলো ততটাই নির্মম এবং বীভৎস।
পরদিন সকালে রতনের কাজের লোক ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। মেঝেতে পড়ে থাকা রতনের বিকৃত লাশ দেখে সে সেখানেই জ্ঞান হারাল। রতনের পেটটা ফালাফালা করে চেরা, আর তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে রক্তমাখা সোনার কয়েন।
হাড়িপাড়া গ্রামে এখনো অমাবস্যার রাতে শ্মশানের দিক থেকে এক অদ্ভুত গোঙানির শব্দ শোনা যায়। কেউ বলে ওটা রতনের আত্মা, যে এখনো তার লোভ আর পিশাচের মাঝে আটকে আছে।