Posts

গল্প

পাকিস্তানী ঋণ

March 17, 2026

Rakib Shafqat Reza

Original Author My original post

27
View

ছোটকালে, ইউরোপের ভাষা না জানা একদেশে আমি মাস্টার্স পড়তে গিয়েছিলাম। পড়ালেখা ফ্রি, বেঁচে থাকা তো আর না। বাপ-মরা ছেলে, নানীর হাতে মানুষ হয়েছি – টাকা চাহিয়া পিতার কাছে আকাশের ঠিকানায় চিঠি লেখা যায়, কিন্তু সেই চিঠির উত্তর আসে না। জীবনের উপর খুব অভিমান হয়।  

ছাত্র অবস্থায় দেশে সামান্য কিছু পয়সা কামিয়েছি, ফন্দি-ফিকির জানি না বলে সেটা নিতেও পারিনি। ফলে দুইদিন পরেই দেখা গেল, আমার পকেটে খাওয়ার পয়সা নাই। একবেলার খাবার দুইবেলা ভাগ করে খাই। মাঝরাতে খুব খিদা লাগে, যন্ত্রনায় ঘুমাইতে পারি না – সকাল ৭টায় খেয়ে বের হতে হবে বলে, আমি সারারাত ক্রীম দেয়া ছোট্ট গোল একটা বাটার বনের দিকে তাকাই থাকি। মাঝেমাঝে নাকে বনের গন্ধ শুকি। সকালে পানি দিয়ে ঐ খেয়ে আমাকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বেঁচে থাকা লাগবে।

৮ মাস গায়ে দেবার সাবান কিনিনি। একটা সাবান কিনলে আমার ৪ দিনের খাবারের টাকা থাকবে না। শ্যাম্পু যে কি জিনিস – জানতামই না! বরফের দেশ, বংগবাজারের যে মামা গ্যারান্টি দিয়ে আমার কাছে জাম্পার বিক্রি করেছিল – সে জাম্পারে আমার শীত মানাতো না। দিনের বেলা হাটাচলায় শীত ভুলে থাকা যায়। রাতে বেলা ঠকঠক করে কাঁপতাম। নাক দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তো। আল্লাহ খোদার নাম নিতে ইচ্ছে করতো না, তাও মাঝেমাঝে উপরে তাকায়ে বলতাম – আমার ঔষুধ কেনার পয়সা নাই খোদা, আমারে নিউমোনিয়া দিও না। এতটুকু রহম অন্তত কর, আমি কোন দোষ করি নাই জীবনে … 

এরো-ইলাস্টিসিটির মোটা বই রাতে বুকে রেখে ঘুমাতাম। তখন কেন জানি মনে হত, মোটা বইয়ের কারনে রাতে ঠান্ডায় বুকে কফ জমবে না !  

এমন মানুষের জীবনে, স্বাভাবিকভাবেই ঈদ আসে না। যে ব্যাটা খাইতেই পারে না, তার আবার রোজা কিসের – আমি তো সারাবছরই সেহেরি ছাড়া রোজা থাকি ! 

সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে, সবুজ ঘাসের উপরে ঝিঝিপোকারা দলবেঁধে উড়ে বেড়ায়। বেগুনী আলোতে অসহ্য সুন্দর আকাশের নিচে, প্রায় মানুষ শুন্য ক্যাম্পাসেও আমাকে মানুষের ছায়া থেকে পালিয়ে থাকা লাগে। ইফতারের আগে, পাকিস্তানী ছেলেরা কাগজ দিয়ে ভু-ভু জেলা ধরনের একটা চোং বানায়ে মানুষকে ইফতার করতে ডাকে। আপনি কোন ধর্মের, সেটা দেখার সময় তাদের নাই। বিদেশীরা খুব আগ্রহ নিয়েই ইফতারে বসে। ছাত্র মানুষ, সবাইকেই হিসেব করে চলা লাগে। 

