Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ডার্ক কমেডি

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

316
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

এমনিতেই নন-এসি বাস, এর উপর আবার এনা! বাস উড়াধুড়া ছুটতেছে তু-ফা-নের গতিতে। রাত দুইটার পর ১৫ মিনিটের যাত্রা বিরতি দিলো ভৈরবে। নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার ইচ্ছা থাকলেও কাঁধ থেকে একজন ঘুমন্ত মানুষের মাথাকে কীভাবে সরাবে, বুঝতে পারতেছিল না স্নেহা। তবে উপরওয়ালা দয়াপরবশত হয়েই সম্ভবত বাস থামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভদ্রমহিলাকে প্রকৃতির ডাকে ঘুম থেকে জাগালেন। ওই জন্মরাতে ওইটাই স্নেহার গিফট ফ্রম অলমাইটি বলে মনে হলো।

নিচে নেমে হাঁটতে হাঁটতে কয়েক পাফ ভেপ টানতেই শুরু হয় বিরতি শেষের হর্ণ বাজানো। অতঃপর বাসে উঠে একদম পেছনে কিছু সিট খালি দেখতে পায় ও। ওইদিক বসার জন্য আগাতে আগাতেই বলতে থাকে- নো মার বার্ডেন ফর টুনাইট! হ্যাভ অ্যা রিলাক্স, ইয়ং লেডি। কিন্তু মন তো রিলাক্স হতে চায় না আসলে। অনেক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে, আবির নিশ্চয় টেক্সটের রেসপন্স না পেয়ে টেনশন করতেছে খুব? এই ভাবনা মনকে বারবার অস্থির করে তুললেও ওই রাতটা স্নেহা শুধু নিজের যন্ত্রণা নিয়েই ভাবতে চাইলো; নিজেকে নিজের সঙ্গে রাখতে চাইলো, যেভাবে ওর ইচ্ছা করবে, যেভাবে ও নিজের যন্ত্রণা কমাতে পারবে বলে ওর মনে হবে।

পেছনের সিটে আর স্নেহার বসা হয় না শেষ পর্যন্ত। লাস্ট রো-এর একদম কর্নার সিটে বসে ছিল কম বয়সী এক জোড়া কপোত-কপোতী। চোখে চশমা না থাকায় দূর থেকে ও খেয়াল করতে পারে নাই আসলে। ইশ! হুট করে সামনে গিয়ে ওদের কী অস্বস্তিতেই না ফেলে দিলো! বাকি রাস্তাটা এই একই অস্বস্তিতে ওরও জার্নি করতে হবে ভেবেই নিজের উপর বিরক্তিটা বাড়লো আরেক দফা। আর কোনো অপশন না থাকায় নিরুপায় হয়ে বসতে হলো ওই আগের সিটেই।

গাড়ি চলা শুরু হতেই আবারও লাইট বন্ধ হয়ে নব্বইয়ের আরেকটা বেহুদা গান বেজে উঠলো লাউড স্পিকারে- "বাআআস এক সানাম চাহিয়ে…এএএ...আশিকিকে লিয়ে...।” বিরক্তি থেকে বাঁচতে কানে ইয়ারবাড গুঁজতে হলো আবারও। র‍্যান্ডম ‘আমোন’ প্লেলিস্টটা প্লে করতেই, অচেনা শহরের ওই অজানা যাত্রায় মন ভেজাতে গেয়ে উঠেন শাফকাত আমানত আলী- "ম্যায় লাখ যাতন কার হারি, লাখ যাতান কার হার রাহি...মোরা সাইয়্যা মো সে বোলে না...।” কিন্তু মনের বদলে ভিজে উঠে চোখ! এর মাস খানিক পর বৃষ্টিস্নাত দুপুরবেলায়; রাজশাহীর এক নির্জন রাস্তায় পার্ক করা গাড়ির ভেতরে, ওই একই গান সম্ভাব্য বিচ্ছেদের অব্যক্ত বেদনায় দীর্ঘক্ষণ আরো একবার দুই জোড়া চোখকে ভিজিয়ে তুলেছিল।

