Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্ল্যাকহোল

March 20, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

134
View

সিলেট শহরে তিন ঘণ্টা কাটানোর পর ওমর ফারুক চাচার রিকশাতে চড়েই কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে ফিরে যায় স্নেহা। এরপরের গন্তব্য সম্পর্কে তখনও সে নিশ্চিত না, তবে ওই মুহূর্তে সিলেট সফরে সমাপ্তি টানতে হবে, মনের এইটুকু আভাসে সে কদমতলী বাসস্ট্যান্ড গিয়ে নামে। ওমর ফারুক চাচার হাতে এক হাজার টাকার দুইটা নতুন চকচকে নোট দিয়ে জানতে চায় ভাড়া ঠিক আছে কি না?

তিন ঘণ্টা ট্রিপ মারলে ওমর ফারুক কত টাকা ইনকাম করতে পারতেন, এই ব্যাপারে স্নেহার স্পষ্ট ধারণা নাই, আবার এটা জানতে চাইতেও তার অস্বস্তি হইতেছিল বলে সে টাকাটা হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করে- চাচা, ভাড়া ঠিক আছে? রিকশাতে উঠানোর সময় ওমর ফারুকের মুখে যেই হাসি ছিল, ঠিক একই রকম হাসি দিয়েই সে মাথা নাড়িয়ে আশ্বস্ত করলো ভাড়া ঠিক আছে।

কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে নেমে একটু সামনে আগাতেই হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা ট্রান্সপোর্ট আর বিলাস পরিবহনের তিনটা ঢাকাগামী বাস দাঁড়ানো দেখলো স্নেহা। ওই বাসগুলাকে পাশ কাটিয়ে সে গিয়ে উঠলো সিলেট-মৌলভীবাজার-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ লেখা সাগরিকা এন্টারপ্রাইজের বাসে। নন-এসি। ভাড়া ৬০০ টাকা। বাসে তেমন একটা যাত্রী নাই। সে গিয়ে বসলো ডি-ওয়ান এ। পাশের সিট ফাঁকা। মনে মনে খোদার কাছে শুকুর গুজার করে জানালো- আলহামদুলিল্লাহ।

সুরমা নদীর পাড়ের নির্জনতার ঘোর তার তখনো কাটে নাই। বড় বড় হোটেলের রুমের মতো “ডু নট ডির্স্টাব” সাইন টাঙিয়ে বাকিটা পথ পাড়ি দিতে ইচ্ছে করতেছিল স্নেহার। ঢাকায় যে একাকীত্বকে অসহ্য লাগার কারণে সে ওই অপরিকল্পিত যাত্রায় বের হইছিল, সুরমা পাড়ে বসে তা কিছুটা সহনীয় হয়ে ওঠে। ময়মনসিংহে যাত্রার শুরুর সময়টা তাই সে ফিল করে- মনের অস্থিরতা অনেকটাই শান্ত, যেন সে নিজের ভেতর থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় সঙ্গীটাকে এই অচেনা শহরে এসে আবার কিছু সময়ের জন্য ফিরে পেল।

ওই মুহূর্তে জঁ পল সার্ত্রের “ইফ ইউ আর লোনলি হোয়েন ইউ আর এলোন, দেন ইউ আর ইন ব্যাড কোম্পানি” মনে পড়তেই স্নেহা হেসে দিলো। পারহেপ্স, শি ওয়াজ ফিলিং লোনলি ইন ঢাকা আফটার আবির লেফট। স্নেহা বুঝতে পারলো, নিজের যে একাকীত্ব সে এত বছর ধরে উপভোগ করে আসতেছিল, যা ইন ফ্যাক্ট তার অনেক প্রিয়ও ছিল, আবিরের সঙ্গে কাটানো দুই রাত-দুই দিন তাকে এমন এক কম্প্যানিয়ন এবং এক্সপেরিয়েন্সের ভেতর জার্নি করালো- দ্যাট হ্যাজ চেঞ্জড দ্য মিনিং অফ হার লাইফ অ্যান্ড দিস উইল কজ হার অ্যা লট অফ সাফারিংস ইন ফিউচার। বাসে উঠে বসার পর স্নেহা নিজেকে একবার প্রশ্নও করলো- হোয়াই নট ঢাকা? উত্তরের তোয়াক্কা না করে মোবাইলের নোট খুলে লিখলো-

In the city where you are not,
Loneliness curls around me like smoke,
I retreat into the quiet,
Waiting, unseen, untouched by the world.
In the city where you are not,
Joy is a stranger, warmth like a ghost,
Even my footsteps forget their purpose.
I'm hollow!

