Posts

প্রবন্ধ

“বসন্তের রঙে দেবী দুর্গার নীরব আগমনী"

March 24, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

72
View
Durga Puja Melodies: Divine Bliss
বসন্তের সুবাতাসে ভাসছে মায়ের পবিত্র অর্চনা

বসন্ত-প্রকৃতির পুনর্জন্মের ঋতু। শীতের নির্জীবতা ভেঙে যখন চারদিক রঙে, গন্ধে, সুরে ভরে ওঠে, তখনই আসে বসন্তকাল। আর এই ঋতুর বুকে যখন দুর্গাপূজার আবাহন ঘটে, তখন তার মাহাত্ম্য যেন আরও গভীর, আরও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে। বসন্তের দুর্গাপূজা, যা ‘বাসন্তী পূজা’ নামে পরিচিত, কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়-এ এক চিরন্তন চেতনার পুনরুজ্জীবন।শাস্ত্র মতে, দেবী দুর্গার পূজা মূলত বসন্তকালেই প্রচলিত ছিল। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে, রাজা সুরথ বসন্তকালে প্রথম দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। পরবর্তীতে রামচন্দ্রের অকাল বোধনের মাধ্যমে শরৎকালের দুর্গাপূজা জনপ্রিয়তা লাভ করে। কিন্তু বসন্তের পূজা যেন প্রকৃতির সঙ্গে দেবীর এক স্বাভাবিক মিলন-যেখানে নবপল্লবের সজীবতা, কোকিলের ডাক, আর মৃদুমন্দ সুবাতাস মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অপার্থিব আবহ। 

বাঙালির একটি পার্বণ হলো বাসন্তীপূজা। সাধারণত চৈত্র মাসের শুক্ল পক্ষের বাসন্তীপূজা হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আদি দুর্গাপূজা। শরৎকালে দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপুজা, আর বসন্তকালে দেবীর আরাধনা বাসন্তীপূজা হিসেবেই প্রসিদ্ধ। শারদীয়া দুর্গাপূজা আর বাসন্তীপূজা, উভয় পূজার রীতি প্রায় এক। বাসন্তীপূজা অবাঙালিদের মধ্যে এখনও প্রচলিত আছে। তবে বাঙালিরা শারদীয় দুর্গাপূজাকেই প্রধান পার্বণ হিসেবে বেছে নিয়েছে।

সাহিত্যিক রাধারমণ রায় লিখেছেন, ‘সেনযুগে দুর্গাপূজা পরিণত হয় রাজ-রাজড়া আর দস্যু-তস্করের পূজায়। রাজ-রাজড়ারা এই পূজা করতেন বছরের শ্রেষ্ঠ ঋতু বসন্তকালে। যখন প্রকৃতি ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠত, তখন গরিব প্রজাদের কাছ থেকে খাজনার নামে ছিনিয়ে আনা রক্তরাঙা টাকায় রাজা-জমিদাররা দুর্গাপূজা করতেন জৌলুস-জাহিরের জন্যে। তখন এই পূজার নাম ছিল বাসন্তী।’

শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মাতৃভাবে ঈশ্বরের উপাসনা ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মানুষ্ঠান হিসেবে সুপরিচিত।পূজা ও উপাসনার অর্থ হলো ঈশ্বরকে অবলম্বন করে জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়াস। ঈশ্বরকে মাতৃভাবে পূজা ও উপাসনা করা সনাতন সংস্কৃতির অনন্য বৈশিষ্ট্য।সব ধরনের বিপদ থেকে যিনি জীবকে রক্ষা করেন, জগতের কল্যাণ সাধন করেন ও মানুষের দুঃখকষ্ট দূর করেন, তিনিই হচ্ছেন দেবী দুর্গা। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, চণ্ডী, নারায়ণী প্রভৃতি নামে ও বিশেষণে অভিহিত হন। পুরাণে কথিত আছে, আদ্যাশক্তি মহামায়া দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের লক্ষ্যে ও সমগ্র জীবের কল্যাণার্থে যুগে যুগে ও কালে কালে বিভিন্ন রূপে ভিন্ন ভিন্ন নামে আবির্ভূত হয়েছেন। দেবী দুর্গা তারই বিশেষ সময়ের, বিশেষ যুগের এক বিশেষ রূপ।দূর্গাপূজা প্রচলনের নানাবিধ উপাখ্যান আমরা ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, দেবী ভাগবত পুরাণ, দেবীমাহাত্ম্য, রাজা সুরথের গল্প, মধু-কৈটভের কাহিনি, মহিষাসুরের কাহিনি, শুম্ভ-নিশুম্ভের কাহিনি, কালিকা পুরাণ, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, শ্রীশ্রী চণ্ডী ইত্যাদি গ্রন্থে দেখতে পাই।

আকবরের রাজত্বকালেই ১৫৮০ সাল নাগাদ তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বাংলাদেশে শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনা করেন বলে জানা যায়। তা হলে কংসনারায়ণের পূর্বে শারদীয়া দুর্গাপূজার অস্তিত্ব কি ছিল না? রাধারমণ রায়ের মতে, আগে এ দেশে বসন্তকালে হত দুর্গাপূজা আর শরৎকালে হতো নবপত্রিকা পূজা, যার স্থান আজ গণেশের পাশে। নবপত্রিকাই কালক্রমে চার পুত্র-কন্যাসহ দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে রূপান্তরিত। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস মতে, যে সময়টা উত্তরায়ণ, অর্থাৎ দেবতারা জেগে থাকেন, সেই সময়েই বাসন্তী পূজার নির্ঘণ্ট। তাই বাসন্তী পূজায় দেবীর অকালবোধনের উপাচার নেই। আবার শীতের পরে বসন্তের অতি মনোরম, ঝড়-ঝঞ্ঝামুক্ত আবহাওয়াতেই এই পূজার ব্যবস্থা হয়েছিল। শরৎকালে কিন্তু আবহাওয়া সর্বদা অনুকূল থাকে না। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যার প্রকোপে উৎসবে তৈরি হয় বিঘ্ন। তা ছাড়া এই সময়টা দক্ষিণায়ন, দেবতারা নিদ্রিত। ফলে প্রয়োজন অকাল বোধনের।

পুরাণমতে রাজা সুরথ করেন বাসন্তীপূজা এবং রাবণ বধের আগে রামচন্দ্র করেন শারদীয়া দুর্গাপূজা। তবে বাঙালির কাছে জনপ্রিয় হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। শারদীয়া দুর্গাপূজার গুরুত্ব বৃদ্ধির পেছনে মোগল আমলে রাজস্ব প্রদানের নতুন নিয়মেরও ভূমিকা আছে। নতুন নিয়মে দিল্লিতে মোগল সম্রাটের কাছে প্রাদেশিক শাসনকর্তা, অর্থাৎ নবাবকে ভাদ্র মাসের নির্দিষ্ট দিনে রাজস্ব পাঠানোর নির্দেশ জারি হয়। অর্থাৎ স্থানীয় রাজা বা জমিদারদের তার আগেই নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা জমা দিতে হত। এই নির্দিষ্ট খাজনা বাদ দিয়ে রাজস্বের বাকি অংশ ছিল স্থানীয় রাজা বা জমিদারদের প্রাপ্য। তাই সঞ্চিত রাজস্বের অনুষঙ্গে অর্থনৈতিক দিক থেকে শরতের এই সময়টি ছিল বসন্তের তুলনায় উৎসব উদ্‌যাপনের উপযুক্ততর সময়। অতএব হিন্দু রাজা-জমিদারদের একটা বড় অংশ নিজেদের কৌলীন্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রতি সমর্থন দেওয়া শুরু করেন। আবার এই মোগল রাজস্ব ব্যবস্থার হাত ধরেই যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সূচনা হয়েছিল। তার সূত্রে কৃষ্ণনগরসহ বেশ কিছু নগরভিত্তিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আবির্ভাব ঘটে। মধ্যযুগের বাংলায় এই সব হিন্দু অধিপতিরা, নদীকেন্দ্রিক পূর্ববাংলার ‘গ্রামীণ’ বাসন্তীপূজার তুলনায় শারদীয়া দুর্গার প্রতিই পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেন। প্রসঙ্গত অষ্টাদশ শতকের হিন্দু নেতৃস্থানীয় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভূমিকা স্মরণ করতেই হয়। শাক্ত ঐতিহ্যকে শক্তিশালী করতে গিয়ে তিনি তন্ত্রমতে দেবী অন্নপূর্ণার যে পূজা করেছিলেন, তার দিনক্ষণ নির্ধারিত হয় বাসন্তী পূজার অষ্টমী তিথিতে। এর ফলে রাজার পৃষ্ঠপোষিত অন্নপূর্ণাই প্রধান হয়ে ওঠেন, গুরুত্ব নষ্ট হয় প্রাচীন বাসন্তী দুর্গার।

অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য সব কালেই মানুষ আদ্যাশক্তির আরাধনা করে। পুরাণ অনুযায়ী, সমাধি নামক বৈশ্যের সঙ্গে মিলে রাজ্য-হারানো রাজা সুরথ বসন্তকালে ঋষি মেধসের আশ্রমে মূর্তি গড়ে দেবী দুর্গার আরাধনা করেন, যা পরে বাসন্তী পূজা নামে প্রসিদ্ধ হয়। সেটাই চলতে থাকে। কিন্তু রামচন্দ্র সীতা-উদ্ধার কালে অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য শরৎকালেই দুর্গার আরাধনা করলেন। এটি অকালবোধন হিসাবে বিখ্যাত হল। আর তার পর থেকে এই পূজাই চলতে থাকল।বাল্মীকি অকালবোধনের ঘটনাটি তাঁর রচনায় উল্লেখ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর বঙ্গ-রামায়ণে এই অংশের এমন আবেগমথিত বর্ণনা দেন যে, তা বরাবরের জন্য বাঙালিচিত্তে গেঁথে যায়। শরৎকালের দুর্গাপূজা এইভাবেই ধীরে ধীরে তার নিজস্ব ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞান রচনা করে জনমনে চিরস্থায়ী হয়ে ওঠে।

তবু বাঙালি তার আদি দুর্গাপূজাকে কোনোদিনই পুরোপুরি ভুলে যায়নি। সে এখনও দুর্গাপূজার আদিরূপ বাসন্তীপূজার আয়োজন করে। যদিও এই পূজা কোনো দিনই বারোয়ারির আকার নেয়নি। রাজ-রাজরা জমিদারদের আঙ্গিনা ছেড়ে এই পূজা কোনো দিনই সাধারণের পূজা হয়ে ওঠেনি।