ভালোবাসায় জুনুনের স্তরে পৌঁছে গেলে মানুষ আর কতক্ষণ পর্যন্ত রাগ-অভিমান পুষে রাখতে পারে, স্নেহা বোঝার চেষ্টা করে। নাকি আরো বেশি তীব্র হয় এইসব অনুভূতি? আবিরের জন্য মায়া হয় ওর, খুব মায়া হয়। সম্ভবত এই স্তরের সব অনুভূতিই প্রচণ্ড তীব্র। এইসব ভাবনা আর শাফকাত আমানত আলীর কণ্ঠের আকুলতা ওর দুই চোখের একটাকে করে তোলে সুরমা, অন্যটাকে কুশিয়ারা। ওই দুই নদীধারা চিবুকে গিয়ে গড়ায় কালনী নদী হয়ে। থামে না কোথাও। বুকের বঙ্গোপসাগরের ভার আরেকটু বাড়াতে সোজা বয়ে চলে যায়, বইতেই থাকে। নিজের কান্নাকেও ও এমনভাবে ধারা বর্ণনা দিতেছিল যেন ওর পুরা জীবনটাই একটা ‘ডার্ক কমেডি’!

আবির ওর কোনো লেখা পড়লে অধিকাংশ সময়ই বলতো- ইটস ডার্ক! টু ডার্ক! স্নেহা হেসে জবাব দিতো- আমার পুরা জীবনটাই তো ডার্ক! আবির ওকে বলতো- রাইট সামথিং চেয়ারফুল। গিভ সাম লাইট টু আদার্স, গিভ সাম হোপ। স্নেহা বুঝতে পারতো না- যে জীবন বিষণ্নতায় ভরপুর, কীভাবে তা চেয়ারফুল কিছু লিখবে? যে জীবন অন্ধকারে পরিপূর্ণ, কীভাবেই বা তা আলো ছড়াবে? মানুষ তো মূলত নিজেকে, নিজের চারপাশকেই লেখে। সব জীবন তো আর রূপকথার মতো না।

ইন ফ্যাক্ট, কোনো জীবন বা কারো জীবনই রূপকথার মতো হওয়ার কথা না। এভ্রিওয়ান হ্যাজ দেয়্যার য়ৌন সাফারিংস। প্রত্যেকের কাছেই নিজের যন্ত্রণাটা বড়। স্নেহার মনে হয়, অন্যেরটা আমরা কেবল বোঝার ভণিতা করি; কিন্তু কেউ-ই আসলে ঠিকঠাক বুঝি না। বোঝার চেষ্টা বলতে আমরা বড়জোর নিজের কষ্টের সঙ্গে অন্যেরটা তুলনা করে বলি- আই ক্যান ফিল অর আই ক্যান অ্যান্ডারস্ট্যান্ড! আদতে ঘোড়ার আন্ডা। মানুষ মনে মনেও বরং আরেকজনের কষ্টের তুলনায় নিজের কষ্টটাকেই বড় হিসাবে জাস্টিফাই করতে থাকে নানা উপায়ে। নিজের সিচ্যুয়েশনকে অন্যের চেয়ে আরো বেশি জটিল বিবেচনায় নিয়ে নানা রকম হিসাব নিকাশ শেষে সিদ্ধান্তে আসে- আমার সিচ্যুয়েশনটাই বেশি ডিফিকাল্ট! আমার কষ্টটাই জগতের সবচেয়ে বড় কষ্ট! অমুক-তমুক আর বেবাকেরটাই এই কষ্টের চেয়ে কিছুটা ছোট, কিছুটা কম যন্ত্রণার।

নাহ! এই সুঁই দিয়ে আজকে আর পুলসিরাত পার হওয়া যাবে না, স্নেহা বুঝতে পারে! মেহদি হাসান থেকে শুরু করছিল লম্ফঝম্প সুঁইকে বশে আনতে, এরমধ্যে উনি চলে গিয়ে ফতেহ আলী সাহেব এসে কিছুক্ষণ জানিয়ে গেছেন- “তুমহে দিললাগি ভুল যা নে পারহে গি, মোহাব্বত কি রাহু ম্যায় আ কার তো দেখো..।” তবুও সুঁইয়ের লাফানো বন্ধ হইতেছে না। আরেকটা আনমোল রতনের খোঁজে এখন নিচে নামতে হবে ভাবতেই প্যারা লাগা শুরু হলো ওর। এরচেয়ে ও ফতেহ আলীর পরের লাইনটায় মনোযোগী হওয়ার কথা ভাবে। বাহ! পরের লাইন ওর বেশ মনে ধরছে! সিলেবাসে কমন পড়ছে বোধহয়। বেশ লজিক্যালও লাগতেছে। উনি এখানে বলতেছেন, “তাড়াপনে পে মেরে না ফির তুম হাসো গে…কাভি দিল কিসিসে লাগা কার তো দেখো।” 

