Posts

ফিকশন

কুয়াশায় ঢাকা প্রহর

March 22, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

19
View

শহরের সবচেয়ে পুরোনো আর ঘিঞ্জি গলিটার শেষ মাথায় ছিল ‘রহমান অ্যান্টিকস’। বৃষ্টির বিকেলে দোকানটায় একটা স্যাঁতস্যাঁতে, পুরোনো কাগজের গন্ধ ম ম করে। অয়ন পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স লেখক এবং পুরোনো জিনিসের সংগ্রাহক। সেদিন বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতেই সে এই দোকানে ঢুকেছিল।

​দোকানের এক কোণে, ধুলোর আস্তরণে ঢাকা একটা কাঠের বাক্স তার নজর কাড়ে। বাক্সটার গায়ে অদ্ভুত কিছু কারুকাজ, আর তাতে মরচে ধরা একটা ছোট পিতলের তালা ঝুলছে। রহমান সাহেবকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে বাক্সটা কিনে নেয় অয়ন।

​রাতে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে তালাটা ভাঙতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে দুটো জিনিস—একটা ভারী, রূপালী পকেট ঘড়ি এবং একটা হলদেটে হয়ে যাওয়া খাম। ঘড়িটার কাঁটা ১১টা ৩২ মিনিটে গিয়ে চিরতরে থেমে আছে। আর খামের ভেতরের চিঠিটার লেখাগুলো অনেকটাই মুছে গেছে। শুধু কয়েকটা লাইন পড়া যাচ্ছিল:

"নন্দিনী, আজ রাতে জলপাহাড়ের পুরোনো গির্জার পেছনে আমার জন্য অপেক্ষা কোরো। আমি আসবো। ঘড়ির কাঁটা ১১টা ৩২ ছোঁয়ার আগেই আমি তোমার কাছে পৌঁছাবো। ওটা আমি পেয়েছি। আমাদের আর কোনো বাধা নেই। — রুদ্র"

​চিঠির নিচে তারিখ দেওয়া— ১২ আগস্ট, ১৯৬৪ সাল।

​অয়নের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। ১৯৬৪ সালের একটা চিঠি, একটা থেমে থাকা ঘড়ি, আর একটা অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতি। কে এই রুদ্র? নন্দিনী কি সেদিন অপেক্ষা করেছিল? অয়ন সিদ্ধান্ত নেয়, জলপাহাড়ের এই রহস্য সে ভেদ করবেই।

​জলপাহাড় জায়গাটা মানচিত্রের একদম কোণায়, পাহাড়ি আর জঙ্গলে ঘেরা একটা ছোট গ্রাম। শহরে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও, জলপাহাড় যেন এখনো ষাটের দশকেই আটকে আছে।

​গ্রামের একমাত্র চায়ের দোকানে বসে অয়ন খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করে। রুদ্র বা নন্দিনী নাম দুটো শুনে গ্রামের বয়স্ক লোকগুলোর চোখেমুখে একটা ভয়ের ছায়া নেমে আসে। কেউ মুখ খুলতে চায় না।

​অবশেষে চা-দোকানি করিম চাচা গলা নামিয়ে বলেন, "বাবা, শহরের ছেলে তুমি, ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী লাভ? রুদ্র বাবু তো সেই কবেই উধাও হয়ে গেছেন। আর নন্দিনী... ওই তো, গ্রামের শেষ মাথায় পুবের বিলের ধারের ভাঙা বাড়িটায় এখনো একা থাকে। সবাই বলে মহিলা পাগল হয়ে গেছে। গত ষাট বছর ধরে সে নাকি রোজ রাতে গির্জার পেছনে গিয়ে কার জন্য অপেক্ষা করে।"

​অয়নের শরীরে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়। ষাট বছর! একটা মানুষ ষাট বছর ধরে একটা মিথ্যে আশার জন্য অপেক্ষা করছে? নাকি রুদ্র সত্যি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছিল?

​সন্ধ্যার পর জলপাহাড়ের রূপ বদলে যায়। ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ, আর পাইন বনের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে গেলে মনে হয় কেউ যেন ফিসফিস করে কথা বলছে।

​অয়ন সিদ্ধান্ত নেয় সে পুরোনো গির্জাটায় যাবে। গির্জাটা অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত। এর পেছনের জঙ্গলটা বেশ ঘন। টর্চের আলো ফেলে সাবধানে এগোতে থাকে সে। হঠাৎ তার চোখে পড়ে একটা ছায়া। একটা বৃদ্ধা মানুষ, গায়ে একটা পুরোনো চাদর জড়ানো, গির্জার পেছনের একটা ভাঙা সমাধির পাশে পাথরের মতো বসে আছেন।

​"নন্দিনী দেবী?" অয়ন সন্তর্পণে ডাক দেয়।

​বৃদ্ধা চমকে ওঠেন না। খুব শান্ত গলায় বলেন, "সময় হয়ে গেছে? ও কি এসেছে?"

​অয়ন কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বৃদ্ধার চোখের দৃষ্টি শূন্য, কিন্তু সেখানে একটা গভীর হাহাকার লুকিয়ে আছে। অয়ন পকেট থেকে সেই রূপালী ঘড়িটা বের করে। ঘড়িটা দেখামাত্রই বৃদ্ধার সারা শরীর কেঁপে ওঠে। দুই হাতে ঘড়িটা আঁকড়ে ধরে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

​"কোথায় পেলে এটা? রুদ্র কোথায়? সে আমাকে বলেছিল আসবে... সে বলেছিল ১১টা ৩২ মিনিটে সে আসবে!"