শুধু যাই না আমি। আমার কাছে সেই ফ্রি ইফতারকে ‘দান’ মনে হত। 

কিন্তু আমার মনে হওয়াতে কিছু যায় আসতো না। পাকিস্তানীরা ঠিকই নতুন নতুন জায়গা থেকে আমাকে খুজে বের করতো। সারা ক্যাম্পাস দেখতো, একদল পাকিস্তানী আমাকে চ্যাংদোলা করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন। 

অনেক ফল থাকতো। তরমুজ, মাল্টা, আঙ্গুর, বেদানা, খেজুর, পেস্তাবাদামের শরবত, নাশপাতি। কোন কোনদিন আম। দুই তিন পদের কাবাব থাকতো। রুটি দিয়ে ডালের তরকারী থাকতো, মাংসের কিমা থাকতো। কোনদিন হালিম থাকলে, অন্যদিন তেহেরী ধরনের খাবার। ওরা দুধ দিয়ে অনেক মিষ্টি জাতীয় খাবার রাখতো।

খাবারের সামনে খুব বেশিক্ষন অভিমান ধরে রাখা যেত না। পাকিস্তানীদের ইফতারি খাই বলে আজন্ম যে ক্ষোভ পুষে বড় হয়েছি – কোথায় জানি উবে যেত। আগুনের হলকার মত সুন্দরী বান্ধবীরা নানা ছুতোয় প্লেটে নিজের কাবাব কিংবা ফলের টুকরো রেখে যেত। পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করতো, ‘ আমাদের আপন ভাবো না কেন? আমরা কি তোমার ভাই-বোন না …” 

আমি কোনদিন সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। তারা বক্সে রাতের খাবার দিয়ে দিতো, আমি সেটা সেহেরিতে গবগবায়ে খেতাম।

আমার এখন পয়সার সে অভাব আর নাই। এত খাওয়া খাইসি যে, লিভারে চর্বি, হার্টে ব্লক। বিকেলে ইফতার কিনতে বের হই, হুদাই। নতুন নতুন দোকানের সামনে দাড়িয়ে বলি, ‘ ইফতারের সময় সামনে যাকে পাবেন ভাই, জোর করে দাওয়াত দিয়েন। এইখানে সামান্য কিছু টাকা আছে, তাদের মেহমানদারির খরচ … ‘ 

অনেকে টাকাটা রাখে, কেউ কেউ চিৎকার দিয়ে বলে, ‘ব্যবসা করি বলে ছোটলোক ভাবসেন, ইফতারির সময় আমরা কাউকে ফিরাই না, একসাথে খাই …’ 

আমি আরেক দোকানে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বলি,’কয়েকজনের সেহেরির খরচটা রাখেন …’

আমি শুধু আমার সেদিনের পাকিস্তানী ভাইবোনদের খুজে পাই না। পড়াশোনা শেষে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। আমার তাদের একবেলা খাওয়ানোর ঋণ শোধ করবার সুযোগ আসে না। এবার Hans Zimmer এর কনসার্ট দেখার নাম করে জার্মানী যাবার সুযোগ এল, যুদ্ধে পৃথিবী থমকে গেল। দুবাই-দোহা কোথাও দিয়ে যাবার সুযোগ আর নাই। 

একসময় ভাবতাম বুড়োরাই আগে মারা যাবে, এখন কত বন্ধু যে অকালে চলে গেল। আগামী বছর আমি বেঁচে থাকবো কিনা জানি না। আমি শুধু জানি, এ বছরও আমার তাদের ইফতারের ঋণ শোধ করা হল না। হাউ-মাউ বাধায়ে বলা হল না, ‘ দোস্ত, শরম পাইস না, কি খাবি খা – সব বিল আমার … ‘

মানুষ ভালো হলে হয়তো আল্লাহ ইচ্ছা পূরন করতেন … 

-রাকীবামানিবাস
১৭ই মার্চ, ২০২৬ 

          

Comments

    Please login to post comment. Login