Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ডার্ক কমেডি

March 16, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

181
View

এমনিতেই নন-এসি বাস, এর উপর আবার এনা! বাস ছুটতেছে তু-ফা-নের গতিতে। রাত দুইটার কিছু পর ১৫ মিনিটের যাত্রা বিরতি দিলো ভৈরবে। নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার ইচ্ছা থাকলেও কাঁধ থেকে একজন ঘুমন্ত মানুষের মাথাকে কীভাবে সরাবে, বুঝতে পারতেছিল না স্নেহা। তবে উপরওয়ালা দয়াপরবশত হয়েই সম্ভবত বাস থামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভদ্রমহিলাকে প্রকৃতির ডাকে ঘুম থেকে জাগালেন। ওইটাই ওই জন্মরাতে ওর গিফট ফ্রম অলমাইটি বলে মনে হলো।

স্নেহা নিচে নামলো। ভেপটা সঙ্গেই ছিল। কয়েক পাফ মেরে কিছুক্ষণ হাঁটতেই বাসের হর্ন বাজানো শুরু হয়ে যায়। অতঃপর বাসে ওঠে একদম পেছনে কিছু সিট খালি দেখতে পেয়ে ওইদিকে বসতে এগিয়ে যেতে যেতে নিজেকে ও বলে- নো মার বার্ডেন ফর টুনাইট! হ্যাভ অ্যা রিলাক্স, ইয়ং লেডি। কিন্তু ওর মন তো রিলাক্স হতে চায় না। অনেক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আবির নিশ্চয় ওর রেসপন্স না পেয়ে টেনশন করতেছে- এই ভাবনা বারবার ওকে অস্থির করে তুললেও ওই রাতটা ও শুধু নিজের যন্ত্রণা নিয়েই ভাবতে চাইলো। নিজেকে নিজের সঙ্গে রাখতে চাইলো, যেভাবে ওর ইচ্ছা করবে, যেভাবে ও নিজের যন্ত্রণা কমাতে পারবে বলে মনে হবে।

পেছনের সিটে আর বসা হয় না। একদম পেছনের সিটের কর্নারে কম বয়সী একটা কাপল বসে আছে, দূর থেকে ওইটা ও খেয়াল করতে পারে নাই। ইশ! হুট করে কাছে গিয়ে তাদের অস্বস্তিতে ফেললো, নিজেও অস্বস্তিতে পুরা রাস্তা যেতে হবে ভাবতেই নিজের উপর ওর বিরক্তিটা আরেক দফা বেড়ে গেল। আর কোনো অপশন না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের আগের সিটটাতে গিয়েই ওর বসতে হলো।

বাসের লাইট আবারও বন্ধ হলো। কর্কশ লাউড স্পিকারে তখনও নব্বইয়ের বেহুদাই গান বাজতেছে- "বাআআস এক সানাম চাহিয়ে এ এ এ...আশিকিকে লিয়ে...।" স্নেহা এয়ারবাড খুলে ‘আমোন’ প্লেলিস্টটা প্লে করতেই শাফকাত আমানত আলী এক অচেনা শহরের অজানা যাত্রায় মন ভেজাতে গেয়ে ওঠলেন- "ম্যায় লাখ যাতন কার হারি, লাখ যাতান কার হার রাহি...মোরা সাইয়্যান মো সে বোলে না...।" কিন্তু মনের বদলে ভিজে ওঠলো চোখ! এর মাস খানিক পর এক মেঘলা দুপুরবেলায়, রাজশাহীর এক নির্জন রাস্তায় পার্ক করা গাড়ির ভেতরে ওই একই গান সম্ভাব্য বিচ্ছেদের অব্যক্ত বেদনায় দীর্ঘক্ষণ আরো একবার ভাসিয়েছিল দুই জোড়া চোখকে। 

