Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: মাঞ্জা সুতা

March 26, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

233
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

সন্ধ্যার এই সময়টা ব্যালকনিতে বসে সূর্য ডোবা দেখতে খুব ভালোবাসতো স্নেহা। আজকের সন্ধ্যার মতো বিষণ্ন কি এ যাবত কালের সমস্ত সন্ধ্যা ছিল? মনে করার চেষ্টা করে একবার। নাহ, ঠিক বিষণ্ন বলা ঠিক হবে না। এই সময়টা কেমন যেন। একটা ভালো লাগা, আবার কিছুটা বিষণ্নতার মিশ্র একটা ফিলিং। সূর্যাস্তের নানা রকম ছবি তোলাও এক সময় বেশ পছন্দের কাজ ছিল। ভোর আর সন্ধ্যা- এই দুই প্রহরও ওর প্রিয় ছিল আগে। এখন কি নাই? একটু ভাবে। ইদানিং প্রিয় সবকিছুই কেমন যেন ওর খুব দূরের মনে হয়।

অদ্ভুত এক ঘোর লাগা কাজ করে ভোর আর সন্ধ্যার সময়গুলাতে। একটা প্রহর অন্ধকার কেটে আস্তে আস্তে আলো ছড়িয়ে পড়ে পুরা পৃথিবীতে; আর অন্যটায় আলো মিলিয়ে গিয়ে অন্ধকার নামে আসমান আর জমিনের বুকে। এই দুই প্রহরের নির্জনতায় কিছু একটা আছে যা কিছু সময়ের জন্য দুনিয়াদারির অসহনীয় সব ভাবনা-চিন্তা থেকে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ও ছাড়া কারো কোনো প্রবেশাধিকার নাই। যেখানে কেউ যেতে পারে না; যেখানে কেউ যায় না, যে জগতটা ও ছাড়া আর কেউই চেনে না।

ভোর আর সন্ধ্যার প্রার্থনাও ওর খুব প্রিয়। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ নির্ঘুম কাটিয়েছে ও। সারা রাত অস্থির পায়চারিতে কাটিয়ে ক্লান্ত-অবসান্ত শরীর-মনে চুপচাপ ভোরের সূর্যাস্ত দেখতো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে। নিজের সঙ্গে নানা রকম আলাপ আর তর্ক-বিতর্ক করে এভাবে রাতের পর রাত আর ভোরের পর ভোর কেটে গেছে ওর। মূলত ওই সময় থেকেই ফজরের নামাজের অভ্যাসটাও হইছিল। আর কোনো ওয়াক্তের নামাজ পড়ুক বা না পড়ুক, ফজরেরটা ওকে পড়তেও হতো, তাও একদম নিয়ম করে। কোনো একদিন মিস হয়ে গেলেই মন খারাপ হতো ভীষণ। ওই একটা ওয়াক্তের নামাজই যেন ওর জন্য নিয়ম করা হইছে খোদার তরফ হতে, বাকিগুলা পড়া না পড়াতে উনি নাখোশ হবেন না মোটেই!

ভোরের নির্জন ওই সময়ে দীর্ঘক্ষণ সিজদাহতে কাটাতো স্নেহা। কী যে অদ্ভুত এক প্রশান্তি আছে ওই প্রার্থনায়, যেন স্বয়ং ঈশ্বরের সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি হতো ওই নীরবতায়। নীরবে নীরবে খানিকটা কথাও হতো তার সঙ্গে। দীর্ঘক্ষণের সিজদাহ আর মোনাজাত শেষে জানালার পাশে গিয়েও অনেকটা সময় ওই ঘোর কাটতো না ওর। প্রতি ভোরেই নামাজ শেষে রুমির বলা “সাইলেন্স ইজ দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব গড, অল এলস ইজ পুউর ট্রান্সলেশন”  লাইনটা আত্মার অন্তঃস্থল থেকে স্নেহা অনুভব করতো। 

