Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্যাড ট্রিপ

March 19, 2026

Shifat Binte Wahid

103
View

আবিরের সঙ্গে রাজশাহীতে প্রথম দিন দেখা হওয়ার মতো সুন্দর শেষদিনটা থাকলো না। মূলত আবির-স্নেহার বিদায়ের মুহূর্তগুলো অসুন্দর হওয়া শুরু হয় ওইদিন থেকেই। ১৫ তারিখ সকাল সকাল আবির আসতে পারে না। আসতে পারবে কি না, তা নিয়েও কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। হুট করেই অফিসের কনফারেন্স থাকায় আটকে গেছিল।

স্নেহা তাতে মন খারাপ করে নাই। দেখা হলে ভালো লাগতো, দেখা না হলে একটু খারাপ লাগবে, এই এতটুকুই। কিন্তু দুপুর দুইটায় আবির হোটেলের নিচে এসে স্নেহাকে কল করে নিচে নামার জন্য। ঠিক এর একটু আগেই স্নেহার ব্রিথিং প্রব্লেম শুরু হয়। বিকালটা একসঙ্গেই থাকা হয় দুজনের। স্নেহার ফ্লাইট রাত আটটায়। ছয়টায় হোটেল থেকে চেক আউট করে বের হয়ে যাবে। তার আগে পাশেই এক বারে ওরা যায় আবিরের অস্থিরতার কারণে। স্নেহা আবিরের জন্য আগে থেকেই অল্প ব্যালেন্টাইন রেখে দিছিল, সেটা শেষ করার পরও তার আবার খাওয়া লাগবে।

এই অবস্থাতে সে আবার গাড়ি ড্রাইভ করে যাবে, স্নেহা এজন্য প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। আবির জাস্ট একটা পেগ খাবে বলে জোর করেই গেল। বারে দুজন হালকা গল্প-টল্প করলো। সময় নাই দুইজনের হাতেই। আবিরের সাতটার মধ্যে অফিসে গিয়ে একটা কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে হবে। স্নেহাকেও যেতে হবে এয়ারপোর্টে। দুইজনকেই ৬টার মধ্যে উঠতে হবে বার থেকে। আবিরের তাড়া থাকায় স্নেহা তাকে আগে চলে যেতে বললো। কিন্তু যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আবির স্নেহাকে বলে ওঠলো, স্নে…হা…

স্নেহার মন তখন কিছুটা খারাপ হওয়ার পথে। দুই মাস পর দেখা হলো। কালকে কী সুন্দর সময় কাটলো দুইজনের। আজকেও আবার দেখা হলো। আবার কবে দেখা হবে কে জানে- এসব ভাবতে ভাবতে আবিরের ডাক শুনে ওর দিকে তাকায় স্নেহা। আবির হুট করেই বলে বসলো- তুমি আর এখানে এসো না। স্নেহার তখন কী হলো ও নিজেও জানে না, হুট করেই আবিরের গালে একটা চড় বসিয়ে দিলো বারের ভেতরেই। আবিরের চশমাটা নিচে পড়ে ভেঙে গেল। সে চুপ করে বসে রইলো কয়েক সেকেন্ড।

স্নেহা মনে হয় একটা ঘোরের ভেতর কোনো জাহান্নাম থেকে ঘুরে আসলো। হুঁশ ফিরতেই তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে নিচে আবিরের চশমা খুঁজতে থাকলো। আবির ওকে থামাচ্ছিল। স্নেহা ভাঙা চশমা উঠিয়ে সর‍্যি সর‍্যি বললো কয়েকবার। এরপর আবিরকে বললো, প্লিজ তুমি এখান থেকে চলে যাও। কিন্তু আবির চশমা ছাড়া কীভাবে গাড়ি চালাবে? ও উঠে দাঁড়াতেই স্নেহা ডাকলো- আ…বির…গাড়ি কীভাবে চালাবা? আই'ম সর‍্যি। তোমার চশমাটাও আমি…আবির বললো, ইট'স ওকে। ডোন্ট ওয়ারি। স্পেয়ার একটা চশমা আছে গাড়িতে। তুমি সাবধানে যেও। ঢাকায় গিয়ে আমাকে টেক্সট দিও।

স্নেহার ওই রাতে ঢাকায় ফেরা হয় না আর। প্রচণ্ড অপমান আর কষ্টে হোটেলের রুমে চলে যায়। ফ্লাইট ক্যান্সেল করে না। কিছু জানায়ও না। হোটেলের নিচের একটা এজেন্সি থেকে সকালের ফ্লাইটের টিকেট কাটে। রুমে গিয়ে কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েই শুয়ে পড়ে। আবির সম্ভবত কনফারেন্সে। স্নেহা কোনো টেক্সট দেয় না, ঢাকায় ফিরছে না জানায়ও না। একটা সময় ওইভাবেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। অনেক রাতে ঘুম ভেঙে দেখে আবিরের অসংখ্য টেক্সট।

