Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ইন দ্য সেইম সিটি

March 18, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

84
View

রাজশাহী ট্যুরের ব্যাপারে উত্তর আসে ঘণ্টা দেড়েক পর। আবির জানায়- আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট। আই'ম আন্ডার সারভেইল্যান্স হেয়্যার। হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড। স্নেহা মোটেও রাগ বা অভিমান করে না। আবির যে ওকে বলছে হি উইল ট্রাই হিজ বেস্ট, এটাই ওর জন্য অনেক। ও প্রেশার ফিল করে বা ওর কাজ বা ফ্যামিলিতে কোনো প্রব্লেম হোক, এমন কিছু কখনোই স্নেহা করতে চায় না। সে খুশি মনেই লিখে পাঠায়- নো ওয়ারিজ। প্যারা নিও না। না দেখা হলে কোনো একটা অচেনা লোককে ধরে গান শুনে চলে আসবো! লল! আবির রিপ্লায় দেয়- কাম অন! 

রাজশাহীতে আবিরের সঙ্গে দেখা হওয়ার প্রথম দিনটা সম্ভবত স্নেহার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনের মধ্যে অন্যতম, অথবা ওইটাই তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন। এখনো ওই দিনটাকে স্নেহার সবচেয়ে সুন্দর দিন ভাবতেই ইচ্ছা করে। ওই দিনে কোনো কদর্য অনুভূতি নাই, যা আছে, পুরোটাই আনন্দ, পুরোটাই শান্তি। ১৩ ফেব্রুয়ারির বিকালের ফ্লাইটে নেমেই এয়ারপোর্টের পার্কিংয়ে হোটেল গ্র্যান্ড রিভার ভিউয়ের পাঠানো হাইস গাড়িতে উঠে ছিমছাম শহরটাকে দেখায় মনোযোগী হয়ে উঠলো স্নেহা। গাড়িতে উঠার একটু পর ড্রাইভার ভদ্রলোকটা জানতে চাইলেন, “এইবারই কি পথম রাজশাহী আস্লেন, মেডাম?"

ভদ্রলোকের কথায় আঞ্চলিকতার টান আছে, তবে সেটা রাজশাহী নাকি চাঁপাইনবাবগঞ্জের, এই ব্যাপারে স্নেহা নিশ্চিত হতে পারে না। রাজশাহী শহরে চাঁপাইয়ের অনেক লোক থাকে বলে সে শুনছে। জানালা দিয়ে সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তটা দেখতে দেখতে স্নেহা উত্তর দিলো- নাহ! সম্ভবত দ্বিতীয় অথবা তৃতীয়বার, মনে নেই। তবে প্রথম না। এর আগে আব্বার সঙ্গে দুইবার রাজশাহী আসছিল স্নেহা। তখন ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ে, এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়তেছে না। তবে এর আগে বা পরে হওয়ার কথা না।

রাজশাহীর এয়ারপোর্টটার নাম অদ্ভুত আছে- শাহ মখদুম বিমানবন্দর। কোনো পীর-আউলিয়ার নাম হবে হয়তো। স্নেহা উনার সম্পর্কে জানে না কেন? নিজের উপর একটু বিরক্তই হলো। একটা জেলা শহরের এয়ারপোর্ট তার নামে নামকরণ করা হইছে মানে সে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কেউ। নিজের দেশের একটা জেলার গুরুত্বপূর্ণ একজনের ব্যাপারে সে জানে না, এটা সে মানতেই পারতেছে না। নিজেকে বার কয়েক সে মূর্খ বলে ভেবে রাখলো হোটেলে ঢুকেই আজকে প্রথম কাজ হবে মখদুম সাহেব সম্পর্কে জানা। কিন্তু মখদুমের অর্থটার মানে তার তখনই জানতে হবে। গুগল ঘাটতেই চটপট উত্তর চলে আসলো, ‘মখদুম’ অর্থ ধর্মীয় নেতা বা শিক্ষক। সঙ্গে এটাও জানা গেল শাহ মখদুমের প্রকৃত নাম আসলে এটা না, উনাকে এই অঞ্চলে এই নামে ডাকা হইতো। তার আসল নাম আব্দুল কুদ্দুস জালালুদ্দীন।

