Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্যাড লায়ার

March 22, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

147
View

বসন্তকালে এমন বজ্রবৃষ্টির নজির ভালো না খারাপ? জানালা গলে বৃষ্টির ছাট গায়ে পড়তেই একবার মেঘে কালো আকাশটার দিকে উদাসীন তাকিয়ে ভাবলো স্নেহা। আধা ঘণ্টা আগেও এমন ঝড়ো বৃষ্টির কোনো লক্ষণই ও দেখে নাই। বরং সিরিঞ্জ নিয়ে ফার্মেসি থেকে ফেরার সময় আকাশটাকে ও বেশ ঝকঝকে পরিষ্কার দেখে আসছিল বলে ওর স্পষ্ট মনে আছে। দীর্ঘশ্বাস ওকে বিট্রে করলেও নিজের মেমোরি সম্পর্কে বেশ কনফিডেন্স আছে স্নেহার। যদিও আবির মাঝে মাঝে দাবি করতো, উত্তেজিত হয়ে গেলে স্নেহা কী বলে, বা কী পরিমাণ ইনসেন আচরণ করে, তা না কী ওর মনে থাকে না। নিজের ইনসেন আচরণগুলা চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হতেই আবিরের জন্য ওর খারাপ লাগা শুরু হলো।

এই প্রথম লাগলো, এমন না। যতবার ওই রকম ইনসিডেন্ট ঘটছে, ততবারই এবং এরপর যতবার ও ওইগুলা নিয়ে পরে আবার ভাবছে- প্রত্যেকবারই নিজের আচরণের জন্য ও অনুতপ্ত হইছে। আবির মাঝে মাঝেই বলতো, তাহলে এমন আচরণ কেন করো? এর উত্তরটা এক কথায় দেওয়া কখনোই সম্ভব না, জানালার স্লাইড লাগাতে গিয়ে স্নেহার মনে হলো। এসব আচরণের পেছনের কারণগুলা এতই জটিল আর সূক্ষ্ম, স্নেহা কোনোদিনই ওর ট্রিগারড পয়েন্টগুলা আবিরকে বলে বোঝাতে পারে নাই।

প্রতিবারই এসব ইনসিডেন্টের পর স্নেহা নানাভাবে এর পেছনের কারণ আবিরকে বুঝিয়ে বলার ট্রাই করছে। আবির হয়তো বুঝছে বা বোঝার ভান করছে। বুঝতে পারলে আবারও একই আচরণগুলা করে স্নেহাকে উত্তেজিত করে তুলতো বলে ওর মনে হয় না। যদিও শেষের দিকে নিজেকে ডিফেন্ড করতে আবির প্রায় মুখস্তই বলতো- স্নেহা এতই বেশি সেন্সেটিভ যে ওকে কিছুই বলা যায় না, ও না কী তাতে প্রচণ্ড রিয়্যাক্ট করে! স্নেহা সত্য সহ্য করতে পারে না, এমন অভিযোগও আবিরের ছিল শেষ দিকে।

মানুষের সাইকোলজি খুব জটিল! স্নেহা জানে ওর বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার আছে। নিজের ট্রিগার পয়েন্টগুলা নিয়ে ও সচেতন থাকার চেষ্টা করলেও সবসময়ই তো আর পারে না, মাঝেমধ্যে কলাপ্স করে। এটা ওর সীমাবদ্ধতা। সুস্থ মানুষই কি সবসময় একই রকম কনসিস্টেন্সি বজায় রেখে আচরণ করতে পারে? আবিরের সঙ্গেই ওর ট্রিগারড হওয়ার ব্যাপারগুলা বেশি ঘটছে বলেই আবির ওই রিয়্যাকশনগুলাকে পরবর্তীতে নিজের প্রয়োজনে ক্যাশ করতে পারছে। নাহলে শি ইজ ইনসেন, শি নিডস প্রফেশনাল হেল্প- এই কথাগুলা স্নেহাকে বলার আগে নিজের অ্যাংজাইটি আর অদ্ভুত সব মিক্সড আচরণ নিয়ে ও হয়তো ভাবার সুযোগ পেত, সংশোধনেরও।

