Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্যাড ট্রিপ

March 19, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

147
View

আবিরের সঙ্গে রাজশাহীতে কাটানো প্রথম দিনটার মতো সুন্দর থাকলো না শেষদিনটা। সম্ভবত ওইদিন থেকেই আবির-স্নেহার বিদায়ের মুহূর্তগুলা অসুন্দর হওয়া শুরু হয়। ১৫ তারিখ সকাল সকাল আবির আসতে পারে না। আসতে পারবে কি না, তা নিয়েও ও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। হুট করেই ওর অফিসের কনফারেন্স থাকায় সকাল থেকেই ও কাজে আটকে পড়ে। স্নেহা এতে বিন্দুমাত্রও মন খারাপ করে না। ওর মনে হয়, দেখা হলে ভালো লাগতো। দেখা না হলে একটু খারাপ লাগবে, এই এতটুকুই।

সকাল থেকে একটু পর পরই আবির আসা না আসার দোলাচলে একেকটা টেক্সট পাঠাতে থাকে। দুপুর দুইটায় ঠিক ও হোটেলের নিচে এসে স্নেহাকে কল করে নিচে নামার জন্য। এর একটু আগেই স্নেহার ব্রিথিং প্রব্লেম শুরু হয়। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত একসঙ্গেই সময় কাটে ওদের। স্নেহার ফ্লাইট রাত আটটায়। ছয়টায় ও হোটেল থেকে চেক আউট করে বের হয়ে যাবে। এর আগে পাশেই এক বারে ওরা যায় আবিরের পীড়াপীড়ির কারণে। স্নেহা আবিরের জন্য অল্প ব্যালেন্টাইন রেখে দিছিল, ওইটা শেষ করার পরও ওর আবার বারে গিয়ে খাওয়া লাগবে। এর ঘণ্টা খানিক পরই ওর একটা কনফারেন্সেও জয়েন করতে হবে।

ড্রিংক করে আবির আধা ঘণ্টা গাড়ি ড্রাইভ করে যাবে বলে স্নেহা বারে যেতে রাজি হচ্ছিল না। আবির জাস্ট একটা পেগ খেয়েই বের হয়ে যাবে বলে স্নেহাকে এক প্রকার জোর করেই বারে নিয়ে গেল। ওইখানে বসে ওরা দুজন হালকা গল্প-টল্প করলো। দুইজনেরই সময় স্বল্পতা ছিল। আবিরকে সাতটার মধ্যে অফিসে গিয়ে কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে হবে। স্নেহাকেও এয়ারপোর্টের জন্য সাতটার মধ্যেই বের হয়ে যেতে হবে। আবিরের অফিশিয়াল কমিটমেন্ট থাকায় স্নেহা ওকে আগে বের হয়ে যেতে বলে। যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আবির একটু চুপ থেকে স্নেহাকে ডাকে- স্নে…হা…

স্নেহার মন তখন কিছুটা খারাপ হওয়ার পথে। দুই মাস পর ওদের দেখা হলো। আগেরদিন কী সুন্দর সময় কাটলো দুইজনের। ওইদিনও দুপুর থেকে ওরা একসঙ্গে। আবার কবে দেখা হবে, কে জানে! এসব ভাবতে ভাবতে আবিরের ডাক শুনে ওর দিকে তাকায় স্নেহা। আউট অফ নো হোয়্যার আবির হুট করেই বলে বসে- তুমি আর কখনো এখানে এইভাবে এসো না। স্নেহার তখন কী যে হলো, ও নিজেও জানে না। আবিরের কথাটা প্রসেস হওয়া মাত্রই ওই বারের মধ্যেই ও ঠাস করে আবিরের গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। স্নেহার আচমকা চড়ে আবিরের চশমাটা নিচে পড়ে ভেঙে গেল। আবির কিছুক্ষণ ওইভাবেই হতভম্ব হয়ে চুপ করে বসে রইলো ওইখানে।