ভালোবাসায় জুনুনের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেলে মানুষ আর কতক্ষণ পর্যন্ত রাগ-অভিমান পুষে রাখতে পারে, স্নেহা ভাবে। নাকি আরো বেশি তীব্র হয় এইসব অনুভূতি? আবিরের জন্য মায়া হয় স্নেহার, খুব মায়া হয়। সম্ভবত এই স্তরের সব অনুভূতিই প্রচণ্ড তীব্র। ওই সময় এসব ভাবনা, সঙ্গে শাফকাত আমানত আলীর কণ্ঠের আকুলতা- স্নেহার দুই চোখের একটাকে করে তোলে সুরমা, অন্যটাকে কুশিয়ারা। আর এই দুই নদীধারা ওর চিবুকে গিয়ে গড়ায় কালনী নদী হয়ে। থামে না কোথাও, কালনী নদীও সোজা বয়ে চলে যায় বুকের বঙ্গোপসাগরের ভার আরেকটু বাড়াতে। নিজের কান্নাকেও স্নেহা এমনভাবে ধারা বর্ণনা করে, যেন ওর পুরা জীবনটাই একটা- ডার্ক কমেডি!

স্নেহার কোনো লেখা পড়লে আবির প্রায়ই বলে- ইটস ডার্ক! টু ডার্ক! স্নেহা তখন উত্তর দেয়- আমার পুরা জীবনটাই তো ডার্ক! আবির ওকে বারবারই বলে- রাইট সামথিং চেয়ারফুল। গিভ সাম লাইট টু আদার্স, গিভ সাম হোপ। স্নেহা বুঝতে পারে না; যে জীবন বিষণ্নতায় ভরপুর, কীভাবে তা চেয়ারফুল কিছু লিখবে? যে জীবন অন্ধকারে পরিপূর্ণ, কীভাবেই বা সেটা আলো ছড়াবে? মানুষ তো মূলত নিজেকে আর নিজের চারপাশকেই লেখে।

সব জীবন তো রূপকথার মতো না। ইন ফ্যাক্ট কারো জীবনই রূপকথার মতো হওয়ার কথা না। এভ্রিওয়ান হ্যাজ দেয়্যার য়ৌন সাফারিংস। প্রত্যেকের কাছেই নিজের যন্ত্রণাটা বড়। অন্যেরটা আমরা কেবল বোঝার ভণিতা করি, কেউ-ই আসলে বুঝি না। বোঝার চেষ্টা বলতে আমরা যেটা করি, বড়জোর তা নিজের কষ্টের সঙ্গে তুলনা করে মুখে বলে দেওয়া- আই ক্যান ফিল অর আই ক্যান অ্যান্ডারস্ট্যান্ড! আদতে ঘোড়ার আন্ডা। মানুষ মনে মনেও বরং আরেকজনের কষ্টের চেয়ে নিজের কষ্টটাকেই আরো বেশি জটিল বিবেচনা করে হিসাব নিকাশ শেষে সিদ্ধান্তে আসে- আমারটাই বড় কষ্ট! অমুক-তমুক-বেবাকেরটাই এই কষ্টের চেয়ে কিছুটা কম যন্ত্রণার।

নাহ! এই সুঁইয়ে আজকে আর পুলসিরাত পার হওয়া যাবে না, স্নেহা বুঝতে পারে! মেহদি হাসান থেকে শুরু করছিল লম্ফঝম্প সুঁইকে বশে আনতে, এরমধ্যে ফতেহ আলী সাহেব কিছুক্ষণ জানিয়ে গেছেন- “তুমহে দিললাগি ভুল যা নে পারহে গি, মোহাব্বত কি রাহু ম্যাঁয় আ কার তো দেখো..”। তবুও সুঁইয়ের লাফানো বন্ধ হয় নাই। কিন্তু সুঁইয়ের খোঁজে এখন নিচে নামতে হবে ভাবতেই ওর আর ভালো লাগলো না। এরচেয়ে ফতেহ আলীর গজলের পরের লাইনটায় মন দিলো ও- বাহ! বেশ মনে ধরছে ওর! সিলেবাসে কমন পড়ছে বোধহয়।