কোন বছরের কথা হবে, একবার সময়ের হিসাব করতে থামে। কী আশ্চর্য! একটা মানুষের সঙ্গে ৬টা বছর একই ফ্ল্যাটে, একই রুমের একই বিছানায় ও রাত-দিন কাটালো, অথচ তার সঙ্গে বিচ্ছেদের সময়কাল মনে করতে গিয়ে মেমোরিতে চাপ পড়তেছে এখন। এমন কী ওই যৌথ সময়ের কোনো স্মৃতিও ওর মনে পড়ে না আর! মানুষের চলতে-ফিরতে গেলেও তো কিছু না কিছু ভুলে হলেও মনে পড়ে; কিন্তু বিপুলের সঙ্গে কাটানো কোনো সময়ের স্মৃতিই ও স্পষ্ট মনে করতে পারে না আর। মনে করতে হয়তো চায়ও না আসলে।

খুব কনসাশলিই যে এটা করে, এমনটা একদমই মনে হয় না স্নেহার। সচেতনভাবে মনে না করার জন্যও যে মনোযোগ দেওয়ার দরকার, ওই সামান্য মনোযোগটাও বেচারা বিপুলের প্রতি ওর কবে যে নাই হয়ে গেছে! অদ্ভুত! অথচ গত দুই বছরে কবে আবির ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠছে, কবে দাঁত দিয়ে নখ কামড়ানোর কারণে ওর ঝাড়ি খাইছে, কবে গাড়ি বাঁকা করে পার্ক করছে, কবে কথা বলার সময় চোখ লুকাইছে আর কবেই বা লুকিয়ে ওকে আড় চোখে দেখছে- সমস্ত কিছু চোখ বন্ধ করলেও একদম ফকফকা চোখের সামনেই ভাসতে দেখে ও!  এমন কী এখনো!

চাইলে এখনো আবিরের অদ্ভুত সুন্দর হাসিটা চোখ বন্ধ করলেই ও দেখতে পারবে…কিন্তু এইটা ও চাইতেছে না এখন। এক প্রকার জোরজবরদস্তি করেই এই না চাওয়াটা ওকে কার্যকর করার প্রয়াস চালিয়ে যেতে হয় সচেতনভাবে। এখানেই বিপুল আর আবিরের স্মৃতির মধ্যে ফারাকটা টের পাওয়া যায় স্পষ্টভাবে। কিন্তু আবির কি ওকে বিপুলের চেয়ে কম যন্ত্রণা দিছে? ও ভাবে! এসব হিসাব খুব জটিল আসলে। বিপুলের যন্ত্রণারা এখন আর স্পর্শ করে না ওকে, বহু আগেই ওইসবের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে গেছে।

স্নেহার কাছে বিপুল এখন কেবলই একজন পূর্ব পরিচিত। ও ভালো থাকলে স্নেহার ভালো লাগবে। খারাপ থাকলে, এই দুনিয়ার আর আট-দশটা অন্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষের খারাপ থাকার কথা জেনে একজন মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষের যেটুকু আফসোস হয়, ওইটুকুই হবে। ব্যাস! এর বেশি কোনো অনুভূতিই আর কাজ করে না বহুদিন যাবত। না রাগ, না অভিমান, না অভিযোগ, না ক্ষোভ, না ক্রোধ, না করুণা, এমন কী মায়াও না। মনে পড়ছে, ২০১৬ সালের ঘটনা। বিচ্ছেদের দশ বছর! যদিও বিপুলের প্রতি কোনোকিছু ফিল না করার শুরুটা হইছিল সম্ভবত ২০১৮ সাল থেকে।

ওই বছরেরই কোনো একদিন; কোন মাস, কয় তারিখ, এসব কিছুই আর এখন মনে নাই স্নেহার। শুধু মনে পড়তেছে; ওইদিন ভর দুপুরে মন উদাস লাগায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়ে বসছিল ও। ওদের সার্কেলের এক ছোট ভাই, শান্ত, দূর থেকে ওকে দেখে দি…দি……দি…দি… বলে চিৎকার করতে করতে সামনে আসছিল হাঁপাতে হাঁপাতে। এসেই ও বলা শুরু করে- আপনি গানের লিরিকটা আমাকে না দিয়ে ফরহাদকে দিলেন কেন? ও সবাইকে বলে বেড়ায় ওইটা আপনি আর ও দুইজন মিলে লিখছেন। কয়দিন পর বলা শুরু করবে একলাই লিখছে। আপনার নামটা ওইখান থেকে আলগোস্তে সরাইয়া দিবে, দেইখেন! শান্তর এমন অভিযোগে নিঃশব্দে হাসতেছিল ও।

