Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ডার্ক কমেডি

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

149
View

এমনিতেই নন-এসি বাস, তার উপর আবার এনা! বাস ছুটতেছে তু-ফা-নের গতিতে। রাত দুইটার কিছু পর ১৫ মিনিটের যাত্রা বিরতি দিলো ভৈরবে। নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার ইচ্ছা থাকলেও কাঁধ থেকে একজন ঘুমন্ত মানুষের মাথাকে কীভাবে সরাবে স্নেহা বুঝতে পারতেছিল না। তবে উপরওয়ালা দয়াপরবশত হয়ে সম্ভবত বাস থামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভদ্রমহিলাকে প্রকৃতির ডাকে ঘুম থেকে জাগালেন। এটাই আজকের জন্মরাতে তার গিফট ফ্রম অলমাইটি।

স্নেহা নিচে নামলো। ভেপটা সঙ্গেই ছিল, কয়েক পাফ মেরে কিছুক্ষণ হাঁটতেই বাসের হর্ন বাজানো শুরু হয়ে গেল। অতঃপর বাসে উঠে একদম পেছনে কিছু সিট খালি দেখতে পেয়ে সেখানে বসতে এগিয়ে যেতে যেতে স্নেহা নিজেকে বললো- নো মার বার্ডেন ফর টুনাইট! হ্যাভ রিলাক্স, ইয়ং লেডি। কিন্তু মন রিলাক্স হতে চায় না তার। অনেক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, আবির নিশ্চয় স্নেহার রেসপন্স না পেয়ে টেনশন করতেছে- এই ভাবনা বারবার অস্থির করে তুললেও স্নেহা ওই রাতটা শুধু নিজের যন্ত্রণাটা নিয়ে ভাবতে চাইলো, নিজেকে নিজের সঙ্গে রাখতে চাইলো, যেভাবে তার ইচ্ছা করবে, যেভাবে সে নিজের যন্ত্রণা কমাতে পারবে।

পেছনের সিটে আর বসা হয় না। একদম পেছনের সিটের চিপায় একটা কম বয়সী কাপল বসে আছে, এটা দূর থেকে স্নেহা খেয়াল করতে পারে নাই। ইশ! হুট করে কাছে গিয়ে তাদেরও অস্বস্তিতে ফেলছে, নিজেও অস্বস্তিতে এখন পুরা রাস্তা যেতে হবে ভাবতেই নিজের উপর বিরক্তিটা আরেক দফা বাড়লো তার। আর কোনো অপশন না পেয়ে নিজের আগের সিটে গিয়েই তার বসতে হলো।

বাসের লাইট আবারও বন্ধ হয়ে গেল। কর্কশ লাউড স্পিকারে এখনও নব্বইয়ের পিন পিন- "বাআআস এক সানাম চাহিয়ে এ এ এ...আশিকিকে লিয়ে...।" স্নেহা এয়ারবাড খুলে ‘আমোন’ প্লে করতেই শাফকাত আমানত আলী এক অচেনা শহরের অজানা যাত্রায় মন ভেজাতে গেয়ে ওঠলেন- "ম্যায় লাখ যাতন কার হারি, লাখ যাতান কার হার রাহি...মোরা সাইয়্যান মো সে বোলে না...।" কিন্তু মনের বদলে ভিজে উঠলো চোখ!

ভালোবাসায় জুনুনের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেলে মানুষ আর কতক্ষণ পর্যন্ত রাগ-অভিমান পুষে রাখতে পারে, সে ভাবতেছিল। নাকি সেসব আরো বেশি তীব্র হয়? আবিরের জন্য মায়া হয় স্নেহার, খুব মায়া হয়। সম্ভবত এই স্তরের সব অনুভূতি প্রচণ্ড তীব্র। এসব ভাবনা আর শাফকাত আমানত আলীর কণ্ঠের আকুলতা স্নেহার দুই চোখের একটাকে করে তোলে সুরমা, অন্যটাকে কুশিয়ারা, আর এই দুই নদীধারা তার চিবুকে এসে কালনী নদী হয়ে চলে যায় বুকের বঙ্গোপসাগরের ভার আরেকটু বাড়াতে। নিজের কান্নাকেও এমনভাবে সে ধারাবর্ণনা করলো যেন তার পুরা জীবনটাই একটা ডার্ক কমেডি।

