Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ব্যাড লায়ার

March 22, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

250
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

বসন্তকালে এমন বজ্রবৃষ্টির নজির ভালো না খারাপ? জানালা গলে বৃষ্টির ছাট গায়ে পড়তেই একবার মেঘে কালো আকাশটার দিকে উদাসীন তাকিয়ে ভাবলো স্নেহা। আধা ঘণ্টা আগেও এমন ঝড়ো বৃষ্টির কোনো লক্ষণই দেখে নাই ও। বরং ওর স্পষ্ট মনে আছে, ফার্মেসি থেকে ফেরার সময় আকাশটাকে বেশ ঝকঝকে পরিষ্কারই দেখে আসছিল। দীর্ঘশ্বাস ওকে বিট্রে করলেও নিজের মেমোরি সম্পর্কে বেশ কনফিডেন্স আছে ওর। যদিও আবির মাঝে মাঝে দাবি করতো- উত্তেজিত হলে ও কী বলে, বা কী পরিমাণ ইনসেন আচরণ করে, ওর নাকি মনে থাকে না! হবে হয়তো! আবিরেরও কি ওর ড্রাঙ্ক হয়ে করা বিহেভিয়র মনে থাকে!

নিজের ইনসেন আচরণগুলা চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাক হতেই আবিরের জন্য ওর খারাপ লাগা শুরু হলো। এই প্রথম লাগলো, এমন না। যতবার ওই রকম ইনসিডেন্ট ঘটছে, ততবার তো বটেই; এরপরও কারণে-অকারণে যখনই এসব মনে পড়ছে, প্রতিবারই নিজের আচরণের জন্য লজ্জা পাইছে ও, অনুতপ্তও হইছে। আবির মাঝে মাঝে বলতো- তাহলে এমন আচরণ কেন করো? এর উত্তর একটা-দুইটা বাক্যে দেওয়া কখনোই সম্ভব না, জানালার স্লাইড লাগাতে গিয়ে ওর মনে হলো। এসব আচরণের পেছনের কারণগুলা এতই জটিল, এতই সূক্ষ্ম যে কোনোদিনই নিজের ট্রিগার পয়েন্টগুলা ও আবিরকে বলে বোঝাতে পারে নাই।

অনেকবার ও বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে দেখছে; আবির হয়তো বুঝছে, কিংবা বোঝার ভান করে গেছে। কিন্তু বুঝতে পারলে তো বারবার একই আচরণে স্নেহাকে উত্তেজিত করে তুলতো বলে মনে হয় না। তোমাকে তো কিছু বলাই যায় না। ইউ আর টু সেন্সেটিভ। তুমি সত্য সহ্য করতে পারো না- শেষের দিকে এই অভিযোগ ওর ঠোঁটের গোড়ায় একদম এক পা বাড়িয়ে রেডি হয়ে থাকতো। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, যখন-তখন, এই অভিযোগে অভিযুক্ত করার সুযোগ ও কিছুতেই ছাড়তো না। মানুষের সাইকোলজি খুব জটিল! স্নেহা জানে যে ওর বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার আছে। নিজের ট্রিগার পয়েন্টগুলা নিয়ে ও সচেতন থাকার চেষ্টাও করে। সবসময় পেরে উঠে না, কলাপ্স করে মাঝে মাঝে। এটা ওর সীমাবদ্ধতা। কিন্তু সুস্থ মানুষরাও কি নিজেদের আচরণের একই রকম কনসিসটেন্সি বজায় রাখতে পারে সবসময়?