ফতেহ আলীর ওই লাইনটা লজিক্যালও। উনি পরের লাইনে বলতেছেন, “তাড়াপনে পে মেরে না ফির তুম হাসো গে/ কাভি দিল কিসিসে লাগা কার তো দেখো।” ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে, আমার জুতায় পা দিয়ে হাঁইটা দেখোর মতো লাগলেও, এটাই বাস্তব এবং সত্য! নিজে কোনো অনুভূতি নিজের জীবন দিয়ে এক্সপেরিয়েন্স করার আগে মানুষ কখনোই তা ঠিকঠাক বুঝতে পারে না। নিজের ওই অনুভূতির অভিজ্ঞতার আগ পর্যন্ত অন্য মানুষের একই অনুভূতি নিয়ে মানুষ খুব সহজেই হাসি-তামাশা অথবা মশকরা করতে পারে! কিন্তু একবার যখন নিজেও ওই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যায়, শুধুমাত্র তখনই উপলব্ধি করতে পারে- দরজার ওই পাশে দাঁড়িয়ে হাসাটা যত সহজ, নিজেও একই অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাটুকু অতটা সহজ নাও হতে পারে! বরং ক্ষেত্র বিশেষে, কঠিন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। ফতেহ আলী সাহেবের এই লজিক্যাল ব্যাপারটা দুইবার রিপিট বাটন চেপে শুনলো ও। 

এর একটু পর বেগম আখতার আবার অনেক দুঃখ নিয়ে বলে গেলেন- “আমি তো রাখিনি তারে বেঁধে, শুধু ভুল করেছি ভালোবেসে…চুপি চুপি চলে না গিয়ে, সে কেন বিদায় নিলো না হেসে?” বেগম আখতার এত দুঃখ নিয়ে কাকে এই অভিযোগ জানাইছেন, আল্লাহই জানেন! আল্লাহকেই মনে হয়। তবে যার নামেই অভিযোগ জানান না কেন, স্নেহা শিওর- ওই ব্যক্তিকেও আল্লাহ একইভাবে দুঃখ বোধে ভুগাইছেন। ওই গজল একদম রুহ ছিঁড়ে বের হওয়া কণ্ঠ থেকে আসা। কারো রুহতে কষ্ট পৌঁছে গেলে, আল্লাহ ওই কষ্টের কারণকেও শান্তিতে থাকতে দেন না বলেই স্নেহার মনে হয়। তবে এই দুনিয়ায় হেসে বিদায় নেওয়াটা তো একটা কঠিন কাজই আসলে। এরজন্য বিরাট বড় কলিজা লাগে।

এত বড় কলিজা স্নেহার অন্তত এখন আর নাই- এই বিষয়ে আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পর ও নিশ্চিত হতে পারছে। অথচ স্নেহার আম্মা যে জীবনে কতবার ওকে বলছেন- তোর শরীরের পুরাটাই কলিজা। অবশ্যই আম্মা এটা প্রশংসামূলক বাক্য হিসেবে বলতেন না। বলতেন নেগেটিভ অর্থে অথবা সোজা বাংলায় ঠেস মারতে। একটু রাত করে বাড়ি ফিরলেই এই ডায়লগ; আম্মার মতের বাইরে গিয়ে কিছু করলেই এই ডায়লগ! কতকিছু নিয়ে যে কতবার ওর এই কথা শুনতে হইছে আম্মার কাছ থেকে! আহারে!

স্নেহার হুট করেই আম্মার জন্য মনটা কেমন করে ওঠলো। বুকের মধ্যে একটা নিঃশূন্য অঞ্চল খাঁ খাঁ করে ওঠলো যেন। কত কত কারণে যে স্নেহা কত বিরক্ত হইছে আম্মার উপরে। আম্মার কথা সহ্য হতো না বলে কতবার যে ও বাড়ি ছেড়ে চলে গেছিল। কতটা বছর একা থাকছে এখানে-সেখানে নিজের মতো করে। আর এখন! আব্বার মতো আম্মাও যদি চলে যায়? ঠেস মারুক; গালমন্দ করুক, চিল্লাচিল্লি করে অসহ্য বানিয়ে দেক, তাও তো আছে! চলে গেলে তো কেউ এসব করারও থাকবে না আর। আম্মার জন্য ওর কষ্ট হইতেছে, খুব কষ্ট, খুউউউউউব বেশি কষ্ট!