আবির প্রায়ই স্নেহার কোনো লেখা পড়লেই বলে- ইটস ডার্ক! টু ডার্ক! স্নেহা তখন উত্তর দেয়- আমার পুরো জীবনটাই তো ডার্ক! আবির বলে রাইট সামথিং চেয়ারফুল, গিভ সাম লাইট টু আদার্স। স্নেহা বুঝতে পারে না, যে জীবন বিষণ্নতায় ভরপুর, সে কীভাবে চেয়ারফুল কিছু লিখবে? যে জীবন অন্ধকারে পরিপূর্ণ, সে-ই বা কীভাবে আলো ছড়াবে? মানুষ তো মূলত নিজেকে লেখে, নিজের চারপাশকে লেখে। সব জীবন রূপকথার মতো না, ইন ফ্যাক্ট কারো জীবনই রূপকথার মতো হওয়ার কথা না। এভ্রিওয়ান হ্যাজ দেয়্যার ওউন সাফারিংস।

প্রত্যেকের কাছেই নিজের যন্ত্রণা বড়। অন্যেরটা আমরা কেবল বোঝার ভণিতা করি, কেউ-ই বুঝি না। বোঝার চেষ্টা বলতে আমরা যা করি, সেটা বড়জোর নিজের কষ্টের সঙ্গে তুলনা করে মুখে বলে দেওয়া- আই ক্যান ফিল অর আই ক্যান অ্যান্ডারস্ট্যান্ড! আদতে ঘোড়ার আন্ডা। মানুষ মনে মনেও বরং আরেকজনের ওই কষ্টের চেয়ে তার নিজের কষ্টটা আরো কত বেশি জটিল, এই হিসাব নিকাশ করে শেষ সিদ্ধান্তে আসে- আমারটাই বড় কষ্ট! অমুক-তমুক-বেবাকেরটাই আমার কষ্টের চেয়ে কিছুটা কম যন্ত্রণার।

নাহ! এই সুঁইয়ে আজকে আর পুলসিরাত পার হওয়া যাবে না, স্নেহা বুঝতে পারলো! মেহদি হাসান থেকে শুরু করছিল লম্ফঝম্প সুঁইকে বশে আনতে। এরমধ্যে ফতেহ আলী সাহেব কিছুক্ষণ জানাইয়া গেছেন “তুমহে দিললাগি ভুল যা নে পারহে গি, মোহাব্বত কি রাহু ম্যাঁয় আ কার তো দেখো..”। তবুও সুঁইয়ের লাফানো বন্ধ হয় নাই। কিন্তু সুঁইয়ের খোঁজে এখন নিচে নামা লাগবে ভাবতেই ভাল লাগতেছে না।

এরচেয়ে ফতেহ আলীর গজলের পরের লাইনটায় মনে দিলো স্নেহা, বাহ! বেশ মনে ধরছে তার! সিলেবাসে কমন পড়ছে বোধহয়। লাইনটা লজিক্যালও। উনি পরের লাইনে বলতেছেন, “তাড়াপনে পে মেরে না ফির তুম হাসো গে/ কাভি দিল কিসিসে লাগা কার তো দেখো।” আমার জুতায় পা দিয়ে হাঁইটা দেখোর মতো লাগলেও এটাই বাস্তব! ফতেহ আলী সাহেবের লজিক্যাল ব্যাপারটা দুইবার রিপিট দিয়ে শুনলো স্নেহা।

