আমি ফাহিম। পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আজ আমি আপনাদের আমার জীবনের এমন একটি ঘটনার কথা বলতে এসেছি, যা কোনোদিন কাউকে বিশ্বাস করাতে পারিনি। ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় চার বছর আগের। কিন্তু আজও যখন একা কোনো অন্ধকার ঘরে থাকি, আমার মনে হয় ঘাড়ের কাছে কেউ একজন ঠান্ডা নিঃশ্বাস ফেলছে।
আমাদের কনস্ট্রাকশন কোম্পানির একটা প্রজেক্ট চলছিল খাগড়াছড়ির একদম ভেতরের দিকের একটা পাহাড়ি এলাকায়। জায়গাটা এতই দুর্গম যে সেখানে ঠিকমতো মোবাইলের নেটওয়ার্কও থাকে না। আমাকে পাঠানো হয়েছিল সাইট সুপারভিশনের জন্য। টানা পনেরো দিন থাকতে হবে। কোম্পানির পক্ষ থেকে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল পাহাড়ের চূড়ায় ব্রিটিশ আমলের এক পুরোনো ডাকবাংলোতে।
বাংলোটা দেখলেই কেমন যেন গা ছমছম করে ওঠে। বিশাল উঁচু ছাদ, সেগুন কাঠের ভারী দরজা-জানালা আর চারপাশ ঘিরে থাকা ঘন জঙ্গল। বাংলোর দেখাশোনার জন্য সিরাজ মিয়া নামের এক বৃদ্ধ কেয়ারটেকার ছিলেন। প্রথম দিন বিকেলে যখন আমি সেখানে পৌঁছাই, আকাশ মেঘলা হয়ে আসছিল। সিরাজ মিয়া আমার মালপত্র ঘরে রেখে খুব নিচু স্বরে একটা কথা বলেছিলেন, "স্যার, পাহাড়ে তো রাত তাড়াতাড়ি নামে। রাইতে যাই হোক, ঘরের দরজা খুলবেন না। আর কেউ নাম ধইরা ডাকলে ভুলেও সাড়া দিবেন না।"
আমি তখন শহরের আধুনিক ছেলে, এসব ভূত-প্রেত বিশ্বাস করি না। সিরাজ মিয়ার কথায় হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি, কী ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতার দিকে আমি পা বাড়াচ্ছি।
প্রথম দুই দিন কাজের চাপে এতই ক্লান্ত থাকতাম যে রাতে বিছানায় গা ছোঁয়াতেই ঘুম চলে আসত। আসল ঘটনাটা শুরু হলো তৃতীয় দিন রাতে।
সেদিন সন্ধ্যা থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। পাহাড়ি বৃষ্টি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মনে হচ্ছিল আকাশ ভেঙে পড়বে। রাত ১০টার দিকে জেনারেটরের তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় পুরো বাংলো ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। সিরাজ মিয়া নিচতলার একটা ছোট ঘরে থাকেন, আর আমি দোতলার বিশাল মাস্টার বেডরুমে। আমার সম্বল বলতে শুধু একটা ইমার্জেন্সি লাইট।
রাত তখন সম্ভবত ১টা কি দেড়টা বাজবে। বৃষ্টির শব্দ কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু বাতাসের গোঁ গোঁ আওয়াজ আর জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারপাশটা কেমন যেন ভৌতিক হয়ে উঠেছে। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম—বাংলোর নিচতলার কাঠের সিঁড়ি দিয়ে কেউ একজন ওপরে উঠছে।
খট... খট... খট...
শব্দটা খুব ধীর আর ভারী। মনে হচ্ছে কেউ একজন অনেক কষ্টে এক এক করে সিঁড়ি ভাঙছে। আমার প্রথমে মনে হলো সিরাজ মিয়া হয়তো কিছু দরকার হওয়ায় আসছেন। আমি বিছানা থেকে উঠে দরজার কাছে গেলাম। কিন্তু দরজার নব ঘোরানোর আগেই শব্দটা থেমে গেল।
আমি কান পেতে রইলাম। একদম পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ দরজার ঠিক ওপাশ থেকেই খুব পরিচিত একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম।
"ফাহিম... দরজাটা খোল বাবা। আমার খুব শীত লাগছে।"
আমার পুরো শরীর এক নিমেষে বরফ হয়ে গেল। কণ্ঠটা আমার মায়ের! কিন্তু আমার মা তো ঢাকাতে! এই গভীর রাতে, এই দুর্গম পাহাড়ে মা কীভাবে আসবে? আমার মনে পড়ে গেল সিরাজ মিয়ার সেই সতর্কবাণী—"কেউ নাম ধইরা ডাকলে ভুলেও সাড়া দিবেন না।" আমি বুঝতে পারলাম, এটা নিশির ডাক। আমি এক পা পিছিয়ে এলাম।
দরজার ওপাশ থেকে আবার ডাক এল। এবার আর মায়ের কণ্ঠে নয়, কণ্ঠটা পাল্টে গেল। এবার ডাকছে আমার ছোট বোন! "ভাইয়া, আমাকে বাঁচা... ওরা আমাকে মেরে ফেলবে ভাইয়া..."