কিছুক্ষণ পাশে বসে এটা-সেটা নানা কিছু বলার পর অনেকটা কাঁচুমাচু ভঙ্গীতে বিরাট কোনো অপরাধের কনফেস করার টোনে শান্ত বলে উঠলো- দাদা আছে পার্কে। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়, দিদি। একবার কি কথা বলবেন উনার সঙ্গে? আমাকে বইকেন দরকার হলে, তবুও একটাবার কথা বলেন। দেখেন না কী বলে। আপনাদের দুইজনকেই আমি ভালোবাসি, দিদি। এমন অনুরোধে হালকা বিরক্ত হলেও এক্সপ্রেশনে বিরক্তি ভাবটা প্রকাশ করলো না স্নেহা। সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে গেলে আদিখ্যেতা কেবল তিক্ততাই বাড়াতে পারে, এর বাইরে কোনো উপকারে আসে না- শান্তকে এটা বলতে ইচ্ছা করলো না ওর।

কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে যেখানে বসে ছিল, ওইখানেই ও বসে রইলো। শান্ত ওইটাকে নীরব সম্মতি ভেবে ওর দাদা অর্থাৎ বিপুলকে ধরে নিয়ে আসলো কই থেকে, কে জানে! বিপুল এসে ওর মুখামুখি বসতেই ওর মুখ থেকে একইসঙ্গে কেরু আর গাঁজার বিশ্রী মিশ্র গন্ধটা টের পেতে এক সেকেন্ডও সময় লাগলো না স্নেহার। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে গেল ওর মাথাব্যথাও।

পৃথিবীতে গাঁজার গন্ধের চেয়ে জঘন্য আর কী কী গন্ধ আছে- অনেক চিন্তা করেও হাজারীবাগের ট্যানারির গন্ধ ছাড়া আর তেমন কিছুই ও মনে করতে পারলো না। দশ বছর বয়সে বোর্ডিং স্কুলে থাকার সময় শ্মশানের ঠিক পাশেই একটা রুমে একটা বছর কাটাইতে হইছে ওকে। মড়া পোড়ার গন্ধও গাঁজার চেয়ে উন্নত মনে হয় ওর! লাশ পোড়া ওই গন্ধের স্মৃতি খুব একটা মনে নাই যদিও। তবুও গাঁজার গন্ধের চেয়ে নির্ঘাত সহনীয়ই হবে বলে ওর লাগতেছিল তখন। কিছুক্ষণ মুখামুখি অবস্থানের পর বিপুল ওর পাশে গিয়ে বসে। শান্ত তখন গিটারে টিউনিং করতে করতে খুব ধীর গতিতে গাইতেছিল-

আমি মেঘের দলে আছি,
আমি ঘাসের দলে আছি
তুমিও থাকো বন্ধু হে
বসিয়া থাকো…একটু বসিয়া থাকো…

গাঁজার ওই গন্ধ স্নেহার একেবারে মাথা বরাবর গিয়ে বিঁধতেছিল। ‘মুখ থেকে গন্ধ বের হইতেছে’ অযুহাতে হুট করে ওইখান থেকে উঠে চলে যাওয়া ঠিক হবে না ভেবে আগের মতোই ও চুপ করে বসে থাকে। কোথাও চুপ করে বসে থাকা ওর বেশ পছন্দের একটা কাজ। যেকোনো নির্জন জায়গাতেই চুপচাপ বসে চারপাশ অবজার্ভ করতে ভালোবাসে ও। কিন্তু ওই মুহূর্তে ওইভাবে চুপ করে বসে থাকা স্নেহার ভেতরে একটা বিশ্রী রকম অস্বস্তি তৈরি করতেছিল। কেমন একটা ভালো না লাগা ফিলিং। ওই ভালো না লাগা ফিলিংটা নিয়েও গাঁজার গন্ধ সহ্য করতে করতে ওইভাবে বসে থাকার জন্য নিজের ভদ্রতা বোধকে দুই-একবার ও আবালচোদা বলে গালিও দিলো মনে মনে। জীবনে ভদ্রতা বোধের জন্য কত যে সাফার করতে হইছে ওকে, ভাবতেছিল। অনেক অনেক সাফারিংস তখন চামড়া গণ্ডারের মতো করে তুলছিল অবশ্য। আর এখন? সামান্য টোকাতেই ও ভেঙে পড়ে! কী আশ্চর্য!

