সবাইকে সালাম। ঘটনাটি আজ থেকে প্রায় বছর পাঁচেক আগের। তখন আমি ভার্সিটিতে পড়ি। আমার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়ি ছিল বরিশালের একদম ভেতরের দিকের একটা গ্রামে, যেখান থেকে সুন্দরবনের সীমানা খুব বেশি দূরে নয়। ওর দাদার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একটা মিলাদে আমাকে জোর করে নিয়ে যায় ও। আমরা ঢাকা থেকে লঞ্চে করে ভোরে পৌঁছাই সদরঘাটে। সেখান থেকে বাস, এরপর আবার ট্রলার, শেষে ভ্যান। ওর গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল।
গ্রামটা এমনিতেই ছমছমে। কারেন্টের কোনো নামগন্ধ নেই। বড় বড় গাছপালায় ঘেরা জায়গাটা কেমন যেন স্যাঁতস্যাঁতে। বন্ধুর যে বাড়িতে আমরা উঠলাম, সেটা ওদের পুরনো আমলের দোতলা একটা টিনের বাড়ি। নিচে কয়েকটা রুম, আর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে একটা বড় চিলেকোঠা। আমাকে আর আমার বন্ধুকে থাকতে দেওয়া হলো সেই চিলেকোঠার পাশের একটা রুমে।
প্রথম দিন জার্নি করে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় পিঠ ঠেকাতেই ঘুম চলে আসলো। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটলো মাঝরাতে। হঠাৎ আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। মোবাইল বের করে দেখি রাত ২টা বেজে ১৭ মিনিট। পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঠিক তখনই আমি একটা অদ্ভুত শব্দ পেলাম। আমার রুমের ঠিক ওপরের টিনের চালে মনে হলো খুব ভারী কিছু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছে। ‘খট... খট... খট...’। শব্দটা এমন ছিল যেন কেউ পায়ে ভারী বুট জুতো পরে টিনের চালে হাঁটছে। আমি বন্ধুকে ডাকলাম, কিন্তু সে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। ভাবলাম, হয়তো বড় কোনো বাঁদর বা বিড়াল হবে। এই ভেবে আবার চোখ বন্ধ করলাম। কিন্তু মনের ভেতর একটা অস্বস্তি থেকেই গেল।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি বন্ধুকে রাতের কথা বললাম। সে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলল, "আরে ধুর! গ্রামের দিকে রাতে শিয়াল-টিয়াল ছাদে ওঠে, ওসব কিছু না।" ওর কথায় আশ্বস্ত হলেও আমার মন মানছিল না।
দুপুরের দিকে আমি একটু একা বের হলাম গ্রামের চারপাশটা ঘুরে দেখার জন্য। ওদের বাড়ির পেছনের দিকটায় বিশাল এক বাঁশবাগান, আর তার পাশেই শান বাঁধানো একটা পুরনো পুকুর। দিনের বেলাতেও জায়গাটা কেমন অন্ধকার হয়ে আছে। আমি পুকুর ঘাটে গিয়ে বসলাম। হঠাৎ একটা বিশ্রী গন্ধ নাকে আসলো। পচা মাংস আর কাঁচা রক্তের গন্ধ মেশালে যেমন হয়, ঠিক তেমন একটা গন্ধ। আমি নাক চেপে উঠে দাঁড়ালাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখ গেল বাঁশবাগানের একেবারে ভেতরের দিকে। বিশ্বাস করুন, দিনের আলোতেও আমি স্পষ্ট দেখলাম, অনেক লম্বা, প্রায় ৭-৮ ফুট উচ্চতার একটা কালো ছায়ামূর্তি একটা বাঁশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার কোনো মুখাবয়ব নেই, কিন্তু আমি অনুভব করলাম সে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি না করে দৌড়ে বাড়িতে চলে আসলাম। সেদিন রাতে আমার একটু জ্বর জ্বর অনুভব হচ্ছিল। বন্ধুকে বাঁশবাগানের কথা বলতেই ওর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ও নিচু গলায় বলল, "তোর ওইদিকে একা যাওয়া ঠিক হয়নি। দাদাজান বলতো, ওই বাঁশবাগানটা ভালো না।"
দ্বিতীয় রাত। আমার জ্বর ততক্ষণে বেশ বেড়েছে। বন্ধু আমাকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। রাতে হঠাৎ আমার খুব তৃষ্ণা পেল। চোখ খুলে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার। বন্ধু পাশে নেই। হয়তো বাথরুমে গেছে ভেবে আমি পাশ ফিরতে যাব, ঠিক তখনই আমার শরীরটা হিম হয়ে গেল।