তবে কেউ কেউ বাসন্তী পূজার ভিন্ন কারণের কথাও বলেন। বসন্তঋতুর শেষে গ্রীষ্মের শুরুর এই সময়টায় সেকালে বসন্ত রোগের খুব প্রকোপ ছিল। টিকাহীন চিকিৎসাহীন সেই অতীতে দুর্বার বসন্তের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য মায়ের আরাধনা করে তার কৃপা প্রার্থনা করা হত। রোগকে প্রশমিত করার জন্য়ও তাই বাসন্তীদেবীর পূজার চল হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।লোককাহিনিমতে, আগের দিনে রাজারা যুদ্ধে পরাজিত না হওয়ার জন্য শক্তির উপাসনা করতেন। সেই হিসেবে মহামায়াকে অপার শক্তির সাথে তুলনা করা হয়। আর মনে করা হয়, তার আশীর্বাদপ্রাপ্ত হলে কোনো কাজেই পরাজয় আসবে না। পৌরাণিক কাহিনি মতে, সমাধি নামক বৈশ্যের সঙ্গে মিলে রাজা সুরথ বসন্তকালে ঋষি মেধসের আশ্রমে দেবী মহামায়া তথা দুর্গার আরাধনা করেন। যা পরে বাসন্তীপূজা নামে প্রসিদ্ধ হয়। দেবী দুর্গার প্রথম পূজারী হিসাবে চণ্ডীতে রাজা সুরথের উল্লেখ রয়েছে।মানুষ আসলে শক্তির উপাসক। একসময় সেই শক্তি ছিল বিভিন্ন দেবদেবী। এখন যে আসন দখল করেছেন বিভিন্ন দলের নেতানেত্রীরা। তাদের মন জয় করতে পারলেই অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। সমস্ত ঐশ্বর্য হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেয়।

দেবী মানে কালী। কালী দুর্গারই ভিন্ন রূপ। দুর্গা দেবী বারো মাসে বারো নামে পূজিত। বৈশাখে গন্ধেশ্বরী নামে, জ্যৈষ্ঠে ফলহারিণী, আষাঢ়ে কামাক্ষা, শ্রাবণে শাকম্ভরী, ভাদ্রে পার্বতী, আশ্বিনে দুর্গা, কার্তিকে জগদ্ধাত্রী, অগ্রহায়ণে কাত্যায়নী, পৌষে পৌষকালী, মাঘে রটন্তীকালী, ফাগুনে সংকটনাশিনী আর চৈত্রে বাসন্তী নামে পূজিত হন। তো উত্তর কাট্টলির জেলেরা দুর্গার মা কালী রূপকে সংবৎসর পূজা করে আসছিল।বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও দুর্গাকে বড় ভালোবাসতেন। নইলে কেন তাঁর সৃষ্ট সবচেয়ে আকর্ষণীয় নারী চরিত্রটির নাম হয় দুর্গা! পথের পাঁচালীর দুর্গা কোন পাঠককে ব্যাকুল করেনি? তাই প্রতিটি ভক্তকুলই বাল্যবয়সের সেই উন্মেষকাল থেকেই দুর্গাকে বড্ড ভালোবেসে ফেলেছিলো।

পুরাণমতে, দুর্গা মহাদেব বা শিবের স্ত্রী। তার গায়ের রং অতসী ফুলের মতো সোনালি হলুদ। তিনি দশভুজা ও ত্রিনয়নী। তার বাহন সিংহ। শান্ত-সৌম্য, অভয় প্রদানকারী মুখ দুর্গা দেবীর। দুদিকে দাঁড়ানো তাঁর চারটি সন্তান। একজন ছাড়া অন্য সব সন্তানই দৃষ্টিনন্দন। গণেশঠাকুরের মুখমণ্ডল প্রশ্ন-জাগানিয়া। পরবর্তীকালে বুঝেছি, পশুত্ব আর মানবতার সমন্বয় করার জন্যই পুরাকালে গণেশের এই ধরনের মূর্তির কল্পনা করা হয়েছে। মানুষ যে আসলেই পুশুত্বমুক্ত নয়, তারই দৃষ্টান্ত হিসেবে গণেশের এই রকম রূপ কল্পনা করেছেন শাস্ত্রকারেরা।অন্যদিকে হিংস্র চেহারা মা কালীর। মা কালী-নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক ভয়াল, অগ্নিমূর্তি। উন্মুক্ত জিহ্বা, রক্তমাখা তলোয়ার, গলায় খুলি-মালা-সব মিলিয়ে যেন ধ্বংসের প্রতীক। কিন্তু এই ভয়ংকর রূপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য, যা কেবল ভয়ের নয়, বরং সৃষ্টির, রক্ষার এবং ন্যায়ের প্রতীক।তাঁর এই হিংস্র চেহারা আসলে অন্যায়, অশুভ এবং অসুর শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের ভাষা। তাই তাঁর হাতে অস্ত্র, তাঁর রূপে ক্রোধ-এসব কোনো অকারণ উগ্রতা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত প্রতিরোধ। আসলে কালী আর দুর্গা এক দেবীর দুটো রূপ। দুজনেই অসুর শ্রেণিকে নিধনে উদ্যত। দুজনেরই আবির্ভাব মানবতার সংকটকালে। রূপ ভিন্ন হলে কী হবে, দুজনের উদ্দেশ্য একটাই-পৃথিবীকে পাপাচারমুক্ত করা।

ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে অনুষ্ঠেয় সাধারণ কিন্তু অত্যাবশ্যক অঙ্গানুষ্ঠান—ষোড়শোপচারে (আসন, স্বাগত, পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, মধুপর্ক, পুনরাচমনীয়, স্নানীয়, বস্ত্র, ভূষণ, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য ও বন্দনা) পূজা হয়। গৃহে কোনো শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি এলে নানা আয়োজনে তাকে অভ্যর্থনা করা হয়, তার পছন্দের দ্রব্যাদি দিয়ে যত্নের সঙ্গে সেবা করা হয়, তাকে আনন্দ দেওয়ার ও তার প্রীতলাভের চেষ্টা করা হয়, জগন্মাতার আগমনে পূজায়ও যেন তদ্রূপ।শাস্ত্রজ্ঞরা বলে থাকেন, ভক্তিসহকারে এসব উপচারদ্রব্য উপাস্য দেবতাকে সমর্পণ করলে তা সাধককে দেবসন্নিধানে নিয়ে যায় বা বাঞ্ছিত ফলকে নিকটে এনে দেয় বলে উল্লিখিত দ্রব্যাদিকে উপচার বলা হয়। পূজারি-সাধক বাইরে যেসব দ্রব্য প্রতিমাকে নিবেদন করেন, মনে মনেও সেসব চিন্ময়ী মাকে নিবেদন করেন।অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজায় বলির অনুষ্ঠান। বলিতে সাত্ত্বিক, রাজসিক, স্থূল, সূক্ষ্ম (মনোবৃত্তি) ইত্যাদি প্রকারভেদ আছে। সাত্ত্বিক পূজারি বলির মাধ্যমে মনে মনে (সূক্ষ্মভাবে) কামাদি রিপুর বিনাশ চিন্তা করেন।ভক্তের সাথে মায়ের সম্পর্কটা যেনো অনেকটা শিশুরই মতো। শিশু যেমন সর্বদা মায়ের কাছে যুক্ত থাকে। ভাবে, মা আছেন, সঠিক পথ দেখিয়ে দেবেন; মা আমার হাত ধরে আছেন, অতএব কোনো ভয় নেই। ভক্তের এই বিশ্বাসেই মায়ের সন্নিধানে যুক্ত থেকে জয় করেন ভয় ও বিপর্যয়কে। সাধারণের তত্ত্ব নয়, ফল প্রত্যাশিত। শাস্ত্র আশ্বস্ত করছে, এ পূজায় ধর্ম, অর্থ, কাম, মোহ- চতুর্বর্গ ফল লাভ হয়। শ্রীশ্রী চণ্ডীর আখ্যানে আছে, মহামায়ার কৃপায় রাজা সুরথ হৃত রাজ্য ফিরে পেয়েছিলেন। পুরাণে উল্লেখিত আছে যে পুরাকালে রাজ্যহারা রাজা সুরথ এবং স্বজনপ্রতারিত বৈশ্য সমাধি মেধস মুনির আশ্রমে উপস্থিত হলে তার পরামর্শে উভয়ই দেবী দুর্গা বা ভগবতীর পূজা করেন। পূজায় তুষ্ট হয়ে তাদের মনস্কামনা পূর্ণ করেন দুর্গা।