স্নেহার মনে হলো, ও একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে যেন জাহান্নাম ঘুরে আসলো। হুঁশ ফিরতেই ও তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে নিচে বসে আবিরের চশমা খোঁজা শুরু করে। আবির ওকে থামানোর চেষ্টা করলো- ইট'স ওকে। কাম অন। ওঠো, প্লিজ বলে। স্নেহা ভাঙা চশমা ওঠিয়ে কয়েকবার সর‍্যি বলে আবিরকে। এরপর পরই ও আবিরকে ওইখান থেকে চলে যেতে বলে। কিন্তু আবির চশমা ছাড়া গাড়ি কীভাবে চালাবে, এই ভাবনা মাথায় আসতেই আবার পেছন থেকে ডাক দিলো- আ…বির…তুমি গাড়ি কীভাবে চালাবা? শিট! আই'ম সর‍্যি! তোমার চশমাটাও আমি…। আবির পেছনে ঘুরে বলে- ইট'স ওকে। ডোন্ট ওয়ারি। স্পেয়ার একটা চশমা আছে গাড়িতে। তুমি সাবধানে যেও। ঢাকায় গিয়ে আমাকে টেক্সট দিও।

ওই রাতে আর স্নেহার ঢাকায় ফেরা হয় না। প্রচণ্ড অপমান আর কষ্টে বার থেকে ওঠে ও হোটেলের রুমে চলে যায়। ফ্লাইটও ক্যান্সেল করলো না। এয়ারলাইন্সে কিছু জানায়ও না। হোটেলের নিচের একটা এজেন্সি থেকে সকালের ফ্লাইটের টিকেট কেটে রুমে গিয়ে কয়েক পেগ হুইস্কি খায়, এরপর শুয়ে পড়ে। আবির সম্ভবত কনফারেন্সে ছিল। স্নেহা ওকে কোনো টেক্সট দেয় না, ঢাকায় ফিরতেছে না, ওইটাও জানায় না। বারের মধ্যে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনাটা ওর দুঃস্বপ্নের মতো লাগে। দীর্ঘক্ষণ ও রাগে-অপমানে, এমন কী আবিরের গায়ে হাত তোলার জন্য অনুশোচনাতেও কাঁদতে কাঁদতে একটা সময় ঘুমিয়ে পড়ে। অনেক রাতে ওর ঘুম ভাঙলে দেখতে পায় আবিরের অসংখ্য টেক্সট টেলিগ্রামে এসে জমে আছে।

স্নেহা শুধু লেখে- আমি এখানেই আছি, ঢাকায় যাইনি। শরীর খারাপ লাগতেছিল। কথাটা মিথ্যা ছিল না। বার থেকে হোটেলে ফেরার পর স্নেহার শরীর কিছুটা খারাপ হয় ঠিকই, ওভারড্রিংকের কারণে। আবির রিপ্লাই দেয়- কাজটা ভালো করলা না। স্নেহার আর উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না। আবির ভাবে স্নেহা জেদ করে ওই রাতে ঢাকায় ফিরে নাই, কারণ ওর ফেরার ফ্লাইটের টিকেটটা আবির অনেক রিকোয়েস্ট করে কেটে দিছিল। আবিরের মনে হয়, ওকে শাস্তি দিতেই ওর কাটা টিকেটে স্নেহা ঢাকায় ফিরলো না। আর স্নেহা ভাবে, বিদায়ের ওই মুহূর্তে “আর কখনো এখানে এভাবে এসো না” বলাটা কি আবিরের খুব জরুরি ছিল?

পরদিন সকাল ৮টার ফ্লাইটে স্নেহা ঢাকায় রওনা হয়। ১০টার মধ্যে ওকে অফিসে ঢুকতে হবে, অত সকালে রওনা হওয়া ছাড়া আর উপায়ও ছিল না। ফ্লাইটে ওঠে ফ্লাই করার ঠিক আগ মুহূর্তে ও আবিরকে টেক্সট করে- যাচ্ছি। ১৪ তারিখ আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন ছিল। আমি এত হ্যাপি কোনোদিন ছিলাম কি না, মনে পড়তেছে না। কিন্তু যাওয়ার আগ মুহূর্তে আর কখনো না আসার কথাটা বলা কি খুব দরকার ছিল? ঢাকায় ফেরার পরও তো বলতে পারতা। খুব ক্ষতি হতো?