৮ বছরের ব্যবধানে নিজের এই অধঃপতনের কথা কল্পনা করে স্নেহার খারাপ লাগার বদলে মায়া হলো। নিজের প্রতি অব্যক্ত মায়া! কিন্তু ওইদিন বিপুলের প্রতি কোনো মায়াই ওর কাজ করে নাই। ওইদিনই প্রথম স্নেহা বুঝতে পারে, বিপুলকে আসলে ও মাফ করে দিছে। একইসঙ্গে ওদের মধ্যে সমস্ত সংযোগও চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ও উপলব্ধি করতেছিল- কোনো যাদুমন্ত্রেই ওই সংযোগ আর পুনঃস্থাপিত হবে না কোনোদিনও। সূর্যের একদম শেষ আলোটুকু ডুবে যাওয়া দেখতে গিয়ে ওর মনে হলো- আবিরও সম্ভবত এখন ওর ব্যাপারে ঠিক একই রকমই ফিল করে! কী ভয়াবহ!

৮ বছর আগে এক বিচ্ছিন্নতা বোধের কারণে ওর জীবনে যেমন স্বস্তি আসছিল, আজকে আরেক বিচ্ছিন্নতার কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটায় খুব চিকন একটা তীব্র ব্যথা টের পেলো ও। মাঞ্জা সুতায় আঙুল কেটে গেলে মুহূর্তেই যেমন গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়; ঠিক তেমন! কিন্তু তীক্ষ্ম সুতার ওই আঘাত রক্তমাংসের ঠিক কতটা গভীরে গিয়ে হানা দিলো অথবা ঠিক কী পরিমাণ জ্বালা-যন্ত্রণা ওই মুহূর্তে ভেতরে বোধ হইতেছে, কাউকে যেমন তা বুঝিয়ে বলা সম্ভব হয় না- ঠিক ওই একই রকম তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণায় ওর ভেতরটাও ছাড়খার হতে থাকে।

ওই দুপুরে বিপুল দুই বছর পর ওর সঙ্গে কথা বলতে আসছিল। কিন্তু কোনো কথাই আসলে ও বলতে পারে নাই। স্নেহার দুই পায়ে হাত রেখে অনেকক্ষণ যাবত শুধু ও কাঁদতে কাঁদতে মাফই চাইতে থাকে। আগে থেকেই অস্বস্তিতে থাকা স্নেহা আরো অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যায় এতে। বিরক্তি বোধটা আর ঠিকঠাক ও টের পাইতেছিল না তখন। অদ্ভুতভাবে ও খেয়াল করলো, বিপুলের কান্না সামান্যতমও কোনো অনুভূতি ক্রিয়েট করতেছিল না ওর ভেতরর। বরং একটা অস্বস্তি বোধ নিয়ে বসে ও মনে মনে ভাবতেছিল- কখন ওর পা থেকে হাত দুইটা সরবে, কখন ও উঠে বাড়ির দিকে রওনা হতে পারবে। কিন্তু বিপুল না পা থেকে হাত সরাইতেছিল, না থামতেছিল ওর অঝোর ধারার কান্না। এ রকম উদ্ভট আচরণ দেখে শান্ত নিজেও কিছুটা বিব্রত হয়ে একবার স্নেহার দিকে তাকায় এরপর হাঁটা শুরু করে অন্য আরেক দিকে।

