২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে সিলেট থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় ফেরার পরও আফতাবনগরের ফ্ল্যাটটায় থাকতে পারে না স্নেহা। প্রথমে ওখানেই যায়; কিন্তু আবারও একই সব দৃশ্য, একই ঘ্রাণ তাকে রেস্টলেস করে তুলে। বাধ্য হয়েই রাতটা কাটাতে সে নিকেতনে আম্মার বাসায় যায়। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীর তখন কিছুক্ষণ চুপচাপ ঘুমানোর জায়গা খুঁজছিল। এমন একটা জায়গা, যেখানে আবিরের স্মৃতি ওকে আরাম দেবে, লোনলি ফিল করাবে না।
ওই রাতে নিকেতনে যাওয়ার পর আবির স্নেহাকে ভিডিও কল করে। প্রায় দেড় ঘণ্টার ওই কলে একটু পরপরই আবির বলতে থাকে- তুমি আমাকে ভুল বুঝতেছো, স্নেহা। আই'ম সর্যি। আই ওয়াজ সো ড্রাঙ্ক, আমি জানি না ফ্লাইটে উঠে আমি তোমাকে কী বলছি যেটাতে তুমি কষ্ট পাইছো। একটু মনে করিয়ে দিতে পারবা? কী বলছিলাম আমি? সিরিয়াসলি, মনে নাই আমার।
অনেকবার রিকোয়েস্ট করার পর স্নেহা শুধু মনে করায়- “আমাদের আর দেখা হবে না”র অংশটুকু। এর আগে যে আবির বেশ কয়েকবার তাকে আই লাভ ইউ বলছে, ইচ্ছে করেই স্নেহা ওই অংশটুকু এড়ায়। এই রকম অসংখ্যবার ড্রাঙ্ক অবস্থায় বলা আবিরের অনেক সেন্সিটিভ কথা সোবার অবস্থায় স্নেহা মনে করায় না শুধুমাত্র আবির বিব্রত হবে ভেবে। কিন্তু ড্রাঙ্ক আর সোবার আবিরের মিক্সড বিহেভিয়র স্নেহার জীবনে ক্রমাগত অস্থিরতা বাড়াতে থাকে।
যে স্নেহা একদিন আবিরের হাত ধরে তার ভালোবাসা প্রকাশের অনুমতি চেয়ে নিছিল, তার মনটা এসবে আস্তে আস্তে ডিমান্ডিং হয়ে উঠতে থাকে। সে অভিমান করে, অধিকার দেখায়- আবির এর রেসপন্সে হয় নির্লিপ্ত থাকে নতুবা ওই সময় ম্যানেজবল বিহেভ করে পরিস্থিতি শান্ত রাখে।
ওই রাতের কনভার্সেশনে একটা পর্যায়ে স্নেহা খুব ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে পড়ে। একদিকে আবির একেক সময় স্নেহার প্রতি প্রচণ্ড কনসার্ন দেখায়, অন্যদিকে অনেক বিষয়ে তার প্রচণ্ড নির্লিপ্ততাও স্নেহাকে হজম করতে হয়। এসব মিক্সড আচরণে একটা পর্যায়ে গিয়ে স্নেহার বদহজম শুরু হয়। সে রিয়্যাক্ট করা শুরু করে, রেগে যায়, জেদ দেখায়, শাউট করে। নিজের কাছে নিজেকেই অপরিচিত লাগা শুরু হয় স্নেহার।
একটা ব্ল্যাকহোলের ভেতর পড়ে তার মানসিক অবস্থা এমন বিশ্রী একটা অস্থিরতার ভেতর বন্দি হয়ে যায় যার দোষ এখন আর কাউকে দেয় না স্নেহা। ওই সময়গুলাতে রাতের পর রাত জায়নামাজে বসে কাঁদতে কাঁদতে স্নেহা আল্লাহকে পথ দেখাতে বলে, আকুতি জানায় তার মনটা অন্যদিকে ঘুরানোর জন্য। কিন্তু যত সে এই প্রার্থনা জানায়, তত আবিরের প্রতি তার অনুভূতি তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে।
স্নেহা একটা সময় গিয়ে নিজেকে সমর্পণ করে দেয়, কিন্তু তাতেও খুব একটা লাভ হয় না। সে প্রায়ই ফিল করে, একটা পাতলা সুতায় বেঁধে কেউ তাকে একটা ব্ল্যাকহোলের মাঝ বরাবর ঝুলিয়ে রাখছে। না উপরে উঠতে দিচ্ছে, না একেবারে ফেলে দিচ্ছে। ফেলে না দেওয়াটা করুণা; উপরে উঠতে না দেওয়াটা- অনিচ্ছা, কিছুটা অক্ষমতাও।
