Posts

গল্প

বাঁশবাগানের সেই রাত

March 17, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

46
View

হ্যালো, আমি শফিক। থাকি ঢাকার মিরপুরে। আজ আমি আমার জীবনের এমন একটি সত্য এবং ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে যাচ্ছি, যা মনে পড়লে আজও আমার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৫ বছর আগে, আমার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে।

​বন্ধুর নাম রাশেদ। ওর গ্রামের বাড়ি বরিশালের এক বেশ প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেবার বর্ষাকালে রাশেদ খুব করে ধরল, "চল, গ্রামের বৃষ্টি দেখে আসি। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনবি, সাথে হাঁসের মাংস আর ভুনা খিচুড়ি—দারুণ জমবে!" ওর কথায় রাজি হয়ে গেলাম।

​ঢাকা থেকে লঞ্চে করে ভোরে গিয়ে পৌঁছালাম ওদের গ্রামে। ওদের বাড়িটা বেশ পুরোনো ধাঁচের। বিশাল এক উঠোন, চারপাশে বেশ কয়েকটা টিনশেড ঘর। আর বাড়ির ঠিক পেছনেই বিশাল এক বাঁশবাগান আর সুপারি গাছের সারি। দিনের বেলায় জায়গাটা দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগলেও, সন্ধ্যা নামতেই যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করে পুরো বাড়িটাকে।

​প্রথম দিনটা বেশ আনন্দেই কাটল। কিন্তু বিপত্তি শুরু হলো দ্বিতীয় দিন রাত থেকে।

​সেদিন রাত তখন প্রায় ১২টা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে বিদ্যুতের ভয়াবহ চমকানি। গ্রামে সকাল থেকেই কারেন্ট নেই, যাকে বলে লোডশেডিং। পুরো বাড়ি ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু হারিকেনের টিমটিমে আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই। রাশেদ আর আমি একটা ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম। রাশেদ জার্নি করে বেশ ক্লান্ত ছিল, তাই ও বিছানায় যাওয়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু আমার চোখে কোনোভাবেই ঘুম আসছিল না।

​হঠাৎ, বৃষ্টির শব্দের মাঝেই আমি একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম। আমাদের টিনের চালের ওপর দিয়ে কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছে।

ছপ... ছপ... ছপ...

​পা ফেলার শব্দটা কোনো বিড়াল বা কুকুরের নয়। মনে হচ্ছিল, অনেক ভারী কোনো মানুষ খালি পায়ে টিনের চালের ওপর দিয়ে হাঁটছে। আমি ভাবলাম, চোর-টোর না তো! আমি রাশেদকে ধাক্কা দিলাম, "দোস্ত, ওঠ! চালে কে যেন হাঁটছে।"

রাশেদ ঘুমের ঘোরেই বিরক্তি নিয়ে বলল, "আরে ওসব কিছু না। খাটাশ বা বনবিড়াল হবে। তুই ঘুমা তো।" এই বলে ও পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।

​আমিও নিজেকে প্রবোধ দিলাম। কিন্তু মিনিট দশেক পর শব্দটা চাল থেকে নেমে উঠোনে এসে পড়ল। থপ! বেশ ভারী কিছু একটা লাফ দিয়ে পড়ার শব্দ।

​আমার বুকের ভেতরটা এবার ছ্যাঁত করে উঠল। আমি বিছানা থেকে চুপিচুপি উঠে জানালার কাছে গেলাম। জানালার কপাট সামান্য ফাঁকা করে বাইরের উঠোনের দিকে তাকালাম। বাইরে তখনো অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় আমি যা দেখলাম, তাতে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল।

​উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের মতো আকৃতি, কিন্তু উচ্চতায় স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে অনেক লম্বা—অন্তত আট-নয় ফুট হবে। তার হাত দুটো হাঁটুর নিচে পর্যন্ত ঝুলে আছে। অন্ধকারে মুখটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও, আমি অনুভব করছিলাম ছায়ামূর্তিটা আমার জানালার দিকেই তাকিয়ে আছে।

​আমি ভয়ে জমে গেলাম। চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হলো না। পরের বার যখন বিদ্যুৎ চমকাল, দেখি উঠোনে কেউ নেই! জায়গাটা ফাঁকা। আমি দ্রুত জানালার কপাট বন্ধ করে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে লেপের নিচে ঢুকে গেলাম।