আপাতদৃষ্টিতে লাইনটাকে “আমার জুতায় পা দিয়ে হাঁইটা দেখো”র মতো শোনালেও, এটাই বাস্তবতা! নিজের লাইফে সেইম এক্সপেরিয়েন্স না থাকলে অন্যের সিচ্যুয়েশন আসলে কারোই ফিল করা পসিবল না। এই ফিল না করতে পারা বা না বুঝতে পারাও খুবই স্বাভাবিক। কেউ কেউ হয়তো অন্যের পরিস্থিতি জেনুইনলিই বোঝার ট্রাই করে, কিন্তু নিজের অনভিজ্ঞতার কারণে পুরাপুরি বুঝতে পারা তাদের জন্য ডিফিকাল্ট হয়। কিন্তু বাস্তবতা হইতেছে, অধিকাংশ মানুষই অন্যের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন না। সেটাতেও সমস্যা নাই। সমস্যা হইতেছে- নিজে কিচ্ছু বুঝবেও না, বোঝার ট্রাইও করবে না, অথচ জাজমেন্টাল হবে, অন্যের সিচ্যুয়েশনের ঠিক-বেঠিক খুঁজবে! অদ্ভুত দুনিয়ার বিচিত্র মানুষ এরা! অথচ ব্রুটাল ট্রুথ হইতেছে- লাইফের কোনো না কোনো মোড়ে তাদেরও হয়তো ঠিক একই সিচ্যুয়েশনের মুখামুখি হওয়া লাগে। তখনই কেবলমাত্র তারা বুঝতে পারেন- দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অন্যের যেই সিচ্যুয়েশনে খুব সহজেই হাসা অথবা জাজমেন্টাল হওয়া যাইতেছিল, ওই একই পরিস্থিতিতে এসে নিজের দাঁড়ানো অতটা সহজ লাগতেছে না! জগতের এইসব প্যাঁচগোছ নিয়ে ভাবতে ভাবতে ফতেহ আলী সাহেবের লজিক্যাল ব্যাপারটা আরো দুইবার রিপিট বাটনে চেপে শুনলো স্নেহা।

ওই গজল শেষ হতেই প্রচণ্ড দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ের পুরাটাই কণ্ঠস্বরে প্রতিস্থাপন করে বেগম আখতার গাওয়া শুরু করলেন- "আমি তো রাখিনি তারে বেঁধে, শুধু ভুল করেছি ভালোবেসে…চুপি চুপি চলে না গিয়ে, সে কেন বিদায় নিলো না হেসে?” এত দুঃখ নিয়ে কাকে উনি এই অভিযোগ জানালেন আল্লাহই জানেন! মনে হয় আল্লাহকেই। তবে যার নামেই জানাক না কেন, স্নেহা নিশ্চিত- অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও আল্লাহ একইভাবেই যন্ত্রণায় ভুগাইছেন। কারো রুহ পর্যন্ত কষ্ট পৌঁছালে, সৃষ্টিকর্তা ওই কষ্টের কারণকেও শান্তিতে থাকতে দেন না বলেই ওর বিশ্বাস। তবে ভালোবেসে যে বেগম সাহেবা ভুল করছেন, এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ পোষণ করতেছে না স্নেহা। ভালোবাসা ব্যাপারটাই তো একটা ভুলে ভরা পদ্যের মহাসংকলন! কিন্তু উনার পরের লাইন খানিকটা গোলমেলে লাগলো ওর। উনার ভালোবাসার মানুষ কেন চুপিচুপি চলে গেলেন, কেন উনার কাছ থেকে হেসে বিদায় নিলেন না যাওয়ার আগে- এইটাই তো মূলত অভিযোগ, না কি? স্নেহা বোঝার চেষ্টা করে ও ঠিক ট্র্যাকে আছে কি না। মনে হয়, আছে।