এর পরেই আরেকটা টেক্সটে লেখে- পরশু আমরা এত সুন্দর একটা দিন কাটালাম। আমার কাছে ওইটা একটা স্বপ্নের মতো দিন! ওই অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে কেন আমাকে ঢাকা পর্যন্ত যেতে দিতে পারলা না, আবির? সি…আমি যে সবসময় বলি না? আমার কপালে আনন্দের মুহূর্ত খুব বেশিক্ষণ থাকে না? দ্যাটস দ্য প্রুভ! কালকের বারের ইনসিডেন্টের জন্য আই'ম সর‍্যি। প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম। মাথা কাজ করছিল না ওই সময়। তুমি যদি না করতে, আমি তো জোর করে এখানে আসতাম না, আবির। জোর করে দেখা করাও কখনো সম্ভব না। এবারও আমি তোমাকে কোনো রকম জোর করিনি। তাহলে…কেন? লিভ ইট। ভালো থেকো। তোমার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে সবসময়ই কষ্ট হয়, এখনো হচ্ছে।

ঢাকায় ল্যান্ড করেই আবিরের টেক্সট দেখলো স্নেহা- আই'ম রিয়েলি সর‍্যি, স্নেহা। হ্যাভ ইউ ল্যান্ডেড? রাজশাহীর ওই শেষদিনের কুফাটা আর কাটে না স্নেহা-আবিরের জীবনে, বরং প্রতিবারই আরো বেশি বাড়তে থাকে। একটা সময় ওদের বিদায় মুহূর্তটা দুইজনের জন্যই ট্রমা হয়ে ওঠে। দুইজনের কেউই হয়তো তেমনটা আশা করে না; কিন্তু মানুষ যা আশা করে, তা সবসময় আর হয় কই?

এক সময়ের শান্তি ক্রমশই অশান্তিতে পরিণত হয়। আনন্দের মুহূর্তগুলা তো আর কেউ চিরকাল বাক্সবন্দি করে রাখতে পারে না। সেটা পারলে তো মানুষ বাক্স খুলে খুলে প্রয়োজন মাফিক আনন্দ বের করে কাটিয়ে দিতে পারতো পুরোটা জীবন। সময় বদলায়, মুহূর্তগুলাও আর আগের মতো থাকে না সবসময়। যা এক সময় আনন্দ ছিল, তা বিষাদ হয়ে ওঠে- কী যেন কার বা কীসের দোষে!

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কোনোকিছু কিনতে যাওয়া একটা পেইনফুল কাজ। তবুও স্নেহাকে নামতে হলো। ফার্মেসি থেকে নতুন সিরিঞ্জ কিনে এনে সুঁইয়ের নিচের দিকের প্লাস্টিকের অংশটা আগুন দিয়ে গলাতে গলাতে ও ভাবতেছিল- সব শেষ কেন এত অসুন্দর হয়? মানুষ কেন অভিযোগ আর কদর্য অনুভূতি দেওয়া ছাড়া বিদায় জানাতে পারে না? আবিরের ক্ষতি হোক, এমন কিছু ও স্বপ্নেও কি কখনো ভাবছিল? এ কথা এখন হাজারবার চিৎকার করে বললেও কি আর আবির বিশ্বাস করবে? স্নেহার হঠাৎ ব্রেক ডাউন হয়। সমস্ত শরীর ঘাম দিয়ে কাঁপতে থাকে।

লাইটারে সুঁইটা সেট করে জ্বালানোর চেষ্টা করতেই আগুন ধরে যায় পুরা ফয়েল পেপারে। স্নেহা আগুনটা নিভিয়ে চুপ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে কতক্ষণ। সমস্ত শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম ছাড়তে থাকে। বেঁচে থাকার অনুভূতিটা ইদানিং যন্ত্রণার লাগতেছে ওর, কিন্তু মৃত্যুও তো সহজ লাগে না। এসব ভাবনায় ওর ভীষণ ক্লান্ত লাগে। যতটা না শারীরিক, মানসিক ক্লান্তিটা এর চেয়েও বেশি। চোখ বন্ধ করে স্নেহা ব্লু টুথ স্পিকারটায় শোনে, সুবীর সেন গাইতেছেন-

ক্ষতি নেই আজ কিছু আর, ভুলেছি যতকিছু তার
এ জীবনে সবই যে হারায়, জানি ভুলে যাবে যে আমায়…

চোখ বন্ধ করে গান শুনতে শুনতেই ওর মনে পড়ে সিলেটের ওই অদ্ভুত সকালটার কথা। সারা রাত লোকাল বাসে জার্নির পর ভোরে যখন ও সিলেট শহরের লাস্ট স্টপেজ কদমতলীতে নামে, নেক্সট গন্তব্যস্থল নিয়ে ওর একদমই ভাবতে হয় নাই তেমন। বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে হাক-ডাক শুরু হয়ে যায় সিএনজি আর বাংলা টেসলার ড্রাইভারদের। স্নেহা যে সিলেটি ফুরি না, আর ও যে ওইখানে নতুন আসছে, এটা ওর মুখ দেখেই ওইখানে হাকডাক ওয়ালাদের সবাই সম্ভবত বুঝে ফেলছিল। ও বাস থেকে মাটিতে পা রাখা মাত্রই একেকজনের ডাক শুরু হয়ে গেল- আপা, দরগাহ যাইবায় নি না চান্দনী ঘাট?

