Posts

উপন্যাস

সাফল্যের অর্জনের গল্প

March 18, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

11
View

গল্পের নাম: সাফল্যের গল্প 🌟
মাটির দেয়ালের ছোট্ট একটি ঘরে জন্ম হয়েছিল নাঈমের। জন্মের পর থেকেই তার জীবন যেন কষ্টের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল। বাবা দিনমজুর, মা অসুস্থ। সংসারে অভাব এমন পর্যায়ে ছিল যে অনেক সময় ভাতের বদলে লবণ দিয়ে পানি খেয়েই রাত কাটাতে হতো। ছোটবেলায় যখন অন্য বাচ্চারা খেলাধুলা করত, তখন নাঈম বাবার সাথে ইট টানত, বাজারে ব্যাগ ধরত, কিংবা খেতে কাজ করত।
তবুও তার মনে ছিল এক অদ্ভুত জেদ—সে পড়াশোনা করবে। কারণ একদিন সে শুনেছিল, “শিক্ষাই মানুষের জীবন বদলাতে পারে।” সেই কথাটা তার হৃদয়ে গেঁথে যায়। কিন্তু পড়াশোনা করাও তার জন্য সহজ ছিল না। স্কুলে যাওয়ার জন্য তাকে প্রতিদিন ভোরে উঠে দুই ঘন্টা হেঁটে যেতে হতো। অনেক সময় ক্ষুধায় মাথা ঘুরে পড়ে যেত, তবুও সে উঠে দাঁড়াত।
প্রথম বড় বাধা আসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়। বাবার পা ভেঙে যায় কাজ করতে গিয়ে। সংসারের দায়িত্ব তখন প্রায় পুরোটা তার কাঁধে এসে পড়ে। স্কুল ছেড়ে দেওয়ার কথা উঠেছিল। অনেকেই বলেছিল, “এখন আর পড়ে লাভ নেই।” কিন্তু নাঈম রাতে কেঁদে কেঁদে সিদ্ধান্ত নেয়—সে পড়া ছাড়বে না। দিনে কাজ করবে, রাতে পড়বে।
এরপর শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। দিনে সে হোটেলে বাসন মাজত। গরম পানিতে হাত পুড়ে যেত, তবুও থামত না। রাতে বাড়ি ফিরে কুপির আলোয় বই খুলে বসত। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে এলে সে মুখে পানি দিত, আবার পড়া শুরু করত। অনেক দিন এমন গেছে, যখন সে মাত্র দুই-তিন ঘন্টা ঘুমিয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষায় সে পুরো উপজেলায় প্রথম হয়। তখন প্রথমবারের মতো গ্রামের মানুষ তাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এক শিক্ষক তার পাশে দাঁড়ান। তিনি নিজের টাকায় বই কিনে দেন, পড়া বুঝিয়ে দেন। নাঈম বুঝতে পারে—সাফল্যের পথে শুধু কষ্টই নয়, মানুষের সাহায্যও বড় শক্তি।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে আবার বড় বিপদ আসে। মায়ের অসুখ বেড়ে যায়। চিকিৎসার টাকা নেই। নাঈম নিজের পড়ার সময় কমিয়ে আরও বেশি কাজ শুরু করে। সে ভোরে সংবাদপত্র বিলি করত, দুপুরে দোকানে কাজ করত, রাতে পড়ত। শরীর ভেঙে পড়লেও মন ভাঙেনি। শেষ পর্যন্ত সে ভালো ফল নিয়ে মাধ্যমিক পাস করে।
এরপর শহরে কলেজে ভর্তি হওয়া তার জীবনের আরেক মোড়। শহরের ভাড়া, খাবার, পড়ার খরচ—সব মিলিয়ে যেন অসম্ভব এক যুদ্ধ। সে একটি ছোট্ট ঘরে চারজন মিলে থাকত। টিউশনি করে খরচ চালাত। কখনো টাকা না থাকলে একবেলা খেয়ে থেকেছে। তবুও সে প্রতিদিন নিজের জন্য একটা নিয়ম বানায়—কমপক্ষে ছয় ঘন্টা পড়বে, যতই কষ্ট হোক।
এই নিয়মই ধীরে ধীরে তার জীবন বদলাতে শুরু করে। কলেজে সে ভালো ফল করে বৃত্তি পায়। প্রথমবারের মতো তার হাতে নিজের উপার্জনের বাইরের টাকা আসে। সে সেই টাকা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা করায়, বাবার জন্য নতুন কাপড় কিনে দেয়। সেই দিন তার মনে হয়—সাফল্যের আলো খুব দূরে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার সামনে নতুন সুযোগ আসে। সে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়, নতুন দক্ষতা শেখে, কম্পিউটার শেখে, ইংরেজি শেখে। অনেকবার ব্যর্থ হয়। চাকরির ইন্টারভিউয়ে গিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। একদিন খুব হতাশ হয়ে সে ভেবেছিল—সব ছেড়ে দেবে। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে যায় ছোটবেলার সেই কুপির আলো আর বাবার কষ্টের মুখ।
সে আবার নতুন করে শুরু করে। প্রতিদিন ভোরে উঠে নিজের দুর্বলতা ঠিক করার চেষ্টা করে। ধীরে ধীরে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। অবশেষে একদিন সে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায়। প্রথম মাসের বেতন হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। মনে হয়—এই টাকায় শুধু টাকা নয়, তার বছরের পর বছর কষ্টের মূল্য লুকিয়ে আছে।
কয়েক বছরের পরিশ্রমে সে পদোন্নতি পায়, নিজের বাড়ি বানায়, বাবা-মাকে আর কাজ করতে দেয় না। কিন্তু সাফল্য পেয়েও সে নিজের অতীত ভুলে যায় না। সে গ্রামের দরিদ্র ছাত্রদের জন্য একটি তহবিল গঠন করে, যাতে কেউ শুধু অভাবের কারণে স্বপ্ন ছেড়ে না দেয়।
আজ নাঈমের নাম সবাই জানে। কিন্তু তার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য পদ বা টাকা নয়—সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, সে হাল ছাড়েনি।

Comments

    Please login to post comment. Login