[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]
সিলেট শহরে তিন ঘণ্টা কাটানোর পর কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে ফিরে যায় স্নেহা। এরপরের গন্তব্য সম্পর্কে তখনও ও নিশ্চিত ছিল না। তবে ওই মুহূর্তে সিলেট সফরে সমাপ্তি টানতে হবে, মনের এইটুকু আভাসেই ও কদমতলী বাসস্ট্যান্ড গিয়ে নামে। এক হাজার টাকার দুইটা নতুন চকচকা নোট ওমর ফারুক চাচার হাতে দিয়ে জানতে চায়, ভাড়া ঠিক আছে কি না? তিন ঘণ্টা ট্রিপ মারলে উনি কত টাকা ইনকাম করতে পারতেন, এই ব্যাপারে ওর স্পষ্ট কোনো ধারণা নাই। জানতে চাইতে অস্বস্তি হইতেছিল বলেই টাকাটা হাতে দিয়ে জিজ্ঞেস করে- চাচা, ভাড়া ঠিক আছে? রিকশাতে উঠানোর সময় উনি যে রকম নিঃশব্দ হাসি দিছিলেন, ঠিক একই রকম হাসি দিয়েই মাথা নাড়িয়ে আশ্বস্ত করলেন, ঠিক আছে।
বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু সামনে আগাতেই হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা ট্রান্সপোর্ট আর বিলাস পরিবহনের তিনটা ঢাকাগামী বাস দাঁড়ানো দেখতে পেল ও। এদেরকে পাশ কাটিয়ে সিলেট-মৌলভীবাজার-কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ লেখা সাগরিকা এন্টারপ্রাইজের বাসে গিয়ে উঠলো। নন-এসি বাস। ভাড়া ৬০০ টাকা। তেমন একটা যাত্রী নাই বাসে। ওর সিট ডি-ওয়ানে। পাশের সিট ফাঁকা। মনে মনে খোদার কাছে ও শুকুর গুজার করে- আলহামদুলিল্লাহ বললো।
সুরমা নদীর পাড়ের নির্জনতার ঘোর কাটে নাই তখনো। বড় বড় হোটেলের রুমের বাইরে ঝোলানো “ডু নট ডির্স্টাব” সাইনটা বুকের মধ্যে বিশাল আকারে টাঙিয়ে বাকিটা পথ পাড়ি দিতে ইচ্ছা করলো ওর। ঢাকায় যে একাকীত্বকে অসহ্য লাগার কারণে এই রকম এক অপরিকল্পিত যাত্রায় বের হয়ে হইছিল, সুরমার পাড়ে বসে তা কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠে। ময়মনসিংহ যাত্রার শুরুতে মনটাকে অনেকটাই শান্ত লাগে ওর। অচেনা ওই শহরের নির্জন সকালে নিজের ভেতরের হারানো সঙ্গীটাকে কিছু সময়ের জন্য ও ফিরে পাইছে বলে মনে হলো।
বাসের সিটে হেলান দিয়ে জঁ পল সার্ত্রের কথা মনে পড়তেই স্নেহা হেসে দিলো। উনি বলছিলেন, "ইফ ইউ আর লোনলি হোয়েন ইউ আর এলোন, দেন ইউ আর ইন ব্যাড কোম্পানি”। পারহেপ্স, শি ওয়াজ ফিলিং লোনলি ইন ঢাকা। আবির রাজশাহী চলে যাওয়ার পর মুহূর্ত থেকেই ওই ফিলিং হয় ওর। ও বুঝতে পারলো, নিজের যে একাকীত্ব এত বছর ধরে ও উপভোগ করে আসতেছিল; যা ইন ফ্যাক্ট ওর অনেক প্রিয় ছিল, আবিরের সঙ্গে কাটানো দুই রাত-দুই দিন ওকে এমন এক কম্প্যানিয়ন, এমন এক অদ্ভুত এক্সপেরিয়েন্সের ভেতর জার্নি করালো, দ্যাট হ্যাজ চেঞ্জড দ্য মিনিং অফ হার লাইফ অ্যান্ড দিজ উইল কজ হার অ্যা লট অব সাফারিংস ইন ফিউচার। ময়মনসিংহের ওই বাসে উঠার পর ও একবার নিজেকে প্রশ্ন করে- হোয়াই নট ঢাকা? কিন্তু উত্তরের তোয়াক্কা না করেই মোবাইলের নোট খুলে লিখতে থাকে-
In the city where you are not,
Loneliness curls around me like smoke,
I retreat into the quiet,
Waiting, unseen, untouched by the world.
In the city where you are not,
Joy is a stranger, warmth like a ghost,
Even my footsteps forget their purpose.
I'm hollow!