স্নেহা শুধু লেখে- আমি ঢাকায় যাইনি। এখনো রাজশাহীতেই আছি। শরীর খারাপ লাগছিল। কথাটা মিথ্যা ছিল না। স্নেহার শরীর হোটেলে ফেরার পর কিছুটা খারাপ হয় ঠিকই, ওভারড্রিংকের কারণে। আবির রিপ্লাই দেয়- কাজটা ভালো করলা না। স্নেহার উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না। আবির ভাবে স্নেহা জেদ করে ওই রাতে ঢাকায় ফিরে নাই, কারণ ফ্লাইটের টিকেটটা আবির জোর করে কেটে দিছিল। আর স্নেহা ভাবে, বিদায়ের মুহূর্তে “আর কখনো এখানে এসো না” বলাটা কি খুব জরুরি ছিল?

পরদিন সকাল ৮টার ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরে স্নেহা। ১০টার মধ্যে অফিসে ঢুকতে হবে তাই অত সকালে রওনা হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। ফ্লাইটে উঠে ঠিক ফ্লাই করার আগ মুহূর্তে আবিরকে টেক্সট পাঠায়- যাচ্ছি। আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন ছিল ১৪ তারিখ। আমি এত হ্যাপি কখনো ছিলাম কি না আগে, মনে পড়ে না। শুধু যাওয়ার আগ মুহূর্তে আর কখনো না আসার কথাটা বলা খুব দরকার ছিল কি? আমি ঢাকায় ফেরার পর বললে খুব ক্ষতি হতো?

অনেক সুন্দর একটা সময় কাটিয়েছিলাম আমরা পরশুদিন। আমি ঢাকায় ফেরা পর্যন্ত ওই অনুভূতিটা নিয়ে কেন যেতে দিলে না, আবির? সি…আমি যে সবসময় বলি না? আমার কপালে আনন্দের মুহূর্ত বেশিক্ষণ থাকে না। আমি সর‍্যি কালকের বিহেভিয়রের জন্য, কিন্তু প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম ওই মুহূর্তে। তুমি না করলে তো আমি কখনো জোর করে আসতাম না, আবির। এবারও আমি তোমাকে জোর করিনি। তাহলে…কেন? লিভ ইট। ভালো থেকো। তোমার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি, কষ্ট হচ্ছে। তোমার কাছ থেকে বিদায়ের নেওয়া আমার জন্য সবসময়ই বেদনার। ঢাকায় ল্যান্ড করেই আবিরের টেক্সট দেখে স্নেহা- আই'ম সো সর‍্যি। হ্যাভ ইউ ল্যান্ডেড?

রাজশাহীর ওই শেষদিনের কুফাটা আর কাটে না স্নেহা-আবিরের জীবনে। বরং প্রতিবার আরো বেশি বাড়তে থাকে। একটা সময় ওদের বিদায় মুহূর্তটা দুইজনের জন্যই ট্রমা হয়ে উঠে, দুইজনের কেউই হয়তো এমন কিছু আশা করে নাই, কিন্তু মানুষ যা আশা করে, তা সবসময় হয় কই?

এক সময়ের শান্তি অশান্তি হয়ে উঠে। আনন্দের মুহূর্তগুলা তো আর কেউ চিরকাল বাক্সবন্দি করে রাখতে পারে না। তাহলে তো সবাই বাক্স খুলে খুলে প্রয়োজন মতো আনন্দ নিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতো পুরোটা জীবন। সময় বদলায়, মুহূর্তগুলাও আর আগের মতো থাকে না সবসময়। যা এক সময় আনন্দ ছিল, তা বিষাদ হয়ে উঠে কী যেন কার বা কীসের দোষে।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কোনোকিছু কিনতে যাওয়া একটা পেইনফুল কাজ। তবুও নামতে হলো স্নেহাকে। ফার্মেসি থেকে নতুন সিরিঞ্জ কিনে এনে সুঁইয়ের নিচের দিকের প্লাস্টিকের অংশটা আগুন দিয়ে গলাতে গলাতে ভাবতেছিল- সব শেষ কেন এত অসুন্দর হয়? মানুষ কেন অভিযোগ আর কদর্য অনুভূতি দেওয়া ছাড়া বিদায় জানাতে পারে না? আবিরের ক্ষতি হোক এমন কিছু সে স্বপ্নেও কি কখনো চেয়েছিল? এ কথা হাজারবার চিৎকার করে বললেও কি আর আবির বিশ্বাস করবে? স্নেহার ব্রেক ডাউন হয় আবার। শরীর কাঁপতে থাকে।