ফ্লোরের মধ্যেই দুই পা আর হাত জোড় করে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে পড়লো স্নেহা। যেন মায়ের জঠরে ও ফিরে যাইতে চাইতেছে। যেন ও চাইতেছে আম্মা তার নাড়ি দিয়ে ওকে ভেতরে পেঁচিয়ে রেখে দেক আবার। এই দুনিয়াকে যেন কোনোদিনই আর ওর ডিল করতে না হয় আবার। আম্মাও চলে গেলে, এই মহিলা আমাকে সারা জীবন জ্বালাইছে বলে- কাকে নিয়ে আর ও অভিযোগ করবে? আল্লাহ কেন তার বান্দাদের ক্যান্সারের মতো সর্বনাশা অসুখে মারেন? এত ভুগিয়ে, এত কষ্ট দিয়ে!

স্নেহার ধারণা ছিল, আব্বার পর আল্লাহর তরফ থেকে ওর ডাকটাই আগে আসবে। এখনো ও এটাই বিশ্বাস করতে চায়। আবির সবসময় ওকে বলতো- তোমার আগে আমি চলে যাবো, দেইখো! বয়সে আমি তোমার বড়, হিসাবে আমারই যাওয়ার কথা আগে। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে দুনিয়ায় আনেন নিজের হিসাবে, ফিরিয়েও নেন তার হিসাব মোতাবেকই। এই হিসাব-নিকাশ শুধু তিনিই ভালো জানেন।

আবির স্নেহার চেয়ে মাত্র দুই মাস দশ দিনের বড়! কিন্তু কথায় কথায় ভাবটা এমন করবে যেন সে বিরাট মুরুব্বি! কয়দিন পর পরই অন্তত একবার ও বলবে- “উই আর গেটিং ওল্ড।" যতবার ও এইটা বলে, সঙ্গে সঙ্গে স্নেহাও বলে ওঠে- তুমি, আমি না! চল্লিশ বছরে নাকি কেউ বুড়া হয়! তাও আবার বেটা-ছেলে! নবীজী নব্যুয়াতই লাভ করছিলেন চল্লিশ বছর বয়সে। জীবন শুরুই হয় চল্লিশের পর। যদিও আবির বারবার কেন এই কথা ওকে মনে করিয়ে দেয়, স্নেহা বোঝে। প্রেম কমানোর জন্য।

ওরা যে নাইন-টেনের নিব্বা-নিব্বি না, এটা আবির তো আর ভেঙে স্নেহাকে বলতে পারে না! আরো বলতে পারে না যে কথায় কথায় তুমি গাল ফুলাইয়ো না, অথবা এত প্রেম দেখাইয়ো না। এত প্রেম আশাও কইরো না। শেষ পর্যন্ত তো আমি…আবিরের ওইসব অব্যক্ত কথা স্নেহা নিজে নিজেই বুঝে নেয় মাঝেমাঝে। কিছু সময় ঠিক বুঝে, কিছু সময় ভুল। এটাই আবির আর ওর সম্পর্কের মূল সমস্যা বলে মনে হয় স্নেহার।

এই সমস্যাটা ওভারলুকের কারণে…থাক! গানের মতো মেমোরির রি-ওয়াইন্ডে গিয়ে কদর্য মুহূর্তগুলা ওর মনে করতে ইচ্ছা করলো না তখন। যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ বলে একটা প্রবাদের কথা মনে করে বরং মেজাজটা আরো খিঁচে গেল ওর। শোওয়া থেকে সটান করে ওঠে ও বলে ওঠলো- শালা! আমার যায় দিনও খারাপ, আসে দিন আরো বেশি খারাপ! গত দুই মাসের কদর্য স্মৃতি মনে করার চেয়ে বরং এক বছর আগের রাতে সিলেটের ওই জার্নির কথা মনে করা ওর তুলনামূলকভাবে কম যন্ত্রণার মনে হলো তখন।

