পাকা লিচুর পাহারায় ১৫/০৫/১৯
হুমায়ূন কবীর
বুড়িভৈরব নদীর পূর্বপাড়ে, দক্ষিণ মাঠের শেষ প্রান্তে, শ্মশান থেকে ৭০ ফুট দূরে, জংগলের ভিতর আমাদের লিচু বাগান। গাছে ঝুলছে থৈল থৈল পাঁকা লিচু।পাঁকা টসটসে মিষ্টি লিচুর স্বাদ নিতে রাত-দিন ছুটে আসছে পার্থিব -অপার্থিব, দৃশ্য- অদৃশ্য শতরকম শত শত্রু। শত্রুর হাত থেকে বাঁচাতে রাত-দিন পড়ে আছি পাহারায়।
আর মাত্র দুটো দিন ঠেকিয়ে রাখতে পারলে ঢাকার ব্যাপারী আসবে।ভালো দাম পাওয়া যাবে।গতবার যথেষ্ট ট্রিটমেন্ট করেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি - লাভ দূরে থাক খরচের টাকায় ওঠেনি। সার-কীটনাশকের দোকানে এইবারও অনেক টাকা বাকি হয়ে গেছে।
লিচু এলাকায় বিক্রি করলে দাম কম আর টাকাও বাকি রাখে।
এইবার পর্যাপ্ত পরিমাণ লিচু ধরেছে।লিচুগুলো যেমন বড় হয়েছে তেমন লাল টকটকে সুন্দর রঙও হয়েছে।সঠিক ভাবে পাকার কারণে আটি ছোট চিকন হয়েছে,খোসা একেবার পাতলা, রসে পরিপূর্ণ পুরু স্বাস।এত সুস্বাদু লিচু সব বছর হয় না। আল্লাহর রহমতে এইবার হয়েছে।শত্রুর সংখ্যাও বেড়ে গেছে। গাছগুলো ফলের ভারে সাংঘাতিক নত হয়ে আছে।একটা ঝড় হলে সব ভেঙেচুরে তছনছ হবে। সারাক্ষণ মাথায় টেনশন আর আতঙ্ক।
এখন বাগানের দক্ষিণ আইলের উপর, লেবুগাছের পশ্চিম পাশে, মেহগনি গাছটার নিচে, গর্তটার ভিতর থেকে একটা সাপ মাথা উচু করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।সাপ লিচু খায়?লিচু চিবানোর জন্যে প্রয়োজনীয় দাঁত কি ওর আছে?থাকতেও পারে, না হলে বারবার গাছের দিকে তাকাবে কেন?
সাপটার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছি না।সে দুই একটা লিচু খেতে চায় খাক।খেয়ে ভালোই ভালোই কেটেপড়ুক।চোখ ফেরালে চুপিচুপি এসে কামড়ে না দেয়। মুখে শব্দ করে তাড়াবার চেষ্টা করছি,হাততালি দিচ্ছি, বাঁশের ফটকায় শব্দ করছি এখন সে ভয়ও পাচ্ছে না, নড়ছেও না, যাচ্ছেও না।আসলে এ জঙ্গলে তো সারাবছর ওদেরই রাজত্ব থাকে।হঠাৎ করে এসে আমিই কয়েকদিনের জন্য জুড়ে বসে আছি।তাই হয়তো সে আমার নানান শব্দে বিরক্ত হচ্ছে,রেগে যাচ্ছে শেষে কোনোকিছু তোয়াক্কা না করে চুপচাপ মাথা উঁচুকরে স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বসে আছি আমার মোবাইল মঞ্চের উপর।প্রচণ্ড রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বাগানের উত্তর আইলের পাশের মোটা গাছের ছায়াই মঞ্চটা সরিয়ে এনেছি।সামনের গাছটাতে থোকা থোকা পাঁকা লিচু ঝুলছে।একটা দোয়েল পাখি ঐ গাছের ডালে বসে লেজ উঁচু করে আমার চোখের সামনে পুট পুট করে পায়খানা করছে।এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন পায়খানাটা করেই চলে যাবে।আসলে তা না।তার অন্য উদ্দেশ্য আছে।ঐ দেখো সে লিচু ঠোকাতে শুরু করে দিয়েছে।
দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি।তাকে আমরা সম্মানের আসনে বসিয়েছি।তার একটা মর্যাদা আছে।সে কথা সে জানে না। তার না জানা সম্মান রক্ষা করতে গেলে আমার এখানে বসেথাকা বৃথা।সে এখন একের পর এক লিচু ঠুকরে ঠুকরে নষ্ট করছে।ঠোকরানো ফুটো লিচু বাজারে বিক্রি করা যাবে না, নিজেরাও খাওয়া যাবে না। ওগুলো নষ্ট হিসেবে ফেলে দিতে হবে।জাতীয় পাখিকে এভাবে লিচু নষ্ট করতে দেয়া যায় না। তবু আমি তার সম্মানের প্রতি খেয়াল রেখে গলাটা নরম করে মিষ্টিস্বরে মোলায়েম করে সম্মানের সাথে বললাম,"জাতীয় পাখি দোয়েল, তুমি এভাবে লিচু নষ্ট করো না। তুমি যাও।"সে গেলো না। আমি তাকে বললাম,"গাছের নিচে ভালো ভালো ঝরা লিচু আছে তুমি সেখান থেকে খাও।"
সে আমার কথা শুনলো না।শেষে আমি তাকে তাড়া দিলাম,"যাও পাখি।"তাতেও কাজ হলো না।সে তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে,সমানে লিচু ঠোকাচ্ছে।হাতে তালি দিয়ে তাড়ানোর চেষ্টা করলাম।সে গেলো না। মুখে জোরে আওয়াজ করে তাড়া দিলাম সে একডাল থেকে উড়ে আরেক ডালে যেয়ে বসলো।শেষে না পেরে বাঁশের ফটকায় প্রচণ্ড কর্কশ আওয়াজ করলাম।এইবার সে উড়ে পালালো।
ওমা একটু পরে দেখি সে আবার ফিরে এসেছে।লিচু গাছের নিচে তিড়িংবিড়িং করে লাফাচ্ছে।ভাবখানা এমন যে, দেখো আমি তোমার লিচু খেতে আসিনি একটু নাচতে এসেছি।আমি মনেমনে বললাম, "নাচো।"
আসলে নাচানাচি তার ছলনা।আবার সে গাছে উঠে লিচু ঠোকাতে শুরু করলো।আমি এবার আর তার জাতীয় পাখির মর্যাদা রক্ষার জন্য বিভিন্ন পর্যায় রক্ষা করতে পারলাম না।একেবার বাঁশের ফটকায় কানফাটা আওয়াজ করলাম।ভয় পেয়ে সে পালিয়ে গেলো।একটু পর সে আবার এলো। আবার শব্দ করলাম আবার পালিয়ে গেলো।এইভাবে সে ক্রমাগত পালিয়ে যাচ্ছে আবার আসছে। সে জাতীয় পাখি হলে কী হবে লোভের জন্য সে তার প্রদেয় সম্মান ধরে রাখতে পারছে না। তাড়া খেয়ে চলে যাচ্ছে আবার ছ্যাঁচড়ার মতো ফিরে ফিরে আসছে।পাঁকা লিচুর টসটসে রসের লোভ তাকে জাতীয় পাখির আসন থেকে নামিয়ে ছ্যাঁচড়া চোর পাখিতে পরিণত করেছে।
হলুদ বেনেবৌ পাখি তার অপরূপ রূপ সহ লিচু খেতে এসেছিলো। তাড়া খেয়ে ফিরে গেছে। এখন সে অদূরে একটা উঁচু শিমুলগাছের ডালে সুরেলা চিৎকারে দশদিক মাতিয়ে তুলছে। সে আর্তনাদের মতো বিরহের চিৎকার করছে,"পিউকাঁহা,পিউকাঁহা?"
