শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি, আমি তথাকথিত কোনো লেখক নই। আমার সাথে ঘটে যাওয়া হাড়হিম করা কিছু সত্য ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগের। আমার কর্মস্থল ছিল ঢাকার বাইরে ছোট্ট এক মফস্বল শহরে। সেখানে একটা পুরনো জমিদার বাড়িতে আমাদের অফিসের গেস্ট হাউস করা হয়েছিল। বাড়িটা দেখতে যতটা রাজকীয়, তার চেয়েও বেশি রহস্যময়।
সেই অভিশপ্ত প্রথম রাত
শহরে পৌঁছাতে আমার বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘড়িতে তখন প্রায় রাত ১২টা বাজে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছিল, আর বাতাসের শব্দে পুরনো জানলাগুলো অদ্ভুত এক আওয়াজ করছিল। গেস্ট হাউসের কেয়ারটেকার মতি মিয়া লণ্ঠন হাতে আমাকে রিসিভ করল। লোকটার চেহারাটা কেমন যেন ফ্যাকাশে, চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক।
আমাকে দোতলার শেষ মাথায় একটা বড় ঘরে থাকতে দেওয়া হলো। মতি মিয়া ঘরটা খুলে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় নিচু স্বরে বলল, "স্যার, রাতে যাই হোক না কেন, ঘরের দরজা খুলবেন না। আর দেয়ালে টাঙানো ওই পুরনো আয়নাটার দিকে বেশিক্ষণ তাকাবেন না।"
আমি তখন ক্লান্ত, তাই ওর কথাগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দিলাম না। ভাবলাম, বুড়ো মানুষ হয়তো একটু বেশিই কুসংস্কারাচ্ছন্ন। কিন্তু আমার ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগল না।
আয়নার ওপারে কে?
ঘরটা বিশাল। আসবাবপত্রগুলো সব সেগুন কাঠের, কারুকাজ করা। দেয়ালের এক কোণায় প্রায় ৬ ফুট লম্বা একটা পুরনো বেলজিয়াম গ্লাস। আমি ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। ঠিক যখন ঘুমের ঘোর আসছে, তখনই হঠাৎ কানে এলো খসখস একটা শব্দ। মনে হচ্ছে ঘরের কোণে কেউ একজন পায়চারি করছে।
আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। টর্চ জ্বালিয়ে সারা ঘর দেখলাম, কেউ নেই। কিন্তু যেই আমার নজরটা কোণার ওই আয়নাটার ওপর পড়ল, আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। আয়নার ভেতরে আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি না! বদলে দেখা যাচ্ছে একটা অন্ধকার গলি, আর সেই গলির ভেতর দিয়ে কেউ একজন হামাগুড়ি দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
সেই হাড়কাঁপানো আওয়াজ
আমি চোখ কচলে আবার তাকালাম। এবার দেখি সব স্বাভাবিক। ভাবলাম মনের ভুল। কিন্তু ঠিক তখনই আমার খাটের তলা থেকে একটা শব্দ ভেসে এল— ঠিক যেন কেউ নখ দিয়ে কাঠের ওপর আঁচড় কাটছে। 'খস... খস... খস...'।
আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি সাহস করে খাটের নিচে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বিছানা থেকে নামার আগেই ঘরের তাপমাত্রা একদম কমে বরফ হয়ে গেল। ঘরের কোণায় রাখা সেই আয়নাটা হঠাৎ ফেটে চৌচির হয়ে গেল কোনো কারণ ছাড়াই। আর ঠিক সেই মুহূর্তে একটা নারীকণ্ঠের অমানুষিক চিৎকার পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল। মনে হলো কেউ একজন আমার কানের একদম কাছে এসে ফিসফিস করে বলল:
"তুই এখানে কেন এলি? এখান থেকে পালানোর পথ যে বন্ধ হয়ে গেছে!"
আমি ভয়ার্ত চোখে তাকালাম দরজার দিকে। দেখলাম, দরজার তলা দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ভেতরে ঢুকছে। অথচ বাইরে বৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই থাকার কথা নয়। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হলো না। মনে হলো অদৃশ্য কোনো হাত আমার গলা চেপে ধরেছে।
প্রথম পর্ব এখানেই শেষ। অন্ধকার তখনো কাটেনি, বরং ঘনীভূত হচ্ছে। মতি মিয়ার নিষেধ অমান্য করে আমি কি তবে কোনো মহাবিপদ ডেকে আনলাম?