লাইটারে সুঁইটা সেট করে জ্বালানোর চেষ্টা করতেই আগুন ধরে যায় পুরো ফয়েল পেপারে। স্নেহা সেটা নিভিয়ে চুপ করে মাথায় হাত দিয়ে বসে। সমস্ত শরীর থেকে দর দর করে ঘাম ছাড়ে তার। বেঁচে থাকার অনুভূতিটা ইদানিং যন্ত্রণার লাগছে, কিন্তু মৃত্যুও তো সহজ লাগে না। এসব ভাবনায় ক্লান্ত লাগে। যতটা না শারীরিক, মানসিক ক্লান্তি এরচেয়ে বেশি। চোখ বন্ধ করে স্নেহা ব্লু টুথ স্পিকারে শোনে সুবীর সেন গাইছেন-

“ক্ষতি নেই আজ কিছু আর, ভুলেছি যতকিছু তার

এ জীবনে সবই যে হারায়, জানি ভুলে যাবে যে আমায়…।"

চোখ বন্ধ করে গান শুনতে শুনতেই স্নেহার মনে পড়লো সিলেটের ওই অদ্ভুত সকালটার কথা। সারা রাতের লোকাল বাসের জার্নির পর ভোরে যখন সিলেট শহরের লাস্ট স্টপেজ কদমতলীতে সে নামলো, নেক্সট গন্তব্যস্থল কোথায় হতে পারে, এটা নিয়ে তার তেমন একটা ভাবতেই হয় নাই। বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে হাক-ডাক শুরু হয়ে গেল সিএনজি আর বাংলা টেসলার ড্রাইভারদের। স্নেহা যে সিলেটি ফুরি না, আর সিলেটে নতুন আসছে, এটা তার মুখ দেখেই বোধহয় সবাই বুঝে ফেলছে। তাকে দেখেই ড্রাইভাররা হাক-ডাক দিচ্ছেন- আপা, দরগাহ যাইবায় নি না চান্দনী ঘাট?

সিলেটে এবারই প্রথম আসে নাই স্নেহা। ২৩ বছর আগে প্রথম আসছিল। অগুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি তার মেমোরিতে কম থাকে, তাই ওইবার এসে সে এই শহরে কী কী করছিল, তা এখন আর মেমোরিতে খুব একটা স্পষ্ট না। দরগাহতে যে গেছিল, সেটা ওর মনে আছে। ১২ বছর আগে সিলেটে সে শেষবার আসে। ওই স্মৃতি মোটামোটি মনে আছে। ওই হিসাবে এটা তার সিলেট শহরে তৃতীয়বারের মতো আসা, তবে একা আসা এবারই প্রথম।

এত হাক-ডাকের মাঝে একজন বয়স্ক লোকের টানা রিকশার দিকে এগিয়ে গিয়ে স্নেহা বললো- চাচা, দরগাহ রোড নিয়ে যাবেন? লোকটা একটা হাসি দিয়ে সম্মতি জানিয়ে তাকে রিকশায় উঠতে বললেন। চাচার নাম ওমর ফারুক। সিলেট শহরে স্নেহা ছিল তিন ঘণ্টার মতো, এই পুরাটা সময় সে ওমর ফারুক চাচার রিকশাতে করেই এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াইছে।

সিলেটে নেমেই স্নেহার প্রথম যাওয়া হয় জালালী কবুতর দর্শনে। খুব সকাল হযরত শাহজালাল (রহঃ)-এর মাজারে গিয়ে কিছুক্ষণ সে চুপচাপ বসে ছিল গজার মাছ খ্যাত পুকুরের পাশে। ওই সকাল সকালই কত ভক্ত-মুরীদ ছুটে আসছেন মাজারে কত কী মানত করতে! স্নেহা ভাবে, তার কি কোনো মানত করার আছে? ওলী-আউলিয়াদের মাধ্যমে ভক্তরা মূলত খোদার কাছেই তো মানত জানান।

স্নেহার ভাবতে থাকে, খোদার সঙ্গে তো বান্দার যোগাযোগ থাকার কথা সরাসরি। যে খোদায় বিশ্বাসী, তার কি কোনো মাধ্যম লাগে খোদার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে? স্নেহার মনে হলো- নাহ! ডাকার মতো ডাকলে, খোদার জবাব বান্দা নিজেই খুঁজে পায়, এরজন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন নাই।  তবু সে মাজারের ভেতর একবার ঢোকে। সালাম জানিয়ে বের হয়ে মাজারের সফেদ কবুতরগুলার উড়াউড়ি কিছুক্ষণ দেখে। 

এরপর ওমর ফারুক চাচার রিকশায় চলে যায় চাঁদনী ঘাট। সুরমা নদীর পাড়ে বাঁধানো সিঁড়িতে বসে তার মনটা হঠাৎ ভীষণ শান্ত হয়ে যায়। ফাল্গুনের মিষ্টি রোদ আর হালকা বাতাস, কোথা থেকে যেন ভেসে আসতেছে কোকিলের ডাক, স্নেহা খুব মন দিয়ে ওই ডাক শুনতে শুনতে কিছুক্ষণের জন্য দুনিয়াদারির সমস্ত যন্ত্রণা বোধের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের ভেতর হারিয়ে গেল, একা, নির্জনে।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login