লেখা শেষ হলে আবারও ফিরে গেল সার্ত্রের কাছে। সিমন দ্য বোভোয়ারকে একবার সার্ত্রে লিখছিলেন- “ইট'স স্ট্রেঞ্জ…আই ফেল্ট লেস লোনলি হোয়েন আই ডিডেন্ট নো ইউ।” ওর মুখে হাসি আসে আবার; আনন্দের না, অসহায়ত্বের। ও যে অলরেডি একটা বিরাট ব্ল্যাকহোলের মধ্যে পড়ে গেছে, এটা বুঝতে ওর আর কোনো দার্শনিকের শরণাপন্ন হতে হলো না। সার্ত্রেই ওকে বুঝিয়ে দিছেন- এই ব্ল্যাকহোলের লুপ ওকে বয়ে চলতে হবে আরো কিছু দূর। আরো ঠিক কতটা দূর, ওই সীমানাটাও নির্ধারণের ক্ষমতা সম্ভবত ওর হাতে থাকবে বলে মনে হইতেছে না। এইখান থেকে উত্তরণ বা মুক্তি- কোনো পথই আপাতত খুঁজে পাইতেছে না; সামনেও কবে যে পাবে, বা আদৌ পাবে কি না- এ ব্যাপারেও ঠিক নিশ্চিত হওয়া গেল না।
কিন্তু ও তো আর সিমোন দ্য বোভোয়ার না- এটা ভাবতেই অসহায়ত্বের হাসিটা ফিরে আসলো আবারও। নিজের এই হেল্পলেস দশা দেখে ও ক্রমাগত বিদ্রূপের হাসি ছুঁড়ে দিতেছে নিজের প্রতিই। এই উপহাস আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মধ্যেই ও আবিষ্কার করে- মানুষ নিকটে আসে মূলত আরো বেশি নিঃসঙ্গ করে দিতে। বিনয় মজুমদারের প্রকৃত সারস ডানা নাড়াচাড়া দিয়ে তৈরি হইতেছে, টের পেলো স্নেহা। সুযোগ পেলে ঠিকই উড়াল দিয়ে দেবে সময় বুঝে!
ঢাকায় ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের অদ্ভুত ইউটোপিয়ান জার্নির পর আবিরকে এয়ারপোর্টের সি অফ করা; ওই রাতেই লোকাল বাসে সিলেট যাত্রা; তিন ঘণ্টা যাত্রা বিরতি শেষে আবারও এক অজানা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতে গিয়ে স্নেহা টের পায়- ওর শরীর-মন সবই ততক্ষণে প্রচণ্ড ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। তবে সুরমা নদী আর দরগাতে কাটানো কিছুটা সময় ওর ছটফট করতে থাকা মনকে অনেকটাই শান্ত করে তোলে। ওই হিসাবে অপরিকল্পিত অজানা ওই যাত্রায় ওর লাভ কতটুকু হলো না জানলেও, খুব একটা ক্ষতি হয় নাই বলেই মনে হলো।
যতটা বিরক্তি, একাকীত্ব আর যন্ত্রণা নিয়ে ও সিলেট যাত্রা শুরু করছিল; ওই শহর ছাড়ার সময় অনুভূতিগুলা ঠিক একই পরিমাণে তীব্র ছিল বলে মনে হলো না। না খারাপ-না ভালোর মতো মাঝামাঝি একটা সিচ্যুয়েশনের ভেতর নিজেকে ওই মুহূর্তে ও আবিষ্কার করলো। একটা পারফেক্ট ব্যালেন্স ডায়েট। ওই ফিলিংটা কোনো একদিকে বেশি হেলান দিয়ে, কোনো একটা নির্দিষ্ট অনুভূতির তীব্রতায় মেদ বাড়াইতেছে না। আপাতত ওইটাই ওর কাছে স্বস্তিদায়ক লাগতেছিল। এইসব ভাবনায় হুট করে ঢিল ছুঁড়ে মারে বাসে বেজে উঠা গান-
হাম ভুল গেয়ে রে হার বাত
মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে
কেয়া কেয়া হুয়া দিল কে সাথ
মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে…
এক ঝলক ও ড্রাইভারকে দেখছিল বাসে উঠার সময়। হেল্পার অল্প বয়সী হলেও ড্রাইভারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি বা পঞ্চাশোর্ধই হবে বলে মনে হইছে। মুখ ভর্তি মেহেদি দেওয়া দাড়িগুলা ডান হাতে মুঠি করে ধরে নিচের দিকে ঢেউয়ের মতো উনি টেনে নিয়ে যাইতেছিলেন বারে বারে। লোকটার গায়ের রঙ বেশ উজ্জ্বল। পান খাওয়া ঠোঁটে আরো বেশি উজ্জ্বল লাগতেছিল তাকে। চেহারার মধ্যে একটা সুফী ভাব আছে। কেমন যেন একটা আত্মতৃপ্তি ভরা মুখ উনার। দেখলে মনে হয়, জগতের কিছুতেই উনি বিচলিত না বোধহয়।