তার একটু পর বেগম আখতার কত দুঃখ নিয়ে বলে গেলেন- “আমি তো রাখিনি তারে বেঁধে, শুধু ভুল করেছি ভালোবেসে…চুপি চুপি চলে না গিয়ে, সে কেন বিদায় নিলো না হেসে?” উনি এত দুঃখ নিয়ে কারে এই অভিযোগ জানাইছেন আল্লাহই জানেন! আল্লাহকেই মনে হয় জানাইছেন, যার নামে জানাইছেন, স্নেহা শিওর ওই ব্যক্তিকেও আল্লাহ এইভাবেই দুঃখ দিয়ে দিছেন, সে ভাবে। এই গজল রুহ ছিঁড়ে বের হওয়া কণ্ঠ থেকে আসা…কারো রুহতে কষ্ট পৌঁছে গেলে আল্লাহ ওই কষ্টের কারণকেও শান্তিতে থাকতে দেন না বলে স্নেহার বিশ্বাস।

তবে এই দুনিয়ায় হেসে বিদায় নেওয়াটা তো কঠিন কাজ আসলে। এরজন্য বিরাট বড় কলিজা লাগে। এত বড় কলিজা স্নেহার অন্তত এখন আর নাই, এই বিষয়ে আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পর নিশ্চিত হতে পারছে সে। অথচ স্নেহার আম্মা যে জীবনে কতবার স্নেহাকে বলছেন- “তোর শরীরের পুরাটাই কলিজা”। অবশ্যই তা প্রশংসামূলক বাক্য হিসেবে বলতেন না, বলতেন নেগেটিভ অর্থে অথবা সোজা বাংলায় ঠেস মারতে। একটু রাত করে বাড়ি ফিরলেই এই ডায়লগ; আম্মার মতের বাইরে গিয়ে কিছু করলেও এই ডায়লগ! কতবার কতকিছু নিয়ে যে এটা তাকে শুনতে হইছে! আহারে!

স্নেহার হুট করেই আম্মার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো। বুকের মধ্যে একটা নিঃশূন্য অঞ্চল খাঁ খাঁ করে উঠলো যেন। স্নেহা ভাবতেছে- কত কত কারণে যে কত বিরক্ত হইছে সে আম্মার উপর। আম্মার কথা সহ্য হয় না বলে কতবার সে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। কতটা বছর সে একা থাকছে এখানে-সেখানে নিজের মতো করে। আর এখন! আব্বার মতো আম্মাও যদি চলে যায়? ঠেস মারুক, গালমন্দ করুক, চিল্লাচিল্লি করে অসহ্য বানিয়ে দেক, তাও তো আছে। চলে গেলে তো কেউ এসব করারও থাকবে না। আম্মার জন্য কষ্ট হইতেছে স্নেহার, খুব কষ্ট, খুউউউউউব বেশি কষ্ট! স্নেহা ফ্লোরের মধ্যেই দুই পা আর হাত জোড় করে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়লো যেন সে মায়ের জঠরে ফিরে যাইতে চাইতেছে। যেন সে চাইতেছে আম্মা তার নাড়ি দিয়ে যেন স্নেহাকে ওইখানেই পেঁচিয়ে রেখে দেয়, এই দুনিয়াকে যেন তার আর ডিল করতে না হয়।

আম্মাও চলে গেলে, কাকে নিয়ে স্নেহা অভিযোগ করবে- এই মহিলা আমাকে সারা জীবন জ্বালাইছে বলে? আল্লাহ কেন তার বান্দাদের ক্যান্সারের মতো সর্বনাশা অসুখে মারেন? এত ভুগিয়ে, এত কষ্ট দিয়ে! স্নেহার ধারণা ছিল আব্বার পর তার ডাকটাই বাকিদের চেয়ে আগে আসবে, এখনো সে এটাই বিশ্বাস করতে চায়। আবির সবসময় স্নেহাকে বলতো, তোমার আগে আমি চলে যাবো, দেইখো! বয়সে আমি তোমার চেয়ে বড়, হিসাবে আমিই যাবো আগে।