আমি বুঝতে পারলাম, আমি আমার হাত-পা কিছুই নাড়াতে পারছি না। যাকে বলে ‘স্লিপ প্যারালাইসিস’ বা বোবায় ধরা। কিন্তু এটা কোনো সাধারণ বোবায় ধরা ছিল না। আমার খাটের ঠিক পায়ের কাছে, মশারিটা কেউ একজন একটু একটু করে উঁচু করছিল। ঘরের ভেতরে সেই দুপুরের পচা মাংসের গন্ধটা আবার ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্ধকারের মধ্যেও আমি দেখলাম, সেই বাঁশবাগানের লম্বাটে ছায়ামূর্তিটা আমার মশারির ভেতরে মাথা গলিয়ে দিচ্ছে। ওর চোখ দুটো আগুনের মতো লাল, আর দাঁতগুলো অস্বাভাবিক রকম সুঁচালো। সে আমার দিকে তাকিয়ে একটা বিকৃত হাসি দিল। আমি চিৎকার করতে চাইছিলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুকের ওপর বিশাল একটা পাথর চাপিয়ে রেখেছে। মূর্তিটা আস্তে আস্তে ওর একটা লম্বাটে হাত আমার গলার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি মনে মনে শুধু আয়াতুল কুরসি পড়ার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ভয়ে সব গুলিয়ে যাচ্ছিল।
ঠিক যখন ওর বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতটা আমার গলা স্পর্শ করতে যাবে, তখন হঠাৎ ঘরের দরজাটা ক্যাঁচ করে খুলে গেল। আমার বন্ধু ঘরে ঢুকল হারিকেন হাতে। চোখের পলকে সেই মূর্তিটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। আমার শরীরের প্যারালাইসিসও ছুটে গেল। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে বসলাম। বন্ধু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কিরে, তুই ঘেমে নেয়ে একাকার কেন? আর ঘরে এই বিশ্রী গন্ধ কিসের?"
আমি ওকে কিছু বলতে পারলাম না, শুধু হাউমাউ করে কেঁদে দিলাম। সে রাতে আর আমাদের কারও ঘুম হলো না। আমরা দুজন মিলে কোরআন তিলাওয়াত করতে শুরু করলাম।
কিন্তু আসল ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল ভোরের দিকে। ফজরের আযান দিতে তখনো কিছু সময় বাকি। আমার বন্ধু একটু পানি আনার জন্য নিচে গেল। আমি বিছানায় বসে আছি। আমার ঠিক সামনেই একটা পুরনো ড্রেসিং টেবিল। হঠাৎ আমার চোখ গেল আয়নার দিকে। আয়নায় আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার পেছনের জানালার বাইরে... একটা মানুষ উল্টো হয়ে ঝুলে আছে!
ওর পা দুটো জানালার ওপরের কার্নিশে আটকানো, আর মাথাটা নিচের দিকে। ওটা আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসছিল। ওর চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরছিল। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ওটার চেহারা ছিল হুবহু আমার মতো! আমি নিজের চেহারা এরকম বিভৎস অবস্থায় দেখে আর জ্ঞান ধরে রাখতে পারলাম না।
যখন আমার জ্ঞান ফিরল, তখন সকাল হয়ে গেছে। আমি দেখি গ্রামের এক হুজুর আমার শিয়রে বসে দোয়া পড়ছেন। আমার বন্ধু আর ওর বাড়ির লোকজন চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
হুজুর আমাকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "বাবা, তোমার ওপর খুব খারাপ একটা জিনিসের নজর পড়েছিল। ওটা কোনো সাধারণ ভূত-প্রেত নয়, ওটা ছিল একটা প্রাচীন পিশাচ গোত্রের জ্বীন। ওই বাঁশবাগানে তুমি ওর আস্তানায় চলে গিয়েছিলে। আল্লাহর অশেষ রহমতে তুমি বেঁচে গেছো, নাহলে কাল রাতেই ও তোমাকে শেষ করে দিত।"
আমি আর এক মুহূর্তও ওই বাড়িতে থাকতে রাজি হলাম না। জ্বর গায়ে নিয়েই, ওই দিন সকালেই আমি আর আমার বন্ধু ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। গ্রামটা পার হওয়ার সময় আমি ভুল করেও আর ওই বাঁশবাগানের দিকে তাকাইনি।
আজ এত বছর পরও, যখন রাতে একা থাকি আর কোথাও কোনো খটখট শব্দ হয়, আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। আমি এখনো মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি, জানালার বাইরে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা সেই বিভৎস চেহারাটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কিছু কিছু জিনিস বোধহয় জীবনভর তাড়া করে বেড়ায়।