আবিরের সঙ্গে ওর ট্রিগারড হওয়ার ঘটনাগুলা বেশি ঘটছে বলেই নিজের প্রয়োজনে ওইসব রিয়্যাকশনকে আবির ক্যাশ করতে পারছে। ‘ইউ আর ইনসেন’, ‘ইউ নিড প্রফেশনাল হেল্প’- আরেকজনকে বলার আগে নিজের অ্যাংজাইটি আর ডুয়েল পারসোনালিটি নিয়ে কি ও কখনো ভাবছে? অথবা সেসব সংশোধনের কথা? এই একবিংশ শতাব্দীর অস্থির পৃথিবীতে প্রত্যেকেই কোনো না কোনো মানসিক অস্থিরতা অথবা ডিজঅর্ডার নিয়েই জীবন পার করতেছে বলে ধারণা স্নেহার। ও নিজেরটা জানে, অনেকেই জানে না। আবির কি জানে ওর মধ্যে কী কী ডিজঅর্ডার আছে? এটা ওর কখনো জানার প্রয়োজন হয় নাই কারণ ও নিজের আচরণগুলাকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েই এতকাল জীবন যাপন করে আসতেছিল।

গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারির কথা মনে পড়ে স্নেহার। এর সপ্তাহ খানিক আগেই ও রাজশাহী থেকে আবিরের সঙ্গে দেখা করে ফিরছিল। ফেরার আগ মুহূর্তে বলা আবিরের বেফাঁস কথার কারণে ও ঢাকায় এসেও কিছুটা রেগেই ছিল। সপ্তাহ পার হলেও রাগ আর অভিমানের সিলসিলাটা জারি থাকায় কথা কম বলতেছিল নিজে থেকে। ওরমধ্যেই একদিন দুপুরে আবির হঠাৎ টেক্সট করে বলে- ওয়ানা মিট? ১৯ অথবা ২০ ফেব্রুয়ারি। ডেটটা এই মুহূর্তে এগজ্যাক্টলি মনে পড়তেছে না। কোনো আগাম পূর্বাভাস ছাড়া ওয়ানা মিট লেখা টেক্সটে ও বেশ সারপ্রাইজডই হইছিল ওইদিন। যদিও আগে আবির এমন হুটহাটই দেখা করতে চেয়ে টেক্সট পাঠাতো। তবুও ওইদিনেরটা ওর কাছে খুব আনএক্সপেক্টেডই ছিল।

বিকালে ওদের দেখা হলো কিংফিশারে। কয়েক ঘণ্টা ড্রিংক আর গল্প-গুজবে কাটিয়ে দেওয়ার পর স্নেহাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায় আবির। ঢাকায় ওইবার ও কেন এবং কতদিনের জন্য আসছে, ওইসব নিয়ে কোনো কথা বলে না, স্নেহাও কিছু জানতে চায় না। ওর ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলাতে তখনও স্নেহা কোনো আগ্রহ দেখায় নাই, দেখানোর প্রয়োজনও হয় নাই আসলে। ইন ফ্যাক্ট, রাজশাহীতে পোস্টিং হওয়ার আগ পর্যন্ত কখনোই স্নেহা আবিরের সঙ্গে দেখা করতে চায় না অথবা ওকে দেখা করার কথা বলেও নাই। এমন কী দুই বছরে নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে ও আবিরকে কোনোদিন টেক্সটও দুই-একটা ব্যতিক্রম ঘটনা ছাড়া করে নাই। আবির টেক্সট করলে উত্তর দিছে; আবির কল করতে চাইলে, কথা বলছে, দেখা করতে চাইলে, দেখাও করছে। 

বিকট এক বজ্রপাতের শব্দ হলো হঠাৎ! আকাশের বুক চিরে মাঝ বরাবর আগুন ঝলকানোর মতো একটা বিদ্যুৎ রেখা দেখা গেল। বিদ্যুৎ চমকানোর দৃশ্য দেখতে দেখতেই ও ভাবার চেষ্টা করে- ঠিক কবে থেকে ওদের মধ্যে জটিলতা শুরু হইছে আসলে? ও কি প্রথম থেকেই এমন ‘ইনসেন’ ছিল? আবিরের ডুয়েল বিহেভিয়র প্যাটার্ন অথবা ইনকনসিসটেন্ট পারসোনালিটি এক্সপ্রেশনগুলা কি এর প্রভাবক হিসেবে কাজ করে নাই? এই ভাবনা থেকে বের হয়ে ও আবারও ফেব্রুয়ারিতে ফিরে যায়। ওইবার ওদের সেকেন্ড টাইম দেখা হয় ২৩ ফেব্রুয়ারি। প্রথমদিন দেখা করার পর আবির যে ও কয়দিন যাবত ঢাকাতেই ছিল, স্নেহা এটা অনুমান করে। নিজে থেকে এ বিষয়ে আবির কিছু না বলায় ওর বেশ অদ্ভুত লাগতেছিল।

