Posts

উপন্যাস

ফেব্রুয়ারী মাস

March 18, 2026

উপন্যাস রাইটার

16
View

https://rkmri.co/p0le20A2yAop/ বইটি খুব সুন্দর চাইলে দেখে আসতে পারেন

ফেব্রুয়ারী মাসের সকালগুলোতে এক অদ্ভুত নীরবতা থাকে। শীতের শেষ কুয়াশা তখনও শহরের গলিপথে ভেসে বেড়ায়, অথচ বাতাসে বসন্তের আগমনী সুর। ঢাকা শহরের পুরনো এক মহল্লায় দাঁড়িয়ে আছে রূপারী গাছের সারি—যাদের পাতায় রোদ পড়লে মনে হয় যেন সোনালী আগুন জ্বলে উঠেছে।

এই মহল্লাতেই থাকে অর্পিতা। নবম শ্রেণির ছাত্রী, বয়স মাত্র পনেরো। কিন্তু তার চোখে যেন এক অদ্ভুত গভীরতা—যেন সে পৃথিবীর প্রতিটি ঋতুকে নিজের ভেতর ধারণ করে রেখেছে। ফেব্রুয়ারী তার কাছে শুধু একটি মাস নয়, বরং এক আবেগের নাম।

অর্পিতা প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে মহল্লার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনারের দিকে তাকায়। ফুলে ভরে ওঠা সেই মিনার তাকে মনে করিয়ে দেয় ভাষার জন্য দেওয়া রক্তের কথা। তার বাবা একসময় ছাত্র আন্দোলনে ছিলেন, তাই ফেব্রুয়ারী মাসে তাদের বাড়িতে সবসময় এক ধরনের আবেগময় পরিবেশ বিরাজ করে।

প্রথম দৃশ্য: শহীদ মিনারের পথে

ফেব্রুয়ারীর ২১ তারিখ। ভোর চারটায় অর্পিতা ঘুম থেকে উঠে। মায়ের হাত ধরে সে যায় শহীদ মিনারে ফুল দিতে। চারপাশে মানুষের ভিড়, সবার হাতে ফুল, কারও চোখে অশ্রু। অর্পিতা মনে মনে ভাবে— "ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, ভাষা হলো আত্মার প্রকাশ।"

সে যখন মিনারের সিঁড়িতে ফুল রাখে, তখন মনে হয় তার ছোট্ট হাতের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের ভার নেমে আসছে।

দ্বিতীয় দৃশ্য: বসন্তের রঙ

ফেব্রুয়ারীর শেষ সপ্তাহে স্কুলে বসন্ত উৎসব হয়। অর্পিতা পরে হলুদ শাড়ি, মাথায় গাঁদা ফুলের মালা। তার বন্ধু রাহাত তাকে দেখে মুচকি হেসে বলে— “তুই যেন পুরো ফেব্রুয়ারী মাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিস।”

অর্পিতা লজ্জা পায়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আনন্দে ভরে ওঠে। বসন্তের রঙ, ফুলের গন্ধ, আর বন্ধুত্বের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারী যেন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে ওঠে।

তৃতীয় দৃশ্য: অর্পিতার ডায়েরি

অর্পিতা রাতে ডায়েরি লেখে। সে লিখে— "ফেব্রুয়ারী আমাকে শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানে শুধু মানুষকে ভালোবাসা নয়, নিজের ভাষাকে ভালোবাসা, নিজের মাটিকে ভালোবাসা।"

তার ডায়েরির পাতায় আঁকা থাকে লাল-সবুজ পতাকা, আঁকা থাকে শহীদ মিনারের ছবি। সে জানে, একদিন সে বড় হয়ে লেখক হবে, আর তার প্রতিটি গল্পে ফেব্রুয়ারীর আবেগ ছড়িয়ে থাকবে।

চতুর্থ দৃশ্য: রাহাতের চিঠি

একদিন স্কুল শেষে রাহাত অর্পিতাকে একটি ছোট্ট চিঠি দেয়। তাতে লেখা— "তুই যখন শহীদ মিনারে ফুল রাখিস, তখন মনে হয় তুই শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের সবার জন্য রাখছিস। তুই আমাকে শিখিয়েছিস ফেব্রুয়ারী মানে আত্মত্যাগ, আবার ভালোবাসাও।"

অর্পিতা চিঠি পড়ে হাসে। তার মনে হয়, ফেব্রুয়ারী মাস শুধু ইতিহাসের নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কেরও মাস।

পঞ্চম দৃশ্য: ফেব্রুয়ারীর শেষ দিন

ফেব্রুয়ারীর শেষ দিন। আকাশে হালকা মেঘ, বাতাসে বসন্তের গন্ধ। অর্পিতা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। সে ভাবে— "প্রতিটি ফেব্রুয়ারী আমাকে নতুন করে জন্ম দেয়। আমি যেন প্রতি বছর এই মাসে আবার মানুষ হয়ে উঠি।"

তার চোখে ভেসে ওঠে শহীদদের মুখ, ফুলে ভরা মিনার, হলুদ শাড়ি, রাহাতের চিঠি। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারী তার জীবনের এক অনন্ত উপন্যাস হয়ে ওঠে।

উপসংহার

ফেব্রুয়ারী মাসের গল্প আসলে অর্পিতার বেড়ে ওঠার গল্প। ইতিহাস, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, আর বসন্তের রঙ—সব মিলিয়ে সে শিখে নেয় জীবনের আসল অর্থ।

এই এক পর্বের উপন্যাসে ফেব্রুয়ারী যেন এক চরিত্র, যে অর্পিতাকে প্রতিদিন নতুন করে শেখায়— ভাষা মানে জীবন, আর জীবন মানে ভালোবাসা।

Comments

    Please login to post comment. Login