বাসন্তী পূজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্যও অনন্য। বসন্ত মানে নতুন করে শুরু করা, পুরোনো ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলা। দেবী দুর্গা এখানে কেবল অসুরনাশিনী নন, তিনি জীবনের স্থবিরতা ভেঙে নতুন শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতীক। তাঁর আরাধনার মধ্যে দিয়ে মানুষ নিজের অন্তর্গত অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস খুঁজে পায়।বসন্তের সুবাতাসের সঙ্গে দুর্গাপূজার এই মেলবন্ধন আমাদের জীবনে এক বিশেষ বার্তা নিয়ে আসে-পুনর্জন্মের, পুনর্গঠনের।জীবনের প্রতিটি সংকটের পরেও যে নতুন ভোর আসতে পারে, তারই ইঙ্গিত দেয় এই সময়। প্রকৃতির মতোই মানুষের মনও তখন সজীব হয়ে ওঠে, নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়।এ সময়ের পূজায় জাঁকজমক কম হলেও আন্তরিকতা বেশি।শহরে আরাধনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কারুকাজে দৃষ্টিনন্দিত হয় দুর্গাপূজার মাহাত্ম্য অন্যদিকে শহুরে কোলাহল থেকে দূরে, গ্রামবাংলার নিস্তব্ধ পরিবেশে বসন্তের দুর্গাপূজা যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত। এখানে দেবীর আরাধনা হয় নিভৃত অনুভবে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আসলে পূজা মানে বাহ্যিক আয়োজন নয়, অন্তরের নিবেদন। আজকের দ্রুতগতির জীবনে বসন্তের দুর্গাপূজা আমাদের একটু থামতে শেখায়। নিজের ভেতরের শক্তিকে চিনতে শেখায়, আর প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ দেয়। এই পূজা যেন এক নীরব আহ্বান-নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার, অশুভকে দূর করে শুভর পথে এগিয়ে যাওয়ার। বসন্তের মৃদু হাওয়ায় যখন দেবীর আরতি ভেসে আসে, তখন মনে হয়-এই মিলন কেবল ঋতুর নয়, আত্মারও। আর সেখানেই বাসন্তী দুর্গাপূজার আসল মাহাত্ম্য।

কেউ কেউ বলেন, আমরা প্রতিমাপূজা করি কেন? মাটি-খড়-কাঠ-রং দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমার পূজা করার মাহাত্ম্যই–বা কী? কেউ কেউ শাস্ত্রের বড় বড় শ্লোক আওড়ে চর্যাপদীয় ভাষায় আমাকে বোঝাতে চেয়েছেন যে এটাই নিয়ম।এটিই প্রথা,  এটিই সংস্কার-শাস্ত্রলগ্ন ধর্মাশ্রিত সংস্কার।তাঁদের কথা আমার মনে ধরেনি। আমি বলি,দুর্গাপূজা উপলক্ষে চার দিন ধরে কত মানুষেরই আলাপচারিতা! ভেতরের আর চারদিকের কষ্টকে ঝেঁটিয়ে দিয়ে পূজার চারটা দিন মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যময় সুষম জীবন যাপন করে। কিন্তু তাই বলে, উৎসবের সাথে পূজার মাহাত্ম্যকে বাদ দেবে কেন? শাস্ত্রলিখিত প্রথম এবং সংস্কার অমান্য করার অধিকার কারও নেই। কিন্তু অনেকেই পূজার সঠিক মাহাত্ম্যই বুঝে উঠতে পারে না। হিন্দুরা আসলে প্রতিমাপূজার আড়ালে মৃত্তিকা আর বৃক্ষের পূজা করে। পূজা মানে বন্দনা। বন্দনার ভেতরে সব প্রশংসা লুকিয়ে আছে। প্রতিমা তৈরিতে মাটি লাগে, খড় ও কাঠ লাগে। মাটি আমাদের জীবন ধারণের সব বস্তু উৎপাদনের আধার। অন্ন আসে ধান থেকে। ধান আর খড় একসূত্রে গাঁথা। কাঠ হয় বৃক্ষ থেকে। মানুষ নয় শুধু, সব প্রাণীর জীবিত থাকার সব উৎপাদন সরবরাহ করে এই মৃত্তিকা, খড় আর বৃক্ষ। হিন্দুরা মূলত দুর্গাসহ নানা দেব–দেবীর মূর্তির প্রতীকে জীবনদায়িনী সঞ্জীবনী উপাদানগুলোরই পূজা মানে বন্দনা মানে প্রশংসা করে থাকে। শারদোৎসব কিংবা বসন্তের দুর্গোৎসব বরাবরই বাল্যবয়স কিংবা তরুণ বয়সকে বড় আনন্দ লাগায়, বয়সের ব্যবধান বাড়লেই এখনো পূজা আসলেই বাঙালিরা নতুন জামাকাপড়, পরিচিত-অপরিচিতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কথোপকথনে মেতে উঠে। যথাপ্রথায় ধূপ-মোমবাতি জ্বালিয়ে বাদ্যবাজনা করে পূজা উদযাপন করে, মানুষ উপুড় হয়ে দুর্গা-প্রণাম করছে, অল্প ভিড়ে ঘুরে বেড়াতে পূজার আমেজ অনুভব করে। 