আবির ঢাকায়, অথচ ওদের দেখা হইতেছে না- এই ভাবনা ওকে অস্থির করে তোলে ভেতরে ভেতরে। ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে খুব ডিপ্রেসড লাগায় একাই ও কিংফিশারে গিয়ে হুইস্কির সঙ্গে রেডবুল মেশাইতেছিল বসে বসে। কাজ না থাকলে মানুষ কত কী করে! হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ও নিজের পায়ের ছবি তুলতেছিল বিভিন্ন এঙ্গেলে। একটা ছবি টেলিগ্রামের স্টোরিতে পোস্ট করতেই আবিরের টেক্সট আসে- ওয়েট ফর মি। আই'ম ট্রায়িং টু কাম দেয়্যার। স্নেহা প্রচণ্ড লো ফিল করতেছিল ওইদিন। ওইদিনই না শুধু, এর এক-দুইদিন আগে থেকেই খুব ডিপ্রেসড লাগতেছিল ওর। আবিরকে এর আগের রাতে ও এই সংক্রান্ত একটা দীর্ঘ রচনাও লিখে পাঠাইছে।

বিকালে কিংফিশারে ঢুকেই আবির প্রথমে স্নেহার পাঠানো আগের রাতের টেক্সটটা খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ে। এরপর অভিমানে মুখ কালো করে বসে থাকা স্নেহার দিকে তাকিয়ে ওর কাছে গিয়ে বসতে ডাকলো। তাতে স্নেহার অভিমান আরো বেড়ে গেল হুর হুর করে। কিছুটা দূরত্ব রেখে আগের জায়গাতেই ও ফ্রিজ হয়ে বসে থাকলো। মুখটাতেও আলোর কোনো ছিটেফোঁটা দেখা গেল না। আবির নিজেই তখন কাছে এসে ওর ডান হাত টান দিয়ে বলে- আমি খারাপ মানুষ ঠিক আছে, তাই বলে আমার কাছেও বসা যাবে না? স্নেহার ভেতরের বরফ গলতে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না আর। আবিরের ব্যাপারে ও বরাবরই ভয়ংকর দুর্বল, হেল্পলেসও! অথচ এই দুর্বলতা নাকি আবির বুঝতেই পারে নাই বহুদিন!

ওর ওই উদ্ভট ডিনায়াল আর ডিফেন্সিভ বিহেভিয়রের কথা মনে পড়লে এখনো স্নেহার খুব আশ্চর্য লাগে! মানুষ নিজেকে ডিফেন্ড করতে আরেকজনকে এত ছোট করতে পারে? ও তো শেষদিন নিজেকে ভালো মানুষ বলে দাবি করতেছিল। স্নেহা এটা বিশ্বাসও করে। ওকে কখনোই স্নেহার খারাপ মানুষ মনে হয় নাই। এমন ভাবনা বা বোধ, একটাবারের জন্যও হয় নাই ওর কোনোদিন। বরং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আবিরকে ও ‘ওয়ান্ডারফুল হিউম্যান বিং’ হিসেবেই মেনশন করে গেছে। কিন্তু একজন চমৎকার মানুষ নিজের মান-মর্যাদা আর সম্মান রক্ষা করার জন্য মরীয়া হয়ে কনসেন্টের মাধ্যমে দুইজনের মানুষের মধ্যে ঘটা সমস্ত কিছুর দায় একজনের উপর এত নগ্নভাবে চাপিয়ে দিতে পারে? মুহূর্তের মধ্যেই সমস্ত মায়া-আবেগ, এত এত চমৎকার মেমোরি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কারো অস্তিত্ব এইভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে? ভালো মানুষরা কি কখনো ভুল করে না? নাকি হাদিসে বর্ণিত আছে- ভালো মানুষ দ্বারা পৃথিবীতে কোনো ভুল কাজ ঘটে না? নিজের ভুল স্বীকার করতে ভালো মানুষদের এতই সমস্যা? নাহ! এইসব ভাবতে গেলে আবিরের প্রতি খুব বাজে ফিলিং হয় ওর। অথচ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ও আবিরকে ভালোবাসার অনুভূতিটাই মনে রাখতে চাইছিল সবসময়।

