অ্যামেরিকার লস এঞ্জেলস থেকেঅনেক ভাবেই সিয়্যাটল আসা যায়। প্লেনেএলে ২ ঘন্টা ৩০মিনিট, ট্রেনে লাগে ৩৬ ঘন্টা।ট্রেনের নাম অ্যামট্রেক।
সাগরের পাড়ঘেষে যে পথে ঝিকঝিক করে ট্রেন চলে, সেটার নামই কোস্টস্টারলাইট - অ্যামেরিকার সবচেয়ে সুন্দর রেলপথগুলোর একটা।
বুদ্ধিমানমানুষরা সাধারণত আড়াই ঘন্টার যাত্রা বেছেনেয়। কিন্তু পৃথিবীর সব সৌন্দর্যতো আর বুদ্ধিমানদেরজন্য বানানো হয়নি। জীবনানন্দের মত আমরা অনেকেই অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না; জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আমাদের আছে। আমরা তাই ট্রেনে উঠে বসি। বোকা মানুষরা জানে, পৃথিবীর সুন্দর জিনিসগুলো দেখার জন্য মানুষকে একটু থামতে হয়।
ট্রেনটা চলে অদ্ভুত মায়াবীসব পথ মাড়িয়ে। শুরু লস এঞ্জেলেসে। আলো আর ব্যস্ততায় ভরা এক শহর। কিন্তু ট্রেন ছাড়ার একটু পরই কংক্রিটের শহরটা হঠাৎ ফিকে হয়ে যায়। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে খুলে যায় ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশ।
শহর ছাড়িয়ে দূর থেকে ভাসতে শুরু করে পাহাড়, তার পাশে অদ্ভুত শান্ত সাগর।
জানালারদিকে চেয়ার ঘুড়িয়ে আপনি দেখতে পারবেননীল প্যাসিফিক – কি যে অদ্ভুত সেই নীল ! এমন নীল, মনেহয় আকাশ ভুল করেসাগরের ভেতর নেমে এসেছে।আপনার মন হুট করে আকাশের মত অকস্মাৎ কোননীল নীলে ডুবে থাকবেযেন। ট্রেনে চড়ে দেখতে পারবেনসান্তা বারবারা - যেখানে সাগরের তীর ঘেসা সবুজপাহাড়ের গায়ে গোলাপী বুনোফুল ছেয়ে থাকে। মনেহয়, হাত বাড়িয়ে না; মন বাড়িয়ে ছুই তাদের। কখনো শেষ বিকেলের আলোয় নীল প্যাসিফিক হয়ে যায় রুপালী ! রুপার আলোয় সাদা সিগালেরা উড়ে যায়।
সাগর ছেড়ে ট্রেনটা একসময়ঢুকে পড়ে স্যান লুইসেরজারুল বনে। মিষ্টি আলো জারুল ছুয়ে যখন গায়ে মাখে, এই পৃথিবীর কাছে, তখন আর কোনআফসোস করা যায় না।
ঝিকঝিক করে ট্রেন সামনেআগায়। ওর্যাগনে এলে কেন জানি বুকটা ঠান্ডা হয়ে যায়। কি যে অদ্ভুত সুন্দরসবুজ বন রে ভাই ! তার পাশে টলটলে লেকেরপানি, যেন দূর আকাশের মেঘ পানিতে ভাসে। ট্রেন আগায় মাউন্ট শাস্তারগা ঘেঁষে। বিস্ময় কাটে না। পাহাড়টাএত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে যে, মনেহয় সে হাজার বছরধরে মানুষের বোনা জীবনের গল্পশুনছে …
ট্রেন একসময় থামে সিয়্যাটলে। বৃষ্টিতে, প্রিয় মানুষের আচমকা জড়িয়ে ধরবার মত আদর মাখা শহর। যে শহরের পাহাড়ি ঝর্না রংধনু বাড়ির কথা ভোলায় …
আমার প্রাক্তন বলেছিল, আমি গরীব। তাই প্লেনে না চড়ে বাসে করে ঢাকা-চিটাগাং যাওয়া-আসা করি। পথের হাইওয়ে ইনের তেল চিটচিটে পরোটা দিয়ে গরুর মাংস আমার প্রিয়। সে কখনো জানতে চায়নি, আমিও নিজ থেকে বলিনি। মানুষটার কাছে যাওয়ার মত, প্রিয় এই খাবারও এখন জীবনে নিষিদ্ধ।
আমার প্রার্থনা, আপনার এমন একজন একান্ত মানুষ হোক, যেন তার চোখে এই পৃথিবীর সব বিস্ময় আপনার কাছে ধরা দেয়। বৃষ্টি,বাতাস, আলোর সব আয়োজন ব্যর্থ যদি নিজের মানুষটা পাশে না থাকে।
আর যদি এমন মানুষ না’ও পান, তবু পথ দেখতে ভুলবেন না। বুদ্ধিমান হবেন না। পথের আনন্দ টিকিটের দামে মাপতে যাবেন না।
-রাকীবামানিবাস
১৫ই মার্চ,২০২৬