এই একবিংশ শতাব্দীর অস্থির পৃথিবীতে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো মানসিক অস্থিরতা অথবা ডিজঅর্ডার নিয়েই জীবন পার করতেছে বলেই ধারণা স্নেহার। ও নিজেরটা জানে, অনেকেই জানে না। আবির কি জানে ওর মধ্যে কী কী ডিজঅর্ডার আছে? এটা ওর কখনো জানার প্রয়োজন হয় নাই কারণ ও নিজের আচরণগুলাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েই এতকাল জীবন যাপন করে আসছে। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারির আবিরের কথা মনে পড়ে স্নেহার। এর সপ্তাহ খানিক আগেই ও রাজশাহী থেকে আবিরের সঙ্গে দেখা করে ফিরছিল। ফেরার আগে আবিরের ওই ভুল সময়ে বলা বেফাঁস কথার রাগটা কিছুদিন ও পুষে রাখছিল। ঢাকায় ফিরেও তাই অভিমানের সিলসিলা কিছুদিন জারি ছিল। এরমধ্যেই একদিন দুপুরে হুট করেই আবির স্নেহাকে টেক্সট করে- ওয়ানা মিট?

১৯ অথবা ২০ ফেব্রুয়ারি, ডেটটা এই মুহূর্তে এগজ্যাক্টলি স্নেহার মনে পড়তেছে না। ঠিক আজকের বৃষ্টির মতোই কোনো আগাম পূর্বাভাস ছাড়া আবিরের ওয়ানা মিট লেখা টেক্সটে ও বেশ সারপ্রাইজডই হইছিল ওইদিন। যদিও আগে আবির এমন হুটহাটই দেখা করতে টেক্সট পাঠাতো স্নেহাকে। তবুও ওইদিনেরটা ওর কাছে খুব আনএক্সপেক্টেডই ছিল। ওইদিন কিংফিশারে দেখা করে কয়েক ঘণ্টা গল্প গুজবে কাটানোর পর স্নেহাকে আবির ওর আফতাবনগরের বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যায়। ঢাকায় ওইবার ও কেন এবং কতদিনের জন্য আসছে, ওইসব আবির নিজে থেকে স্নেহাকে কিছু জানায় না, স্নেহাও ওর কাছে কিছু জানতে চায় না। তখনো পর্যন্ত আবিরের ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলাতে স্নেহা কোনো আগ্রহই দেখায় নাই, দেখানোর প্রয়োজনও হয় নাই।

ইন ফ্যাক্ট রাজশাহীতে ট্রান্সফার হওয়ার আগ পর্যন্ত স্নেহা কখনো আবিরের সঙ্গে নিজে থেকে দেখা করার কথা বলেও নাই, দেখা করতে চাইও নাই। এমন কী দুই বছরে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে ও আবিরকে কোনো টেক্সটও দুই-একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া করে নাই। ওই সময় পর্যন্ত- আবির টেক্সট করলে, ও উত্তর দিছে। আবির কল করতে চাইলে, ও কথা বলছে। আবির দেখা করতে চাইলে, ও দেখাও করছে। 

বিকট এক বজ্রপাতের শব্দ হলো হঠাৎ! আকাশের বুক চিরে মাঝ বরাবর আগুন ঝলকানোর মতো একটা বিদ্যুৎ রেখা দেখা গেল। স্নেহা ওই বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য দেখতে দেখতেই ভাবার চেষ্টা করলো- ঠিক কখন থেকে আসলে ওদের মধ্যে জটিলতা শুরু হইছে? স্নেহা কি এমন ইনসেন প্রথম থেকেই ছিল? আবিরের ডুয়েল বিহেভিয়র প্যাটার্ন অথবা ইনকনসিসটেন্ট পারসোনালিটি এক্সপ্রেশনগুলা কি এর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে নাই? স্নেহার মনে পড়ে, ওইবার সেকেন্ড টাইম দেখা হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি।