সিলেটে ওইবারই স্নেহার প্রথম ট্যুর না। ২৩ বছর আগে ও প্রথম সিলেটে গেছিল। অগুরুত্বপূর্ণ মেমোরিকে ওর ব্রেইন খুব একটা জায়গা নষ্ট করে থাকার পারমিট দেয় না বলে ২৩ বছর আগে সিলেটে গিয়ে ও ঠিক কী কী করছিল বা কোথায় কোথায় গেছিল- ওইবার সিলেটে গিয়ে ওইসব আর ওর খুব একটা মনে পড়ে না। দরগাহতে যে গেছিল, এইটাই শুধু ওর মনে ছিল। ১২ বছর আগে আরেকবার ও সিলেটে গেছে। ওইবারই শেষবার। ওই স্মৃতি অবশ্য ওর মোটামোটি মনে আছে। ওই হিসাবে ওই ভোরে ও তৃতীয়বারের মতো সিলেট শহরে পা রাখছিল। তবে একা বোধহয় ওইবারই প্রথম গেছে।

এত এত হাক-ডাকের মধ্যে স্নেহা একজন বয়স্ক লোকের টানা রিকশার সামনে গিয়ে বলে- চাচা, দরগাহ রোড যাবেন? লোকটা কথা দিয়ে না, হাসিতে ওকে দরগাতে নিয়ে যাওয়ার সম্মতি জানালেন। উনার নাম ওমর ফারুক। সিলেট শহরে তিন ঘণ্টার মতো ছিল স্নেহা, পুরাটা সময়ই ওমর ফারুক চাচার ওই রিকশাতেই ও এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াইছে।

সিলেটে নামার পর স্নেহা প্রথমে জালালী কবুতর দর্শনে যায়। খুব সকাল হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মাজারে গিয়ে কিছুক্ষণ ও চুপচাপ বসে থাকে গজার মাছ খ্যাত পুকুরের পাশে। ওই ভোর সকাল থেকেই নানা জায়গা থেকে নানা কিছিমের ভক্ত-মুরীদরা মাজারে ছুটে আসতে ছিলেন কত কী মানত নিয়ে! স্নেহা ভাবে, ওর কি কোনো মানত করার আছে? ওলী-আউলিয়াদের মাধ্যমে ভক্তরা তো মূলত খোদার কাছেই মানত করে।

স্নেহা ভাবতে থাকে, খোদার সঙ্গে তো বান্দার যোগাযোগ থাকার কথা সরাসরি। যে খোদায় বিশ্বাসী, তার কি কোনো মাধ্যম লাগে খোদার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে? স্নেহার মনে হলো- নাহ! সংযোগ ঘটাইতে জানলে কোনো মাধ্যমই কারো লাগে না! ডাকার মতো ডাকলে, খোদার জবাব বান্দা নিজেই খুঁজে পায়। এরজন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নাই। তবু ও মাজারের ভেতর একবার ঢুকে সালাম জানিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মাজারের সফেদ কবুতরগুলার উড়াউড়ি দেখে। 

দরগাহ থেকে বের হয়ে ওমর ফারুক চাচার রিকশাতে চড়েই স্নেহা চলে যায় চাঁদনী ঘাট। সুরমা নদীর পাড়ে বাঁধানো সিঁড়িতে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই ওর মনটা হঠাৎ ভীষণ শান্ত হয়ে যায়। ফাল্গুনের মিষ্টি রোদ আর হালকা বাতাস; কোথা থেকে যেন ভেসে আসে কোকিলের ডাক- স্নেহা খুব মন দিয়ে ওই ডাক শুনতে শুনতে কিছুক্ষণের জন্য দুনিয়াদারির সমস্ত যন্ত্রণা বোধের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতর হারিয়ে যায়; একেবারে একা, খুব নির্জনে!

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্ল্যাকহোল

Comments

    Please login to post comment. Login