ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এমন কিছু সত্য ঘটনা পাওয়া যায়, যা যেকোনো কাল্পনিক থ্রিলার বা সাসপেন্স গল্পকেও হার মানায়। মানুষের অদম্য বেঁচে থাকার ইচ্ছা আর প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার এমন এক নিখুঁত এবং রোমাঞ্চকর নন-ফিকশন গল্প হলো স্যার আর্নেস্ট শ্যাকলটনের ১৯১৪ সালের অ্যান্টার্কটিকা অভিযান। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল মৃত্যুর সাথে এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই।
সালটা ১৯১৪। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে ইউরোপে। ঠিক সেই সময়ে, ৫ই আগস্ট, ব্রিটিশ অভিযাত্রী স্যার আর্নেস্ট শ্যাকলটন তার জাহাজ 'এন্ডুরেন্স' (Endurance) নিয়ে রওনা দিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম এবং অজানা মহাদেশের দিকে—অ্যান্টার্কটিকা। লক্ষ্য ছিল বিশাল: প্রথম মানুষ হিসেবে অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পায়ে হেঁটে পার হওয়া। ২৮ জন নাবিক, ৬৯টি স্লেজ কুকুর আর অদম্য জেদ নিয়ে শুরু হলো যাত্রা। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব কিছু পরিকল্পনা ছিল, যা এই অভিযাত্রীদের জানা ছিল না।
ডিসেম্বর মাস নাগাদ এন্ডুরেন্স যখন ওয়েডেল সাগরে প্রবেশ করল, তখন সমুদ্রের রূপ বদলাতে শুরু করেছে। জলের বদলে চারদিকে ভাসমান বরফের চাঁই। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে, গন্তব্যের খুব কাছাকাছি এসে, এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। চারদিকের জমে যাওয়া বরফ এক দানবীয় সাঁড়াশি হয়ে চেপে ধরল এন্ডুরেন্সকে। জাহাজটি আটকে পড়ল। ইঞ্জিন বন্ধ, পাল নামানো। দিগন্ত বিস্তৃত সাদা বরফের মরুভূমিতে একটি কাঠের জাহাজ যেন একটি ছোট বিন্দুর মতো আটকা পড়ে রইল।
শীতের শুরু হলো অ্যান্টার্কটিকায়। তাপমাত্রা নেমে গেল হিমাঙ্কের অনেক নিচে। টানা কয়েক মাস বরফের কারাগারে বন্দি রইল এন্ডুরেন্স। নাবিকরা জাহাজের ভেতরেই জীবনযাপন করতে লাগল, অপেক্ষা করতে লাগল বসন্তের, যখন বরফ গলবে। কিন্তু মাস যত গড়াতে লাগল, বরফের চাপ তত বাড়তে থাকল।
অক্টোবর ১৯১৫। প্রকৃতির সেই নীরব সাঁড়াশি এবার তার আসল শক্তি দেখাতে শুরু করল। লক্ষ লক্ষ টন বরফ চারদিক থেকে কাঠের জাহাজের গায়ে চাপ দিতে লাগল। ক্রুরা ভেতর থেকে শুনতে পেত সেই হাড়-হিম করা শব্দ—যেন বিশাল কোনো প্রাণী কাঠের হাড়গোড় চিবিয়ে খাচ্ছে। জাহাজটি কাত হয়ে গেল, তক্তাগুলো ফেটে চৌচির হতে শুরু করল। শ্যাকলটন বুঝতে পারলেন, এই জাহাজ আর বাঁচবে না। তিনি নির্দেশ দিলেন, "সবাই জাহাজ ছাড়ো!" খাবার, কুকুর আর তিনটি ছোট লাইফবোট নিয়ে বরফের স্তূপের ওপর নেমে এল ২৮ জন মানুষ। চোখের সামনে তাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল, তাদের প্রিয় এন্ডুরেন্স, বরফের নিচে চিরতরে তলিয়ে গেল।
এখন তারা আর অভিযাত্রী নয়, নিছকই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে নামা কিছু অসহায় মানুষ। নিচে অথৈ সাগর, আর তারা দাঁড়িয়ে আছে ভাসমান বরফের চাঁইয়ের ওপর। সেই বরফের চাঁই সমুদ্রের স্রোতে ভাসতে ভাসতে অজানা দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন তারা সিল আর পেঙ্গুইন শিকার করে খায়। কনকনে ঠান্ডা, ফ্রস্টবাইট, আর যেকোনো মুহূর্তে বরফ ফেটে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ভয়—এই নিয়ে তাদের কাটল আরও কয়েক মাস।