যে যাওয়ার, সে তো এইভাবে চুপিচুপিই যায়। হেসে সুন্দরভাবে বিদায় নেওয়ার ধার কি আসলে সে ধারে? এইটা হলো এক রকম যাওয়া; যারা চোর-জোচ্চর; মিথ্যুক-প্রতারক-ঠকবাজ, যাদের সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ উঠে গেছে, মায়া-অনুভূতি যাদের আর নাই- এইসব কেসে। এরা থাকলেই কী, গেলেই কী? এদের বিদায়ে কান্নাকাটিরই বা আছে কী? এখন মালিকা-ই-তারান্নুম যেই ভালোবাসার কথা বলতেছেন, সেটা আবার ডিফরেন্ট কেস লাগতেছে স্নেহার। জুনুন বা জুনুনের কাছাকাছি কিছু একটা হবে। তো ওইখানে বিদায়টা তো মূলত বিচ্ছেদ। বিচ্ছেদের সময় ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে হেসে বিদায় নেওয়া দুনিয়ার যে কোনো মাশুক-মাশুকার জন্য কঠিন কাজই আসলে। বেগম আখতার ওর সামনে বসে আছেন, আর ও এই সুরের সম্রাজ্ঞীর সঙ্গে বিচ্ছেদ বিষয়ক ফিলোজফি নিয়ে সিরিয়াস বাতচিতে মগ্ন আছেন, এমন ভঙ্গীতে খালি ঘরের ভেতর রীতিমতো হাত নাড়াতে নাড়াতে স্নেহা কথা বলেই যাইতেছে- যার হৃদয়ে ইশক আছে, সে কি হাসতে হাসতে তার আশিক বা মাশুকার কাছ থেকে বিদায় নিতে পারে কখনো, ওস্তাদ? সম্ভব কখনো? এটা বিরাট কঠিন কাজ, এরজন্য প্রয়োজন বিশাল কলিজার।

এত বড় কলিজা স্নেহার আর এখন নাই- এই বিষয়ে আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পর ও নিশ্চিত হতে পারছে। অথচ আম্মা জীবনে যে ওকে কতবার বলছেন- তোর শরীরের পুরাটাই কলিজা। অবশ্যই উনি প্রশংসামূলক বাক্য হিসেবে এই কথা বলতেন না কখনোই। নেগেটিভ অর্থেই বলতেন, অথবা সোজা বাংলায়- ঠেস মারতে! একটু রাত করে বাড়ি ফিরলেই এই ডায়লগ দিতেন; তার মতের বাইরে গিয়ে কিছু করলেও একই ডায়লগ! কতকিছু নিয়ে যে কতবার ওর এই কথা শুনতে হইছে জীবনে! আহারে! হুট করেই ওর আম্মার জন্য মনটা কেমন করে উঠলো। বুকের মধ্যে যেন একটা নিঃশূন্য অঞ্চল খাঁ খাঁ করতেছে।

কত কত কারণে যে ও বিরক্ত হইছে উনার উপরে। আম্মার কথা সহ্য হতো না বলে কতবার যে ও বাড়ি ছেড়েও চলে গেছে। কতটা বছর একা থাকছে এখানে-সেখানে নিজের মতো করে। আর এখন! আম্মাও যদি আব্বার মতো চলে যান? ঠেস মারুক; গালমন্দ করুক, চিল্লাচিল্লি করে অসহ্য বানিয়ে দেক, তাও তো আছে! চলে গেলে তো এসব করারও কেউ থাকবে না আর। আম্মার জন্য কষ্ট হইতেছে স্নেহার, খুব কষ্ট, খুউউউউউব বেশি কষ্ট!