২৩ ফেব্রুয়ারির ওই বিকালে ওকে কাছে টেনে বসানোর পর আবির বলতেছিল- তুমি এমন বাংলার পাঁচের মতো মুখ করে বসে আছো, আর আমি সাভার থেকে কত কী ফ্যান্টাসাইজ করতে করতে আসলাম এখানে। ওই কথায় বেশ অবাক হয় স্নেহা! নিজ থেকে এমন অ্যাপ্রোচ সম্ভবত ওইবারই ডিরেক্টলি ও প্রথম করছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত দাবি করছে, কোনোদিনই নিজে থেকে ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ না কী ও করে নাই। খুব একটা ভুল বলে নাই। ওর এ ধরনের এপ্রোচ করার প্রয়োজনই তেমন হয় নাই। স্নেহাই সবসময় ইন্টিমেট হতে চাইছে; আর ও যে বারবারই এটা চাইবে- সেটা কি আবির জানতো না, না কি বুঝতো না? কোনটা? না বোঝার কি কোনো কারণ ছিল ওর? অবশ্য নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে তো ও কত কী-ই শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করলো! এইগুলা ভাবতেও স্নেহার খুব নোংরা লাগে এখন। বিশ্রী রকম একটা অনুভূতি হয়। অথচ ওই স্মৃতিগুলা ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সব থেকে দামি ছিল। কিন্তু শেষদিন আবিরের বিশ্রী-নির্লজ্জ সব ন্যারেটিভের আঘাতে সমস্ত সুন্দর স্মৃতিগুলার মৃত্যু ঘটে। এত নিখুঁতভাবে ও সবকিছু বিষাক্ত বানিয়ে দিয়ে স্নেহার সমস্ত এগজিসটেন্সকেই নোংরা আর সস্তা ফিল করিয়ে গেল!

কোনোদিনই আবির ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ করে নাই, বা ইন্টিমেট হতে চাইতো না- এইসব দাবি চাইলেই স্নেহা ভুল প্রমাণ করে দিতে পারতো! কিন্তু ওইসব ছোটলোকির অভ্যাস ওর নাই, ও করতে চায়ও নাই। ‘কোনোদিন’ শব্দটা নিজের টুলস হিসাবে ব্যবহার না করে ও যদি বলতো- ‘ম্যাক্সিমাম টাইম' স্নেহাই ইন্টিমেট হতে চাইছে, ওই স্টেটমেন্টটা বরং স্নেহার জন্য স্বস্তিদায়ক লাগতো। অবশ্যই স্নেহা ইন্টিমেট হতে চাইতো, বারবারই চাইছে। ও তো অস্বীকার করে নাই কখনো। স্পষ্টভাবে স্বীকার করছে সবসময়। ওই চাওয়াটা কি ওর জন্য স্বাভাবিক ছিল না? নিজের সর্বস্ব দিয়ে ও আবিরকে ভালোবাসছিল। পাগলের মতোই- এতে ওর কোনো সন্দেহ নাই। অথচ নিজেকে এক পত্নীব্রত পুরুষ প্রমাণে শেষদিন আবির যা যা বলছে, তাতে ওর মনে হইতেছিল- গত দুই বছর সম্ভবত ও আবিরকে ব্যাকমেইল করে ওর সঙ্গে শুইতে বাধ্য করছে! ইয়া আল্লাহ! এই ভাবনায় নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে জিন্দা ওইখানে শুয়ে পড়তে মন চাইতেছিল ওর। আচ্ছা, ব্ল্যাকমেইল করে কেউ সেক্সুয়ালি এত ইন্টেন্সিভ মোমেন্ট ক্রিয়েট করতে পারে? তাও আবার প্রতিবারই? লাগাতার? দুই বছরের প্রতিটা সময়ই? স্ট্রেঞ্জ! নিজের পাওয়ার আর এবিলিটির কথা ভেবে স্নেহার কি প্রাউড ফিল করা উচিত, নাকি লজ্জার গলায় দড়ি দেওয়া- মাঝেমাঝে এই ভাবনায় ও খেই হারিয়ে ফেলে!

