সন্ধ্যার এই সময়টা ব্যালকনিতে বসে সূর্য ডোবা দেখতে খুব ভালোবাসতো স্নেহা। আজকের সন্ধ্যার মতো বিষণ্ন কি এ যাবত কালের সমস্ত সন্ধ্যা ছিল? স্নেহা মনে করার চেষ্টা করে। না, ঠিক বিষণ্ন বলা ঠিক হবে না। এই সময়টা কেমন যেন। একটা ভালো লাগা, আবার কিছুটা বিষণ্নতার মিশ্র একটা ফিলিং। সূর্যাস্তের নানা রকম ছবিও সে তুলতো এক সময়। ভোর এবং সন্ধ্যা দুইটাই স্নেহার খুব প্রিয় সময় ছিল আগে। এখন কি প্রিয় নাই? স্নেহা একটু ভাবে। ইদানিং প্রিয় সবকিছুই তার কেমন যেন খুব দূরের মনে হয়।
ভোর আর সন্ধ্যার সময়গুলা অদ্ভুত এক ঘোর লাগা কাজ করে তার। ভোরে অন্ধকার কেটে আস্তে আস্তে আলো ছড়িয়ে পড়ে পুরা পৃথিবীতে, আর সন্ধ্যায় আলো মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নামে সমস্ত দুনিয়ায়। এই দুই সময়ের নির্জনতায় কিছু একটা আছে যা তাকে কিছু সময়ের জন্য এই অসহনীয় দুনিয়াদারি থেকে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায়- যেখানে সে ছাড়া কারো কোনো প্রবেশাধিকার নাই। যেখানে কেউ যেতে পারে না; যেখানে কেউ যায় না, যে জগতটা সে ছাড়া আর কেউ চেনেই না। ভোর আর সন্ধ্যার প্রার্থনাও স্নেহার খুব প্রিয়। একটা দীর্ঘ সময় স্নেহার রাত কাটতো সম্পূর্ণ নির্ঘুম। সারা রাত রুমের ভেতর অস্থির পায়চারি করে ভোরের সময়টা ক্লান্ত হয়ে জানালার পাশে গিয়ে সূর্য উঠা দেখতো সে।
এভাবে যে কত কত রাত থেকে ভোর সে কাটিয়ে দিছে নিজের সঙ্গে কত রকম আলাপে। মূলত ওই সময় থেকেই স্নেহার ফজরের নামাজের অভ্যাস হইছে। আর কোনো ওয়াক্তের নামাজ পড়ুক বা না পড়ুক, ফজরেরটা সে ঠিকই পড়া শুরু করলো একটা সময়, তাও একদম নিয়ম করে। কোনোদিন মিস হয়ে গেলেই ভীষণ মন খারাপ হয়ে যেত। যেন ওই একটা ওয়াক্তের নামাজই তার জন্য খোদার তরফ থেকে নিয়ম করা আছে, বাকিগুলা পড়া না পড়াতে খোদা তেমন একটা নারাজ হবেন না। ভোরের ওই নির্জন সময়টায় সিজদায় সে অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতো। কী যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি আছে ভোরের প্রার্থনায়, যেন স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি হতো ওই নীরবতায়। নীরবে নীরবে কথাও হতো খানিকটা। দীর্ঘক্ষণ সিজদাহ শেষে মোনাজাতের পর জানালার পাশে গিয়েও অনেকটা সময় তার এই ঘোর কাটতো না। প্রতি ভোরেই নামাজ শেষে স্নেহা রুমির- “সাইলেন্স ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অফ গড, অল এলস ইজ পুউর ট্রান্সলেশন” কথাটা আত্মার অন্তঃস্থল থেকে অনুভব করতো।
কোন বছরের কথা হবে, স্নেহা একবার সময়ের হিসাব করতে থামে। কী আশ্চর্য! একটা মানুষের সঙ্গে সে ৬টা বছর একই ফ্ল্যাটে, একই রুমের একই বিছানায় রাত-দিন কাটাইছে, অথচ তার সঙ্গে বিচ্ছেদের সময়কাল এখন আর মনে করতে পারে না। এমন কী তার সঙ্গে কাটানো কোনো স্মৃতিও স্নেহার মনে পড়ে না! মানুষের তো চলতে-ফিরতে গেলে ভুলেও কিছু না কিছু মনে পড়ে; অথচ বিপুলের সঙ্গে কাটানো একটা সময়ের স্মৃতিও সে এখন আর স্পষ্ট মনে করতে পারে না। মনে করতে চায়ও হয়তো না।
খুব সচেতনভাবে যে সে এটা করে, এমনটা একদমই মনে হয় না স্নেহার। সচেতনভাবে না করার জন্যও যে মনোযোগটা দেওয়ার দরকার, সেই সামান্য মনোযোগটাও বিপুল বেচারার প্রতি স্নেহার কবে যে নাই হয়ে গেছে! অদ্ভুত! অথচ গত দুই বছরে কবে আবির ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠছে, কবে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানোর কারণে স্নেহার ঝাড়ি খাইছে, কবে গাড়ি বাঁকা করে পার্ক করছে, কবে কথা বলার সময় চোখ লুকাইছে আর কবেই বা লুকিয়ে স্নেহাকে আড় চোখে দেখছে- সমস্ত কিছু স্নেহা চোখ বন্ধ করলেই একদম ফকফকা দেখতে পারে! এমন কী এখনো!