কার কাছে সে অনাবরত তার প্রিয়ার কথা জানতে চেয়ে হয়রান হচ্ছে কে জানে। আসলে সে তার প্রিয়ার কথা জানতে চাচ্ছে না কি লিচু কোথায়, লিচু কোথায় বলে চিৎকার করছে? তবে তার সেই চিৎকার মায়াবী এবং সুরেলা। হয়তো মিষ্টি লিচুর রস খেয়েই তার কণ্ঠ ঐরকম সুরেলা মায়া মাখা হয়েছে। তারই বিরহেই হয়তো এখন সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমি সরে গেলে ইচ্ছেমতো লিচুর রস খেয়ে তবেই হয়তো সে তার "পিউকাঁহা, পিউকাঁহা" ডাক থামাবে।
হঠাৎ খেয়াল করে দেখি সাপটা আর দেখা যাচ্ছে না। যাক আপদ বিদায় হয়েছে। মনের ভিতরে ভালো লাগছে। তারপর আবার হঠাৎ শিরদাঁড়া সোজা হয়ে গেলো। অজানা আতঙ্ক আমাকে গ্রাস করছে। হায়! সাপটা গেলো কোথায়?সে কি গর্তে ঢুকে গেছে? না-কি চুপিচুপি আমারই মঞ্চের নিচে এসে হাজির হয়েছে? পা ঝোলানোর সাথেসাথে হয়তো সে কষে ছোবল মেরে দিলো। নাকি মাথার উপর গাছে কোথাও উঠে বসে আছে? কখন হয়তো ঝুপ করে বুকের উপর পড়বে।
দুটো শালিক সমানে লিচু ঠোকাচ্ছে। বাঁশের ফটকায় বারবার প্রচন্ড শব্দ করছি তারা যাচ্ছে না। এই শব্দে তারা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। চিৎকার করছি, হাততালি দিচ্ছি কাজ হচ্ছে না। মঞ্চের নিচে শুকনো লিচুর পাতা খচমচ করে উঠলো। সাপ নাকি? না।শুকনা লিচু শুকনা পাতার উপর ঝরে পড়েছে এ তারই শব্দ। কখনো কখনো পাখিতে খেতেখেতে লিচু বা লিচুর আঁটি খসে পড়ছে। শুকনা পাতার উপর তারই শব্দ। এখন আমার মনে সাপের আতঙ্ক ঢুকে গেছে তাই লিচু পড়ার শব্দকে সাপের নড়াচড়ার শব্দ বলে মনে হচ্ছে।
বেলা যতো বাড়ছে সূর্যের তীব্রতা ততো বাড়ছে। আকাশ থেকে মনে হচ্ছে আগুন ঝরছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে তাপ এসে সরাসরি মাথায় আঘাত হানছে। তাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য মাঝে মাঝেই আমার মোবাইল মঞ্চটা সরিয়ে সরিয়ে নিচ্ছি। আমার মোবাইল মঞ্চটা আসলে একটা ভ্যান। ভ্যানের উপর সুন্দর একটা পাটি, একটা বালিশ আর সামান্য কিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র। একটা চমৎকার ডিজিটাল মোবাইল মঞ্চ। বাঁশ-খুটি দিয়ে অথবা গাছের ডালে মাচা করলে রোদে পুড়ে গেলেও সরানো যায় না। অথচ এই তিনচাকার ভ্যানের উপর স্থাপিত মোবাইল মঞ্চ ইচ্ছে মতো সরানো যায়।
মাঝেমাঝেই বাতাস থেমে যাচ্ছে। বাতাস থেমে গেলে সমস্ত বাগান ভ্যাপসা গরমে গুমোট হয়ে যাচ্ছে। টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। কখনো কখনো দক্ষিণ দিকের হাল্কা বাতাসে ঘুমও ধরে যায়।