সুতার নাটাইটা যার হাতে ছিল, সে নিজেই পুরাটা সময় ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্বে। সে কেন কী করে, কখন কী বলে, কেন আসে, কেনই বা চলে যেতে চায়- এ বিষয়ে তার নিশ্চিত হতে সময় লেগেছে দুইটা বছর। সুতাটা যখন সে ছিঁড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলো, ততদিনে গভীর শূন্যতা থেকে উপরে উঠে আসার মানসিক শক্তিটা স্নেহা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলছিল।
২৭ ফেব্রুয়ারি রাতের কনভার্সেশনে অনেক যুক্তি-তর্ক, অভিযোগ-অনুযোগ, কান্নাকাটির পর আবির স্নেহাকে বলে- আই থিংক উই নিড অ্যা ব্রেক। স্নেহা প্রথমে বুঝতে পারে না। পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে সে জানতে চায় কত দিনের জন্য ব্রেক? আবির বলে, দুই বছর। স্নেহা হেসে ফেলে। দুই বছর পর কী হবে জানতে চাইলে আবির জবাব দিতে পারে না। চুপ থাকে। স্নেহা আবার বলে, আমি দিলাম তোমাকে দুই বছর। দুই বছর কোনো যোগাযোগ করবো না, কিন্তু এরপর কী হবে? আবির উত্তরে বলে- জানি না।
স্নেহা তখন জোরে হেসে দেয়। স্নেহা জানে, দুই বছর পর কিছুই হবে না। আবির এই সম্পর্ক থেকে বের হতে চাইছে, সেটা স্পষ্টভাবে বলার সাহস সে করতে পারছে না বলেই দুই বছরের ব্রেক তাকে চাইতে হইতেছে। সামনের দুই বছর সে রাজশাহীতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকবে, কয়েক মাসের মধ্যে তার ফ্যামিলিও ওইখানে মুভ করবে একসঙ্গে থাকতে। এরপর ঢাকায় আসার তেমন সুযোগও আর থাকবে না আবিরের, আসার প্রয়োজনীয়তাও থাকবে না, তাই সে স্নেহার চ্যাপ্টারটা বন্ধ করতে চাইছে। কিন্তু স্পষ্টভাবে এই কথা সে স্নেহাকে বলতেও পারতেছে না। ইন ফ্যাক্ট, নিজের ফ্যামিলির ওইখানে মুভ করার ব্যাপারটাও না!
আবিরের হয়তো তখন মনে হচ্ছিল, ব্রেক দিলে একটা সময় স্নেহা তাকে ভুলে যাওয়া শুরু করবে! ফয়েল পেপারের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যেতে যেতে স্নেহার আজকে প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছে আবিরের ওই রাতের ভাবনার কথা চিন্তা করে। এর পরপরই প্রচণ্ড রাগ-ক্ষোভ আর অপমানে আবিরকে দুই-একটা কড়া বকাঝকা দেওয়ার ইচ্ছা মাথায় আসলো। আগুন-ধোঁয়ার উড়াউড়িতে একটু পজ দিলো স্নেহা।
কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম ডান হাতের তালুর উল্টা দিক দিয়ে মুছতে মুছতে চিৎকার করে উঠলো- আই রিগ্রেট দ্যাট আই লাভ অ্যা স্টুপিড লাইক ইউ! আই রি-গ্রে-ট! বাট আই য়োন্ট ফরগেট এনিথিং, নট আফটার টু ইয়ার্স, নট আনটিল মাই ডেথ! নাইদার উইল ইউ ফরগেট মি। পারহেপ্স, দিস ইজ দ্য পানিশমেন্ট উই ডেসটিন্ড টু ক্যারি ফর ইচ আদার। আই ফাকিং লাভ ইউ, ইয়েস আই স্টিল ডু অ্যান্ড আই রিগ্রেট কজ ইউ ডোন্ট ডিজার্ভ ইট! আবিরকে এসব শোনানোর সুযোগ এখন আর নাই তার, সেটার প্রয়োজনও নাই বলেই সে মনে করে।