ওইবার সত্যিই সত্যিই স্নেহা সিলেট শহরের লাস্ট স্টপেজে গিয়েই নামলো। বাসের সব যাত্রী নেমে যাওয়ার পর হেল্পার ওকে ডেকে বললো- আপা, লাস্ট স্টপেজ! আপনে কই নামবেন? জায়গাটার নাম কদমতলী। স্নেহার পাশের সিটের ঘুমন্ত পাখিটা নিজের গন্তব্যে আসতেই কী সুন্দর কাঁধ থেকে মাথা ওঠিয়ে আরও দুই স্টপেজ আগেই নেমে গেল। দুনিয়ার মানুষের ভেতরে কোনো কৃতজ্ঞতা বোধ নাই! ঘুমন্ত পাখি নেমে যাওয়ার পর পরই স্নেহার ওই ফিল হলো। সারা রাত ওই মহিলার কোনো প্রেমিকও মাথা রাখার জন্য তাকে এমনভাবে কাঁধ পেতে দিয়ে রাখে নাই কখনো, স্নেহা এই বিষয়ে এক হাজার পারসেন্ট শিওরিটি দিতে পারে!

কৃতজ্ঞতা বোধ স্নেহারও নাই আসলে। স্নেহা আবিরের সমস্যা আর ইস্যুগুলা কিছুটা বোঝে। অনেককিছুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্নেহাকে মেইন্টেইন করা ওর জন্য যেমন ডিফিকাল্ট, তেমন রিস্কেরও। নিজের সাধ্যের গণ্ডির মধ্যে থেকে ও অনেক সময় চেষ্টা করে স্নেহাকে একটু টেক্সট করে টাইম দিতে। কিন্তু সমস্যা তো টাইমে না, সমস্যা টাইমিংয়ে। সমস্যা আবিরের এই সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়ার। সমস্যা ক্লিয়ারিটিরও। সমস্যাগুলা কিছুটা জটিল হলেও সবসময় সমাধানযোগ্যই ছিল।

সবকিছু বাদ দিয়ে, আবির স্নেহার পাশে থাকার সময় যেই ফিলটা দেয়, শুধুমাত্র ওই কারণেই তো সারা জীবন আবিরের প্রতি ওর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত, ও কৃতজ্ঞও। শুধুমাত্র প্রতিবার বিদায়ের মুহূর্তে আবিরের বাকওয়াজগুলা বাদ দিলে, হি ইজ ট্রুলি অ্যা জেনুইন জেন্টলম্যান। কিন্তু একটা নেহাতই ভদ্রলোকের টাইম সেন্স কত খারাপ হলে ৪৬ ঘণ্টা দুইটা মানুষ এত তীব্র, ভয়ংকর সুন্দর সময় কাটিয়ে বিদায় নিতে গিয়ে বলে- আই লাভ ইউ, এবং এর পর পরই- আমাদের আর কখনো দেখা হবে না! এটা কিছু হলো!

দেখা না হলে না হবে; যখন হবে না, তখন দেখা যাবে। এটা বারবার বলে বলে কেন ও প্রতিবার যাওয়ার সময় একটা মানুষকে এভাবে যন্ত্রণার মধ্যে রেখে যাবে? আবার এটা যে যন্ত্রণাদায়ক একটা ব্যাপার, সেটাও ও ওই সিচ্যুয়েশন ক্রিয়েট করার সময় বুঝতে পারবে না! পরে হাজারবার সর‍্যি হবে, এবং এগেইন পরেরবার ওই একই রিপিটেশন চলতেই থাকবে। ওই একই কাজ ও স্নেহা রাজশাহী থেকে ফেরার দিনও করছিল। দুইটা বছর, প্রতিবার বিদায়বেলা এই যন্ত্রণা স্নেহাকে সহ্য করতে হয়েছে। একটা মানুষের সহ্যেরও তো সীমা থাকে!

কেউ যদি প্রতিবার চরম ভালো মুহূর্ত কাটানোর পর বিদায়ের সময় এমন ট্রমার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে এক সময় অল্পতেই রিয়্যাক্ট করা শুরু করে অথবা ওই বিদায়ের মুহূর্তগুলা আগের ট্রমাকে মনে করিয়ে তার আচরণকে প্রভাবিত করে, তাহলে এর পেছনের কারণ না বুঝতে চেয়ে তাকে 'পাগল' তকমা দেওয়া কতটা যৌক্তিক? স্নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে- কে এসবের উত্তর দেবে? কত কত প্রশ্ন করার বদলে নিশ্চুপ থেকেও তো বাকিটা জীবন একটা মানুষকে আঁকড়ে ধরে ও বাঁচতে চেয়েছিল, জীবনটা কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল এভাবেই- সেটাও কপালে সইলো না কেন? মানুষেরও কেন তা এত গাত্রদাহের কারণ হলো?