ড্রাইভারের বয়স অনুমান করার পর বাসে বাজতে থাকা গানটাকে ওর জায়েজ মনে হলো। আশির দশকের হিন্দি সিনেমার গান। তবে কিছুক্ষণ পরই ওইটা বদলে গিয়ে যদি নব্বই দশকে ঠেকে, খুব বেশি অবাক হবে না ও। সেলুন, বাস আর সিডি-ক্যাসেটের দোকানগুলাতে একশ বছর পরও বোধহয় নব্বই দশকের কোনো না কোনো হিন্দি গান বাজবেই বাজবে- বিরক্তির বদলে এই ভাবনায় ওর হাসি চলে আসে। বাসের স্পিকারে তখন শোনা যাইতেছে-
দুনিয়াসে শিকায়াত ক্যায়া কারতা, যাব তুনে হামে সামঝা হি নেহি
গেয়রো কো ভালা ক্যায়া সামঝাতে, যাব আপনোনে সামঝা হি নেহি
তুনে ছোড় দিয়ারে মেরা হাত, মাগার তেরা প্যায়ার নেহি ভুলে…
লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠ। যদিও ৬০ দশকে এই গান সেহেলি নামের একটা পাকিস্তানি সিনেমায় প্রথম গাইছিলেন নাসিমা বেগম নামের একজন উর্দু গায়িকা। ওই কণ্ঠটাও ওই মুহূর্তে স্নেহার কানে বাজলো। ওইটা বেশি দুঃখ-ভারাক্রান্ত। তবে লতাজিরটাও মন্দ না। ব্যর্থ প্রেমিকার আকুলতা তার কণ্ঠে বেশ তীব্র আর গভীরভাবে ফিল করা যাইতেছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ ওই জিনিস ফিল করা ঠিক হবে না ভেবে ও চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে। জিন্সের পকেট থেকে ফোনটা বের করে এয়ারপ্লেন মোড অফ করতেই আবার ঢাই ঢাই ঢাই- আবিরের একের পর টেক্সট আসা শুরু হলো! ঠিক শুরু বলা যাবে না, বরং এই টেক্সটগুলা আগেই আসছিল, এয়ারপ্লেইন মোডের বাধা পার হয়ে ফাইনালি তখন ওর পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারলো।
স্ক্রিনের উপর নোটিফিকেশন থেকেই কয়েকটা বাক্য দেখা গেল- স্নেহা…প্লিজ…টক টু মি…আমার অবস্থা ভালো না…হোয়্যার আর ইউ? স্নেহা, আই’ম সর্যি…স্নেহা, প্লিজ টক টু মি ওয়ান্স। ইউ ওকে? প্লিজ টেল মি ইউ আর অলরাইট। ডোন্ট পানিশ মি লাইক দ্যাট। টক টু মি, প্লিজ। আই বেগ…। রেসপন্স করতে ইচ্ছা করলো না স্নেহার। নিজের কাছেই ও জানতে চাইলো- কাকে আসলে শাস্তি দিতেছে ও? উত্তর আসে- নিজেকেই! ময়মনসিংহ শহরে থাকা হয় খুব অল্প সময়। এক বাস থেকে নেমে অন্য বাসের টিকেট কেটে উঠতে যেইটুকু সময় লাগে, ঠিক ততক্ষণই।
ওইদিন ভোরে সিলেট পৌঁছানোর পর সম্পাদক আর এইচআর বরাবর ও রেজিগনেশন লেটার মেইল করছিল। আবিরের টেক্সটগুলা ইগনোর করে অন্যান্য নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়ে দেখে, রেজিগনেশন পাঠানো মেইলের রিপ্লাইতে লেখা- “নট এক্সেপটেড”। এরসঙ্গে আবার ওর মেইলের প্রিন্টেড ভার্শনের নিচে বড় বড় করে “NOT ACCEPTED” লিখে, সম্পাদকের সাইন-সিলসহ একটা স্ক্যান কপিও এটাচ করে পাঠানো হইছে।
মেজাজটা খারাপ করতে গিয়েও ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো! হোয়াটসঅ্যাপ খুলতেই দেখলো বস লিখে পাঠাইছেন- পাগলামিটা ছাড়ো! সমস্যা থাকলে ছুটি নাও কয়েকদিন। চাকরি ছাড়ার কথা ভুলেও ভাববা না। মাথা ঠান্ডা হলে অফিসে আইসো। স্নেহা ভাবে, ওর মাথা তো ঠান্ডাই আছে। সবাই কেন ওর মাথা গরম থাকে ভাবে? ও তো মূলত দুপুরবেলার নির্জন পুকুর পাড়টার মতো শান্ত আর একাকী।
ঢাকায় ফেরার পথে আবিরের একটা টেক্সটে ওর নির্জনতার ধ্যান ভঙ্গ হয়, বা ওর দীর্ঘ প্রায় ২৪ ঘণ্টার মৌনতায় চ্ছেদ পড়ে- ইউ ওকে? আই’ম ইন পেইন। ডিপ পেইন। কল দাও। আই নিড টু টক টু ইউ। চেস্ট পেইন হচ্ছে। প্লিজ হেল্প মি। আমাকে যন্ত্রণা দিতে কি তোমার ভালো লাগে? স্নেহা উত্তর লেখে- আই’ম ওকে। ডোন্ট ওয়ারি এবাউট মি। তোমাকে যন্ত্রণা দিতে আমার কখনোই ভালো লাগে না, আবির। টেক্সট সেন্ড করার পরপরই ওর ফোন বেজে উঠে। একবার…দুইবার…তিনবার…শেষ পর্যন্ত ও রেসপন্স করলো ঢাকায় ফেরার পরে।