স্নেহার হঠাৎ করে আকরাম ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। আকরাম ভাই ওর এক্স বস। ওর প্রফেশনাল লাইফের মেন্টরও। উনি সবসময়ই স্নেহাকে বলেন- ইউ অলওয়েজ আন্ডারএস্টিমেট ইউর য়োর্থ। ভ্যালু ইট। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট জেম ইউ রিয়েলি আর। ইউ আর জাস্ট ওয়েস্টিং ইউর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড এনার্জি অন সামথিং য়োর্থলেস।
আকরাম ভাইয়ের এই কথা স্নেহা বরাবরই এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিছে। কিন্তু এখন সে ফিল করে মাঝে মাঝে, মেবি আবির ইজ আউটস্ট্যান্ডিং ইন হিজ জব, দ্যাটস টোটালি ডিফরেন্ট ইস্যু। বাট এজ অ্যা হিউম্যান বিং, হি ইজ টু ইললিটারেট টু আন্ডারস্ট্যান্ড সিম্পল হিউম্যান ফিলিংস, অ্যান্ড দ্যাটস ম্যাটার মোর দ্যান হাউ সাকসেসফুল হি ইজ ইন হিজ প্রফেশন। তার এই মূর্খতা অনেকগুলা মানুষের জীবনকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দেবে না বহুদিন, হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এটা বোঝার মতো সক্ষমতাও আবিরের নাই! ওই রাতেও ছিল না।
ওই রাতের কনভার্সেশন এখনো স্নেহার স্পষ্ট মনে আছে। সে চোখ বন্ধ করে ভাবে- দুই বছর কেন, বিশ বছর ব্রেক দিলেও কিছু সম্পর্ক, কিছু স্মৃতি মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলে না, ভুলতে পারে না। এটা একজন ইমোশনালি ইললিটারেট মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। আবির শুধু ইমোশনালি ইললিটারেটই না, মানসিকভাবেও প্রচণ্ড দুর্বল প্রকৃতির একজন মানুষ। এমন পেশায় সুনাম কামানো একজন মানুষ কী করে এত দুর্বল চিত্তের হয়, এটা ভাবতেই অবাক লাগে স্নেহার।
আবির কোনোদিনও স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে নাই কোনো বিষয়েই। হয় ভয়ে, নয়তো বা অশান্তি সৃষ্টির আশঙ্কায়। ও বরাবরই স্নেহা কী রিয়্যাক্ট করবে এই চিন্তায় সঠিক সময় সঠিক তথ্য দেয় নাই বা যেটা বলার প্রয়োজন ছিল, না বলে চুপ থাকছে। এতে যে সে নিজের, স্নেহার, নিজের পরিবারের সবার ক্ষতি করলো, এই বোধ সম্ভবত এখনো আবিরের হয় নাই- স্নেহা চোখ বন্ধ করেই ভাবে আর ওর মনটা বিষাদে ভরে যায়।
আবিরের ক্যারেক্টারইস্টিক নিয়ে এই ব্যবচ্ছেদ খুব বাজে ফিল দেওয়া শুরু করলো স্নেহাকে। এসব চিন্তা বন্ধ করতে এখন দিনের পর দিন সে নিজেকে কত কী প্রসেসের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাইতেছে। মাঝে মাঝে এসব ভাবনা স্নেহাকে বুজের পাঁজর ভাঙার সমান যন্ত্রণা দেয়। সমস্ত মন আর শরীর তাতে ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে। আবিরকেও নিশ্চয় মাঝে মাঝে এই রকম সিচ্যুয়েশন ফেস করতে হইতেছে, স্নেহা ভাবে আর তার আবার ওর উপর মেজাজ খারাপ হয়।