ওর কাছে আবিরের স্থান ছিল অনেক অনেক উঁচুতে। ও একরকম আবিরকে পুজাই করতো আসলে। স্নেহার ধারণা ছিল, আবির ওর দেখা সবচেয়ে মার্জিত, বুদ্ধিমান এবং জেনুইন একজন জেন্টলম্যান; সাধারণ আর দশটা পুরুষের চেয়ে অনেক উপরে। এই বিশ্বাসের কারণেই জীবনের এই পর্যায়ে, এই বয়সে এসেও ও অন্ধের মতো ভালোবাসছে। কিন্তু শেষমেশ, নোংরা সব ব্লেম গেমে সমস্ত কিছু অস্বীকার করার মাধ্যমে আবির নিজের ভেতরে থাকা ‘বেটাগীরি'টাকে লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। গত দুই বছরের সমস্ত দায় যখন ও স্নেহার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে চলে যাইতেছিল, দূর থেকেও স্নেহার তখন মনে হইতেছিল- আবিরের ‘জেন্টলম্যান’-এর মুখোশটা ও চোখের সামনে খসে পড়তে দেখতেছে। ওই মুহূর্তে ওকে দেখতে রাস্তা-ঘাটে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো সস্তা পুরুষদের মতোই লাগতেছিল, হয়তো তাদের থেকেও বেশি নোংরা! আহ! স্নেহার জন্য এরচেয়ে হৃদয়বিদারক আর কী হতে পারে! ও কখনো ভাবতেই পারে নাই আবির এতটা নিচে নামতে পারে! ওর বুকটা ভেঙে খান খান হয়ে যাইতেছিল। শেষ ওই কনভার্সেশনের পর অনেকদিন কোনো মানুষের সঙ্গে স্নেহা কোনো কথাই আর বলতে পারে নাই, এখনো পারে না। মানুষ দেখলেই ওর বমি আসে।

২৩ ফেব্রুয়ারির স্মৃতি ঘাটতে গিয়ে এতকিছু মনে পড়লো ওর। ওইদিনের আগে বা পরে অধিকাংশ সময়ই, হয় সিচ্যুয়েশনের ডিমান্ডে, অথবা স্নেহার এপ্রোচেই ওরা ইন্টিমেট হইছে। বরং ওইদিন আবির এত ডিরেক্ট এপ্রোচ করার পরও স্নেহার কিছুটা অনীহা ছিল। তা সত্ত্বেও ও আবার একই এপ্রোচ করলে ওরা কিংফিশার থেকে বের হয়ে এনচ্যানটেডে যায়। সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বেশ কয়েক ঘণ্টা প্রচণ্ড ইনটেন্স সময় কাটানোর পর রাতে আরেকবার গিয়ে কিংফিশারে বসে। ঘণ্টা খানিক ওইখানে থাকার পর সাভার ফেরার সময় একসঙ্গে আরেকটু সময় কাটানোর জন্য স্নেহাও আবিরের সঙ্গে কিছুটা পথ যায়।

