হঠাৎ শিশুকে বা কোনো যুবকের ঘাড়ে চুমু দেয়া, কাউকে আচমকা পেছন দিক দিয়ে জাপটে ধরা; আপাতত দৃশ্যগুলো অ্যাজ ইউজুয়াল মনে হলেও, আপনাকে প্রশ্ন করি -আপনি কি নিয়মিত এই কাজগুলো করেন?
বুঝেছি, আপনি উত্তর দিয়েছেন, এসব আপনি করেন না। করার কথা কখনো ভাবেননি। ইনফ্যাক্ট জামায়াতের আমির সাহেবের অ্যাকটিভিটিজ দেখার আগে আপনার ভাবনাতেও আসেনি যে, এমনটা আসলে প্রকাশ্যে কারো অসম্মতিতে করা যায় -তাও আবার অবলীলায় ও নির্বিকার চিত্তে!
নাক ঘষাঘষি, পেছন বা সামনা দিয়ে জাপটাজাপটি, চুমাচাট্টি সবই আপনি করবেন সেটি একান্ত নিভৃতে প্রিয় মানুষের সাথে। প্রিয় মানুষ না থাকলে সবর তথা ধৈর্য্য ধারণ করবেন যতদিন না মহান স্রষ্টা আপনার জন্য পৃথিবীর কোনো এক প্রান্ত থেকে একান্ত আপনজনের ব্যবস্থা করে দেন। এবং স্রষ্টা ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন -পুরাণের শিক্ষা এটাই।
গেইজম, পেডোফিলিয়া, পারভারশন -শব্দবন্ধ সম্বন্ধে সবারই কমবেশি জানা আছে। গুগল করলেও বিস্তারিত জানা যাবে। আমাদের প্রায় সবারই প্রবণতা থাকে এসবের ধারেকাছে যেন আমরা না যাই। ইনফ্যাক্ট আমাদের দৈনন্দিন আচরণে যেন এমন কিছু প্রকাশিত না হয় -যাতে ওই শব্দগুলো দিয়ে মানদণ্ড যাচাই হয়ে যায়। এটা আমাদের মতো দেশে ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সতর্কতার গভীরতর অংশ।
মন চাইলেই কি অন্যের গায়ে পড়া যায়?
এই প্রশ্নটা আমরা সাধারণত ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভেতরে করি। কিন্তু যখন এই প্রশ্ন জনপরিসরে, ক্ষমতার বলয়ে, কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির আচরণে এসে দাঁড়ায় -তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না; হয়ে ওঠে সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্ন।
সম্প্রতি সংসদের অপজিশন লিডার ডা. শফিকুর রহমানকে ঘিরে কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে। কোথাও তাকে শিশুদের কপালে চুমু দিতে দেখা যাচ্ছে, কোথাও তরুণদের ঘাড়ে, আবার ঈদের দিন দেখা গেল বিদেশি কূটনীতিকদের জাপটে ধরার দৃশ্য। আপাতত এসবকে নির্দোষ অ্যাটিচ্যুড মনে হলেও আসল ইস্যু হলো -সম্মতি (consent) এবং ব্যক্তিগত সীমানা (personal boundary)। আমাদের সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠরা ছোটদের স্নেহ করে -কপালে চুমু দেয়, মাথায় হাত রাখে -এসব অচেনা নয়। কিন্তু উত্তরাধুনিক সময়ে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছি: “স্নেহ” তখনই স্নেহ, যখন তা গ্রহণযোগ্য; “স্পর্শ” তখনই স্বাভাবিক, যখন তা সম্মতিপ্রসূত।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাদেরকে ব্যাড টাচ ও গুড টাচ সম্পর্কে ধারণা দেয়াটা আমাদের বড় কর্তব্য। কারণ তারা অনেক সময় ‘না’ বলতে শেখে না, বা বলতে পারে না। ফলে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যখন তাদের শরীরে ঘনিষ্ঠভাবে স্পর্শ করেন -সেটি অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভুল বার্তা তৈরি করতে পারে। একইভাবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও -আলিঙ্গন বা চুমু কোনো বাধ্যতামূলক কিংবা সুশোভন সামাজিক রীতি নয়। এটি সংস্কৃতি, ব্যক্তি ও পরিস্থিতি -সবকিছুর ওপর নির্ভর করে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে “পার্সোনাল স্পেস” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সেখানে হঠাৎ শারীরিক ঘনিষ্ঠতা অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই প্রশ্নটা ব্যক্তি নয়, নীতির। ক্ষমতা কারও শরীরের ওপর অবাধ প্রবেশাধিকার দেয় না? অযাচিত ও অহেতুক স্নেহ সম্মতির বিকল্প হতে পারে না।
আমরা যদি সত্যিই একটি সচেতন সমাজ চাই, তাহলে আমাদের শেখাতে হবে: “না” বলার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি “না” শোনার সংস্কৃতিও জরুরি। সুতরাং, যে-ই হোন -রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক কিংবা অভিভাবক -মানুষের শরীরের সান্নিধ্যে যাওয়ার আগে তার সম্মতিকে প্রাধান্য দিন। কারণ, মানুষের মর্যাদা শুরু হয় সেখান থেকেই।
হঠাৎকরে কারো গায়ে পড়া মানে স্নেহ না -বরং একধরনের dominance display হয়ে যায়। আপনি প্রভাবশালী এবং যা কিছু করবার ক্ষমতা রাখেন -সেটি একান্তই আপনার নিজস্ব ব্যাপার। অন্যের বেলায় সেটি দেখাতে যাওয়া মানে স্পষ্ট জুলুম, অসদাচার ও অস্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আপনি কোনো পরিস্থিতিতেই আপনার বাউন্ডারি ভায়োলেশন করতে পারবেন না। আর যদি তা করেন, সেক্ষেত্রে পারভারশন শব্দবন্ধ দিয়েই আপনার আচরণের মানদণ্ড নিরূপণ করা হবে। অভিভাবক হিসেবে সেটি আপনার জন্য যেমন ভালো নয়, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একেবারেই গুড লেসন হবে না। এবার অন্তত থামুন জনাব। আপনার ভেজা ঠোঁট গণের ওপর চাপিয়ে দেয়ার জিনিস না। আপনার অতর্কিত অস্বাভাবিক আলিঙ্গনও পাবলিকলি গ্রহণযোগ্য উষ্ণতা নয়। স্বাভাবিকতা রপ্ত করা সবার জন্যই ফরজ।
লেখক: সাংবাদিক
২২ মার্চ ২০২৬