ফ্লোরের মধ্যে দুই হাত-পা জোড় করে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়ে ও; যেন মায়ের জঠরে ফিরে যাইতে চাইতেছে, যেন চাইতেছে- নাড়ি দিয়ে প্যাঁচিয়ে আম্মা ওকে তার ভেতরে রাখুক আবার। এই দুনিয়াকে যেন ওর ডিল করতে না হয় আর কোনোদিনই। আম্মা চলে গেলে, এই মহিলা আমাকে সারা জীবন জ্বালাইছে- বলে কাকে নিয়ে আর অভিযোগ করবে? আল্লাহ কেন তার বান্দাদের ক্যান্সারের মতো সর্বনাশা অসুখে মারেন? এত ভুগিয়ে, এত কষ্ট দিয়ে! ওর ধারণা ছিল, আব্বার পর আল্লাহর তরফ থেকে ওর ডাকটাই আসবে প্রথমে। এখনো ও এইটাই বিশ্বাস করে।

আবির সবসময় বলতো- তোমার আগে আমি চলে যাবো, দেইখো! বয়সে আমি তোমার বড়, হিসাবে আমারই যাওয়ার কথা আগে। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় আনেন নিজের হিসাবে, ফিরিয়েও নেন তার হিসাব মোতাবেকই। এই হিসাব-নিকাশ ভালো জানেন শুধু তিনিই। ওর থেকে মাত্র দুই মাস দশ দিনের বড় আবির! কিন্তু কথায় কথায় ভাবটা এমন করতো যেন সে বিরাট মুরুব্বি! কয়দিন পর পরই অন্তত একবার করে বলতো- উই আর গেটিং ওল্ড। যতবার ও এইটা বলছে, সঙ্গে সঙ্গে স্নেহাও বলে দিতো- তুমি, আমি না!

চল্লিশ বছরে নাকি কেউ বুড়া হয়! তাও আবার বেটা-ছেলে! নবীজি নব্যুয়াতই লাভ করছিলেন চল্লিশ বছর বয়সে। জীবন শুরুই হয় চল্লিশের পরে। যদিও আবির বারবার কেন এই কথা ওকে মনে করিয়ে দিতো, স্নেহা ঠিকই জানে। প্রেম কমানোর জন্য। ওরা যে নাইন-টেনের নিব্বা-নিব্বি না, এটা আর আবির ওকে ভেঙে বলতে পারতো না! আরো বলতে পারতো না- কথায় কথায় তুমি গাল ফুলাইয়ো না, অথবা এত প্রেম দেখাইয়ো নাএত প্রেম আশাও কইরো নাশেষ পর্যন্ত তো আমি…

আবিরের ওইসব অব্যক্ত কথা ও নিজে নিজেই বুঝে নিতো মাঝেমাঝে। কিছু সময় ঠিক বুঝতো, কিছু সময় ভুল। এই অস্পষ্টতাই ওদের সম্পর্কের মূল সমস্যা বলে মনে হয় ওর। এই সমস্যাটা ওভারলুকের কারণেই…থাক! গানের মতো মেমোরির রি-ওয়াইন্ডে গিয়ে কদর্য মুহূর্তগুলা মনে করার ইচ্ছা হইতেছে না এখন। যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ- বলে প্রচলিত প্রবাদটার কথা মনে করে বরং মেজাজটা আরো খিঁচে গেল ওর। মেঝে থেকে সটান করে উঠে ও বলে- শালা! আমার যায় দিনও খারাপ, আসে দিন আরো বেশি খারাপ!

গত দুই মাসের কদর্য স্মৃতি মনে করার চেয়ে বরং এক বছর আগের রাতে সিলেটের ওই জার্নির কথা মনে করা ওর তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণার মনে হলো। ওইবার সত্যিই সত্যিই সিলেট শহরের লাস্ট স্টপেজে গিয়েই নামে ও। বাসের সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর হেল্পার ডেকে বলে- আপা, লাস্ট স্টপেজ! আপনে কই নামবেন? জায়গাটার নাম কদমতলী। স্নেহার পাশের সিটের ঘুমন্ত পাখিটা নিজের গন্তব্যে আসতেই কী সুন্দর কাঁধ থেকে মাথা উঠিয়ে আরও দুই স্টপেজ আগেই নেমে গেল। দুনিয়ার মানুষের ভেতরে কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই আসলে! ঘুমন্ত পাখি নেমে যাওয়ার পর পরই ওর ওই ফিল হলো। সারা রাত ওই মহিলার কোনো প্রেমিকও মাথা রাখার জন্য তাকে এমনভাবে কাঁধ পেতে দিয়ে রাখে নাই কখনো, এই বিষয়ে ও এক হাজার পারসেন্ট নিশ্চিত!

