ঈদের রাতে বোমাবাজি
সানজিদা ভালো বোমাবাজি করতে পারে।সে দেখতে ভারি কিন্তু চলায় হারি,মানে দ্রুত। বোমা মেরে সে ঝড়ের বেগে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারে।
ঈদের দিন। কোনকোন বাড়িতে তারা বোমা মারবে তা আগেই ঠিক করা আছে।
" বৌমা, যাবা না?" শাশুড়ীর তাগিদা পেয়ে সানজিদার ঠোঁটের কোনটায় একচিলতে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো।সে আর্দ্র কণ্ঠে জবাব দিলো,
"পুতুল তো ঘুমাচ্ছে মা।"
পুতুলের বয়স ছয় মাস।সে সানিজিদার সদস্যজাত মেয়ে।এই কোলের শিশু রেখে, এই অন্ধকার রাতে সে এখন যাবে বোমাবাজি করতে।শাশুড়ী তাকে উৎসাহ দিচ্ছে। অবশ্য শাশুড়ীর পুলকই বেশি।আজ তার কোমর ব্যথাটা বেড়েছে। নাহলে সেও যেতো।
পুতুল ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে দাদীর কোলে রেখে সানজিদা পালঙ্ক থেকে নামলো।
ডাইনিংএ আসতেই সাজিদ জিজ্ঞেস করলো," মা,তোতায় দাততো? "
" এই, তোর অতো শুনতে হবে না। তুই খেল।"সানজিদার কণ্ঠে আর্দ্র ঝাঁঝ।
"আইততা।"
সাজিদ সানজিদার বড় ছেলে।তার বয়স ৫ বছর।সে ঐভাবেই কথা বলে।
উঠানের ঐপাশে মিলি আর সুমনা রান্না ঘরের বারান্দায় ওত পেতে আছে কখন সানজিদা বের হবে।
মিলি লম্বা ছিপছিপে। সেও দৌড়াতে ওস্তাদ। যশোর এমএম কলেজের বাংলায় অনার্স পড়ে।সুমনা তার চাচাতো বোন।সে ইন্টারমিডিয়েট ফাস্ট ইয়ার।তারা দুজন কুটকুট করে কথা বলতে বলতে অধৈর্যভাবে সানজিদার জন্য অপেক্ষা করছে।
উঠানের ঐ পাশে একটা 'খুট' শব্দ। এপাশে রান্নাঘরের বারান্দায় অপেক্ষারত দুইজনের মুখে প্রশান্তির হাসি।
গ্রীল খুলে সানজিদা বের হয়েছে।
মিলি আর সুমনা মুখ চাওয়াচায়ি করলো।তাদের মুখে আসন্ন অভিযানের পুলক ঝিলিক মেরে উঠলো।অন্ধকারের ভিতরও কেউ কাউকে বুঝতে - সামান্যতম অসুবিধা হলো না।
ঘরের আলো উঠানেও আসছে। সেই আলোয় তারা দেখলো,সানজিদা হেলেদুলে এগিয়ে আসছে। তার পরনে মেক্সি।শাড়ি পরে দৌড়ানো যায় না।স্যালোয়ার কামিজ পরলে ভালো দৌড়ানো যায়।কিন্তু সে বৌ মানুষ, দুই সন্তানের মা।তার স্যালোয়ার কামিজের অনুমতি নেই। না হলে পরতো।বাপের বাড়ি সে স্যালোয়ার কামিজ পরে কত সাইকেল চালিয়েছে, গাছে উঠেছে।
মিলি আর সুমনা স্যালোয়ার কামিজ পরেছে।
মিলি বললো," আজ তুই আগুন ধরাবি।এই নে গ্যাস লাইট।"
সুমনা," না আপু।আমার ভয় করে।"
" তাহলে যাস কেন?"
" মজা লাগে।"
"চল।"
তারা বেরিয়ে পড়লো।
সানজিদা আগে আগে, মিলি আর সুমনা পিছেপিছে।সানজিদা এদের সবার সিনিয়র, মোটাসোটা। কিন্তু এরা ওর সাথে হেটে বা দৌড়ে পারে না।
অন্ধকার রাত।ওদের কাছে মোবাইল আছে। আলো জ্বালছে না।এটা গুপ্ত অভিযান।গোরস্তানের কাছে পৌঁছাতেই রোগা রবি কাকুর সাথে দেখা।
রবি কাকু রাগি গলায় জিজ্ঞেস করলো," বউ মা,কী গো রাতের বেলা কোথায় যাচ্ছো?"
