রাতটা যেন অন্যসব রাতের মতো ছিল না। জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছিল, কিন্তু তাতেও শরীরের জ্বালা কমছিল না। মাথাটা ভারী, চোখ দুটো যেন নিজের ইচ্ছায় বন্ধ হয়ে আসছে আবার হঠাৎই খুলে যাচ্ছে—কোনো অদ্ভুত অস্বস্তিতে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আড়াইটার কাছাকাছি। চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোথাও কুকুরের ডাক আর মাঝে মাঝে মশার ভনভন শব্দ। শরীরের তাপ যেন নিজেরই শত্রু হয়ে উঠেছে। কম্বল গায়ে দিলেই গরমে হাঁসফাঁস লাগে, আবার সরালেই ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে।
মা পাশে বসে আছে, হাতের তালু দিয়ে কপালে জল দিচ্ছে। সেই স্পর্শটুকুই যেন সবচেয়ে বাস্তব, সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়। আধো ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে আমি বারবার বুঝতে পারছিলাম—জ্বর শুধু শরীরেই নয়, মাথার ভেতরেও এক ধরনের ঝাপসা ভাব এনে দেয়।
মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কেউ যেন নাম ধরে ডাকছে। আবার কখনো মনে হচ্ছিল আমি ছোটবেলার কোনো দিনে ফিরে গেছি—যেখানে স্কুলে যাওয়ার ভান করে বিছানায় শুয়ে থাকতাম। কিন্তু এবার ভান নয়, সত্যি অসুস্থতা। বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে দুলতে দুলতে সময় কেটে যাচ্ছিল।
একসময় মা ফিসফিস করে বলল,
“আর একটু সহ্য কর, ভোর হলেই ডাক্তার দেখাবো।”
সেই কথাটা যেন এক অদ্ভুত ভরসা দিল। জানতাম, রাত যতই লম্বা হোক, ভোর আসবেই। জ্বরের এই অস্থিরতা, কাঁপুনি, মাথার ভার—সবকিছুর একটা শেষ আছে।
জানালার বাইরে আকাশ ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করল। পাখির ডাক শোনা গেল। সেই প্রথম মনে হলো—হয়তো শরীরটা একটু হালকা লাগছে।
জ্বরের রাতগুলো এমনই—অস্বস্তি, বিভ্রম আর নিঃশব্দ লড়াইয়ে ভরা। কিন্তু প্রতিটা জ্বরের রাতই আমাদের শেখায়, সবচেয়ে দীর্ঘ রাতেরও একটা শেষ আছে, আর ভোর সবসময়ই অপেক্ষা করে।