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পাতার ভিতর ব্যাপক খচমচ শব্দে আতংকিত হয়ে জেগে উঠলাম। আবার কিসের শব্দ? সাপ নয়তো? হাতের কাছের লাঠিটা শক্ত করে ধরলাম। ঘুমের ঘোর কেটে গেছে। শব্দটা ক্রমশঃ জোরালো হচ্ছে এবং আমার দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পশ্চিম দিকে তাকালাম।
আরে,এ যে আমাদের ইসমাইল ভাই। খালি গায়ে ঘেমে নেয়ে সে উদভ্রান্তের মতো দাপাতে দাপাতে বাগানের ভিতর দিয়ে আমার দিকে আসছে। চোখ তার লিচুর দিকে। যে গাছটাতে সব লিচু পেকে একেবারে লাল টকটকে হয়ে গেছে বড়বড় ছড়াছড়া লিচু থৈলথৈল একেবার হাতের নাগালে ঝুলছে সে সেই গাছটার দিকে বিদ্যুৎ বেগে ছুটছে। মনে হচ্ছে লিচু তো খাবেই লিচুর গাছও খাবে। আজ আর কারোর রেহাই নেই। লোভের কারণে চোখ দুটো চকচক করছে। মুখ হা করাই আছে। দৌড়ে যেয়ে ঝপাঝপ ছিড়ে টপাটপ মুখে পুরবে। তার আর তর সইছে না। আমি যে বাগানের ভিতরে আছি তা সে খেয়াল করেনি। সে দৌড়ানোর মতো করে হাটছে।দৌড়ানোর সুবিধার জন্য লুঙ্গি ভাজ করে বাঁধা। লুঙ্গির সামনের বাড়তি একটা অংশ দুই পায়ের মাঝে বিশাল একটা হোলের মতো ঝুলছে।দুই পায়ের আঘাতে আঘাতে পেন্ডুলামের মতো একবার এপাশ আর একবার ওপাশ -- দুলে বেড়াচ্ছে।
ইসমাইল ভাই আশেপাশেই কোথাও হয়তো কাজ করছিলো। দীর্ঘ সময় ধরে বাগানে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে মনে করেছে বাগানে কোনো লোক নেই। এই তো সুযোগ।সে ছুটে এসেছে।
লিচু ছিড়তে যাবে, একটা থৈল ধরে ফেলেছে। আমি শব্দ করলাম।বললাম,"ইসমাইল ভাই,।"সে যেনো কারেন্ট শক পেলো। থতমত খেয়ে থেমে লজ্জায় একেবার থ হয়ে গেলো। তারপর হা করে একগাল হাসলো।জোর করে হাসার কারণে দাঁত গুলো তো বের হলোই সাথে দাঁতের গোড়ার মাংসও সব বের হয়ে এলো। ধরা তো পড়েই গেছে একটা কিছু বলতে তো হবে। সে বললো, "প্রচন্ড রোদে কাজ করছি তো একটু বিশ্রাম দরকার। মনে করলাম দুটো লিচু খেয়ে আসি। হে,হে। "
বাধ্য হয়ে তাকে এক ছড়া লিচু দিলাম। সে বিদায় হয়ে গেলো।
এই দুপুর রোদে ঢোল বাজায় কে?শব্দ ক্রমশঃ গ্রামের ভিতর থেকে মাঠের দিকে আসছে। আস্তে, আস্তে বোঝা গেলো শুধু ঢোল না হারমনিয়ামও বাজছে। সাথে একদল লোক কোরাস গাইছে, বলো হরি, হরি বোল। তারমানে এখন শ্মশানে মরা পোড়ানো হবে। তা হোক, আমার কোনো সমস্যা নেই। আমার জোহরের নামাজ পড়া হয়ে গেছে। আছরের ওয়াক্তের এখনো অনেক দেরি। তার ভিতর ওরা বাদ্য-বাজনা করে মরা পুড়িয়ে চলে যাবে। সমস্যা হবে মরা পোড়া গন্ধ নাকে এলে। রোজার মাস চলছে,রোজা আছি তো।