বসন্ত এলে প্রকৃতি যেমন নতুন রূপে সেজে ওঠে, তেমনই আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার এক প্রাচীন ধারা- বাসন্তী দুর্গাপূজা নিঃশব্দে ফিরে আসে। আভিধানিক অর্থে বসন্তের রঙে দেবী দুর্গার নীরব আগমনী। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই পূজা কেন শহরের প্রতিটি প্রান্তে শরৎকালের দুর্গাপূজার মতো আড়ম্বরের সঙ্গে উদযাপিত হয় না? কেন বাজেটের অজুহাতে তা সীমিত হয়ে পড়ে? আর কেনই বা প্রতিমা শিল্পীরা তাদের প্রাপ্য সম্মান ও পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হন? শরৎ মানেই উল্লাস, ঢাকের বাদ্যি, আলোর মালা আর জনসমুদ্রের ঢেউ। দুর্গোৎসব তখন শুধু ধর্মীয় আচার নয়, হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের উৎসব- এক বিশাল সামাজিক সম্মিলন। মায়ের আগমনী সেখানে ধ্বনিত হয় উচ্চস্বরে, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। অথচ একই দেবী, একই মাতৃমূর্তি, বসন্তে আবার ফিরে এলেও-কেন তাঁর সেই আগমন থাকে অনেকটাই নিভৃত, নীরব?প্রশ্নটি কেবল আয়োজনের নয়, আমাদের মানসিকতারও। শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যে বসন্তের বাসন্তী পূজাই ছিল প্রাচীন রীতি। অর্থাৎ, ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে বসন্তের এই আগমনই আসল, আর শরৎকালীন পূজা একপ্রকার “অকাল বোধন”-এর ফল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা শরদকে যেভাবে আরম্ভরে উদযাপন করছি, কিন্তু বসন্তকে ঠিক সেভাবে‌ উদযাপন করছি কি??