" ও কাকু, ঐযে ছাগলের বাচ্চা হারিয়ে গেছে।"
" ছাগলের বাচ্চা দেখেছেন কাকু?" মিলি সানজিদাকে সাপোর্ট দিলো।
কাকু পান খাওয়া আড়ষ্ট ভারি জিভ তালুর সাথে ঘষে বললো," নারে মা।দেখিনি।যা খোঁজ খোঁজ। "
কাকু চলে গেলো। ওরা তিনজন একসাথে হাল্কা শব্দে আচ্ছা হাসি হেসে নিলো।তারপর এগিয়ে গেলো বুনোর বাড়ির দিকে।
বুনো সাংঘাতিক মানুষ। তার মেজাজ খুব কড়া।সবার সাথে গ্যাঞ্জাম মারামারি করে বেড়ায়।বউ পেটানোর ওস্তাদ।
ওরা জানলার ফাঁক দিয়ে দেখলো,
বুনো ভাত খাচ্ছে। বউ রাবেয়া বেড়ে বেড়ে দিচ্ছে। বেটার বউ টিভিতে অনুষ্ঠান দেখছে।আজ ঈদ টিভিতে অনুষ্ঠানের অভাব নেই।
" গোশে লবণ হয়েছে? " বুনো রাবেয়ার উপর খেকিয়ে উঠলো।রাবেয়া ম্যাও ম্যাও করে বললো, " হয়নি?"
" আর কিছু রেঁধেছিস? "
" না।"
"দাঁড়া। এই লাঠিটা কই রে?"
দুম!
একেবার বুনোর ঘাড়ের পরে,বিকট শব্দে বোমা বার্স্ট হলো।বুনো ভয়ে একলাফে খাট থেকে পড়ে মেঝেয় গড়াগড়ি। ঢুকে পড়লো খাটের নিচে।বউমার হাত থেকে রিমোটটা পড়ে গিয়েছিলো, সেটা তুলতে যেয়ে খাটের তলে তার নজর গেলো।তার শ্বশুর ন্যাংটা।
" ও মা।শীগগির আসেন।"
রাবেয়া এসে দেখলো বুনো ন্যাংটা হয়ে ভয়ে খাটের নিচে কুকুরের মতো দলা হয়ে আছে। রাবেয়া আলনা থেকে লুঙ্গি এনে খাটের নিচি দিলো।লুঙ্গীটুঙ্গি পরে, খাটের নিচ থেকে বের হয়ে হুঙ্কার ছাড়লো,
" কোন শুমন্দি রে,আমার বাড়িতে বোম মারে?"
বউমা হেসে বললো," আব্বা বোম না।বাজি।চকলেট বাজি।বোমের মতো আওয়াজ হয়।"
এইবার বুনো বাঘের সাহস পেলো।ঘরে দরজায় লাগানে কাঠের হুক নিয়ে ছুটলো।
' কোন শালারে?"
ততক্ষণে মিলি বুনোর চাচাতো ভাই হারেজের খড়ির গাদায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে। সুমনা ঝেড়ে দৌড়। সানজিদা পালায়নি।সে ডাকছে," আয়,আয়।"
বুনো হুক নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে দেখলো তার প্রতিবেশি রাব্বির বউ সানজিদা। রাব্বি সম্পর্কে তার ভাইপো।
একটু ধাতস্থ হয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো," বউ মা তুমি? "
" হ্যা,চাচা আমার ছাগলের বাচ্চা হারিয়ে গেছে। আয়,আয়। দেখেছেন?"