কৃতজ্ঞতা বোধ ওরও কি আছে আসলে? আবিরের সমস্যা কিংবা ইস্যুগুলা কিছুটা বোঝে ও। অনেককিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্নেহাকে মেইন্টেইন করা আবিরের জন্য যেমন ডিফিকাল্ট, রিস্কেরও। নিজের সাধ্যের গণ্ডির মধ্যে থেকে ও অনেক সময় চেষ্টা করে স্নেহাকে একটু টেক্সট করে টাইম দিতে। কিন্তু সমস্যা তো টাইমে না, টাইমিংয়ে। সমস্যা আবিরের এই সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়ায়। সমস্যা ক্লিয়ারিটিরও। সমস্যাগুলা কিছুটা জটিল হলেও সবসময়ই সমাধানযোগ্য ছিল। এইসব বাদ দিলে, শুধুমাত্র পাশে থাকার সময়টুকু আবির ওকে যেই ফিলটা সবসময় দিয়ে গেছে, ওই কারণেই তো সারা জীবন স্নেহার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ওর প্রতি। ও তো কৃতজ্ঞও আসলে। মাথা নত হওয়ার পাশাপাশি, চোখও বন্ধ হয়ে আসে ওর আবিরের প্রতি ওই কৃতজ্ঞতা বোধে।

প্রতিবার বিদায়ের আগে আবিরের বাকওয়াজগুলা বাদ দিলে, হি ইজ ট্রুলি অ্যা জেনুইন জেন্টলম্যান, নো ডাউট অ্যাবাউট দ্যাট। কিন্তু একটা নেহাতই ভদ্রলোকের টাইম সেন্স কতটা খারাপ হলে, টানা ৪৬ ঘণ্টা এত তীব্র, ভয়ংকর সুন্দর সময় কারো সঙ্গে কাটানোর পর, বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্তে সে বলতে পারে- আই লাভ ইউ, এবং এর পরপরই- উই উইল নেভার মিট এগেইন! এটা কিছু হলো! দেখা না হলে না হবে; যখন হবে না, তখন দেখা যাবে। এটা বারবার বলে বলে কেন ও প্রতিবার যাওয়ার সময় একটা মানুষকে এইভাবে যন্ত্রণার মধ্যে রেখে যাবে? আবার এটা যে যন্ত্রণাদায়ক একটা ব্যাপার, সেটাও ও ওই সিচ্যুয়েশন ক্রিয়েট করার সময় বুঝতেই পারে না! পরে হাজারবার সর‍্যি হবে, এবং এগেইন ওই একই রিপিটেশনই চলবে, চলতেই থাকবে। একই কাজ স্নেহা রাজশাহী থেকে ফেরার দিনও করছিল ও। দুইটা বছর, প্রতিবার বিদায়বেলা এই যন্ত্রণা স্নেহাকে সহ্য করতে হইছে।

একটা মানুষের সহ্যেরও তো সীমা থাকে! প্রতিবার বিদায়ের মুহূর্তে এমন ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কেউ যদি এক সময় অল্পতেই রিয়্যাক্ট করা শুরু করে অথবা প্রতিবারই বিদায়ের মুহূর্তে আগের ট্রমাকে ট্রিগার করে যদি তার আচরণকে প্রভাবিত করা হয়, তাহলে এর পেছনের কারণ না বুঝতে চেয়ে, তার রিয়্যাকশনকে পাগলামী আর তাকে 'পাগল' তকমা দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক আসলে? একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্নেহা ভাবে- এইসবের উত্তর কে দেবে? ও তো অনেক অনেক প্রশ্নকে চুপ করিয়ে রাখছিল গলা চেপে ধরে। চুপচাপ থেকেই বাকিটা জীবন আবিরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাইছিল। এভাবে দূর থেকেও পাশে থাকার অনুভূতি নিয়েই তো এই একটা জীবনট কাটিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছে, সেটাও কপালে সইলো না কেন?