পরের রাতের ঘটনা ছিল আরও ভয়ংকর।

​সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল, তবে কিছুটা কম। রাত আনুমানিক ২টা বাজে। আমার হঠাৎ করে প্রচণ্ড বাথরুম চাপে। গ্রামের বাড়ির বাথরুমগুলো ঘরের ভেতরে হয় না, সাধারণত উঠোন পেরিয়ে একটু দূরে হয়। ওদের বাথরুমটাও ছিল বাড়ির পেছনে, সেই বিশাল বাঁশবাগানের ঠিক পাশেই।

​আমি রাশেদকে অনেক ডাকলাম, কিন্তু ও এমন গভীর ঘুমে যে কোনোভাবেই উঠল না। অগত্যা আমি মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বেলে একাই বের হলাম। হারিকেনটা ঘরেই রইল।

​দরজা খুলে উঠোনে পা রাখতেই একটা ঠান্ডা বাতাস আমার গায়ে এসে লাগল। পরিবেশটা একদম নীরব, শুধু ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আমি বুকের ভেতর সাহস সঞ্চয় করে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। বাথরুমের কাজ শেষ করে যখনই আমি বের হয়েছি, তখনই আমি একটা ডাক শুনতে পেলাম।

​"শফিক... বাবা শফিক..."

​কণ্ঠটা আমার মায়ের! আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার মা তো ঢাকায়! এই গভীর রাতে বরিশালের এক অজপাড়াগাঁয়ে মায়ের ডাক কীভাবে শুনব?

​আবার ডাক এল বাঁশবাগানের ভেতর থেকে—"শফিক... এদিকে আয় বাবা। আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।"

​এবার আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম, বাঁশবাগানের ভেতর থেকে কেউ আমাকে ডাকছে। কণ্ঠটা অবিকল আমার মায়ের, কিন্তু কথা বলার সুরটা কেমন যেন যান্ত্রিক, আবেগহীন। আমি টর্চের আলোটা বাঁশবাগানের দিকে ফেললাম।

​আলোর বৃত্তে যা দেখলাম, তা কোনোদিন ভুলতে পারব না।

​বাঁশবাগানের ভেতর একটা পুরোনো কবরের পাশে কেউ একজন উবু হয়ে বসে আছে। তার পিঠটা আমার দিকে। পরনে একটা সাদা কাফনের মতো কাপড়। আমার হাতের টর্চের আলো পড়তেই সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল।

​ওর মুখটা আমার মায়ের মতো দেখতে, কিন্তু চোখ দুটো সম্পূর্ণ সাদা—কোনো মণি নেই। মুখটা কান পর্যন্ত চেরা, আর সেখান দিয়ে টপটপ করে কালো রক্ত ঝরছে। আমাকে দেখতেই সে বিকট এক হাসি দিল এবং চার হাত-পায়ে ভর করে মাকড়সার মতো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে আমার দিকে ছুটে আসতে লাগল!

​আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আমার হাত থেকে মোবাইলটা ছিটকে পড়ে গেল। আমি জীবনের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।

​যখন আমার জ্ঞান ফিরল, তখন সকাল হয়ে গেছে। আমি রাশেদদের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছি। রাশেদের বাবা, মা, আর গ্রামের একজন হুজুর আমার শিয়রে বসে আছেন। জানতে পারলাম, আমার চিৎকারের শব্দ শুনে রাশেদ আর ওর বাবা দৌড়ে গিয়ে আমাকে বাথরুমের সামনে বেহুঁশ অবস্থায় পায়। আমার গায়ে তখন প্রচণ্ড জ্বর।

​পরদিন সকালেই আমি ঢাকা ফিরে আসি। রাশেদের বাবা বলেছিলেন, ওই বাঁশবাগানে অনেক বছর আগে নাকি এক ডাইনি বুড়িকে মেরে পুঁতে রাখা হয়েছিল। মাঝরাতে সে মাঝে মাঝেই মানুষের রূপ ধরে পরিচিতদের গলায় ডাকে। কেউ যদি ভুলে তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঁশবাগানের ভেতর যায়, সে আর কোনোদিন ফিরে আসে না।

​সেই ঘটনার পর থেকে আমি আর কখনোই গ্রামে যাইনি। আজও রাতে যখন বৃষ্টি হয় আর লোডশেডিং থাকে, আমার মনে হয়—কেউ কি আমার জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে?

Comments

    Please login to post comment. Login