কিন্তু আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় আনেন নিজের হিসাবে, ফিরায়ে নেনও তার হিসাব মোতাবেকই। এই হিসাব-নিকাশ শুধু তিনিই ভালো জানেন। তাছাড়া আবির স্নেহার চেয়ে মাত্র দুই মাস দশ দিনের বড়! কিন্তু কথায় কথায় ভাবটা এমন করবে যে সে বিরাট মুরুব্বী! প্রতিদিন অন্তর অন্তর অন্তত একবার সে বলবেই- “উই আর গেটিং ওল্ড।" সঙ্গে সঙ্গে স্নেহাও বলে উঠে- তুমি, আমি না! চল্লিশ বছরে নাকি কেউ বুড়া হয়, তাও আবার বেটা-ছেলে!

নবীজী নব্যুয়াতই লাভ করছেন চল্লিশ বছর বয়সে। জীবন শুরুই হয় চল্লিশের পর থেকে। যদিও স্নেহা বুঝতে পারে আবির কেন বারবার এই কথা স্নেহাকে মনে করায়। প্রেম কমানোর জন্য। ভেঙে বলতে পারে না যে আমরা তো আর নাইন-টেনের নিব্বা-নিব্বি না, কথায় কথায় তুমি গাল ফুলাইয়ো না অথবা এত প্রেম দেখাইয়ো না, আশাও কইরো না, শেষ পর্যন্ত তো আমি…আবিরের এসব না বলা কথা স্নেহা নিজে নিজে বুঝে নেয়। কিছু সময় ঠিক বুঝে, কিছু সময় ভুল। এটাই আবির আর স্নেহার সম্পর্কের মূল সমস্যা বলে মনে হয় তার।

এই সমস্যাটা ওভারলুকের কারণে…থাক! গানের মতো মেমোরির রি-ওয়াইন্ডে গিয়ে কদর্য মুহূর্তগুলো মনে করতে ইচ্ছে করলো না এখন আর। যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ বলে একটা প্রবাদের কথা মনে করে বরং মেজাজটা খিঁচে গেল তার। শোওয়া থেকে সটান করে উঠে বসে বললো- শালা, আমার যায় দিনও খারাপ, আসে দিন আরো বেশি খারাপ! গত দুই মাসের কদর্য স্মৃতি মনে করার চেয়ে বরং এক বছর আগের রাতে সিলেটের ওই জার্নির কথা মনে করা তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণার মনে হলো।

ওইবার সত্যিই সত্যিই স্নেহা সিলেট শহরের লাস্ট স্টপেজেই গিয়ে নামছিল। বাসের সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পরে হেল্পার তাকে ডেকে বললো, আপা, লাস্ট স্টপেজ, কই নামবেন আপনে? জায়গাটার নাম কদমতলী। স্নেহার পাশের সিটের ঘুমন্ত পাখিটা নিজের গন্তব্যে আসতেই কী সুন্দর কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে আরও দুই স্টপেজ আগেই নেমে গেল। দুনিয়ার মানুষের ভেতরে কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই, ঘুমন্ত পাখি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্নেহার এই ফিল হলো। সারা রাত এই মহিলার কোনো প্রেমিকও তাকে এমনভাবে কাঁধ পেতে দিয়ে রাখে নাই মাথা রাখার জন্য, স্নেহা এই স্টেটমেন্ট কনফিডেন্টলি দিতে পারে।

কৃতজ্ঞতা বোধ স্নেহারও নাই আসলে। আবিরের সমস্যা স্নেহা কিছুটা বোঝে। অনেককিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্নেহাকে মেইন্টেইন করা তার জন্য যেমন ডিফিকাল্ট, তেমন রিস্কেরও। নিজের সাধ্যের গণ্ডির মধ্যে থেকে সে অনেক সময় চেষ্টা করে স্নেহাকে একটু টেক্সটে টাইম দিতে। কিন্তু সমস্যা তো টাইমে না। সমস্যা টাইমিংয়ে। সমস্যা আবিরের এই সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়ার। সমস্যা ক্লিয়ারিটির। সমস্যাগুলো কিছুটা জটিল কিন্তু অসমাধান যোগ্য না।

