গল্প — “ভয়কে জয় করার আলো”
বাংলাদেশের একটি শান্ত গ্রাম। চারদিকে সবুজ মাঠ, মাঝখানে সরু কাঁচা রাস্তা আর দূরে একটি বড় বিল। গ্রামের মানুষ খুব সাধারণ জীবনযাপন করত। ভোরে মাঠে কাজ, দুপুরে বিশ্রাম, আর বিকেলে সবাই মিলে গল্প করা—এই ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবন।
এই গ্রামেই থাকত ১৪ বছরের এক ছেলে—তার নাম সাদিক। সাদিক খুব চুপচাপ স্বভাবের ছিল, কিন্তু তার ভিতরে ছিল অনেক সাহস আর দায়িত্ববোধ। ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছিল—ভয়কে জয় করতে পারলেই মানুষ বড় কাজ করতে পারে।
সাদিকের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিল তার ছোট বন্ধু রিফাত। রিফাত বয়সে এক বছরের ছোট, খুব চঞ্চল আর হাসিখুশি। তারা প্রায় প্রতিদিন বিকেলে মাঠের পাশের বিলে ঘুরতে যেত। সেখানে তারা মাছ ধরত, নৌকা ঠেলত, কখনো কখনো শুধু বসে আকাশের মেঘ দেখত।
একদিন বিকেলে আকাশটা অদ্ভুত লাগছিল। কালো মেঘ জমে উঠছিল ধীরে ধীরে। গ্রামের বড়রা বলছিল—ঝড় হতে পারে। কিন্তু সাদিক আর রিফাত তখনো বুঝতে পারেনি পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হতে পারে।
তারা বিলে পৌঁছে দেখে—পানি আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। বাতাসও জোরে বইছে। রিফাত বলল,
— “চল না একটু সামনে যাই, নতুন জায়গাটা দেখি।”
সাদিক একটু দ্বিধায় পড়ল। তার মনে হচ্ছিল ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু বন্ধুর কথায় সে রাজি হয়ে গেল।
তারা একটু সামনে এগোতেই হঠাৎ রিফাতের পা কাদায় আটকে গেল। সে ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে গেল। পানি খুব গভীর না হলেও স্রোত ছিল তীব্র। রিফাত ভয় পেয়ে চিৎকার করতে লাগল।
— “সাদিক! আমাকে বাঁচাও!”
সেই মুহূর্তে সাদিকের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তার নিজেরও পানির ভয় ছিল। ছোটবেলায় একবার সে পানিতে পড়ে গিয়েছিল, তখন থেকে গভীর পানির কাছে গেলে তার হাত-পা কাঁপত।
কিন্তু বন্ধুর চিৎকার শুনে সে থামতে পারল না। সে মনে মনে বলল,
“আজ যদি আমি ভয় পাই, তাহলে বন্ধুকে হারাতে পারি।”
সে দ্রুত একটি লম্বা বাঁশ খুঁজে পেল। তারপর ধীরে ধীরে কাদার ওপর পা রেখে রিফাতের দিকে এগোতে লাগল। বাতাস তখন আরও জোরে বইছে, বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
রিফাতের হাত কাঁপছিল, সে বারবার পানির নিচে ডুবে যাচ্ছিল। সাদিক বাঁশটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
— “এটা শক্ত করে ধর!”
রিফাত কাঁপতে কাঁপতে বাঁশটা ধরল। সাদিক নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে টানতে লাগল। তার পা কাদায় পিছলে যাচ্ছিল, হাত ব্যথা হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সে ছাড়েনি।
একসময় গ্রামের দুইজন লোক দূর থেকে দৌড়ে এল। তারা এসে সাহায্য করল। সবাই মিলে রিফাতকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে এল।
রিফাত তখনো কাঁপছিল। সে সাদিককে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “তুই না থাকলে আমি আজ বাঁচতাম না…”
সাদিক কিছু বলল না। সে শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর শ্বাস নিল। তার মনে হচ্ছিল—আজ সে নিজের সবচেয়ে বড় ভয়কে জয় করেছে।
এই ঘটনার পর গ্রামের মানুষ সাদিককে নতুন চোখে দেখতে শুরু করল। তারা বুঝল—সাহস মানে ভয় না থাকা নয়, বরং ভয়ের মাঝেও সঠিক কাজটি করতে পারা।
সাদিক নিজেও বদলে গেল। সে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। সে সিদ্ধান্ত নিল—ভবিষ্যতে সে এমন কাজ করবে যাতে বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে।
বছর কেটে গেল। কিন্তু সেই ঝড়ের বিকেলের স্মৃতি তার মনে রয়ে গেল। যখনই সে কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতো, সে মনে করত—
“আমি একবার ভয়কে জয় করেছি, আবারও পারব।”
গ্রামের মানুষও সেই দিনটি ভুলে যায়নি। তারা প্রায়ই নতুন প্রজন্মকে গল্পটা শোনাত—
একটি ছেলের গল্প, যে নিজের ভয়কে জয় করে বন্ধুর জীবন বাঁচিয়েছিল।
সেই গল্পের নামই হয়ে গেল—
“ভয়কে জয় করার আলো।”
শেষ।
17
View