প্রথমদিন দেখা করার পর বেশ কয়েকদিন আবির ঢাকাতেই ছিল, স্নেহা এটা টের পাইছে। অথচ আবির নিজে থেকে এ বিষয়ে ওকে কিছু বলতেছে না দেখে ওর বেশ অদ্ভুতও লাগতেছিল। এতে ও কিছুটা রেস্টলেসও ফিল করতেছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি কিংফিশারে বসে স্নেহা যখন ওর পায়ের ছবি টেলিগ্রামের স্টোরিতে পোস্ট করলো, আবির ওই সময় স্নেহাকে টেক্সট করে জানায়, ও সাভার থেকে কিংফিশারে আসতেছে। ওইদিন স্নেহা প্রচণ্ড লো ফিল করতেছিল। ইন ফ্যাক্ট, এর এক দুইদিন আগে থেকেই সম্ভবত। আবিরকে ও এর আগের দিন দীর্ঘ একটা মেসেজও পাঠায় এসব নিয়ে।

ওইদিন বিকালের কিছু আগে আবির কিংফিশারে এসে আগের দিন স্নেহার পাঠানো টেক্সটটা আগে বের করে পুরাটা পড়ে। এরপর অভিমানে মুখ কালো করে রাখা স্নেহাকে ওর কাছে গিয়ে বসতে বললেও স্নেহা কাছে না গিয়ে আগের জায়গাতেই কিছুটা দূরত্ব রেখে মুখ কালো করেই বসে থাকে। আবির তখন ওর হাত টেনে বলে- আমি খারাপ মানুষ ঠিক আছে, তাই বলে আমার কাছেও বসা যাবে না? স্নেহার ভেতরের বরফ গলতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না। আবিরের ব্যাপারে ও বরাবরই ভয়ংকর দুর্বল আর হেল্পলেস ছিল! অথচ এই দুর্বলতা নাকি আবির বুঝতেই পারে নাই বহুদিন পর্যন্ত!

আবিরের ওই উদ্ভট ডিনায়াল আর ডিফেন্সিভ বিহেভিয়রের কথা মনে পড়লে এখনো স্নেহার খুব আশ্চর্য লাগে! মানুষ নিজেকে ডিফেন্ড করতে আরেকজনকে এত ছোট করতে পারে? ও তো নিজেকে নিজের মুখেই ভালো মানুষ বলে দাবি করছে শেষদিনও। স্নেহা এটা বিশ্বাসও করে। ও কোনোদিনই আবিরকে খারাপ মানুষ হিসেবে ভাবেও নাই, ওই রকম ফিলও ওর কখনো হয় নাই। বরং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আবিরকে তো ও ওর দেখা সবচেয়ে ওয়ান্ডারফুল হিউম্যান বিং হিসেবেই মেনশন করছে। কিন্তু একজন চমৎকার মানুষ নিজের মান-মর্যাদা আর সম্মান রক্ষা করার জন্য মরীয়া হয়ে সমস্ত দায় আরেকজনের উপর এত নগ্নভাবে চাপিয়ে দিতে পারে? আর এরজন্য যেভাবে, যা খুশি বলে একটা মানুষের অস্তিত্বকে এইভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে মুহূর্তের মধ্যেই? ভালো মানুষরা কি কখনো ভুল করতে পারে না? নাকি হাদিসে এমন বর্ণিত আছে, ভালো মানুষ দ্বারা পৃথিবীতে কোনো ভুল কাজ ঘটে না? নিজের ভুল স্বীকার করতে ভালো মানুষদের এতই সমস্যা?