এখনো স্নেহা চোখ বন্ধ করে চাইলে আবিরের অদ্ভুত সুন্দর হাসিটা দেখতে পারবে…কিন্তু সেটা সে চায় না। এখানে তাকে এক প্রকার জোরজবরদস্তি করতে হয়, সচেতন থাকতে হয়। এখানেই বিপুল আর আবিরের স্মৃতিদের পার্থক্য। কিন্তু আবির কি স্নেহাকে বিপুলের চেয়ে কম যন্ত্রণা দিছে? এসব হিসাব খুব জটিল। বিপুলের যন্ত্রণারা স্নেহাকে এখন আর স্পর্শ করে না, বহু আগেই তা বন্ধ হয়ে গেছে। বিপুল তার কাছে এখন কেবলই একজন পরিচিত।
ও ভালো থাকলে স্নেহার ভালো লাগবে। ও খারাপ আছে জানলে স্নেহার কিছুটা খারাপই লাগে ভেবে যে একটা মানুষ কেন খারাপ থাকবে। এর বেশি কোনো অনুভূতিই কাজ করে না। না রাগ, না অভিমান, না অভিযোগ, না ক্ষোভ, না ক্রোধ, না করুণা, এমন কী মায়াও না। মনে পড়ছে, ২০১৬ সালের ঘটনা। দশ বছর! যদিও বিপুলের প্রতি কোনোকিছুই ফিল না করার শুরুটা সম্ভবত ২০১৮ সাল থেকেই।
একদিন ভর দুপুরে মন উদাস লাগায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে বসে ছিল স্নেহা। এরমধ্যে ওর এক ছোট ভাই শান্ত দূর থেকে দি…দি……দি…দি… বলে চিৎকার করতে করতে আসলো। সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো- আপনি গানের লিরিকটা আমাকে না দিয়ে ফরহাদকে দিলেন কেন? ও সবাইকে বলে বেড়ায় ওইটা আপনি আর ও দুইজনে মিলে লিখছেন। কয়দিন পর বলা শুরু করবে ওইটা ও একলাই লিখছে। আপনার নামটা আলগোস্তে সরাইয়া দিবে দেইখেন আপনি। স্নেহা শান্তর এমন অভিযোগ শুনে হেসে দিলো।
শান্ত স্নেহার পাশে বসে কয়েক সেকেন্ড এটা-সেটা বলে তারপর অনেকটা কাঁচুমাচু ভঙ্গীতে যেন সে কোনো বিরাট অপরাধের কনফেস করতেছে, এই রকম একটা টোনে বললো- দিদি, দাদা আছে পার্কে। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। একবার কি কথা বলবেন? আমাকে বকেন দরকার হইলে, কিন্তু একটাবার কথা বলেন। দেখেন, কী বলে। আমি আপনাদের দুইজনকেই ভালোবাসি, দিদি।
স্নেহা হালকা বিরক্ত হলেও চেষ্টা করলো বিরক্তি ভাবটা লুকানোর। সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে গেলে আদিখ্যেতা কেবল তিক্ততা বাড়াতে পারে, এর বাইরে কোনো উপকারে আসে না। এসব শান্তকে ওর বলতে ইচ্ছা করলো না। স্নেহা কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে যেখানে বসে ছিল, সেখানেই বসে রইলো। শান্ত সেটাকে নীরব সম্মতি ভেবে তার দাদা অর্থাৎ বিপুলকে ধরে নিয়ে আসলো কই থেকে কে জানে। ও এসে প্রথমে স্নেহার মুখোমুখি বসলো। মুখ থেকে একইসঙ্গে কেরু আর গাঁজার বিশ্রী গন্ধ নাকে এসে লাগতেই স্নেহার মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল।
