Subtotal
0 ৳
Shipping and taxes calculated at checkout.
Continue Shopping →
গল্প
March 20, 2026
Faysal Ahmed
Original Author Faysal Ahmed
রাজশাহীর এক ছোট গ্রাম—চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখানে আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তা, আর বিকেল নামলেই পাখির ডাক। এই শান্ত গ্রামেই জন্ম রাফির। ছোট্ট টিনের ঘর, পাশে একটা আমগাছ—এই ছিল তাদের সংসার। রাফির বাবা করিম মিয়া দিনমজুর। কখনো মাঠে কাজ, কখনো ইটভাটায়—যেখানে কাজ পাওয়া যায় সেখানেই ছুটে যান। মা রহিমা বেগম অন্যের বাসায় কাজ করেন। সংসারে টাকার টান সবসময় লেগেই থাকে। অনেক সময় রাতের খাবার জোটে না, তবুও মা-বাবা চেষ্টা করেন ছেলেটাকে যেন না খেয়ে থাকতে না হয়। ছোটবেলা থেকেই রাফি অন্যরকম ছিল। যখন তার সমবয়সীরা খেলাধুলায় মেতে থাকত, তখন সে পুরোনো বই নিয়ে বসে থাকত। বইয়ের পাতায় পাতায় সে খুঁজে পেত অন্য এক পৃথিবী—যেখানে কষ্ট নেই, দারিদ্র্য নেই, আছে শুধু সম্ভাবনা। একদিন রাফি তার বাবাকে বলল, “আব্বা, আমি বড় হয়ে অনেক বড় মানুষ হবো। তোমাকে আর কাজ করতে হবে না।” করিম মিয়া হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, কিন্তু চোখের কোণে লুকানো কষ্টটা রাফি বুঝতে পারল না। গ্রামের মানুষজন কিন্তু এত সহজে বিশ্বাস করেনি। তারা প্রায়ই বলত, “পড়াশোনা করে কি হবে? শেষে তো বাবার মতোই দিনমজুর হতে হবে!” এই কথাগুলো রাফির কানে যেত, কিন্তু তার মনে নয়। সে নিজেকে বলত, “আমি প্রমাণ করব, আমি পারব।” রাতে বিদ্যুৎ থাকত না প্রায়ই। তখন একটা পুরোনো কেরোসিন ল্যাম্প জ্বালিয়ে রাফি পড়তে বসত। গরমে ঘাম ঝরত, মশা কামড়াত—তবুও সে বই ছেড়ে উঠত না। অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়ত বইয়ের উপরেই। একদিন স্কুলে গণিত ক্লাসে শিক্ষক লক্ষ্য করলেন, রাফি খুব মনোযোগ দিয়ে সমস্যা সমাধান করছে। শিক্ষক তার খাতা দেখে অবাক হলেন। “তুই এত ভালো করলি কিভাবে?” লাজুক হেসে রাফি বলল, “স্যার, রাতে প্র্যাকটিস করি।” সেদিন থেকেই শিক্ষক তাকে আলাদা করে সময় দিতে শুরু করলেন। পুরোনো বই এনে দিলেন, অতিরিক্ত পড়ালেন, উৎসাহ দিলেন। সময় এগোতে লাগল। রাফির পরিশ্রমও বাড়তে লাগল। অবশেষে এলো সেই দিন—SSC পরীক্ষার ফল প্রকাশ। গ্রামের একমাত্র দোকানের সামনে ভিড় জমেছে। সবাই ফল দেখতে এসেছে। রাফি একটু দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপা হাতে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ একজন চিৎকার করে উঠল, “রাফি! তুই জেলায় প্রথম হইছস!” মুহূর্তেই চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। যে মানুষগুলো একসময় তাকে নিয়ে হাসত, তারাই এখন তাকে কাঁধে তুলে নিল। করিম মিয়ার চোখে পানি—গর্ব আর আনন্দে ভরা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু। রাফি শহরে চলে গেল কলেজে পড়তে। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই তার জন্য কঠিন ছিল। টাকার অভাবে অনেক সময় তাকে টিউশনি করতে হতো, নিজের খরচ চালাতে হতো। কখনো কখনো মনে হতো, “আমি কি পারব?” কিন্তু তখনই সে মনে করত তার বাবার কষ্ট, মায়ের চোখের পানি—আর আবার উঠে দাঁড়াত। কলেজ শেষে সে একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগ পেল। দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করল। ধীরে ধীরে সে নিজের জায়গা তৈরি করে নিল। কয়েক বছর পর, রাফি একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু সে তার গ্রামকে ভুলে যায়নি। একদিন হঠাৎ সে ফিরে এল সেই পুরোনো গ্রামে। সবকিছু আগের মতোই আছে—কাঁচা রাস্তা, ধানক্ষেত, আর সেই টিনের ঘর। কিন্তু এবার রাফির চোখে অন্যরকম স্বপ্ন। সে সিদ্ধান্ত নিল, শুধু নিজের জীবন নয়—পুরো গ্রামের জীবন বদলাবে। নিজের সঞ্চয় আর কিছু সহায়তা নিয়ে সে গ্রামের মধ্যে একটি স্কুল তৈরি করল। সাথে একটি ছোট লাইব্রেরি, যেখানে গ্রামের বাচ্চারা এসে বই পড়তে পারে। উদ্বোধনের দিন, ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন বই হাতে নিয়ে হাসছে। তাদের চোখে সেই একই স্বপ্ন, যা একসময় রাফির চোখে ছিল। সন্ধ্যা নামছে। আকাশে লালচে আলো। নতুন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে রাফি সবকিছু দেখছে। তার পাশে এসে দাঁড়াল তার বাবা। ধীরে বললেন, “তুই পেরেছস বাবা…” রাফি চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে এক অদ্ভুত শান্তি। সে মনে মনে বলল, “এই আলোটা শুধু আমার না… এই আলো সবার।” সেই দিন থেকে, গ্রামের প্রতিটা সন্ধ্যায় শুধু কেরোসিন ল্যাম্পের আলো নয়—স্বপ্নের আলোও জ্বলতে শুরু করল। আর সত্যিই— সেই আলোটা এখনো জ্বলে।