Posts

গল্প

​অন্ধকার কুঠুরির আর্তনাদ: দ্বিতীয় পর্ব

March 22, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

29
View

সেই অশরীরী ফিসফিসানি শোনার পর আমার সারা শরীর পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে, আর কাঁচের টুকরোগুলোতে অদ্ভুত এক নীলচে আভা ঠিকরে বেরোচ্ছে। আমি যখন ভাবলাম এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না, ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটা ধাক্কা এল।

'ধাম! ধাম! ধাম!'

​পুরনো কাঠের দরজাটা যেন ভেঙে পড়বে। আমি বিছানা থেকে কোনোমতে নেমে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবলাম হয়তো মতি মিয়া এসেছে। কাঁপা গলায় ডাকলাম, "মতি মিয়া? আপনি কি বাইরে?"

​বাইরে থেকে কোনো উত্তর এল না। কিন্তু ধাক্কা দেওয়া বন্ধ হলো না। বরং এবার দরজার ওপাশ থেকে বিড়বিড় করে কিছু একটা পড়ার শব্দ এল। কোনো মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, এটা মোটেও তেমন নয়। মনে হচ্ছিল অনেকগুলো কণ্ঠস্বর একসাথে বিলাপ করছে।

​সেই হাড়হিম করা দৃশ্য

​হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, খাটের তলা থেকে সেই 'খসখস' শব্দটা আবার শুরু হয়েছে। এবার আর আমি বসে থাকলাম না, সাহস সঞ্চয় করে টর্চটা খাটের তলায় মারলাম। যা দেখলাম, তাতে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল।

​খাটের নিচে কোনো মানুষ নেই, কিন্তু ধুলোবালি মাখা মেঝেতে স্পষ্ট চারটে হাতের ছাপ এগিয়ে আসছে আমার দিকে! কেউ অদৃশ্য থেকে হামাগুড়ি দিয়ে আমার একদম পায়ের কাছে চলে এসেছে। আমি চিৎকার দিয়ে ছিটকে জানলার কাছে সরে গেলাম। জানলার পাল্লা খুলে বাইরে তাকালাম সাহায্যের আশায়।

​বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটায় বাগানের একটা বড় বটগাছের নিচে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাদা কাপড় পরা একটা নারীমূর্তি। মাথাটা অদ্ভুতভাবে একপাশে কাত করা। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় দেখলাম, তার কোনো মুখ নেই! শুধু একটা সমতল চামড়ার আস্তরণ। সে একদৃষ্টিতে আমার জানলার দিকে তাকিয়ে আছে।

​আলমারির রহস্য

​ঠিক সেই সময় ঘরের কোণায় রাখা বিশাল পুরনো আলমারিটার পাল্লা নিজ থেকেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। আলমারির ভেতর থেকে একটা পচা মাংসের উৎকট গন্ধ বেরোতে লাগল। আমি নাকে রুমাল দিয়ে এগোলাম। টর্চের আলো ফেলতেই দেখলাম, আলমারির ভেতরে সারি সারি পুরনো কাপড় ঝোলানো। কিন্তু সেই কাপড়ের ফাঁক দিয়ে একটা ছোট হাত বেরিয়ে এল। নীলচে রঙের সেই হাতটা যেন আমাকে ভেতরে ডাকছে।

​আমি পিছিয়ে আসতেই অনুভব করলাম আমার পিঠে কেউ স্পর্শ করল। একটা বরফ শীতল হাত আমার ঘাড়ের ওপর রাখা হয়েছে। কানের কাছে সেই পুরনো কণ্ঠস্বর আবার আর্তনাদ করে উঠল:

"ওকে যেতে দিস না... ও আমাদের সবার কথা জেনে ফেলেছে!"


 

​আমি পেছনে ফেরার সাহস পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যদি এখন পেছনে ঘুরি, তবে এমন কিছু দেখব যা দেখার পর মানুষ পাগল হয়ে যায়। ঠিক তখনই ঘরের আলোটা একবার জ্বলে উঠেই দপ করে নিভে গেল। ঘোর অন্ধকারে আমি অনুভব করলাম, ঘরের সেই অদৃশ্য সত্তাটি আমার একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার দীর্ঘশ্বাসের গরম বাতাস আমি আমার গালে অনুভব করতে পারছি।

​মতি মিয়ার রহস্যময় আচরণ

​হঠাৎ করেই সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। ধাক্কাধাক্কি, শব্দ— সব বন্ধ। আমি অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজার কাছে গিয়ে ছিটকিনি খুললাম। করিডোরে গিয়ে দেখি মতি মিয়া লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে এক বিদ্ঘুটে হাসি।

​সে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আপনি এখনো জেগে? আমি তো আপনাকে বলেছিলাম আয়নার দিকে না তাকাতে। এখন তো ওরা আপনার পিছু ছাড়বে না।"

​আমি রাগে আর ভয়ে চিৎকার করে বললাম, "কারা মতি মিয়া? কী হচ্ছে এই বাড়িতে?"

​মতি মিয়া কোনো কথা না বলে লণ্ঠনটা উঁচিয়ে ধরল। লণ্ঠনের আলোয় তার ছায়া যখন দেয়ালে পড়ল, আমি আঁতকে উঠলাম। দেয়ালে মতি মিয়ার একটা নয়, তিন-তিনটে ছায়া কাঁপছে! অথচ মানুষ সে একা!

Comments