পৃথিবীতে গাঁজার গন্ধের চেয়ে জঘন্য গন্ধ আর কী কী আছে- অনেক চিন্তা করেও স্নেহা হাজারীবাগের ট্যানারির গন্ধ ছাড়া আর কিছু মনে করতে পারলো না। দশ বছর বয়সে সে বোর্ডিংয়ে শ্মশানের পাশের রুমে এক বছর কাটাইছে। মড়া পোড়ার গন্ধও গাঁজার গন্ধের চেয়ে সহনীয় মনে হয় তার। যদিও লাশ পোড়া ওই গন্ধের স্মৃতি এখন খুব একটা মনে নাই স্নেহার। তবুও তার মনে হয়, গাঁজার গন্ধের চেয়ে তা সহনীয়ই হবে।
কিছুক্ষণ মুখামুখি বসার পর বিপুল এসে স্নেহার পাশে বসে। শান্ত তখন গিটারে টিউনিং করতে করতে খুব ধীর গতিতে গাইতেছিল-
"আমি মেঘের দলে আছি,
আমি ঘাসের দলে আছি
তুমিও থাকো বন্ধু হে..
বসিয়া থাকো…একটু বসিয়া থাকো…"
গাঁজার গন্ধটা তখন স্নেহার মাথা বরাবর গিয়ে বিঁধতেছে। মুখ থেকে গন্ধ বের হইতেছে অযুহাতে হুট করে সেখান থেকে উঠে চলে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে স্নেহা আগের মতো চুপ করেই বসে থাকে। অনেক চুপ করে বসে থাকা তার ভালো লাগে। ইন ফ্যাক্ট, সে তো মূলত চুপচাপ বসে থাকতে পছন্দই করে। কিন্তু ওই মুহূর্তে ওই চুপ থাকাটা অস্বস্তি তৈরি করতেছিল স্নেহার ভেতরে। কেমন একটা ভালো না লাগা ফিলিং। ভালো না লাগা ফিলিংটা নিয়ে সে গাঁজার গন্ধ সহ্য করতে করতে ওইখানে বসে থাকার জন্য নিজের ভদ্রতা বোধকে দুই-একবার আবালচোদা বলে গালি দিলো মনে মনে। জীবনে তার এই ভদ্রতা বোধের জন্য যে কত সাফার তাকে করতে হইছে, স্নেহা ভাবতেছিল। অনেক অনেক সাফারিংস তখন তার চামড়া গণ্ডারের মতো করে তুলছিল অবশ্য। আর এখন সামান্য টোকাতেই ভেঙে পড়ে! কী আশ্চর্য!
৮ বছরের ব্যবধানে নিজের এই অধঃপতনের কথা কল্পনা করে স্নেহার খারাপ লাগার বদলে নিজের প্রতি মায়া লাগলো। কিন্তু ওইদিন বিপুলের প্রতি তার কোনো মায়া লাগে নাই। ওইদিনই স্নেহা প্রথম বুঝতে পারে, বিপুলকে সে মাফ করে দিছে। একইসঙ্গে বিপুলের সঙ্গে তার সমস্ত সংযোগও চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্নেহা ফিল করে- কোনো যাদুমন্ত্রেই এই সংযোগ আর পুনঃস্থাপন হবে না। সূর্যের একদম শেষ আলোটা ডুবে যাওয়া দেখতে গিয়ে স্নেহার মনে হলো- আবিরও সম্ভবত এখন স্নেহার ব্যাপারে ঠিক একই রকমই ফিল করতেছে। কী ভয়াবহ!