গুলশান ২ থেকে গাবতলী পর্যন্ত ওই যাত্রার এক ফাঁকে আবিরের ফ্যামিলির রাজশাহী মুভ করার ব্যাপারে ও জানতে পারে। যদিও আবির নিজে থেকে জানায় নাই। স্নেহা বুঝতে পারে জানতে চাওয়ার পর বলছে। শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে ট্র্যাফিক জ্যামে বসে আবির হঠাৎ বলতেছিল- আবার কবে ঢাকায় আসবো জানি না। কবে আবার দেখা হবে কে জানে! হয়তো এক বছরের আগে না। স্নেহা তখনই বুঝতে পারে, ওর ফ্যামিলিও রাজশাহী মুভ করবে বলে এক বছর আর ওর ঢাকায় আসার প্রয়োজন হবে না। এটা বোঝার জন্য ওর সায়েন্সের স্টুডেন্ট হওয়া লাগে না। এসএসসি-এইচএসসিতে বাণিজ্য শাখার ছাত্রী হয়েও ও ঠিকই পরিষ্কার সব বুঝে ফেলে। তারপরও জানতে চায়- তোমার ফ্যামিলি মুভ করতেছে ওইখানে?

কেমন একটা অপরাধীর মতো চেহারা বানিয়ে আবির মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দেয়। কিন্তু কী কারণে কে জানে, ওই সময় ওর চোখ লুকানোর চেষ্টা স্নেহার চোখকে এড়াতে পারে নাই। কবে তারা যাইতেছেন জানতে চাইলে এক শব্দে ও জবাব দেয়- সুন। একটু পর আবার নিজে থেকেই বলে- আমার মেয়েটা নরমাল চাইল্ড না। এবার এসে উই বোথ সিট উইদ হার সাইকিয়্যাট্রিস্ট। আলাদা আলাদাভাবেও ওর মায়ের সঙ্গে ও সেশন নিছে, আবার আমিও ওর সঙ্গে গিয়ে সেশন নিলাম। মেয়েটা সাইকিয়্যাট্রিস্টকে অনেককিছু বলছে যেটা আমাদের বলে না। ওর সাইকিয়্যাট্রিস্টই আমাদের সাজেস্ট করছেন, শি নিডস বোথ অব হার প্যারেন্টস উইদ হার। ও একা একা ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে পড়ছিল কয়দিন আগে।

এক নাগাড়ে কথাগুলা বলার সময় আবির বারবারই ওর চোখ লুকাইতেছিল। চোখ লুকানোর ওই চেষ্টা স্নেহার নজরকে এড়াইতে পারলো না একটাবারের জন্যও। খুব মনোযোগ দিয়ে ওর কথা শুনতে থাকলেও চোখের দিকে তাকিয়ে স্নেহার বারবারই ফিল হইতেছিল- সামথিং ইজ ডেফিনিটলি ফিশি! পুরাপুরি কিছু না বুঝলেও, আবির যে অর্ধসত্য বলতেছে, এইটুকু ও বুঝতে পারে। এক নাগাড়ে নিজের মেয়ের কথা বলার পর পরই ওর মুখটাকে ও খুব দুখী দুখী বানানোর চেষ্টা করলো। কোনটা মানুষের ভেতর থেকে আসা এক্সপ্রেশন, কোনটা ফেক- অল্প খেয়াল করলেই টের পাওয়া যায়। স্নেহার শৈশব-কৈশোর, এমন কী সমস্ত যৌবন গেছে মানুষ দেখতে দেখতে। চোখ দেখলেই ও বহুকিছু টের পায়।

আবির ওই একই ফেক দুখী মুখটা নিয়ে বসে আছে গাড়ির ভেতরে। স্নেহার জন্য ওর খুব খারাপ লাগতেছে বা সামনেও লাগবে- এমনটাই বোঝানোর চেষ্টা ছিল ওর ওই এক্সপ্রেশনে। স্নেহা তখন হাসতে হাসতে বলে- আরে ধুর বোকা! তোমার ফ্যামিলি তোমার কাছে গিয়ে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক! তুমি আমাকে এটা বলতে পারতেছিলা না কেন এই কয়দিন? চোখ-মুখে আরো বেশি দুখী একটা ভাব নিয়ে ও চুপ করেই থাকে।