স্নেহার কাছে জালালুদ্দীন নামটাই বেশি সুন্দর লাগলো। এই নামে উনি পরিচিত হতে পারতেন। নাহ, এখানে আবার হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর নামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার সুযোগ থাকে। এক দেশে দুই জালাল আউলিয়া থাকলে মুরীদগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এগুলা সবই স্নেহার অ্যাজাম্পশন। আন্দাজে যা মনে আসতেছে ভাবতে ভাবতে গাড়ি পৌঁছে গেছে কাজীহাটা নামের এক জায়গায়।

হোটেলের বাইরের লুকটা খুব একটা খারাপ না, ভেতরে সব ঠিক থাকলেই হয় ভাবতে থাকে স্নেহা। এরমধ্যেই আবিরের টেক্সট- রিচড হোটেল? এই নিয়ে ওর ৮ নম্বর টেক্সট। হযরত শাহজালাল থেকে শুরু হয়ে শাহ মখদুম পর্যন্ত বোর্ডিং হইছে কি না, ফ্লাইট অন টাইম কি না, ফ্লাই করলো কি না, ল্যান্ড হইলো কি না, আর এখন হোটেলে পৌঁছালো কি না। স্নেহার মনটা খামাখাই ভালো লাগতেছে। এটার কারণ চিন্তা করতেই সে বের করলো- কারণ একই শহরে আবিরও আছে। দেখা হোক বা না হোক অথবা যখনই দেখা হোক, শি ইজ নাউ ইন দ্য সেইম সিটি! লেভেল ফাইভ ব্যান্ডের “তু…মি সামনে নেই, তাও তুমি ভাসো, মনের মাঝে লুকিয়ে একটুখানি হাসো…” গুন গুন করতে করতে আবিরকে রিপ্লাই দিলো- ইয়েস, স্যার!

আবির সঙ্গে সঙ্গেই লিখলো- রেস্ট নাও। আই হ্যাভ অ্যান অফিশিয়াল ডিনার টুনাইট। কান্ট এভোয়েড। আই উইল ট্রাই টু কাম আর্লি মর্নিং টুমরো। স্নেহা "সকাল থেকে রাতের শেষে থাকো আমার পাশে” গুন গুন করতে করতে উত্তর লিখলো- নো ওয়ারিজ। প্যারা নিয়েন না, স্যার। কিন্তু আবির অলমোস্ট একটু পর পরই প্যারাটা নিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর টেক্সট পাঠিয়ে জানতে চায়- কী করতেছে? কী খাইছে? কোনো প্রব্লেম আছে কি না। হোটেল ঠিকঠাক কি না। এরপর স্টোরিতে হুইক্সির গ্লাসের ছবি দেখে লিখে পাঠালো- বেশি খেও না। একটু রেখে দিও কালকের জন্য। স্নেহা হেসে দিলো- হাহাহা!

১৪ ফেব্রুয়ারি। যদিও ভালোবাসা দিবস মাথায় রেখে এইদিন রাজশাহী যায়নি স্নেহা। ইন ফ্যাক্ট আবিরের সঙ্গে সত্যিই যে ওর দেখা হবে, এটা হোটেলের নিচে পার্কিংয়ে ব্ল্যাক একটা সিএইচআরের ড্রাইভিং সিটে আবিরকে বসা না দেখলে সে বিশ্বাস করতো না। আহ! কতদিন পর দেখা! ৬১ দিন! তবে এটা আর মুখ ফুটে আবিরকে বলে না স্নেহা। এটা বললেই আবির আবার এ্যামবারাস ফিল করবে। স্নেহা গাড়ির দরজা খুলতেই আবির ওর দিকে তাকিয়ে হাসি দিয়ে বললো- হোয়াটস আপ?

