Posts

গল্প

অন্ধকার কুঠুরির আর্তনাদ: তৃতীয় পর্ব

March 24, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

24
View

মতি মিয়া এক পা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তার পায়ের শব্দে এক অদ্ভুত ছন্দ— ঠিক যেন কোনো পশুর হাঁটার আওয়াজ। সে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, এই বাড়ির ইতিহাস বড় খতরনাক। আপনি যে ঘরে শুয়েছেন, ওটা ছিল এই জমিদার বাড়ির বড় মেজবউয়ের ঘর। তিনি জানতেন এই বাড়ির দেয়ালের ভেতর কী লুকানো আছে।"

​আমি দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, "কী লুকানো আছে মতি মিয়া? পরিষ্কার করে বলুন!"

​সে লণ্ঠনটা মেঝের দিকে নামিয়ে আনল। করিডোরের নোনা ধরা দেয়ালগুলোর দিকে ইশারা করে বলল, "এই ইট-সুরকির ভেতরে কান পাতলে আপনি এখনো তাদের কান্নার শব্দ পাবেন। এক সময় এখানে জ্যান্ত মানুষকে চুনকাম করে দেয়ালের ভেতরে গেঁথে ফেলা হতো— জমিদারের ধনসম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য। তারা এখন আর মানুষ নেই, তারা এখন 'যক্ষ' হয়ে গেছে।"

​অভিশপ্ত ডায়েরির খোঁজ

​মতি মিয়ার কথাগুলো শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। সে আমাকে একটা চাবি ধরিয়ে দিয়ে বলল, "দোতলার লাইব্রেরি ঘরে যান। সেখানে একটা কালো মলাটের ডায়েরি আছে। ওটা পড়লে সব বুঝতে পারবেন। তবে সাবধান, লাইব্রেরির কোণার ওই আলমারিটা কক্ষনো খুলবেন না।"

​আমি মরিয়া হয়ে লাইব্রেরির দিকে ছুটলাম। করিডোরের আলোগুলো মিটমিট করছে। লাইব্রেরির দরজাটা খোলার সাথে সাথে এক গাদা ধুলো আর পুরনো কাগজের গন্ধ নাকে এল। হাজার হাজার বইয়ের মাঝে আমি সেই কালো ডায়েরিটা খুঁজে পেলাম। ডায়েরিটা ছিল জমিদার বাড়ির শেষ বংশধরের।

​রক্তে লেখা ইতিহাস

​ডায়েরির পাতা ওল্টাতেই আমার চোখ আটকে গেল একটা পাতায়। সেখানে কাঁপাকাঁপা হাতের লেখায় লিখা ছিল:

"আজ রাতেও ওরা এসেছে। ছাদের ওপর থেকে কারো হাঁটার শব্দ পাচ্ছি। ওরা চায় আমি সোনার কলসগুলো ফিরিয়ে দিই। কিন্তু আমি তো সেগুলো মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছি। ওরা আমার সন্তানদের একে একে নিয়ে যাচ্ছে। কাল রাতে ছোট ছেলেটাকে দেখলাম জানলার ওপাশে শূন্যে ভাসছে। ওর চোখ দুটো আর আগের মতো নেই..."


 

​ডায়েরির শেষ পাতায় একটা নকশা আঁকা ছিল। সেটা আমার ওই ঘরের সেই বড় বেলজিয়াম আয়নাটার নকশা। নকশার নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল— 'আয়নাটা হলো পরজগতের দরজা। ওটা ভাঙলে শয়তান মুক্তি পাবে।'

​আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। আমি তো ওটা আগেই ভেঙে ফেলেছি!

​লাইব্রেরির সেই ভয়ানক সত্তা

​হঠাৎ লাইব্রেরির সেই নিষিদ্ধ আলমারিটা দড়াম করে খুলে গেল। আমি ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরি। আলমারির ভেতর থেকে কোনো মানুষ নয়, বরং অসংখ্য কালো ছায়া বের হতে লাগল। সেগুলো কিলবিল করে সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। ছায়াগুলো দেয়াল বেয়ে সিলিংয়ে উঠে গেল এবং সেখান থেকে আমার দিকে নিচে ঝুলে পড়তে লাগল।

​আমি টর্চটা জ্বালালাম। কিন্তু আলোর তীব্রতা বাড়ানোর সাথে সাথে দেখলাম, ছায়াগুলোর মাঝখানে একটা বিকট আকৃতির মুখ ফুটে উঠছে। তার মুখগহ্বর থেকে কালো তরল ঝরছে। সে গর্জে উঠল:

"তুই আয়না ভেঙেছিস! এখন তুই আমাদের অংশ হয়ে যাবি। তুইও এই দেয়ালের ভেতর বন্দি হবি অনন্তকাল!"


 

​আমি লাইব্রেরি থেকে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে দৌড় দিলাম। কিন্তু সিঁড়ির গোড়ায় গিয়ে দেখি মতি মিয়া আর সেখানে নেই। তার বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই মুখহীন নারীমূর্তিটি, যার কথা আমি আগে বলেছিলাম। সে তার লম্বা নখওয়ালা হাত বাড়িয়ে আমার গলা টিপে ধরার জন্য তৈরি হচ্ছে।

​আমি যখন নিচে পড়ে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম জমিদার বাড়ির উঠোনের মাটি ফুঁড়ে অসংখ্য কঙ্কাল বেরিয়ে আসছে। তারা সবাই একসাথে চিৎকার করে বলছে— "মুক্তি চাই! মুক্তি চাই!"

Comments

    Please login to post comment. Login