আছরের আজানের পরপরই ওরা মরা পুড়িয়ে চলে গেলো। আমি নদীতে ওজু করতে যেয়ে বিপদে পড়ে গেলাম।
বছরের শুরুতে নদী খনন করা হয়েছে। খনন করা মাটি পাড়ে অনেক উঁচু করে রাখা হয়েছে। সেই পাড় থেকে পানি পর্যন্ত পৌছাতে ৪০-৫০ ফুট ঢাল বেয়ে নামতে হয়। ঢাল একদম টাক মাথার মতো। একটা ঘাসও নেই।পিছলে ঢাল বেয়ে অনেক কষ্ট করে নামলাম। নেমে দেখি নদীর পানি মরা পোড়া ছাইয়ে ভরা। শ্মশানের সামনে নদীর প্রায় তিনশো মিটার খোঁচা হয়েছে কিন্তু দুই মাথা আটকানো। যার ফলে ছাই স্রোতে ভেসে যেতে পারেনি। যাইহোক নদীর পানিতে আর ওজু করা হলো না। অন্য ব্যবস্থা করলাম।
বেলা ডুবে যাচ্ছে।এই মাঠের মানুষগুলো অনেক আগেই বাড়ি চলে গেছে একেতো দূরের মাঠ তারউপর আবার শ্মশান। শ্মশানের বাতাসে এখনো চিতার কাঠ পোড়া গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। গন্ধ নাকে ধাক্কা দিচ্ছে। একটা আতঙ্কও জোরালো হচ্ছে। রাতে তো এখানেই থাকি। মনে হচ্ছে আজকের রাতটা কঠিন হয়ে যাবে। কীভাবে আজ যে থাকবো! না থাকলেও উপায় নেই। এক রাতেই লিচু সব সাবাড় হয়ে যাবে। আর দুটো দিন পাহারা দিতে পারলে সব লিচু একসাথে ভেঙে নেওয়া যাবে। এখন বাগান ছেড়ে কোনোভাবেই যাওয়া যাবে না।
এই অবেলায় কোথা থেকে একটা কাঠঠোকরা উড়ে এলো। সে গাছের গোড়ার দিকে কয়েকটি ঠোকর মেরে নিজের ঠোঁটের সামর্থ পরীক্ষা করে উপর দিকে উঠে গেলো। তার লম্বা, চিকন,শক্ত,ধারালো ঠোঁট দিয়ে লিচু বারবার ঠুকিয়ে ঠুকিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেললো।
সারাদিনপর সাপটিও আবার গর্তের মুখে মাথা উঁচু করে দাড়িয়েছে। সারাদিন ও কোথায় ছিলো? চারিদিকে এতো ভয়,এতো আতঙ্ক এর ভিতরও আমি একটা আনন্দের উপাদান এবং শান্তির অনূভুতি অনুভব করলাম।
এই বাগানটা যদি গ্রামের ভিতর হতো তবে এর একটা বড় অংশ কোনো কৈফিয়ত ছাড়াই চলে যেতো পুলিশের পেটে আর স্থানীয় দলবাজ নেতাদের পেটে। বাগানটি দূর্গম ভয়াল পরিবেশে হওয়াই এখানে নিতান্তই কিছু মেঠো লোকে আসে। ওদের চাহিদা সামান্য এবং যৌক্তিক। কিন্তু পুলিশ এবং দলবাজদের চাহিদা সীমাহীন অযৌক্তিক । ওরা এই ভয়াল পরিবেশে আসার সাহস পায় না। তাই বাগানটি নিরাপদে আছে। যৌক্তিক ভাবেই তাই এই ভয়াল পরিবেশে কিছুটা হলেও ভালো আছি।