লাইনগুলো লিখে মাথাটা পেছনের দিকে নিয়ে সিটে হেলান দিয়ে আবার সাত্রের কথা মনে পড়লো। সিমন দ্য বোভোয়ারকে সে একবার লিখছিলেন, “ইট'স স্ট্রেঞ্জ…আই ফেল্ট লেস লোনলি হোয়েন আই ডিডেন্ট নো ইউ।” স্নেহার মুখে একটা হাসি আসে, তবে সেটা আনন্দের না, অসহায়ত্বের। সে যে ইতোমধ্যেই একটা বিরাট ব্ল্যাকহোলে পড়ে গেছে, এটা বুঝতে তার আর কোনো দার্শনিকের শরণাপন্ন হতে হলো না। সাত্রেই তাকে বুঝিয়ে দিলেন, এই ব্ল্যাকহোলের লুপ তাকে বয়ে চলতে হবে আরো কিছু দূর, এখান থেকে উত্তরণ বা মুক্তি, কোনো পথই সে আপাতত খুঁজে পাচ্ছে না, সামনেও কবে পাবে বা আদৌ পাবে কি না- এ ব্যাপারেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

কিন্তু সে তো আর সিমোন দ্য বোভোয়ার না, স্নেহা ভাবে আর আরেকবার অসহায়ত্বের হাসি তার মুখে ফুটে উঠে। যেন সে তার এই অসহায়ত্ব দশা দেখে নিজের প্রতিই বিদ্রূপের হাসি ছুঁড়ে দিতেছে। নিজেকে নিয়ে উপহাস আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মধ্যেই সে আবিষ্কার করলো- মানুষ নিকটে আসে মূলত আরো বেশি নিঃসঙ্গ করে দেওয়ার জন্য। স্নেহা টের পেলো- বিনয় মজুমদারের প্রকৃত সারস ডানা নাড়াচাড়া দিয়ে তৈরি হইতেছে, যেকোনো সময় সুযোগ বুঝে উড়াল দেবে।

ঢাকায় আবিরের সঙ্গে ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের একটা অদ্ভুত ইউটোপিয়ান জার্নির পর তাকে এয়ারপোর্টে সি অফ করা; ওই মধ্যরাতেই লোকাল বাসে চড়ে ভোরে সিলেট আসা, এরপর তিন ঘণ্টা সিলেট শহরে বিরতির পর আবার অন্য শহরে অজানা যাত্রা শুরু- স্নেহার শরীর-মন ততক্ষণে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। তবে সুরমা নদী, এমন কী দরগাতে কাটানো কিছুটা সময় তার মনকে শান্ত করে তুলছে, ওই হিসাবে এই অজানা যাত্রায় লাভ কতটুকু হলো স্নেহা জানে না, তবে ক্ষতি বিশেষ হয় নাই বলেই তার মনে হলো।

যতটা বিরক্তি, একাকীত্ব আর যন্ত্রণা নিয়ে সে সিলেট যাত্রা শুরু করছিল, সিলেট ছাড়ার সময় ওই অনুভূতিগুলা ঠিক একই পরিমাণে তীব্র আছে বলে স্নেহার মনে হলো না। না খারাপ-না ভালোর মতো একটা সিচ্যুয়েশনের ভেতর নিজেকে সে ওই মুহূর্তে আবিষ্কার করলো। একটা পারফেক্ট ব্যালেন্স ডায়েট। ওই ফিলিংটা কোনো একদিকে বেশি হেলান দিয়ে কোনো একটা নির্দিষ্ট অনুভূতির তীব্রতায় মেদ বাড়াইতেছে না, আপাতত এটাই স্বস্তিজনক লাগলো স্নেহার। ঘোর ভাঙলো বাসে বেজে উঠা গানে-

“হাম ভুল গেয়ে রে হার বাত

মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে

কেয়া কেয়া হুয়া দিল কে সাথ

মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে…”

বাসে উঠার সময় স্নেহা এক ঝলক ড্রাইভারকে খেয়াল করে দেখছিল। হেল্পার অল্প বয়সী হলেও ড্রাইভারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি বা পঞ্চাশোর্ধ হবে। মেহেদি দেওয়া দাড়ি ডান হাতে মুঠি করে সে নিচের দিকে ঢেউয়ের মতো টেনে নিয়ে যাইতেছিলেন। লোকটার গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল, পান খাওয়া ঠোঁটে তা আরো বেশি উজ্জ্বল লাগতেছিল। চেহারার মধ্যে একটা সুফী ভাব আছে। কেমন যেন একটা আত্মতৃপ্তি ভরা মুখ তার, যেন জগতের কিছুতেই সে বিচলিত না।

ড্রাইভারের বয়স অনুমান করার পর বাসে বাজতে থাকা গানকে জায়েজ মনে হলো স্নেহার। আশির দশকের হিন্দি সিনেমার গান। তবে এটা যদি একটু পর নব্বই দশকে গিয়ে পৌঁছায়, তাতেও খুব বেশি অবাক হবে না সে। সেলুন, বাস আর সিডি-ক্যাসেটের দোকানগুলাতে আজকে থেকে একশ বছর পরও বোধহয় নব্বই দশকের কোনো না কোনো গান বাজবেই বাজবে- স্নেহা ভাবে আর বিরক্তির বদলে হেসে ফেলে বাসে বাজতে থাকা গানটায় আবার মনোযোগ দেয়-