ওই রাতে স্নেহা কিছু ডট মেলানোর চেষ্টা করলে ৬ ফেব্রুয়ারি রাতের ভিডিও কলে আবিরের কান্না আর সঙ্গত কারণে ভালো না বাসতে পারার হিসাব কিছুটা মিলাতে পারে। ওর মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিক রেড ফ্ল্যাগের ইঙ্গিত দিলেও মন তখন অলরেডি জুনুনের রাস্তায় এক পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে অন্য পায়ের আগমনের অপেক্ষায়। এর ঠিক পরদিন রাত পৌনে দশটা থেকে পরবর্তী ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের সময়কাল ওর জীবনে হয়তো কাল হয়ে আসছিল, সম্ভবত আবিরের জীবনেও। ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিট স্বেচ্ছায়; সজ্ঞানে, নিজের সিদ্ধান্তে, স্বপ্রণোদিত হয়েই আবির স্নেহার সঙ্গে ঢাকাতে অবস্থান করছে। কেউ এর জন্য ওকে ফোর্স করে নাই, ভয়-ভীতিও দেখায় নাই।

বৃষ্টি থেমে আসছে। কালো মেঘগুলা ভেসে ভেসে সরে গিয়ে নীল-সাদা অংশগুলাকে দৃশ্যমান করে তুলতেছে। আকাশের রঙ পরিবর্তন দেখতে গিয়ে স্নেহার খুব জানতে ইচ্ছা করলো- ওর সঙ্গে ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের স্মৃতি কেন আবির বেমালুম গুম করে দিয়ে এর ৫ মাস পরের আলাপগুলাকেই বারবার মুখ্য করে তুলতেছিল বিদায়কালে? কেন বারবার ও সিলেক্টিভ কিছু বিষয়ই মেনশন করতেছিল এই গুরুত্বপূর্ণ টাইম ফ্রেমটাকে পুরাপুরি ইগনোর করে? অথচ এই গুম করে দেওয়া সময়কালের মধ্যেই অনেক প্রশ্নের উত্তর লুকানো ছিল। স্নেহা ওইটা মেনশন করে নাই আবিরকে ছোট করতে না চাওয়ার কারণে।

ও হয়তো ইমপালসিভ, হয়তো ইনসেনও। কিন্তু আবির ওর কাছে দেবতাই ছিল। ওকে ছোট করার মাধ্যমে নিজেকে ডিফেন্ড করার প্রয়োজন ওর কখনোই হয় নাই। ছোটলোকের মতো নোংরা ঘেটে সবকিছু অস্বীকার করে ওর উপর সমস্ত দায়ও ও কখনো চাপাতে চায় নাই। যেটুকু দায় ওর ছিল, এর কিছুটাও যদি আবির নিজে থেকেই স্বীকার করে নিতো, তাতে ওর চোখে ও কোথায় আর কী অবস্থায় থাকতো- তাতে যদিও আবিরের কিছুই যায়-আসে না। কিন্তু ওর ওই দায় স্বীকারে ওর ঘাড়ে থাকা দুইজন ফেরেশতা অন্তত ওর স্পষ্টবাদিতার সাক্ষী হতে পারতো কেয়ামতের দিনের জন্য। এর বদলে তাদের সাক্ষী হতে হলো- চূড়ান্ত পর্যায়ে একজনকে অপমানিত করে, নগ্নভাবে সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে তার উপর সমস্ত দায় চাপিয়ে দিয়ে, এই পৃথিবীতে তাকে বাঁচার অনুপযোগী করে তোলার। স্নেহার অস্তিত্বে যেই তীব্র আঘাত আবির নিজেকে জিতাতে শেষ পর্যন্ত করে গেল, এতে ও শান্তি পেলো তো? পেলেই ভালো!