ওইদিন এক বিচ্ছিন্নতা বোধে স্নেহার জীবনে যেমন স্বস্তি আসছিল, আজকে আরেক বিচ্ছিন্নতার কথা ভাবতেই তার বুকের ভেতরটায় খুব চিকন একটা ব্যথা টের পেলো সে। মাঞ্জা সুতায় আঙুল কেটে গেলে যেমন জায়গাটা লালচে একটা দাগ হয়ে জ্বালাপোড়া করে। কাউকে দেখিয়ে বলা যায় না ঠিক কতটা কাটছে বা কতটুকু জ্বলতেছে ভেতরে, স্নেহার বুকের ভেতরটাও তেমনভাবে জ্বলতেছে।
ওইদিন বিপুল দুই বছর পর স্নেহার সঙ্গে কথা বলতে আসছিল। কিন্তু কোনো কথা আসলে ও বলতে পারে নাই। স্নেহার দুই পায়ে হাত রেখে অনেকক্ষণ যাবত কাঁদে আর ক্ষমা চাইতে থাকে। এতে আগে থেকেই অস্বস্তিতে থাকা স্নেহা আরো অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। বিরক্তি বোধটা আর তখন সে টের পায় না। স্নেহা অদ্ভুতভাবে খেয়াল করে, বিপুলের কান্না তার মধ্যে সামান্যতমও কোনো অনুভূতি ক্রিয়েট করতেছে না।
সে একটা অস্বস্তি বোধ নিয়ে বসে আছে আর মনে মনে ভাবতেছে- কখন বিপুল পা থেকে হাত সরাবে আর সে উঠে বাড়ির দিকে রওনা দিতে পারবে। কিন্তু বিপুল পা থেকে হাত সরাচ্ছে না। কান্নাও থামাইতেছে না। এ রকম উদ্ভট আচরণে শান্ত নিজেও কিছুটা বিব্রত হয়ে একবার স্নেহার দিকে তাকালো, তারপর অন্যদিকে হাঁটা শুরু করলো।
এ রকম অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করার পর স্নেহা বিপুলের দিকে তাকাইয়া বললো- তুমি কাঁদতেছো, আমার খারাপ লাগতেছে। খারাপ লাগতেছে কারণ কোনো মানুষের কান্নাই আমি সহ্য করতে পারি না। এর বাইরে আর কোনো অনুভূতিই কাজ করতেছে না। তুমি ক্ষমা চাইছো, আমি বহু আগেই তোমাকে ক্ষমা করে দিছি। এর বাইরে মায়া, দুঃখ, কষ্ট, রাগ- কোনো বোধই তোমার জন্য আমার নাই। আমি কিছুই ফিল করতেছি না। তুমি জাস্ট কান্নাকাটি করে আমাকে অস্বস্তি ফিল করাইতেছো। অনেক মানুষ আশেপাশে আছে, তারা দেখতেছে, ব্যাপারটা বাজে হইতেছে। আমরা একসঙ্গে জীবন কাটাবো বলে এক সময় ভাবছিলাম, সেটা হয় নাই। হবেও না আর কখনো।
স্নেহা একটু থামে, তারপর নিজের পায়ের উপর পড়া বিপুলের চোখের পানি ঘাসের মধ্যে মুছে বলে- তোমার জগত আর আমার জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন। হতেই তো পারে এমন। তুমি ভালো থাকো। কাউকে ভালো থাকতে দেখলে আমার ভালোই লাগবে। খুব ধীরে ধীরে পুরাটা কথা বলা শেষ করে স্নেহা থামে। বিপুলের কান্না বাড়ে, তবে সে তখন স্নেহার পা থেকে হাত সরিয়ে নেয়। স্নেহাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তকে জোরে একটা ডাক দেয়। শান্ত গিটার বাজাতে বাজাতে কাছে আসে। স্নেহা একবার শান্তর দিকে তাকিয়ে হেসে গায়-
"মেঘের মধ্যে মেঘ হয়ে যাই,
ঘাসের মধ্যে ঘাস।
বুকের মধ্যে হলুদ একটা পাতার দীর্ঘশ্বাস…"
৮ বছর আগের ওই স্মৃতি স্নেহা কিছুটা জোর করেই মনে করলো এই সন্ধ্যায়। স্নেহার স্মৃতিশক্তি খুব একটা খারাপ না। তবে তার মেমোরি তার মতোই খোশ-মেজাজি। যতটুকু প্রয়োজন, যতটুকু প্রিয়, ঠিক ততটুকুই মনে রাখে। এর বাইরে কিছু মনে রাখার দায় পড়ে নাই তার মন আর মস্তিষ্কের। স্নেহা একবার ভাবে- আবিরকে ভুলতে তার মন আর মস্তিষ্ক ঠিক কতটা সময় নেবে? বুকের চিকন ব্যথাটা আবারও সন্ধ্যার অন্ধকার সমস্ত দুনিয়ায় নেমে আসতেই চিলিক মেরে উঠলো।
চলবে…