শরৎকালের দুর্গাপূজা আজ এক সামাজিক-অর্থনৈতিক উৎসবে পরিণত-বাণিজ্য, পর্যটন, কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা সবকিছু মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। সেখানে উৎসব মানেই দৃশ্যমানতা, প্রতিযোগিতা, আর এক ধরনের সামাজিক প্রদর্শন। বসন্তের পূজা সেই কাঠামোর বাইরে। তাই তার আবেদন থাকে ব্যক্তিগত, অন্তর্মুখী-যেখানে ভিড় কম, কিন্তু অনুভব ঘন।এখানেই এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ উঠে আসে-আমরা কি আসলে সেই উৎসবকেই বেশি গুরুত্ব দিই, যেটি চোখে পড়ে? যেটি আলো-আড়ম্বর দিয়ে আমাদের ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করে? আর যে পূজা নিঃশব্দে হৃদয়ে ধ্বনিত হয়, তাকে কি আমরা অবহেলা করি না?বসন্তকালের দুর্গাপূজা যেন এক নীরব প্রত্যাবর্তন। এখানে মা আসেন না আলোর ঝলকানিতে, বরং কোকিলের ডাকে, নতুন পাতার সবুজে, মৃদু বাতাসের স্পর্শে। এই আগমনী বাহ্যিক নয়, অন্তরের। তাই হয়তো এর জন্য জনারণ্যের প্রয়োজন হয় না-এটি অনুভবের উৎসব, প্রদর্শনের নয়।তবু এই নীরবতা পুরোপুরি গৌরবেরও নয়। এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের অবহেলাও। প্রতিমা শিল্পীদের কাজের সুযোগ কমে যায়, পূজার পরিসর সীমিত থাকে, আর ভক্তদের অংশগ্রহণও অনেক সময় বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, আমরা নিজেরাই এই পূজাকে প্রান্তিক করে তুলেছি-অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার আর সামাজিক অভ্যাসের কারণে।

প্রতিমা শিল্পীদের প্রসঙ্গে এলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এই শিল্পীরা কেবল মাটি দিয়ে প্রতিমা গড়েন না, তারা গড়ে তোলেন এক বিশ্বাস, এক ঐতিহ্য। অথচ বাজেটের অভাবে তাদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। বড় পূজাগুলিতে যেখানে শিল্পকর্মের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, সেখানে বসন্তের পূজায় তাদের পারিশ্রমিক প্রায়শই ন্যূনতম পর্যায়ে থেকে যায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নও।

শেষ পর্যন্ত, বসন্তের এই নীরব দুর্গাপূজা আমাদের সামনে এক আয়না তুলে ধরে। সেখানে আমরা দেখি- আমাদের উৎসববোধ কতটা বাহ্যিক, আর কতটা অন্তর্মুখী। মা তো আসেনই-দু’বার, সমান স্নেহে, সমান টানে। পার্থক্যটা আসলে আমাদের গ্রহণে। বসন্তের দুর্গাপূজা যেহেতু তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরে পালিত হয়, তাই তা ‘অফিসিয়াল’ স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু এতে কি তার গুরুত্ব কমে যায়? নাকি আমরা নিজেরাই তার গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছি?

ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এই সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যেই হয়তো বসন্তের পূজার এক বিশেষ সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। আড়ম্বরহীনতা এখানে একধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা এনে দেয়, যা আমাদের আবার মূলের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তবুও, এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন যে অর্থের অভাবে একটি প্রাচীন ঐতিহ্য ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়বে, আর তার ধারক-বাহক শিল্পীরা উপেক্ষিত হবেন।সম্ভবত সময় এসেছে এই পূজাকে নতুনভাবে ভাবার-কারণ, সব আগমনী ঢাকের শব্দে হয় না-কিছু আগমনী অনুভবের গভীরতাতেই ধরা দেয়।শুধু আচার হিসেবে নয়, এক সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে। বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে, কিন্তু তার মধ্যেও কি আমরা শিল্পীদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করতে পারি না? কিংবা সমাজের বৃহত্তর অংশকে এই পূজার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে পারি না? বসন্তের মৃদু হাওয়ায় ভেসে আসা এই পূজা যেন আমাদের কানে কানে বলে-সবকিছুই যে বড় করে করতে হবে, তা নয়; কিন্তু যা করি, তা যেন যথাযথ সম্মান ও সচেতনতার সঙ্গে করি। আর সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নগুলোর আসল উত্তর।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login