নাহ! এইসব ভাবতে গেলে স্নেহার আবিরের প্রতি খুব বাজে ফিলিং হয়। অথচ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ও আবিরকে ভালোবাসার অনুভূতিটাই মনে রাখতে চাইছিল সবসময়। যাই হোক, ২৩ ফেব্রুয়ারির ওই বিকালে স্নেহাকে কাছে টেনে বসানোর পর আবির বলে- তুমি এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছো, আর আমি সাভার থেকে কত কী ফ্যান্টাসাইজ করতে করতে এখানে আসলাম। আবিরের ওই কথায় স্নেহা বেশ অবাক হয়! আবির নিজ থেকে এমন অ্যাপ্রোচ সম্ভবত ওইবারই ডিরেক্টলি প্রথম করছিল। যদিও ও বরাবরই দাবি করছে, কোনোদিনই নিজে থেকে ও ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ না কী করে নাই। খুব একটা ভুল বলে নাই। ওর ওই এপ্রোচ করার প্রয়োজনই তেমন হয় নাই, কারণ স্নেহাই সবসময় ইন্টিমেট হতে চাইতো, আর ও যে বারবারই চাবে- এটাও তো আবির বুঝতোই। না বোঝার কি কোনো কারণ ছিল ওর? অবশ্য ও যে নিজেকে ডিফেন্ড করতে কত কী অস্বীকার করছে, এইগুলা ভাবতে স্নেহার খুব নোংরা লাগে।

আবিরের কোনোদিনই এই এপ্রোচ করে নাই কথাটা হয়তো ভুল প্রমাণ করা যেত যদি স্নেহা দিন-ক্ষণ-তারিখ মনে করে একেকটা দিনের ঘটনা মনে করানোর চেষ্টা করতে যেত! ওই ছোটলোকি চিন্তাধারা স্নেহার কখনোই ছিল না, ওই ছোটলোকিটা ও করতেও যায় নাই। সো ‘কোনোদিন’ শব্দটা নিজের টুলস হিসাবে ব্যবহার না করে আবির যদি বলতো- স্নেহাই ম্যাক্সিমাম টাইম ইন্টিমেট হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে- ওই স্টেটমেন্টটা বরং স্নেহার জন্য শুনতে আরামদায়ক হতো। অবশ্যই স্নেহা ইন্টিমেট হতে চাইতো, বারবারই চাইতো। এটাই তো স্নেহার জন্য স্বাভাবিক ছিল, কারণ ও ওর সর্বস্ব দিয়েই আবিরকে ভালোবাসছিল। অথচ নিজেকে একপত্নীব্রত পুরুষ প্রমাণে আবির শেষদিন যা যা বলছে, স্নেহার একটা পর্যায়ে গিয়ে মনে হইতেছিল- দুইটা বছর সম্ভবত ও আবিরকে ব্যাকমেইল করে ওর সঙ্গে শুইতে বাধ্য করছে! ইয়া আল্লাহ! এই ভাবনায় নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে জিন্দা ওইখানে শুয়ে পড়তে মন চাইতেছিল স্নেহার। আচ্ছা, ব্ল্যাকমেইল করে কেউ সেক্সুয়ালি এত ইন্টেন্সিভ মোমেন্ট ক্রিয়েট করতে পারে প্রতিবারই? স্ট্রেঞ্জ! স্নেহার নিজের পাওয়ার আর এবিলিটির জন্য প্রাউড ফিল করা উচিত, নাকি লজ্জার গলায় দড়ি দেওয়া উচিত- ও মাঝেমাঝে এই ভাবনায় খেই হারিয়ে ফেলে!