এরপরও আবির স্নেহার পাশে থাকলে যেই ফিলটা দেয়, শুধুমাত্র এ কারণেই তো সারা জীবন আবিরের প্রতি স্নেহার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। শুধুমাত্র প্রতিবার বিদায়ের মুহূর্তে আবিরের বকওয়াজগুলো ছাড়া, হি ইজ ট্রুলি অ্যা জেনুইন জেন্টলম্যান। কিন্তু একটা নেহাতই ভদ্রলোকের টাইম সেন্স কত খারাপ হলে ৪৬ ঘণ্টা দুইটা মানুষ এত তীব্র সুন্দর সময় কাটিয়ে বিদায় নেওয়ার সময় বলে- আই লাভ ইউ, এবং এর পর পরই আমাদের আর কখনো দেখা হবে না! এটা কিছু হইলো!

না হলে না হবে, যখন হবে না, তখন দেখা যাবে। এটা কেন বারবার বলে বলে সে একটা মানুষকে এভাবে যন্ত্রণার মধ্যে রাখবে প্রতিবার যাওয়ার সময়? আবার এটা যে একটা যন্ত্রণার বিষয়, সেটাও সে বুঝতে পারবে না তখন! পরে হাজারবার সর‍্যি হবে, এবং সেইম রিপিটেশন চলতেই থাকবে। একই কাজ সে করেছিল স্নেহা যেদিন রাজশাহী থেকে ফিরবে, সেদিনও। ৬ ফেব্রুয়ারির রাতে ভিডিও কলে আবিরের কান্না দেখে স্নেহার অস্থির লাগে। মনে হয় আবির কিছু একটা বলতে চেয়েও পারতেছে না। স্নেহাকে সে না পারতেছে একেবারে বিদায় বলতে, না পারতেছে এই সম্পর্কটাকে কোনো একটা ফরমেটে একনলেজ করতে।

আবির নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বে পুড়তেছে, কিন্তু সেটা নিয়ে খোলাখুলি কথাও সে বলতে চায় না অশান্তির ভয়ে। সে চায় শান্তি, স্নেহাও তাই চায়, কিন্তু দুজনের চাওয়াটা যেখানে মিলতে পারে শান্তভাবে সমাধান খুঁজতে চেয়ে সমঝোতার মাধ্যমে, কথা বলে। সেটা আর হয় না। এক সময় স্নেহা নাকি ছিল আবিরের পিস অফ হার্ট। যদিও ওইটা ড্রাঙ্ক অবস্থায় বলা কথা। এখন স্নেহা আবিরের জীবনে সমস্ত অশান্তির কারণ। শান্তিটা বজায় রাখা যেত, হয়েছে তার উল্টা।

ওই রাতে কান্নাকাটির পর নরমাল হয়ে আবির খুব ক্যাজুয়ালিই স্নেহাকে বলতেছিল, রাজশাহীর দিকে কখনো আসলে জানাইয়ো, একসঙ্গে ডিনার করবোনে। যেহেতু স্নেহা ওই নব্বই দশকের "বেতাবি কেয়া হোতি হে, পুছো মেরে দিল সে, তানহা তানহা লওটা হু মে তো ভারি মেহফিল সে, মারনা যায়ু কাহি, হো কে তুমসে জুদা…নাজার কে সামনে, জিগার কে পাস…কয়ি রেহতা হ্যায়…ও হো তুম" শুনে পিচ্চিকালেই পাকনা ঝুনা হইছে, ফলে রাজশাহীর দিকে আসলে জানাইয়োর মধ্যে থেকে সে ‘কখনো’ কথাটা বেমালুম সাইডে রেখে বাকিটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিছে এবং তার বেতাবি এমন পর্যায়েই চলে গেল যে সে ওই রাতেই বসে বসে ‘গো জায়ান’ থেকে এক সপ্তাহ পরের ঢাকা টু রাজশাহীর প্লেনের টিকেট বুক করে ফেলছে। এরপর হোটেল বুক করাও ডান! কিন্তু সমস্যা হয়ে গেছে ওই “কখনো”টা যখন এরপর স্নেহা সাইড থেকে আবার জায়গামতো সেট করে রি-ওয়াইন্ডে গেল।