৬ ফেব্রুয়ারির রাতের ভিডিও কলে আবিরের কান্না স্নেহাকে অস্থির করে। ওর মনে হয়, কিছু একটা বলতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত বলতে পারে নাই ও। না পারতেছে ও স্নেহাকে একবারে বিদায় বলতে, না পারতেছে ওদের সম্পর্কটাকে কোনো একটা ফরমেটে একনলেজ করতে। নিজের ভেতরে দ্বিধা আর দ্বন্দ্বে পুড়তেছিল আবির। কিন্তু অশান্তির ভয়ে এইসব নিয়ে খোলাখুলি কথাও বলতে চায় নাই কখনো, অথবা পারে নাই। ও শান্তি চাইতেছিল, স্নেহাও তাই। কিন্তু দুইজনের চাওয়াটা কথা বলার মাধ্যমে যেভাবে সমাধান করা যেত বা এক জায়গায় মিলতে পারতো, আবিরের অস্পষ্টতা আর চুপ থাকা স্বভাবের কারণেই তা হয়ে উঠে নাই কখনো। এক সময় স্নেহা নাকি ছিল ওর “পিস অব হার্ট”। এক সময় স্নেহাকে ও বলছিল- আই নিড ইউ! যদিও সেইসব ও ড্রাঙ্ক হয়ে বলছে। কিন্তু ওর চোখ দুইটাও তো তীব্রভাবে ওইসব কথার সত্যতা দিতেছিল ওইসব মুহূর্তগুলাতে। এখন যদিও স্নেহা আবিরের জীবনের সমস্ত অশান্তির কারণ। অথচ চাইলেই বাকি জীবন ওদের ভেতরের শান্তিটা বজায় রাখা যেত একটু চেষ্টা করলেই। কিন্তু হলো ঠিক উল্টাটা! কার দোষে? কারই বা ভুলে? হিসাবগুলা তো এত সহজে আলাদা করা সম্ভব হয় না আসলে।

ওই রাতে অনেক কান্নাকাটির পর খুব ক্যাজুয়ালিই আবির স্নেহাকে বলতেছিল- রাজশাহীর দিকে কখনো আসলে জানাইয়ো, একসঙ্গে ডিনার করবোনে। যেহেতু স্নেহা বড়ই হইছে- "বেতাবি কেয়া হোতি হে, পুছো মেরে দিল সে…তানহা তানহা লওটা হু, মে তো ভারি মেহফিল সে…মারনা যাআআআয়ু কাহিইইই, হো কে তুম্‌সে জুদাআআআ…নাজার কে সামনে, জিগার কে পাস…কয়ি রেহ্‌…তাআআ হ্যায়…ও হো তুম…য়ুম…য়ুম…"- এর মতো নব্বই দশকের বেহুদা লাইন শুনে; পাকনা ঝুনাও হইছে ওই পিচ্চিকালেই, ফলে রাজশাহীর দিকে আসলে জানাইয়ো'র মধ্যে থেকে ‘কখনো’ শব্দটা ও বেমালুম সাইডে রেখে বাকিটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিলো। ওর বেতাবিও তখন এমন পর্যায়ে গেল যে ওই রাতেই ও গো জায়ান থেকে এক সপ্তাহ পরের ঢাকা-রাজশাহীর প্লেনের টিকেট বুক করে ফেলছে। হোটেল বুক করাও ওই রাতেই ডান! কিন্তু ঝামেলা বাঁধে যখন সাইডে থাকা “কখনো” শব্দটাকে একটু পর ঠান্ডা মাথায় ও জায়গামতো বসিয়ে পুরা বাক্যটা রি-ওয়াইন্ড করলো। ব্যাস! এরপরই শুরু হলো ওর হাজারও রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব!