রাতের আকাশে আধখানা চাঁদ। দূরন্ত বাতাসে মেঘেরা চলন্ত। ছেঁড়াছেঁড়া মেঘের ফাঁকে জোছনার অবাধ স্রোত। মাঝেমাঝে আলোর প্লাবনে প্লাবিত হচ্ছে সমস্ত বন আবার হাল্কা আধারে ঢেকেও যাচ্ছে। দিনের মতো গরম এখন আর নেই। বাতাসে একটা মিষ্টি মাতাল ভাব আছে। ঘুম এসে যাচ্ছে। কিন্তু আমার তো ঘুমালে চলবে না। সারাদিন রোজা ছিলাম। কেবলমাত্র এশার নামাজ শেষ করেছি এখনো তারাবির নামাজ বাকি। ফাঁকা মাঠে বনে ঘেরা লিচু বাগে চাঁদের আলোই নামাজ পড়তে ভালোই লাগছে।
বিরতি দিয়ে নামাজ পড়ছি।নামাজের ফাঁকে বাঁশে শব্দ করছি। রাতের বেলা পাখি আসে না। বাদুড় আসে। পাখির চেয়ে বাদুড় বেশি ভয়ংকর। অল্প সময়ের ভিতর একদল বাদুড় পুরো বাগান উজাড় করে দিতে পারে। ।
পশ্চিম পাশের লিচু তলা হতে অন্যরকম একটা আওয়াজ আসছে। কীসের শব্দ? লাইট জ্বেলে দেখি দুটো শেয়াল। ওরা ওখানে কী করছে? আমাকে আক্রমণ করবে নাকি। নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে? চারপাশে টর্চ লাইটের আলো ফেলে দেখলাম আরো কোনো শেয়াল আছে কিনা। না আর কোনো শেয়াল দেখা যাচ্ছে না। থাকলেও বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে। হয়তো আমার মাংস খাওয়ার জন্য গোপনে দাঁতে ধার দিচ্ছে। আমি তার কিছুই জানি না।
আমি বাগানের ঘাসের উপর পাটি বিছিয়ে নামাজ পড়ছি।এই অবস্থায় শেয়াল চারপাশ থেকে আক্রমন করলে বাঁচার সম্ভাবনা কম। হাতের কাছে মোটা লাঠি আছে। একপাল শেয়াল আক্রমণ করলে লাঠি দিয়ে কী করতে পারবো জানি না। দৌড়ে কোনো গাছে উঠতে পারলে বেঁচে যেতে পারি। আমার মোবাইল মঞ্চটাও বেশ উঁচু তাতে চড়তে পারলেও বেঁচে যেতে পারি।
অবশ্য শেয়াল দুটোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না যে তারা আমাকে টার্গেট করেছে। তাদের টার্গেট লিচুর থৈল। শেয়ালও লিচু খায়?
পশ্চিম পাশের গাছটার অনেকগুলো লিচুর থৈল মাটির কাছাকাছি শেয়ালের নাগালের ভিতরই ঝুলে আছে।
শেয়াল দুটো উপর দিকে মুখ করে কিছু একটা করছে। লাইট তো অন করায় আছে।এক হাতে লাইট আর অন্য হাতে লাঠিটা নিয়ে এগিয়ে গেলাম।শিয়াল দুটো ধিরে ধিরে সরে গেলো। তারা সেই সাপের গর্তটাতে ঢুকে পড়লো। শেয়াল আর সাপ একই গর্তে? কী যে ঘটতে যাচ্ছে আল্লাই জানে। ঐ গর্তটা আসলে শেয়ালেরই গর্ত। সাপ তো আর গর্ত খুড়তে পারে না। সে শেয়ালের গর্ত অন্যায় ভাবে দখল করে বসে আছে।
হ্যা,শেয়াল দুটো লিচু খাচ্ছিলো। অনেকগুলো লিচু তারা কামড়ে কামড়ে নষ্ট করেছে। লিচুগুলোর গা বেয়ে রস গড়িয়ে গড়িয়ে গড়ছে। তারমানে শেয়াল তো আর লিচু ছুলতে পারে না তাই কামড়ে রস চুষে খায়। একেক প্রাণীর লিচু খাওয়ার একেক রকম কৌশল।