একটা লোক কতটা স্টুপিড হলে এই রকম সিচ্যুয়েশনের ভেতর ফেলে এতগুলা মানুষকে সাফার করায়। এতকিছুর পর আবিরের প্রতি কোনো অনুভূতিই থাকা যৌক্তিক না স্নেহার। রাগ-জেদ-ক্ষোভ থাকা মানে তো এখনো ভালোবাসাটা কোথাও রয়ে গেছে। সেটা না থাকলে তো এখনো এসব চিন্তা স্নেহাকে ত্যাক্ত-বিরক্ত করে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতো না।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সে ভাবে- অথচ এই গল্প কোনোদিন লেখা হলে স্নেহা হবে সেইখানে এনট্যাগনিস্ট! কিংবা আরেকটু ভয়াবহ- কোনো এক ডেভিল চরিত্রে তার আবির্ভাব হবে যে সব ধ্বংস করে দিয়ে গল্প থেকে বিদায় নেবে। বিষয়গুলা কি এতটাই সাদা বা কালো? না তো! একটা গ্রে লাইনের ভেতর দিয়ে প্রত্যেকটা মানুষকে নিজের জীবনটা যাপন করতে হয়। এভ্রিথিং ইজ গ্রে হেয়্যার; ইভেন ইউ, মাই ডিজায়ার টু- স্নেহা আবারও ফাঁকা ফ্ল্যাটে চিৎকার করে বলে ওঠে।
২৭ ফেব্রুয়ারির রাতের ওই কনভার্সেশন স্নেহাকে ভীষণ বিরক্ত করা শুরু করলো এই একাকীত্ব উদযাপনের মহৎ দিনে। আবিরকে নিয়ে জাজমেন্টাল হতে ভালো লাগে না তার, কিন্তু আবির যেমন শেষটায় নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে স্নেহাকে…উফফফফ! মাথাটা চেপে ধরে চোখ খুলে ফোনটা হাতে নেয় স্নেহা। বিদায়ের আগের ওইসব বিশ্রী-কুৎসিত অনুভূতি মনে করলেই স্নেহার বুকের ভেতরটা এখনো চাপ দেয়!
স্নেহা জোরে জোরেই বলে ওঠে, এ-খ-নো! অনুভূতি ভোঁতা হওয়ার আগে তার আরো অনেক শাস্তি বোধহয় এখনো পাওয়া বাকি আছে- নিজেকে সে মনে করিয়ে দেয়। পুরা ঘর ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। স্নেহার মনে হইতেছে, জাহান্নামের সর্বোচ্চ স্থানে বসে সে যেন একটা কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল দেখতেছে। মাথা হালকা টলতেছে তার। ওইটা ইগনোর করে স্পটিফাইয়ের সার্চ অপশনে গিয়ে লিখলো- সালমা আগা! পারফেক্ট। একদম প্রথম গানটাই এই মুহূর্তে খুঁজতেছিল সে। ধোঁয়া, অন্ধকার, কুয়াশা, জাহান্নাম- গ্লুমি একটা ফিলিংয়ের ভেতর দিয়ে সেও সালমা আগার সঙ্গে একটু পর গাইতে থাকলো-
"শায়াদ উন কা আখিরি হো এ সিতাম
হার সিতাম, এ সোচ কার হাম সেহ গেয়ে…
খুদ কো ভি হামনে মিটা ডালা মাগার
ফাসলে যো দারমিয়াঁ থে রেহ গেয়ে
হাম ওয়াফা কার কে ভি তানহা রেহ গেয়ে
দিল কে আরমান আসুও মেঁ বেহ গেয়ে…"
ইদানিং স্নেহা আর কাঁদে না। এই গানটায় গলা মেলাতে গিয়ে কান্না পেলো হঠাৎ। এই কারণে না যে সালমা আগার মতো তার মনের বাসনাও চোখের পানিতে ভেসে গেছে, বরং এই ভাবনায় যে সে কোনোদিন আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে আর বলতে পারবে না- “হাম ওয়াফা কার কে ভি তানহা রেহ গেয়ে।”
শেষ পর্যন্ত তো ওয়াফা তার থাকা হয় নাই। এর পেছনে কোনো যদি বা কিন্তুর ব্যাখ্যা শোনাতে চাওয়াকেও আবিরের পরিহাস মনে হতে পারে এখন। হয়তো কোনোদিনই আবির জানবে না, কেন বা কোন পরিস্থিতির কারণে বাকিটা জীবন স্নেহা আবিরের গল্পে ডেভিল চরিত্র হয়ে ঘৃণা কুড়াবে। কান্নাটা আসতে গিয়েও কোথায় যেন আটকে গেল। স্নেহা সুঁইয়ের মাথায় আগুন ধরিয়ে আবার গাইলো-
খুদ কো ভি হামনে মিটা ডালা মাগার
ফাসলে যো দারমিয়াঁ থে রেহ গেয়ে…
চলবে…