রাজশাহীতে যাওয়ার কথা টিকেট কাটার চারদিন পর বহু দ্বিধাদ্বন্দ্বে স্নেহা বলতে পারছিল। সেটাও যে কতকিছু, কতবার কতভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে তারপর গিয়ে বলছে। এখন ওই কথা ভাবতে গেলে তার নিজের প্রতি মায়াই লাগে! কী এক কথায় আবির বলতেছিল ওর স্কুল লাইফের ব্যান্ডের কথা। স্কুলের এক প্রোগ্রামে সে গিটার বাজাইতেছে, এমন একটা ভিডিও সে দেখাইছিল স্নেহাকে আগে। স্নেহা ওইটাকে ক্যাশ করে বললো- নিজের কানে না শুনলে আমি কারো এসব ফাঁকা বুলি বিশ্বাস করি না! হাহ! গান না শুনে আমি কীভাবে বুঝবো সে এক সময় ভালো গাইতো।

আবির উত্তর দিলো, ছেড়ে দিছি অনেক আগে। অ্যান্ড আই'ম অ্যা শাই গায়, ইউ নো দ্যাট, রাইট? স্নেহা তখন বলে দিল, ১৩ তারিখের বিকালের ফ্লাইটে রাজশাহী যাচ্ছি। কেউ যদি গান শোনাতে কিছুক্ষণের জন্য সময় বের করতে পারে, অথবা কোনো এক রেস্টুরেন্টে দূর থেকে ৫ মিনিটের জন্য দেখা- দূরত্ব যতই হোক, আমরা আছি কাছাকাছির মতো। সেটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আর কী! পঞ্চবটী গিয়ে যাকে পাবো, ধরে গান শুনে চলে আসবো! আবির এই টেক্সটের উত্তর দিতে সময় নেয়। ওর সময় নেওয়া উত্তরের অর্থ কিছুটা হলেও স্নেহা এখন বুঝতে পারে। অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয় আবিরের। তাদের দুজনের জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন স্নেহা বোঝে। সে তো মুক্ত বিহঙ্গ, তার বিশাল দুই ডানা, কিন্তু সব পাখি বিশাল ডানা থাকলেই উড়তে পারে না।

আবিরকে কাছে পেলে স্নেহা যেমন খুশি ডানায় হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াতো, উড়তে উড়তে বেশি উঁচুতে সম্ভবত চলে গেছিল, যেখানে যাওয়ার আসলে তার এক্সেস নাই। ওখান থেকে ফিরে আসার পথটাও তার জানা ছিল না। ওই উচ্চতার বেশি তাকে নিয়ে উড়ার ক্ষমতা, ইচ্ছা, সাধ্য, সামর্থ্য কোনোটা আবিরেরও ছিল না। শেষ পর্যন্ত পাখ ভেঙেছে দুজনেরই। কে বেশি দোষী, কার দোষ কম- এত বাইনারি না বিষয়গুলা। তবে স্নেহা এখনো মনে করে, ছোট ছোট অস্পষ্ট রাখা সমস্যাগুলা সমাধানের সুযোগ ছিল। আবির সেগুলো তাৎক্ষণিক অশান্তির ভয়ে জমিয়ে রেখে বাড়তে দিছে। সেসবই এখন দাবানল হয়ে সবই পুড়ালো। কারো ঘর, কারো পুরা দুনিয়াটাই!

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login