মঞ্চে ফিরে ভাত খেয়ে একটা সিগারেট ধরালাম।মোবাইল মঞ্চের বিছানায় শুয়ে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে,
চাঁদের আলো উপভোগ করতে করতে সিগারেটে সুখটান মারা দারুন ব্যাপার। আমি সুখ করে সিগারেট টানছি।
হঠাৎ বাতাসটা পড়ে গেলো। পশ্চিম পাশের শ্মশানের দিক থেকে একটা অখণ্ড কালো মেঘের ছায়া এসে সমস্ত বাগানে জেকে বসলো। এখন আমার খুব অস্বস্তি লাগছে । আকাশে চাঁদটা আর দেখা যাচ্ছে না। আশপাশে বনে বড়বড় গাছগুলো চুপ করে ভয়ে ঝিম মেরে আছে। একচুলও নড়ছে না। ঝড় টড় উঠবে নাকি? ভাবতে ভাবতে সব পরিষ্কার হয়ে গেলো। কালো মেঘ সরে যেয়ে সমস্ত আকাশ আবার আধখানা চাঁদের আলোই ঝকমক করে উঠলো। আকাশে কোথাও আর কোনো মেঘ নেই। চাঁদের আলোর এতো ফোকাস যে প্রত্যেকটা লিচু আলাদা আলাদা দেখা যাচ্ছে।
খেয়াল করে দেখি সমস্ত গাছের মাথার উপরের লিচু সব উধাও। প্রত্যেকটা গাছের মাথার লিচুগুলো সবচে বেশি পেকেছে আর মিষ্টিও সবচেয়ে বেশি। সমস্ত প্রাণীরই টার্গেট ঐ লিচুগুলো। অনেক কষ্টে ওগুলো টিকিয়ে রেখেছি। হঠাৎ লিচুগুলো গেলো কোথায়? এতো একেবারে ভৌতিক কাণ্ড। কয়েক মূহুর্ত আগেও তো লিচুগুলো ছিলো।
চাঁদের আলোই বন ভেসে যাচ্ছে। শ্মশানের দিক থেকে আসা কী একটা বুনোফুলের মিষ্টি সুবাস চারপাশ ভরিয়ে তুলছে। যারা লিচুগুলো চুরি করে নিয়ে গেলো তারা বুনোফুলের সেন্ট মেখে এসেছিলো। ওরা শ্মশানের সমস্ত কাজের সাক্ষী, বহু প্রাচীন ষঢ়া গাছটার মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে । গাছটির সবচে উঁচু ডালটি এখনো নড়ছে। সেদিকে গাছের মাথার উপরের লিচুহীন সদ্য ন্যাড়া ডাটাগুলো আর আমি অসহায় ভাবে তাকিয়ে আছি।
মন ভেঙে গেছে। খুব ক্লান্তি লাগছে। ইচ্ছে করছে ঘুমিয়ে পড়ি।
দৃশ্য শত্রু প্রতিরোধ্য,কিন্তু অদৃশ্য মোহন ছদ্মবেশী
নিয়তি? নিয়তি চিরকাল প্রশ্নহীন, উত্তরহীন, অদৃশ্য, অপ্রতিরোধ্য। অপরিমেয় সেই শক্তির ধ্বংসলীলার টর্নেডোর সামনে আমাদের সমস্ত মানবিক চেষ্টা,সাধনা শুকনা পাতার মতো ঠিকানাহীন, বাধ্য আর নত।নিয়তি কখন কোন রূপ ধরে আসে আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই তাই প্রস্তুুতিরও কোনো সুযোগ নেই।
সব জেনেও সব বুঝেও একজন কৃষকের মন ধাতুর মতো টিকে থাকে। শত আঘাতে সে ভেঙে গুড়িয়ে যায়,ছড়িয়ে যায়।আবার নতুন আশায় পারদের মতো একত্রিত হয়।
পরিস্থিতি যাইহোক যত বাঁধাই আসুক শেষ ফলটি পর্যন্ত আমাকে পাহারা চালিয়ে যেতে হবে।
হুমায়ূন কবীর