স্নেহা লাজুক হেসে মাথাটা শুধু একবার ডানে, আরেকবার বামে নাড়ায় ছোট্ট একটা মেয়ের মতো, যেন ওর বয়স এগারো অথবা সবে বারো! সকাল দশটা থেকে রাত সাড়ে দশটা- পুরো একটা সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা থেকে রাত লং ড্রাইভে টি-বাঁধ, বাঘা শাহী মসজিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, বড়কুঠি, এরপর এয়ারপোর্ট রোড কত জায়গায় যে তারা ঘুরছে, হিসাব নেই। যদিও কোথাও গাড়ি থেকে নামে নাই। শুধু দুপুরে সাহেব বাজার নামের একটা জায়গায় খেতে নামছিল- ক্যালিস্টো নামের একটা মাল্টি-কুইজিন রেস্টুরেন্টে।

ওইদিন লাঞ্চে কোরাল বিবি কিউ দিয়ে থাই ফ্রায়েড রাইস খেতে খেতে দুজন শাহ মখদুম থেকে শুরু করে নিজাম উদ্দীন আউলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এত গল্প, যেন শেষই হয় না দুজনের। স্নেহা অনেকদিন পর যেন নিজের ভেতর প্রান খুঁজে পাচ্ছিল। সন্ধ্যা থেকে অনেক রাত পর্যন্ত ওরা দুজন ছিল পদ্মার পাড়ে। অনেকটা সময় দুজন পাশাপাশি হাত ধরে বসে থাকলো, চুপচাপ। যেন এই নির্জনে পাশাপাশি নীরবতাও কত উপভোগ্য। একদিন আবির থাকবে না, এইদিনের স্মৃতিটাই হয়তো স্নেহাকে আনন্দ দেবে, কিংবা কে জানে- যন্ত্রণাও দিতে পারে- আবিরের পাশেই চুপচাপ বসে স্নেহা ভাবতেছিল।

পরদিন স্নেহা ঢাকায় ব্যাক করবে। রাত সাড়ে দশটায় হোটেলের নিচে স্নেহাকে নামিয়ে দিতে এসে আবির নিজেই বলে, চেষ্টা করবো কালকেও এক ফাঁকে দেখা করার। তবে কথা দিতে পারছি না। যদি না আসতে পারি, মন খারাপ করো না। আবিরের সঙ্গে ওইবার রাজশাহীতে স্নেহার দেখা হবে, এটাই তো নিশ্চিত ছিল না সে। এরমধ্যে এমন স্বপ্নের মতো একটা দিন কাটালো। এমন সুন্দর দিন তো আসলে তার জীবনে আসে নাই আগে। স্নেহা হেসে দিয়ে বলে, তুমিও প্যারা নিও না। পারলে আইসো, না পারলে আবার অন্য সময় দেখা হবে। যাওয়ার সময় দুজনেরই কিছুটা মন খারাপ হয়।

আবির কয়েকবার বলে, আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, আরেকটু থাকতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু যেতে হবে। স্নেহারও ইচ্ছা করে আরেকটু আবিরের পাশে থাকার, কিন্তু সে বলে- রাত হয়ে গেছে। তোমার যাওয়া উচিত। স্নেহা আবিরের হাতে চুমু খেয়ে গাড়ি থেকে নামতে নিলে আবির বলে- কালকে পারলে আরেকটু হুইস্কি ম্যানেজ করে রেখো। স্নেহা হেসে ফেলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। আবির হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে গাড়ি টান দেয়। যতক্ষণ গাড়িটা চোখের সীমানায় দেখা যায়, স্নেহা ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। রুমে গিয়ে আবিরকে টেক্সট করে স্নেহা- হ্যাপি ভ্যালেইন্টাইন'স ডে, আমোন। আধা ঘণ্টা পর আবিরের উত্তর আসে- উপস! হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন'স ডে মাদ্‌-মোয়াজেল।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login