বিদায়ের আগে শেষ কনভার্সেশনে আবিরের কথাগুলা…উফফফফফ্! আবারও ও মাথা চেপে ধরে প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। কী ভীষণ চাপ লাগে ওই ৭৫ মিনিটের কনভার্সেশনের কথা মনে পড়লে। মনটা বিষিয়ে উঠে ওর! তবুও আবিরের জায়গায় নিজেকে রেখে বহুবারই ও ভাবছে- আহত বাঘের হিংস্রতা তো কেবল ও একাই দেখায় নাই, স্নেহা নিজেও তো দেখাইছে। কিন্তু তাই বলে…সমস্তটাই মিথ্যা করে? শেষ তো এমনিতেই হয়ে গেছিল, তবুও আবিরের কেন ওই হিংস্র রূপটা দেখানোর প্রয়োজন ছিল এত নোংরা আর নগ্নভাবে? নিজেকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে ওদের সমস্ত মেমোরি আর মোমেন্টগুলাকেই শেষ পর্যন্ত ও মিথ্যা করে দিলো। সবকিছুকে মুহূর্তেই ও অস্তিত্বহীনতায় পরিণত করলো কত নির্বিকারভাবে!

শেষদিন বলার ওর কথাগুলা স্নেহার এখনো বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে না। এখনো ওর মনে হয়, আবির সব সত্য বলে নাই বরাবরের মতোই। রাগের বলছে, জেদে বলছে, ক্ষোভ বা আতঙ্ক থেকে বলছে। কিংবা ওর মোটিভই ছিল নিজেকে ডিফেন্ড করার মাধ্যমে সব শেষ করা। ও সেই চেষ্টাই করে গেছে। স্নেহা প্রথমে কাউন্টার দিলেও একটু পরই ওর মনে হয়- আবির যদি এভাবেই শেষ করতে চায়, এভাবে শেষ করেই ও শান্তি অথবা মুক্তি পায়, করুক। প্রশ্ন করতে গেলেই বিদায়টা আরো বেশি কদর্য হবে।

কোন আবির যে সত্য বলে; আর কোন আবির অর্ধ-সত্য, কোন আবিরই বা সত্য গুম অথবা আড়াল করে- ফয়েল পেপারের নিচে তাপ দিতে দিতে মাল্টিপল পারসোনালিটির আবিরের মিক্সড সব বিহেভিয়রের একটা দীর্ঘ ফ্ল্যাশব্যাক যেন স্নেহা দেখতে পেল চোখের সামনে- ফ্রম বার টু রিভার সাইড, ফ্রম লো টু হাই, ফ্রম রেড ফ্ল্যাগ টু বেড! ইটস প্রিটি হার্ড টু কাম টু এনি ক্লিয়ার কনক্লুশন ফ্রম হিজ দোজ মাল্টিপল অ্যান্ড মিক্সড বিহেভিয়র। ইম্যাজিন ড্রাগন্সের একটা গান আবিরের বেশ পছন্দের ছিল, হুট করেই ওই গানটা মনে পড়ে গেল ওর-

লুক মি ইন দ্য আইজ,
টেল মি হোয়াট ইউ সি
পারফেক্ট প্যারাডাইস, টিয়ারিং অ্যাট দ্য সিমস
আই উইশ আই কুড এসকেইপ ইট,
আই ডোন্ট ওয়ানা ফেইক ইট
উইশ আই কুড ইরেইজ ইট,
মেইক ইউর হার্ট বিলিভ
বাট আইম অ্যা ব্যাড লায়ার, ব্যাড লায়ার
নাউ ইউ নো, নাউ ইউ নো
আইম অ্যা ব্যাড লায়ার, ব্যাড লায়ার
নাউ ইউ নো, ইউ আর ফ্রি টু গো…

চেজিং দ্য ড্রাগন: মাঞ্জা সুতা

Comments

    Please login to post comment. Login