যাই হোক, ২৩ ফেব্রুয়ারির ঘটনার কথা মনে করতে গিয়ে এতকিছু স্নেহার ভাবনায় আসলো। ওইবারের আগে-পরে সবসময়ই ওদের ইন্টিমেট হওয়ার বিষয়টা সিচ্যুয়েশনের ডিমান্ডে হইতো অথবা স্নেহার এপ্রোচে। বরং ওইদিন আবিরের এত ডিরেক্ট এপ্রোচ করার পরও স্নেহার কিছুটা অনীহা ছিল। তা সত্ত্বেও আবির কিন্তু আবারও একই এপ্রোচ করে। কিংফিশার থেকে বের হয়ে ওরা এনচ্যানটেডে গিয়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা প্রচণ্ড ইনটেন্স সময় কাটায় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। এরপর আবার কিংফিশারে গিয়ে কয়েক পেগ ড্রিংক করার পর আবির সাভার ফিরে যাওয়ার সময় স্নেহাও কিছুটা পথ ওর সঙ্গে যেতে চাইলো, আরো কিছুটা সময় পাশে থাকার লোভে।

গুলশান ২ থেকে গাবতলী পর্যন্ত আবিরের সঙ্গে ওই রাতের যাত্রা পথে স্নেহা আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহী মুভ করতেছে জানতে পারে। তবে ওইটা আবির নিজ থেকে জানায় না। স্নেহা গেইজ করে, এরপর প্রশ্ন করে জানতে পারে। শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে ট্র্যাফিক জ্যামে বসে আবির হঠাৎ বলে- আবার কবে ঢাকায় আসবো জানি না। আবার কবে দেখা হবে কে জানে! হয়তো এক বছরের আগে না। স্নেহা তখনই বুঝতে পারে আবিরের ফ্যামিলিও রাজশাহী মুভ করবে বলে ওর আর ঢাকায় আসার প্রয়োজন হবে না এক বছরে। এটা বোঝার জন্য স্নেহার সায়েন্সের স্টুডেন্ট হওয়া লাগে না। এসএসসি-এইচএসসিতে বাণিজ্য শাখার ছাত্রী হয়েও ও ঠিকই পরিষ্কার আবির কিছু বলার আগেই বুঝে ফেলে। এরপর ও নিজ জানতে চায়- তোমার ফ্যামিলি মুভ করতেছে ওইখানে?

আবির কেমন যেন একটা অপরাধীর মতো চেহারা করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলো। কিন্তু কী কারণে কে জানে, ওই সময় ওর চোখ লুকানোর চেষ্টা স্নেহার চোখকে এড়াতে পারে নাই। স্নেহা এরপর জানতে চায়, কবে ওর ফ্যামিলি ওইখানে মুভ করতেছে? আবির শুধু বলে- সুন। একটু পর আবার ও নিজে থেকেই বলতে থাকে- আমার মেয়েটা নরমাল চাইল্ড না। এবার এসে উই বোথ সিট উইথ হার সাইকিয়্যাট্রিস্ট। আলাদা আলাদাভাবেও ওর মায়ের সঙ্গে ও সেশন নিছে, আবার আমিও ওর সঙ্গে গিয়ে সেশন নিলাম। মেয়েটা সাইকিয়্যাট্রিস্টকে অনেককিছু বলছে যেটা আমাদের বলে না। ওর সাইকিয়্যাট্রিস্টই সাজেস্ট করছে শি নিডস বোথ অফ হার প্যারেন্টস উইথ হার। ও একা ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে পড়ছিল কয়দিন আগে।

আবির এক নাগাড়ে কথাগুলা বলে সহজভাবেই, কিন্তু তখনো ওর মধ্যে চোখ লুকানোর বিষয়টা স্নেহার নজরে পড়তেছিল। আবিরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেও ওর চোখ দেখে স্নেহার মনে হয়, সামথিং ইজ ডেফিনিটলি ফিশি! সেটা কী, তা না বুঝতে পারলেও এইটুকু বুঝতে পারে- আবির অর্ধসত্য বলতেছে। ওইগুলা এক নাগাড়ে বলার পর পরই আবির ওর মুখটাকে খুব দুখী দুখী করার চেষ্টা করলো। স্নেহার জন্য ওর খুব খারাপ লাগতেছে বা সামনেও লাগবে, এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা ছিল ওর ওই এক্সপ্রেশনে। স্নেহা তখন হেসে বললো- আরে ধুর বোকা! তোমার ফ্যামিলি তোমার কাছে গিয়ে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক! এটা তুমি আমাকে বলতে পারতেছিলা না কেন এই কয়দিন?