৬ ফেব্রুয়ারির রাতে ভিডিও কলে আবিরের কান্না দেখে স্নেহার অস্থির লাগে। ওর মনে হয়, আবির কিছু একটা বলতে চেয়েও পারে নাই। স্নেহাকে সে না পারতেছে একবারে বিদায় বলতে, না পারতেছে এই সম্পর্কটাকে কোনো একটা ফরমেটে একনলেজ করতে। আবির নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বে পুড়তেছিল। কিন্তু অশান্তির ভয়ে আবার ওইটা নিয়ে ও খোলাখুলি কথাও বলতে চায় নাই কখনো অথবা পারে নাই। ও শান্তি চাইতেছিল, স্নেহাও তাই। কিন্তু দুইজনের চাওয়াটা যেখানে শান্তভাবে খোলাখুলি কথা বলার মাধ্যমে সমাধান করা যেত বা এক জায়গায় মিলতে পারতো, ওইটা আবিরের কারণেই কখনো হয়ে ওঠে না।

এক সময় স্নেহা নাকি ছিল আবিরের পিস অফ হার্ট। যদিও ওইটা আবির ড্রাঙ্ক হয়ে বলছিল, কিন্তু আবিরের চোখ দুইটাও ওই সময় একইসঙ্গে ওর মুখের ওই বাক্যের চেয়ে আরো অনেক বেশি তীব্রভাবে স্নেহাকে ওই ফিলটা দিচ্ছিল। এখন যদিও স্নেহা আবিরের জীবনের সমস্ত অশান্তির কারণ। বাকিটা জীবন ওই শান্তিটা বজায় রাখা যেত খুব সহজেই, কিন্তু হলো এর উল্টা! কার দোষে? কারই বা ভুলে? হিসাবগুলা তো আর এত সহজে আলাদা করা সম্ভব হয় না কখনো।

ওই রাতে অনেক কান্নাকাটির পর নরমাল হয়ে খুব ক্যাজুয়ালিই আবির স্নেহাকে বলতেছিল- রাজশাহীর দিকে কখনো আসলে জানাইয়ো, একসঙ্গে ডিনার করবোনে। যেহেতু স্নেহা ওই নব্বই দশকের "বেতাবি কেয়া হোতি হে, পুছো মেরে দিল সে…তানহা তানহা লওটা হু, মে তো ভারি মেহফিল সে…মারনা যায়ু কাহি, হো কে তুমসে জুদা…নাজার কে সামনে, জিগার কে পাস…কয়ি রেহতা হ্যায়…ও হো তুম" শুনে পিচ্চিকালেই পাকনা ঝুনা হইছে, ফলে রাজশাহীর দিকে আসলে জানাইয়োর মধ্যে থেকে ‘কখনো’ শব্দটা ও বেমালুম সাইডে রেখে বাকিটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিলো এবং ওর বেতাবি তখন এমন পর্যায়েই চলে গেল যে ওই রাতেই গো জায়ান থেকে ও এক সপ্তাহ পরের ঢাকা টু রাজশাহীর প্লেনের টিকেটই বুক করে ফেললো। একইসঙ্গে হোটেল বুক করাও ওই রাতেই ডান! কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল যখন একটু পর সাইড থেকে “কখনো” শব্দটাকে জায়গামতো বসিয়ে আবিরের পুরা বাক্যটাকে স্নেহা ঠাণ্ডা মাথায় রি-ওয়াইন্ড করলো। এরপরই শুরু হয়ে গেল ওর হাজারও রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব!