" না।বাজি মারলো কে?দেখেছো? একেবারে ঘাড়ের পরে।মনেহয় হারুনির জা-রো।ওর ছোটো ছেলে আছে না।বিরাট জা-রো।ওরই কাজ।সকাল হোক তারপর দেখাচ্ছি মজা।আমার তো চেনে না। তুমি কারো দেখেছো বউ মা।"
" না চাচা।কে যেনো লেবু৷ বাগানের দিকে দৌড় দিলো।"
"কে আবার হারুনির জা-রো ছাড়া আর কে? তা তুমি একা-একা রাতের বেলা ছাগলের বাচ্চা খুঁজে বেড়াচ্ছো।রাব্বি বাড়ি নেই? "
" না। বাজারে গেছে। "
" সাথে লাইটও তো নেই। "
"আছে। এই যে মোবাইল। "
সানজিদা মোবাইল দেখালো।
" তা ঘরে এসো।ঈদের দিন।একটু ছেমায় খেয়ে যাও।"
" না চাচা।আমি আগে বাচ্চাটা খুঁজি। শেয়ালে ধরলো কি-না। "
" আচ্ছা যাও।খোঁজো খোঁজো। কিছু না হোক এক পিস গোশ খেয়ে যাও।"
" না চাচা,ঠিক আছে।"
" আচ্ছা যাও, সাবধানে যাও।"
বুনো ঘরে ঢুকে গেলো।মিলি খড়ির গাদা থেকে বেরিয়ে এলো।
মিলি ফিসফিস করে বললো," বুনো বুঝতে পারেনি কউ?"
সানজিদা মৃদু হেসে বললো, " না।ও মনে করেছে হারুনির ছেলে।যে ঐযে মদগাজা খায়।বাজে ছেলেপিলের সাথে আড্ডা মারে।"
" সুমনা কই?"
" মনেহয় বাড়ি দৌড় দিয়েছে। "
ঈদের দিন।বাড়ি উঠান ভর্তি লোক।ছেলেপিলে সাউন্ড বক্সে হিন্দি গান বাজিয়ে আনন্দ করে নাচ্ছে।বড়রা চারিদিকে গোল হয়ে সেই নাচ দেখছে।একপাশে প্লাস্টিকের চেয়ারে নিষ্পাপ শিশুর মতো চুপচাপ সুমনা বসে আছে।কে বলবে একটু আগে সে ভয়ংকর বুনোর ঘাড়ের পরে বাজি মেরে এসেছে?
একটু পর আরও দুজন নিষ্পাপ লোক উঠানে ঢুকলো - সানজিদা আর মিলি।কেউ কিছু জানলো না।তাদের দেখে সুমনা উঠে দাঁড়ালো।
তারা তিনজন গোপনে মিলিত হলো গোয়াল ঘরের পেছনে। সানজিদা সুমনাকে প্রশ্ন করলো, " কিরে দৌড় দিলি কেন?"
"ভয়ে।"
মিলি হেসে বললো," ধুর হারামজাদা। আমরা মেয়েমানুষ না?কেউ আমাদের সন্দেহ করে না। "
সানজিদা, " আর যাবি?"
মিলি," কোথায়?"
সানজিদা, " এইবার যাবো ঘেনা মালেকের বাড়ি।শুনলাম, মালেকের তিন জামাই এসেছে। না-কি এক সপ্তাহ থাকবে।"
সুমনা মজা এবং রাগ একসাথে মিশিয়ে বললো," থাকাচ্ছি এক সপ্তা।"
সানজিদা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো," তুই একটা ভিতু,দৌড় দিস।তুই আবার যাবি?"
" যাবো।"
মিলি বললো, " তিন জামাই, তিন বাজি।"
সানজিদা, 'মানে?"
"মানে তিনটা একসাথে বেঁধে, মুখ এক জায়গায় করে আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে দেবো তিন জামাই এর ঘাড়ের পরে।দেখবি ভয়ে পরের দিনই বাপবাপ করে বাড়ি চলে যাবে।মালেক একেতো গরীব মানুষ। আর ওরা নাকি এক সপ্তা থাকবে।"
সুমনা উৎসাহের সাথে বললো," থাকাচ্ছি।"
বেরিয়ে পড়লো ওরা তিনজন। সুমনার পাজামার পকেটে চকলেট বাজি।মিলির কোমরে লাইটার। সানজিদার মাথায় বুদ্ধি আর সাহস।
ঈদের রাতে ওরা সাত বাড়ি অভিযান চালালো।দোষ হলো সব হারুনের ছোটো ছেলের।
পরের দিন হারুনের ছোট ছেলে লোকের হাতে বেদম মাইর খেলো।সেই থেকে সে ভালো।নেশা এবং সংগ দুটোই সে ছেড়ে দিয়েছে।
ঈদের রাতে বোমাবাজি
হুমায়ূন কবীর, মাসয
২২/৩/২৬