আবির চোখ-মুখে আরো দুখী একটা ভাব নিয়ে চুপ করে থাকে। ওই রাতে আবিরের সঙ্গে গাবতলী পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসার সময় স্নেহা কিছু ডট মেলানোর চেষ্টা করলো। তাতে ৬ ফেব্রুয়ারি রাতের ভিডিও কলে আবিরের কান্না আর সংগত কারণে ভালো না বাসতে পারার হিসাবটা তখন কিছুটা মিলাতে পারে। স্নেহার মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিক রেড ফ্ল্যাগের ইঙ্গিত দিলেও ওর মন তখন অলরেডি ভালোবাসার ষষ্ট স্তর জুনুনের পথে এক পা বাড়িয়ে ফেলছে। এর ঠিক পরদিন রাত পৌঁনে দশটা থেকে পরবর্তী ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের সময়কাল স্নেহার জীবনে হয়তো কাল হয়ে আসছিল, সম্ভবত আবিরের জীবনেও। ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট স্নেহার সঙ্গে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, নিজের সিদ্ধান্তেই আবির ঢাকায় স্টে করছিল। সেটাতে কেউ ওকে ফোর্স করে নাই, ভয়-ভীতিও দেখায় নাই।

বৃষ্টি থেমে আসছে। কালো মেঘগুলা ভেসে ভেসে সরে গিয়ে নীল-সাদা অংশগুলাকে দৃশ্যমান করে তুলতেছে। আকাশের রঙ পরিবর্তন দেখতে গিয়ে স্নেহার খুব জানতে ইচ্ছা করলো- ওর সঙ্গে ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের স্মৃতি কেন আবির বেমালুম গুম করে দিয়ে এর ৫ মাস পরের আলাপগুলাকেই বারবার মুখ্য করে তুলতেছিল বিদায়বেলা? কেন বারবার ও সিলেক্টিভ কিছু বিষয়ই মেনশন করতেছিল এই গুরুত্বপূর্ণ টাইম ফ্রেমটাকে পুরাপুরি ইগনোর করে? অথচ এই গুম করে দেওয়া সময়কালের মধ্যেই অনেক প্রশ্নের উত্তর লুকানো ছিল। স্নেহা ওইটা মেনশন করে নাই আবিরকে ছোট না করতে চাওয়ার কারণে।

স্নেহা হয়তো ইমপালসিভ, হয়তো ইনসেনও, কিন্তু আবির ওর কাছে দেবতাই ছিল। ওকে ছোট করার মাধ্যমে নিজেকে ডিফেন্ড করার প্রয়োজন স্নেহার কখনোই হয় নাই। ছোটলোকের মতো নোংরা ঘেটে সবকিছু অস্বীকার করে ওর উপর সমস্ত দায়ও স্নেহা কখনোই চাপাতে চায় নাই। যেটুকু ওর দায় ছিল, এর কিছুটাও যদি আবির নিজে থেকেই স্বীকার করে নিতো, তাতে স্নেহার চোখে ও কোথায় আর কী অবস্থায় থাকতো- তাতে আবিরের কিছুই যায়-আসে না অবশ্য, কিন্তু ওর ওই দায় স্বীকারে ওর ঘাড়ে থাকা দুইজন ফেরেশতা অন্তত ওর স্পষ্টবাদিতার সাক্ষী হতে পারতো কেয়ামতের দিনের জন্য। এর বদলে তাদের সাক্ষী হতে হলো- চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে অপমানিত করে, নগ্নভাবে তার উপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে এই পৃথিবীতে তাকে বাঁচার অনুপযোগী করে তোলার। স্নেহার অস্তিত্বে যেই তীব্র আঘাত আবির নিজেকে জিতাতে শেষ পর্যন্ত করলো, এতে ও শান্তি পেলো তো? পেলেই ভালো!