​অয়ন তাকে শান্ত করে সব খুলে বলে। নন্দিনী দেবী তখন জানান আসল ঘটনা। রুদ্র ছিল গ্রামের জমিদার পরিবারের ছেলে, আর নন্দিনী সাধারণ এক কৃষকের মেয়ে। তাদের সম্পর্ক কেউ মেনে নেয়নি। রুদ্রর কাছে একটা পারিবারিক গুপ্তধনের নকশা ছিল, যা বিক্রি করে তারা দূরে কোথাও চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাতে রুদ্র আর আসেনি। সবাই ধরে নিয়েছিল, রুদ্র শহরের কোনো বড়লোকের মেয়ের সাথে পালিয়েছে। কিন্তু নন্দিনী বিশ্বাস করেনি।

​অয়নের মনে খটকা লাগে। চিঠি আর ঘড়িটা তো একটা অ্যান্টিক দোকানে পাওয়া গেছে। তাহলে রুদ্র গেল কোথায়? সে ঘড়িটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। হঠাৎ তার নজরে আসে, ঘড়ির পেছনের ঢাকনাটায় একটা সূক্ষ্ম খাঁজ আছে।

​একটা পিন দিয়ে চাপ দিতেই ঢাকনাটা খুলে যায়। ভেতরে ভাঁজ করা ছোট্ট একটা কাগজের টুকরো। তাতে হাতে আঁকা একটা ম্যাপ। ম্যাপটা এই গির্জার পেছনের জঙ্গলেরই, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট পুরোনো কুয়োর দিকে নির্দেশ করা।

​রাতের আঁধারেই অয়ন আর কয়েকজন গ্রামবাসী মিলে সেই কুয়োর সন্ধানে নামে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, ঝোপঝাড়ে ঢাকা একটা শুকনো কুয়োর সন্ধান মেলে। দড়ি বেঁধে কুয়োর নিচে নামানো হয় একজনকে।

​কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে একটা ভারী কাঠের বাক্স দড়িতে বেঁধে ওপরে পাঠানো হয়। বাক্সটা খোলার পর সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

​ভেতরে গুপ্তধন নেই। আছে একটা মানুষের কঙ্কাল। আর তার বুকে আঁকড়ে ধরা একটা ছোট পাথরের খোদাই করা মূর্তি—যেটা রুদ্রর সেই পারিবারিক গুপ্তধন। কঙ্কালের এক পায়ে একটা ভারী শিকল পরানো, যার অন্য প্রান্তটা বাক্সটার সাথে আটকানো।

​রহস্যের জট খুলতে সময় লাগে না। জমিদার বাড়ির পুরোনো এক বিশ্বস্ত কাজের লোক, যে এখনো বেঁচে আছে, পুলিশের কাছে স্বীকার করে সব। রুদ্র যাতে নন্দিনীকে নিয়ে পালাতে না পারে, সেজন্য রুদ্ররই বড় ভাই তাকে ওই কুয়োর ভেতর আটকে রেখেছিল। ভেবেছিল কয়েকদিন পর বের করে আনবে। কিন্তু সে রাতেই প্রবল বৃষ্টিতে কুয়োর পাড় ধসে যায়। আর কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি রুদ্রর কী হয়েছিল। ঘড়ি আর চিঠিটা রুদ্রর পকেট থেকে তার ভাই-ই বের করে নিয়েছিল, যা পরে হাতবদল হতে হতে শহরে পৌঁছায়।

​নন্দিনী দেবী কঙ্কালটার পাশে এসে বসেন। তার চোখে এখন আর জল নেই। ষাট বছরের একটা দীর্ঘশ্বাসের অবসান হয়েছে আজ। তিনি আলতো করে কঙ্কালের হাতটা ধরেন।

​"আমি জানতাম রুদ্র, আমি জানতাম তুমি আমাকে ধোঁকা দাওনি।"

​পরদিন সকালে জলপাহাড়ের কুয়াশা যেন একটু বেশিই স্নিগ্ধ মনে হচ্ছিল অয়নের কাছে। নন্দিনী দেবীর মুখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি অয়নকে ডেকে বললেন, "বাবা, তুমি শুধু একটা ঘড়ি বা চিঠি নিয়ে আসোনি। তুমি আমার রুদ্রকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছো। আমার ষাট বছরের কলঙ্ক তুমি মুছে দিয়েছো।"

​অয়ন যখন জলপাহাড় ছেড়ে শহরের দিকে রওনা দিচ্ছে, তখন তার মনে হলো, ফিকশন বা কল্পকাহিনী হয়তো বইয়ের পাতাতেই থাকে, কিন্তু বাস্তবের গল্পগুলো কখনো কখনো কল্পনার চেয়েও বেশি রহস্যময় আর হৃদয়বিদারক হয়। কিছু ভালোবাসা সময়ের কাঁটায় আটকে থাকে, শুধু সঠিক মানুষটির জন্য, যে এসে সেই থেমে থাকা ঘড়িতে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেবে।

Comments

    Please login to post comment. Login