সাথে সাথে দরজায় প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা পড়তে শুরু করল। দড়াম! দড়াম! দড়াম! মনে হচ্ছিল ভারী কোনো পাথর দিয়ে কেউ দরজাটা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। এত শক্ত সেগুন কাঠের দরজাটাও যেন কবজা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। আমি ভয়ে ইমার্জেন্সি লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে খাটের এক কোনায় গুটিসুটি মেরে বসে সূরা পড়তে লাগলাম।
প্রায় দশ মিনিট ধরে চলল এই তাণ্ডব। তারপর হঠাৎ সব শান্ত। কোনো শব্দ নেই।
আমি ভাবলাম হয়তো বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু তখনই আমার ঘরের ভেতরের পরিবেশটা বদলে যেতে শুরু করল। ঘরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেল। আর চারপাশ থেকে পচা মাংসের মতো একটা উৎকট গন্ধ আসতে লাগল। গন্ধটা এতই তীব্র যে আমার বমি আসার উপক্রম হলো।
হঠাৎ আমি অনুভব করলাম, ঘরের ছাদের দিক থেকে অদ্ভুত একটা খসখস শব্দ হচ্ছে। আমি সাহস করে মুখ তুলে ওপরে তাকালাম। আর সেই মুহূর্তে জানালার বাইরে একটা বিশাল বাজ পড়ল। বিদ্যুতের সেই ক্ষণিকের আলোয় আমি যা দেখলাম, তা কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
ছাদের একদম মাঝখানে, ঠিক আমার খাটের ওপরে একটা মানুষের মতো আকৃতি মাকড়সার মতো চার হাত-পায়ে আটকে আছে। ওর পিঠটা ছাদের দিকে, আর বুক আর মুখটা আমার দিকে ঝুলে আছে। ওর চোখ দুটো পুরো কালো, কোনো সাদা অংশ নেই। আর মুখটা অস্বাভাবিকভাবে হাঁ করা। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ওর গলাটা যেন ভেঙে বুকের কাছে ঝুলে আছে।
বিদ্যুৎ চমকানো শেষ হতেই ঘর আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, সেই জিনিসটা ছাদ থেকে ধীরে ধীরে আমার খাটের দিকে নামছে। আমি ওর ঠান্ডা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। মনে হচ্ছিল কেউ আমার গলা শক্ত করে চেপে ধরে আছে।
জিনিসটা ঠিক আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে উঠল, "দরজাটা খুললি না কেন ফাহিম?"
এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
পরদিন সকালে যখন আমার জ্ঞান ফেরে, দেখি সিরাজ মিয়া আর স্থানীয় কয়েকজন লোক আমার ঘরে। আমার প্রচণ্ড জ্বর। সিরাজ মিয়া জানালেন, আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে এই বাংলোতে এক ব্রিটিশ সাহেবের স্ত্রীকে গলা কেটে খুন করা হয়েছিল। তারপর থেকে বৃষ্টির রাতে মাঝে মাঝেই নাকি সে এইভাবে ফিরে আসে। যারা ভুল করে দরজা খুলে দিয়েছে, তাদের লাশ পরের দিন জঙ্গলে পাওয়া গেছে।
সেদিনই আমি ওই প্রজেক্ট ক্যানসেল করে ঢাকায় ফিরে আসি। প্রায় এক মাস আমাকে মানসিক ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে হয়েছিল স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য। কিন্তু আজও, বৃষ্টির রাতে যখন আমি একা থাকি, আমি দরজার ওপাশ থেকে সেই খটখট শব্দ আর ফিসফিসানি শুনতে পাই।