বিদায়ের আগে শেষ কনভার্সেশনে আবিরের কথাগুলা…উফফফফফ্! স্নেহা আবারও মাথা চেপে ধরে প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। কী ভীষণ এক চাপ লাগে ওই ৭৫ মিনিটের কনভার্সেশনের কথা মনে পড়লে। মনটা বিষিয়ে ওঠে ওর! স্নেহা তবুও আবিরের জায়গায় নিজেকে রেখে একবার ভাবে- আহত বাঘের হিংস্রতা তো কেবল আবির একাই দেখায় নাই, স্নেহাও তো দেখাইছে। কিন্তু তাই বলে…সমস্তটাই মিথ্যা করে? শেষ তো এমনিতেই হয়ে গেছিল, তবুও আবিরের কেন এই হিংস্র রূপটা দেখানোর প্রয়োজন ছিল এত নোংরা আর নগ্নভাবে? নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে আবির ওর সঙ্গে স্নেহার সমস্ত স্মৃতিকেই শেষ পর্যন্ত মিথ্যা করে দিলো। সবকিছুকেই মুহূর্তেই ও অস্তিত্বহীনতায় পরিণত করলো কত নির্বিকারভাবে!

আবিরের শেষদিনের কথাগুলা স্নেহার এখনো বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। এখনো ওর মনে হয়, ও শেষদিনও সব সত্য বলে নাই বরাবরের মতোই। ওর মোটিভই ছিল নিজেকে ডিফেন্ড করার মাধ্যমে সব শেষ করা। ও সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছিল। স্নেহা প্রথমে কাউন্টার দিলেও একটু পরই ওর মনে হয়-  আবির যদি এভাবেই শেষ করতে চায়, করুক। প্রশ্ন করতে গেলে বিদায়টা আরো বেশি কদর্য হবে। তবে কোন আবির যে সত্য বলে; আর কোন আবির অর্ধ-সত্য, কোন আবিরই বা সত্য গুম অথবা আড়াল করে- স্নেহা ফয়েল পেপারের নিচে তাপ দিতে দিতে মাল্টিপল পারসোনালিটির আবিরের মিক্সড সব বিহেভিয়রের যেন একটা ফ্ল্যাশব্যাক দেখলো চোখের সামনে! ফ্রম বার টু রিভার সাইড, ফ্রম লো টু হাই, ফ্রম রেড ফ্ল্যাগ টু বেড! ইটস প্রিটি হার্ড টু কাম টু এনি ক্লিয়ার কনক্লুশন ফ্রম হিজ দোজ মাল্টিপল অ্যান্ড মিক্সড বিহেভিয়র। ইম্যাজিন ড্রাগন্সের একটা গান আবিরের বেশ পছন্দের ছিল, স্নেহার হুট করেই ওই গানটা মনে পড়লো-

লুক মি ইন দ্য আইজ,
টেল মি হোয়াট ইউ সি
পারফেক্ট প্যারাডাইস, টিয়ারিং অ্যাট দ্য সিমস
আই উইশ আই কুড এসকেইপ ইট,
আই ডোন্ট ওয়ানা ফেইক ইট
উইশ আই কুড ইরেইজ ইট,
মেইক ইউর হার্ট বিলিভ
বাট আইম অ্যা ব্যাড লায়ার, ব্যাড লায়ার
নাউ ইউ নো, নাউ ইউ নো
আইম অ্যা ব্যাড লায়ার, ব্যাড লায়ার
নাউ ইউ নো, ইউ আর ফ্রি টু গো…

চেজিং দ্য ড্রাগন: মাঞ্জা সুতা

Comments

    Please login to post comment. Login