অনেকক্ষণ এই রকম কান্নাকাটি দেখার পর স্নেহা বিপুলের দিকে তাকিয়ে বলে- তুমি এভাবে কাঁদতেছো, খারাপ লাগতেছে। খারাপ লাগতেছে কারণ কোনো মানুষের কান্নাই আমি সহ্য করতে পারি না। এর বাইরে আর কোনো অনুভূতিই কাজ করতেছে না আসলে। মাফ চাইতেছো কেন? ইট'স ওকে। বহু আগেই তোমাকে মাফ করে দিছি। মায়া, দুঃখ, রাগ, কষ্ট- কোনো বোধই আর ফিল হইতেছে না আমার। কিছুই ফিল করতেছি না আসলে। এভাবে কান্নাকাটি করে জাস্ট অস্বস্তি ফিল করাইতেছো। অনেক মানুষ আশেপাশে আছে, দেখতেছে। খুব বাজে হইতেছে ব্যাপারটা। আমরা একসঙ্গে জীবন কাটাবো বলে এক সময় ভাবছিলাম, সেটা হয় নাই। হবেও না আর কখনো।

একটু থেমে ওর পায়ের উপর পড়া বিপুলের চোখের পানি ঘাসের মধ্যে মুছতে মুছতে আবার ও বলে- তোমার আর আমার জগত সম্পূর্ণ ভিন্ন। হতেই তো পারে এমন। বুঝতে কিছুটা সময় লেগে গেছে। ভিন্ন মেরুর দুই বাসিন্দার বোঝাপড়ার মাঝখানে ‘ভুল'-এর পর্দাটা সবসময়ই ঝুলতে থাকবে নানা আঙ্গিকে। অনেক তো হইছে! আমার জীবনকে আমি এইসব চাপ থেকে এখন মুক্ত রাখাটাই প্রেফার করি। ভুল-ত্রুটি আমারও থাকতে পারে। সিনসিয়ারলি আই'ম সর‍্যি, ইফ আই হ্যাভ এনি। ভালো থাকো। কাউকে ভালো থাকতে দেখলে আমার ভালোই লাগবে।

খুব ধীরে ধীরে পুরা কথা শেষ করার পর স্নেহা আবারও আগের মতো চুপ করে বসে থাকে শূন্যে দৃষ্টি দিয়ে। বিপুলের ফোঁপানির শব্দ খানিকটা বাড়ে। তবে স্বস্তির বিষয়- স্নেহার পা থেকে ও হাত দুইটা অবশেষে সরায়। স্নেহাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দূরে দাঁড়িয়ে শান্তকে কিছুটা উচ্চস্বরেই ডাকে। ও কাছে আসলে স্নেহা প্রচণ্ড শান্তি আর স্নিগ্ধতার একটা হাসি মুখে ঝুলিয়ে গিটারে বাজতে থাকা বিষণ্ন গানের লাইনও বেশ ফুর্তির সঙ্গে গেয়ে উঠে-

মেঘের মধ্যে মেঘ হয়ে যাই,
ঘাসের মধ্যে ঘাস
বুকের মধ্যে হলুদ একটা পাতার দীর্ঘশ্বাস…

৮ বছর আগের ওই স্মৃতি কিছুটা জোর করেই মনে করলো এই সন্ধ্যায়। স্মৃতিশক্তি খুব একটা খারাপ না ওর। তবে ওর মেমোরিও স্নেহার মতোই খোশ-মেজাজি। যতটুকু প্রয়োজন, যতটুকু প্রিয়, ঠিক ততটুকুই মনে রেখে দেয়। এর বাইরে কোনোকিছু মনে রেখে দেওয়ার দায় পড়ে নাই ওর মন আর মস্তিষ্কের। স্নেহার ভাবনায় তখন একটাই প্রশ্ন বিরাট এক বাবল আকারে এসে চুইং গামের আঠায় লেগে যাওয়া চুলের মতো জট বেঁধে বসে আছে- আবিরকে ভুলতে ওর মন এবং মস্তিষ্ক ঠিক কতটা সময় নেবে আর? সন্ধ্যার অন্ধকার সমস্ত দুনিয়ায় নেমে আসতেই চিলিক মেরে উঠলো বুকের ব্যথাটাও।

চেজিং দ্য ড্রাগন: উইথড্রয়াল

Comments

    Please login to post comment. Login