Posts

গল্প

​অন্ধকার কুঠুরির আর্তনাদ: চতুর্থ পর্ব

March 26, 2026

Md Biddut

Original Author BIDDUT

28
View

সেই মুখহীন নারীমূর্তি আর মাটি ফুঁড়ে ওঠা ছায়াগুলোর মাঝখানে আমি যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই লাইব্রেরির দেয়াল ঘড়িটা বিকট শব্দে বেজে উঠল। রাত তখন ঠিক ৩টে। তিনটে বাজার সাথে সাথে এক মুহূর্তের জন্য সব স্তব্ধ হয়ে গেল। ছায়াগুলো দেওয়ালে মিশে গেল, আর সেই নারীমূর্তিটি কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল করিডোরের অন্ধকারে।

​আমি হাপাচ্ছিলাম। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। হাতে ধরা সেই অভিশপ্ত ডায়েরিটা তখনো কাঁপছে। ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই ওল্টাতে শুরু করল এবং একটা পাতায় এসে থেমে গেল যেখানে রক্ত দিয়ে কিছু একটা লেখা ছিল।

 

​ডায়েরির সেই পাতায় লেখা ছিল এক ভয়ঙ্কর সত্য: "মতি মিয়া কোনো মানুষ নয়। সে এই বাড়ির শেষ পাহারাদার, যাকে ১০০ বছর আগে জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়েছিল ধনাগার রক্ষা করার জন্য।"

​আমার মাথায় বজ্রপাত হলো। তাহলে এতক্ষণ আমি কার সাথে কথা বলছিলাম? আমি তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলাম মতি মিয়াকে খুঁজতে। ডাইনিং হলের বড় টেবিলটার ওপর একটা পুরনো লণ্ঠন জ্বলছিল। সেখানে গিয়ে দেখলাম মতি মিয়া বসে আছে, কিন্তু তার পিঠ আমার দিকে ফেরানো।

​আমি কাঁপা গলায় ডাকলাম, "মতি মিয়া?"

​সে ধীরে ধীরে ঘাড় ঘোরাল। কিন্তু তার শরীরটা স্থির থাকল, শুধু মাথাটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে আমার দিকে তাকাল। তার মুখটা এখন আর মানুষের মতো নেই; চামড়া ঝুলে পড়েছে, আর চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

"স্যার, ডায়েরিটা পড়ে নিলেন? তাহলে তো জেনে গেছেন আমি কে। এখন ওই ডায়েরির শেষ পাতাটা দেখুন, সেখানে আপনার নাম লেখা আছে।"

​ডায়েরির সেই নাম

​আমি ভয়ে ভয়ে ডায়েরির একদম শেষ পাতাটা খুললাম। আমার হাত-পা বরফ হয়ে গেল। সেখানে আজকের তারিখ দিয়ে লেখা আছে— "আজ রাতে এক নতুন মেহমান আসবে, যার রক্ত দিয়ে এই বাড়ির অভিশাপ মুক্তি পাবে।" আর তার নিচেই স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আমার নিজের নাম!

​আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে এখানে ভুল বুঝিয়ে আনা হয়েছে। এটা কোনো গেস্ট হাউস নয়, এটা একটা মৃত্যুপুরী। আমি সদর দরজার দিকে দৌড় দিলাম, কিন্তু দরজাটা লোহার মতো শক্ত হয়ে আটকে আছে। বাইরে থেকে কেউ শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে বলে মনে হলো।

​ভূগর্ভস্থ সেই কুঠুরি

​হঠাৎ মেঝের একটা অংশ ধসে গেল। আমি ভারসাম্য হারিয়ে নিচের এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে পড়ে গেলাম। ওপর থেকে মতি মিয়ার বিকট হাসির শব্দ ভেসে আসছে। নিচে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পচা মাংসের গন্ধ। টর্চটা জ্বালিয়ে দেখলাম, আমি একটা বিশাল ভূগর্ভস্থ কক্ষে আছি।

​সেখানে সারি সারি মাটির কলস রাখা। আর প্রতিটি কলসের পাশে একটা করে মানুষের কঙ্কাল বসা। কঙ্কালগুলোর গলায় রুপোর শিকল বাঁধা। ঠিক মাঝখানে একটা বড় বেদীর মতো জায়গা, যেখানে রাখা আছে সেই ভাঙা আয়নার ফ্রেমটা।

​হঠাৎ সেই কঙ্কালগুলো নড়তে শুরু করল। তাদের হাড়ের খটখট শব্দে পুরো ঘরটা গমগম করছে। তারা সবাই ফিসফিস করে বলতে লাগল:

"রক্ত চাই... মুক্তি চাই... আয়নার দরজা বন্ধ কর!"


 

​সেই অমানুষিক দৃশ্য

​আমি দেখলাম আয়নার ফ্রেমের ভেতর দিয়ে একটা কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে একটা দানবীয় রূপ নিচ্ছে। ওটাই সেই 'যক্ষ', যে এই সম্পদের ওপর অভিশপ্ত হয়ে আছে। সে আমার দিকে দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে দিল। তার আঙুলগুলো ছুরির মতো ধারালো।

​আমি যখন পেছাতে গেলাম, তখন দেখলাম আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মুখহীন নারীমূর্তি। সে এবার তার মুখটা উন্মোচন করল। চামড়া সরে গিয়ে সেখানে শুধু একটা বড় গর্ত বেরিয়ে এল, যা থেকে আগুনের শিখা বেরোচ্ছে। সে আমাকে জাপটে ধরল। তার শরীরের স্পর্শে আমার চামড়া পুড়ে যাচ্ছে বলে মনে হলো।

​আমি বুঝতে পারলাম, আজ রাত আমার শেষ রাত। মতি মিয়া ওপর থেকে চিৎকার করে বলছে, "বলি দাও! ওকে বলি দাও!"

Comments

    Please login to post comment. Login