অবশেষে সেই ভাসমান বরফ গলতে শুরু করলে, তারা তিনটি ছোট লাইফবোটে চড়ে বসল। উত্তাল, বরফশীতল সাগরে সাত দিন একটানা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে তারা পৌঁছাল একটি জনমানবহীন, রুক্ষ পাথুরে দ্বীপে—এলিফ্যান্ট আইল্যান্ড (Elephant Island)। প্রায় ৪৯৭ দিন পর তারা প্রথম শক্ত মাটিতে পা রাখল। কিন্তু এখানে কোনো উদ্ধারকারী জাহাজ আসবে না, কোনো মানুষ তাদের খুঁজবে না।
শ্যাকলটন জানতেন, এখানে বসে থাকার অর্থ হলো তিলে তিলে মৃত্যু। তিনি এক অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিলেন। সবচেয়ে শক্তিশালী লাইফবোটটি, যার নাম 'জেমস কেয়ার্ড', সেটিকে প্রস্তুত করা হলো। শ্যাকলটন এবং আরও পাঁচজন ক্রু এই মাত্র ২২ ফুট লম্বা খোলা নৌকায় চড়ে রওনা হলেন দক্ষিণ জর্জিয়ার উদ্দেশ্যে। দূরত্ব? প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার (৮০০ মাইল)। মাঝখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং উত্তাল মহাসাগর—ড্রেক প্যাসেজ।
তাদের এই যাত্রা ছিল যেন নরকের ভেতর দিয়ে যাওয়া। বিশালাকার ঢেউ, যা কখনো কখনো ৬০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতো, তাদের ছোট নৌকাটিকে যেন খেলনার মতো আছড়ে ফেলছিল। টানা ১৬ দিন ধরে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, জলোচ্ছ্বাস আর প্রবল ঝড়ের সাথে লড়াই করে, প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে তারা পৌঁছাল দক্ষিণ জর্জিয়ার উপকূলে। কিন্তু লড়াই তখনো শেষ হয়নি।
তারা যে উপকূলে পৌঁছাল, সেটি ছিল দ্বীপের উল্টো দিক। হুইলিং স্টেশন (যেখানে মানুষের বাস) ছিল দ্বীপের অপর প্রান্তে। মাঝখানে রয়েছে দুর্গম, বরফে ঢাকা এবং আগে কখনো পার না হওয়া এক পর্বতমালা। শ্যাকলটন এবং তার দুই সঙ্গী—ওয়ার্সলে আর ক্রিন—পায়ে হেঁটে সেই পর্বত পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাদের কাছে কোনো পর্বতারোহণের সরঞ্জাম ছিল না। শুধু বুটের নিচে কিছু স্ক্রু লাগিয়ে তারা রওনা দিলেন সেই অজানা বরফের পাহাড়ে। ৩৬ ঘণ্টার একটানা হাঁটা, বিশ্রামহীন, খাবারহীন, খাড়া বরফের ঢাল বেয়ে তাদের এই অভিযান ছিল মানুষের সহ্যশক্তির এক চরম পরীক্ষা।
অবশেষে, ১৯১৬ সালের মে মাসে তারা যখন স্ট্রমনেস (Stromness) এর হুইলিং স্টেশনে পৌঁছালেন, তারা যেন মানুষের রূপ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ভূত হয়ে গিয়েছিলেন। লম্বা দাড়ি, ময়লা কাপড়, আর চোখের নিচে গভীর কালো দাগ। শ্যাকলটনের প্রথম প্রশ্নটি ছিল, "যুদ্ধ কি শেষ হয়েছে?" স্টেশন মাস্টার অবাক হয়ে বললেন, "যুদ্ধ তো সবে শুরু হয়েছে।"
পরবর্তীতে শ্যাকলটন একটি উদ্ধারকারী জাহাজ নিয়ে ফিরে গেলেন সেই এলিফ্যান্ট আইল্যান্ডে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি তাঁর বাকি ২২ জন ক্রুর সবাইকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই অবিশ্বাস্য অভিযানে একজন মানুষও মারা যায়নি।