বহু দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভেতর দিন-রাতের প্রতিটা মুহূর্ত পার করে টিকেট কাটার চারদিন পর অনেক চেষ্টাসাধ্যের পর স্নেহা রাজশাহী যাওয়ার কথা আবিরকে জানাতে পারছিল। ওইটাও যে কতকিছু, কতবার কতভাবে বলবে ভাবতে ভাবতে তারপর গিয়ে বলতে পারছে, এখন ওই কথা ভাবতে গেলে ওর নিজের জন্য মায়াই লাগে! আবির একবার ওর স্কুল লাইফের ব্যান্ডের কথা বলছিল স্নেহাকে। স্কুলের এক প্রোগ্রামে ও গিটার বাজাইতেছে, এমন একটা ভিডিও বের করেও স্নেহাকে দেখাইছিল। ওই ঘটনাটাকে ক্যাশ করে স্নেহা টিকেট কাটার চারদিন পর আবিরকে টেক্সট দিলো- নিজের কানে না শুনলে কেউ গান গাইতে পারে, এই ফাঁকা বুলিতে ও বিশ্বাস করে না! ও লেখে- গান না শুনে আমি কীভাবে বুঝবো এক সময় কেউ ভালো গাইতো!

আবির রিপ্লাই দিলো, অনেক আগে ছেড়ে দিছি। অ্যান্ড আই'ম অ্যা শাই গায়, ইউ নো দ্যাট, রাইট? স্নেহা ওই চান্সে জানায়, ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকালের ফ্লাইটে ও রাজশাহী যাচ্ছে। ও লেখে- কেউ যদি গান শোনাতে কিছুক্ষণের জন্য, অথবা কোনো রেস্টুরেন্টে দূর থেকে কয়েক মিনিট দেখতে দেওয়ার জন্য সময় বের করতে পারে- দূরত্ব যতই হোক, আমরা আছি কাছাকাছির মতো, তবে যেন ওকে জানায়। আবির যেন এই টেক্সটে প্রেশার ফিল না করে বা সিরিয়াস কিছু লিখে না বসে, এইজন্য পরের লাইনটাকে স্নেহা লাইট করতে লেখে- যদি ওই দুইটার একটাও সম্ভব না হয়, তাহলে আর কী, পঞ্চবটী গিয়ে যাকে পাবো, ধরে গান শুনে ঢাকায় ফিরে আসবো!

আবির ওই টেক্সটের উত্তর দিতে সময় নেয়। ওর সময় নেওয়া উত্তরগুলার অর্থ কিছুটা হলেও স্নেহা তখন বুঝতে শিখে গেছিল। সবকিছুতেই অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হয় আবিরকে। ওদের দুইজনের জগৎটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন স্নেহা বোঝে। ও তো মুক্ত বিহঙ্গ, ওর বিশাল দুই ডানা। কিন্তু সব পাখি বিশাল ডানা থাকলেই উড়তে পারে না। আবিরকে কাছে পেলে স্নেহা যেমন খুশি ডানায় হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়াতো।

উড়তে উড়তে বেশি উঁচুতে সম্ভবত স্নেহা চলে গেছিল, যেখানে ওর যাওয়ার আসলে এক্সেস ছিল না। ওইখান থেকে ফিরে আসার পথটাও ওর জানা ছিল না। ওই উচ্চতার ঊর্ধ্বে বা ওই পরিধির বাইরে ওকে নিয়ে উড়ার ক্ষমতা, ইচ্ছা, সাধ্য বা সামর্থ্য- কোনোটা আবিরেরও ছিল না হয়তো। শেষ পর্যন্ত তাই দুইজনেরই পাখ ভাঙলো। কে বেশি দোষী, কার দোষ কম- এত বাইনারি না বিষয়গুলা। তবে স্নেহা এখনো মনে করে- ছোট ছোট অস্পষ্ট রাখা সমস্যাগুলা সমাধানের সুযোগ ছিল। আবির তাৎক্ষণিক অশান্তির ভয়ে ওইসব জমিয়ে রেখে সমস্যাগুলাকে নিজের অজান্তেই বাড়তে দিছে। ওইসবই শেষ পর্যন্ত দাবানল হয়ে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করলো! কারো ঘর, কারো পুরা দুনিয়াটাই!

চেজিং দ্য ড্রাগন: ইন দ্য সেইম সিটি

Comments

    Please login to post comment. Login