দুনিয়াসে শিকায়াত ক্যায়া কারতা, যাব তুনে হামে সামঝা হি নেহি

গেয়রো কো ভালা ক্যায়া সামঝাতে, যাব আপনো নে সামঝা হি নেহি

তুনে ছোড় দিয়া রে মেরা হাত, মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে…"

লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ। দুঃখ-ভারাক্রান্ত ব্যর্থ প্রেমিকার আকুলতা তার কণ্ঠে বেশ তীব্র আর গভীরভাবে ফিল করা যাইতেছে। তবে এটা বেশিক্ষণ ফিল করা ঠিক হবে না ভেবে স্নেহা চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলো। ফোনটা জিন্সের পকেট থেকে বের করে এয়ারপ্লেন মোড অফ করতেই আবার ঢাই ঢাই ঢাই- আবিরের একের পর টেক্সট আসা শুরু হলো! ঠিক শুরু বলা যাবে না, বরং এই টেক্সটগুলা আগেই আসছিল, এখন শুধু এয়ারপ্লেইন মোডের বাধা পার হয়ে স্নেহার কাছে পৌঁছাইতে পারছে।

মোবাইলের স্ক্রিনের উপর নোটিফিকেশন থেকেই স্নেহা দেখতে পারলো টেক্সটের শুরুর দিকের কিছু বাক্য- স্নেহা…প্লিজ…টক টু মি…আমার অবস্থা ভালো না…হোয়্যার আর ইউ? স্নেহা, আই’ম সর‍্যি…স্নেহা, প্লিজ টক টু মি ওয়ান্স। ইউ ওকে? প্লিজ টেল মি ইউ আর অলরাইট। ডোন্ট পানিশ মি লাইক দ্যাট। টক টু মি, প্লিজ। আই বেগ…

স্নেহার ইচ্ছে করে না রেসপন্স করতে। নিজের কাছে স্নেহা জানতে চায়- কাকে শাস্তি দিচ্ছে সে আসলে? উত্তর আসে- নিজেকেই! ময়মনসিংহ শহরে স্নেহার থাকা হয় খুব অল্প সময়। এক বাস থেকে নেমে অন্য বাসের টিকেট কেটে উঠতে যতটা সময় লাগে, ঠিক ততক্ষণই। ওইদিন ভোরে সিলেট পৌঁছানোর পর স্নেহা সম্পাদক আর এইচআর বরাবর মেইল করে রেজিগনেশন লেটার পাঠায়।

আবিরের টেক্সটগুলো এড়িয়ে অন্যান্য নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়ে দেখে অফিসে পাঠানো ওই মেইলের রিপ্লাইতে লেখা- “নট এক্সেপটেড”। এরসঙ্গে আবার তার মেইলের প্রিন্টেড ভার্শনের নিচে বড় বড় করে “NOT ACCEPTED” লিখে সম্পাদকের সাইন-সিলসহ এটাচ করে পাঠানো হইছে মেইলের সঙ্গে। স্নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে!

হোয়াটসঅ্যাপ খুলে দেখতে পায় বসের টেক্সট- পাগলামিটা ছাড়ো! সমস্যা থাকলে ছুটি নাও কয়েকদিন। চাকরি ছাড়ার কথা ভুলেও ভাববা না। মাথা ঠান্ডা হলে অফিসে এসো। স্নেহা ভাবে, তার মাথা তো ঠান্ডাই আছে। সবাই কেন ভাবে তার মাথা সবসময় গরম থাকে? সে তো মূলত দুপুরবেলার নির্জন পুকুর পাড়টার মতো শান্ত আর একাকী।

ঢাকায় ফেরার পথে আবিরের একটা টেক্সটে স্নেহার নির্জনতার ধ্যান ভঙ্গ হয় বা দীর্ঘ মৌনতায় চ্ছেদ পড়ে- ইউ ওকে? আই’ম ইন পেইন। ডিপ পেইন। কল দাও। আই নিড টু টক। চেস্ট পেইন হচ্ছে। প্লিজ হেল্প মি। আমাকে যন্ত্রণা দিতে কি তোমার ভালো লাগে? স্নেহা উত্তর লেখে- আই’ম ওকে। ডোন্ট ওয়ারি এবাউট মি। তোমাকে যন্ত্রণা দিতে আমার মোটেও ভাল লাগে না, আবির। টেক্সট সেন্ড করার পরপরই স্নেহার ফোনটা বেজে উঠে। একবার…দুইবার…তিনবার…স্নেহা শেষ পর্যন্ত ঢাকায় পৌঁছানোর পর কলটার রেসপন্স করে।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login