বহু দ্বিধাদ্বন্দ্বে দিন থেকে রাত আর রাত থেকে দিন অতিক্রম করে, রাজশাহী যাওয়ার কথা অবশেষে ও আবিরকে জানানোর সাহস সঞ্চয় করতে পারে টিকেট কাটার চতুর্থ দিনে। তাও যে কতকিছু, কতবার, কতভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে তারপর গিয়ে বলতে পারছে! এখন ওইসব মনে করলে নিজের জন্য মায়াই লাগে ওর! আবির একবার ক্যাডেট কলেজ লাইফে ওদের গানের ব্যান্ডের কথা বলছিল স্নেহাকে। ইউটিউব থেকে বের করে “ইন্টার ক্যাডেট কলেজ লিটারেরি অ্যান্ড মিউজিক মিট”- এ ওদের ব্যান্ডের পারফর্মও দেখাইছিল। ওইখানে আবিরকে শুধু ও গিটার বাজাতেই দেখছে, গান গাইতে শোনে নাই। এছাড়া ও প্রায়ই নিজেও মাঝেমাঝে বলতো- আই ওয়াজ অ্যা গুড সিঙ্গার। নিজেই এই কথা বলে স্নেহার দিকে তাকিয়ে বলতো- বিশ্বাস হয় না তোমার? সিরিয়াসলি, আই'ম নট লায়িং! স্নেহা শুধু হাসতো।

ওই ঘটনা ক্যাশ করেই স্নেহা ওকে টেক্সট পাঠালো শেষ পর্যন্ত- গান না শুনে কীভাবে বুঝবো এক সময় কেউ ভালো গাইতো! আবির রিপ্লাই দেয়- হা হা হা! অনেক আগে ছেড়ে দিছি। অ্যান্ড আই'ম অ্যা শাই গায়, ইউ নো দ্যাট, রাইট? স্নেহা ওই চান্সে জানায়, ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকালের ফ্লাইটে ও রাজশাহী যাইতেছে। কেউ যদি গান শোনাতে অথবা “দূরত্ব যতই হোক, আমরা আছি কাছাকাছির মতো” ফিল দিতে কয়েক মিনিটের জন্য দূর থেকেও কোনো রেস্টুরেন্টে দেখা করার সময় বের করতে পারে, তাহলে ওকে যেন জানায়। ওই টেক্সটের কারণে আবির যেন কোনো প্রেশার ফিল না করে বা সিরিয়াস কিছু না ভেবে বা লিখে বসে, পরের লাইনটাকে তাই ও হালকা করতে লেখে- ইফ নাইদার অব দোজ ইজ পসিবল, তাহলে আর কী, পঞ্চবটী গিয়ে যাকে পাবো, তার কাছ থেকে গান শুনে ঢাকায় ফিরে আসবো!

আবির ওই টেক্সটের উত্তর দিতে সময় নেয়। ওর সময় নেওয়া টেক্সটের উত্তরগুলার অর্থ কিছুটা হলেও স্নেহা তখন বুঝতে শিখে গেছিল। সবকিছুতেই ওকে অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হতো। ওদের দুইজনের জগৎটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, এখন স্নেহা বোঝে। ও তো মুক্ত বিহঙ্গ, ওর বিশাল দুই ডানা ছিল। কিন্তু বিশাল ডানা থাকলেই সব পাখি উড়তে পারে না। আবিরকে কাছে পেলেই কেবল ও যেমন খুশি ডানায় হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াতে পারতো। উড়তে উড়তে সম্ভবত অনেক বেশি উঁচুতে চলে গেছিল, যেখানে ওর যাওয়ার আসলে এক্সেস ছিল না কোনো। ওইখান থেকে ফিরে আসার পথটাও ওর জানা ছিল না। এর ঊর্ধ্বে বা ওই পরিধির বাইরে ওকে নিয়ে উড়ার ক্ষমতা, ইচ্ছা, সাধ্য বা সামর্থ্য- কোনোটা আবিরেরও ছিল না হয়তো। শেষ পর্যন্ত তাই দুইজনেরই পাখ ভাঙলো। কে বেশি দোষী, কার দোষ কম- এত বাইনারি না বিষয়গুলা। তবে ও এখনো মনে করে- ছোট ছোট অস্পষ্ট রাখা সমস্যাগুলা সমাধানের সুযোগ ছিল। তাৎক্ষণিক অশান্তির ভয়ে আবির ওইসব জমিয়ে রেখে সমস্যাগুলাকে নিজের অজান্তেই বাড়তে দিছে। শেষ পর্যন্ত ওইসবই দাবানল হয়ে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করলো- কারো ঘর, কারো পুরা দুনিয়াটাই!

চেজিং দ্য ড্রাগন: ইন দ্য সেইম সিটি

Comments

    Please login to post comment. Login